প্রিয় রাত্রি,
আজ তোমাকে আমার চিঠি লিখবার গল্প বলব, চিঠি লিখেই। এই যে চিঠি লিখছি, এই চিঠি মূলত খোলা চিঠি। তোমার ঠিকানা জানি না বলে এইভাবেই লিখতে হচ্ছে। আমি নিশ্চিত জানি না যে এই চিঠি তুমি কখনও পড়বে কি না।
আমার চিঠি লিখবার দিন শুরু হয়েছিল যদ্দূর মনে পড়ে আমি যখন ক্লাস থ্রিতে পড়ি, ১৯৮৯ সালে। প্রথম চিঠি খুব সম্ভবত বাবার কাছে লিখেছিলাম, চিরকুট টাইপ চিঠি। সেদিন তার পকেট থেকে সতেরো টাকা চুরি করে, তার কাছে একটা চিঠি লিখে ফুফুর বাড়িতে পালিয়ে গিয়েছিলাম।
আমি নিয়মিত চিঠি লেখা শুরু করি মূলত ফাইভে উঠবার পর, ১৯৯১ সালে। সেই চিঠি লিখতাম নয়নার কাছে। আমি থ্রিতে থাকতে নয়না নামে আমাদের ক্লাসেরই একটা মেয়ের প্রেমে পড়ি। তুমি হয়তো অবাক হতে পার এই ভেবে যে, অতটুকু বয়সে, মানে মাত্র আট বছর বয়সে কেউ আবার প্রেমে পড়ে কেমন করে? কিন্তু আমি এমনই ছিলাম, একটু আগে থেকেই এইসব অনুভূতির সঙ্গে পরিচিত হয়ে গিয়েছিলাম বহুমুখী সামাজিক ও অসামাজিক কারণে।
নয়না ফোরের ফাইনাল পরীক্ষা দিয়ে অন্য একটা ইশকুলে চলে যাবার পর আমার ভয়ানক যন্ত্রণা শুরু হয়ে গেল। তখন আমি যন্ত্রণা খানিকটা থেকে পরিত্রাণের একটা উপায় বের করে ফেললাম। অঙ্কখাতার উলটো দিক থেকে তাকে চিঠি লেখা শুরু করলাম। লিখে লিখে পাতা ছিঁড়ে বিছানার পাটির তলায় রেখে দিতাম। এইভাবে লিখতে লিখতে দেখা যেত প্রতিমাসে দুইটা করে অঙ্কখাতা শেষ হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু যন্ত্রণা তেমন কমছে না। তখন মাথায় একটা বুদ্ধি এল। নয়নার কাছে আমি প্রতিদিন একটা করে চিঠি পোস্ট করতে শুরু করলাম, তার ইশকুলের ঠিকানায়।
ইশকুলের ঠিকানায় তো লিখতাম, কিন্তু আমি নিশ্চিত ছিলাম না যে সে আমার চিঠি পাচ্ছে কি না। চিঠি তো সবসময় তার গন্তব্যে পৌঁছানোর নিশ্চয়তা বহন করে না। শুরুতেই তোমাকে যে কথা লিখেছি। আর ডাকে দেওয়া হলেও চিঠি পথে হারিয়ে যেতে পারে, ভুল ঠিকানায় পৌঁছাতে পারে, বা এমন কারো কাছে যেতে পারে, বা হাতিয়ে নিতে পারে, যার জন্যে সেই চিঠি লেখা হয়নি। তার মানে এমন চিঠির মাধ্যমে যোগাযোগের প্রক্রিয়া অনির্দিষ্ট ও ঝুঁকিপূর্ণ।
প্রথম কয়েক বছর নয়নার কাছে এমনিতেই দুই টাকার খামে ভরে পোস্ট করতাম, পরে রেজিস্ট্রি করে। রেজিস্ট্রির খরচ জোগাড় করতে আমার প্রাণ হয়ে গেল ওষ্ঠাগত, বাবার পকেট থেকে এক টাকা দুই টাকা সরাই, মায়ের টাকা রাখার হাঁড়ি থেকে এক টাকা বা আট আনা চুরি করি, সুপারি কুড়িয়ে বিক্রি করি, টিফিনের টাকা জমিয়ে দিয়ে একসঙ্গে কয়েকডজন খাম কিনি দোয়েলপাখি মার্কা, পরে স্মৃতিসৌধ মার্কা হলুদ খাম। তারপর অবশ্য ফাইভে সরকারি বৃত্তি পাবার পর, আরও বেশ কয়েকটা বেসরকারি, যেমন অমুক স্মৃতি বৃত্তি, তমুক স্মৃতি বৃত্তি ইত্যাদি পাবার পর টাকার সমস্যা খানিকটা সমাধান হল।
এইভাবে ১৯৯১ সাল থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত এই ৫ বছর নয়নার কাছে আমি ধরতে গেলে প্রতিদিনই একটি করে চিঠি পোস্ট করেছি। গভীর জ্বরটরের সময় হয়তো দুয়েকদিন বাদ যেতে পারে।
রাত্রি, একটা চিঠি একবার লেখা হয়ে গেলে তা লেখকের উপস্থিতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এই ব্যাপার আমি চিঠি লিখবার সেই শুরুর দিনগুলিতেই বুঝতে পেরেছিলাম। তুমি যখন এই চিঠিটা পড়বে, আমি হয়তো তখন অন্য কিছু করছি, বা অন্য কোথাও আছি। এই চিঠিটা আমি আমার মনের একটা বিশেষ মুহূর্তে লিখেছিলাম। যেই মুহূর্তে আমি চিঠিটা তোমাকে পড়ানোর জন্যে আমার কাছ থেকে ছেড়ে দিলাম, সেই মুহূর্তেই চিঠিটা আমার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। এটা আর আমার উপস্থিতি, আমার উদ্দেশ্য বা আমার অনুভবের ওপর নির্ভরশীল থাকল না। ভাবো, আমি হয়তো চিঠিতে খুব যত্ন করে একটা কথা লিখেছিলাম, কিন্তু তুমি যখন পড়লে, তুমি স¤পূর্ণ অন্য কারণে সেটার অন্য অর্থ করলে। এটাই স্বাভাবিক। চিঠি একবার লেখা হয়ে গেলে, সে আর লেখকের কথা শোনে না, সে নিজের পথে চলতে শুরু করে। চিঠিটা যেন নিজেই একটা স্বাধীন মানুষ!
জানো, ১৯৯১ বা ৯২ সালের দিকে একদিন হঠৎ করে আমি নিজেই নিজের ঠিকানায় চিঠি পোস্ট করা শুরু করি! প্রতিমাসে একটা করে চিঠি লিখি নিজের কাছে। হলুদখামের ওপরে আমার ঠিকানা আর পাশে নয়নার ঠিকানা। যেহেতু নয়না কোনো প্রত্যুত্তর দেয় না সেহেতু তার হয়ে চিঠি পোস্ট। তবে খামের ভেতরে চারভাঁজ করা শাদা কাগজ ছাড়া আর কিছু থাকত না। এই শাদা কাগজ পোস্টের ব্যাপার সম্ভবত কোনো বাঙলা সিনেমায় দেখেছিলাম। নায়ক ডাকযোগে খামে ভরে নায়িকার কাছে শাদা কাগজ পাঠাচ্ছে এই রকম। তবে নিজের কাছে শাদা কাগজ পোস্ট করার আইডিয়া আমার নিজের। কারণ নিজের কাছে বানিয়ে বানিয়ে কিছু লিখতে লজ্জা লাগত। নৈঃশব্দ্যের ভাষা যেমন বেশি শব্দময়, তেমন শাদা কাগজের ভাষাও। ইদানীং প্রিয় কোনো মানুষকে খুব মনে পড়লে তার কাছে খালি মেসেজ পাঠাই, কোনো টেক্সট থাকে না।
১৯৯৬ সালের পর নয়নার কাছে কোনো চিঠি আর পোস্ট করিনি। কারণ ওই বছর রোজার ইদের দিন জানতে পারি, আমার পোস্ট করা একটা চিঠিও সে পায়নি। সে অন্য এক গল্প। অন্য এক চিঠিতে বলব।
এর মধ্যে চিঠি লেখায় আমি এতটাই দক্ষ হয়ে গেলাম যে পাড়ার সিনিয়র ভাইদের প্রেমিকাদের জন্যে চিঠি লিখে দেয়া শুরু করলাম। একদিন আমাদের এমন দিন এলো, তিনবেলার জায়গায় ভাত খেতে হতো একবেলা। সেইসব দিনে আমার বৃত্তির টাকা, টিউশনির টাকা ইত্যাদি দাদা মানে আমার বড়োভাই আর আমার একটা জয়েন্ট অ্যাকাউন্টে জমা হতো রুপালি ব্যাংকে। পাঁচ হাজার টাকা জমেছিল। সেই টাকা উঠিয়ে সংসারের কাজে লাগানো হল। আর আমি সিনিয়রদের কাছ থেকে প্রতি চিঠিতে কুড়ি টাকা করে নেয়া শুরু করলাম। সেই সময় সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়ের দুইখণ্ডের রম্য উপন্যাস ‘লোটাকম্বল’ পড়ছিলাম। ওই বইতে এমন একটা চরিত্র ছিল যে, এক লোক পোস্ট অফিসের ধারে বসে টাকার বিনিময়ে লোকজনকে চিঠি লিখে দিত। সেই উপন্যাস শেষ করে আমার মনে হলো আমিও ওই রকম করি। নিতান্তই শিশুতোষ আবেগ। মাকে বললাম। কিন্তু মা ধমক দিয়ে মানা করল। আর হল না। যাইহোক সিনিয়র ভাই-বন্ধুদের কাছ থেকে প্রেমের চিঠি প্রতি সর্বোচ্চ ৫০ টাকাও নিয়েছিলাম। তারা তো প্রতিদিন চিঠি লেখাতো না, মাসে তিনমাসে একটা, তাই পত্রলেখক হিসেবে আয়-রোজগারও আমার কম হতো।
আমি পত্রমিতালিও করতাম। কিশোর পত্রিকার শেষে, চিত্রবাংলার শেষে আর অনেক জায়গায় ঠিকানা লেখা থাকত, ওইসব ঠিকানায় নাম পছন্দ হলেই চিঠি লিখতাম। এইভাবে বেশ কয়েকজনের সঙ্গে পত্রমিতালি হয়ে গেল। তারপর ইশকুলের হোস্টেলে থাকতেও বন্ধুদের কাছে চিঠি লিখেছি, কলেজে থাকতেও, তারাও উত্তর দিত। এক আমার কলেজের প্রেমিকা নূপুরের কাছেই ১৯৯৮ সাল থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত চিঠি লিখেছিলাম প্রায় হাজারখানেক পৃষ্ঠা। তার উত্তরে আমাকে লিখেছিল মাত্র এগারোটা চিঠি। তার বিবাহের পর আমার চিঠিগুলি সে পুড়িয়ে ফেলেছিল, এই কথা সে আমাকে বলেছিল।
প্রিয় রাত্রি, আমি ১৯৯১ সাল থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত এই আঠারো বছরে হাজার হাজার চিঠি লিখেছি। যার বিপরীতে আমার কছে জমেছিল প্রচুর চিঠি, সংখ্যায় গণনা করা যাবে না। তবে ওজনে ৬ থেকে ৭ কেজি তো হবেই। সেইসব চিঠি রেখেছিলাম একটা আবলুশ কাঠের কালো সিন্দুকে। ২০১২ সালে একবার বাড়ি গিয়ে পেট্রোল আর কেরোসিন ঢেলে সব পুড়িয়ে ফেলেছিলাম কোনো পূর্বপরিকল্পনা বা উস্কানি ছাড়াই সহসা। তারপর নিজেকে কেমন ভারমুক্ত লাগছিল! কেমন করে বলি।
তবে আমি নিশ্চিত জানি, সেই সময় যদি তোমার কাছে চিঠি লিখতাম, সব চিঠি তোমার কাছেই লিখতাম, হাজার হাজার চিঠি। আর কারো কাছেই কোনো চিঠি লিখতাম না, লিখবার দরকারও পড়ত না। যাই আজ, আবার কবে তোমাকে কোন অজুহাতে চিঠি লিখব তাইই ভাবি। নিজের যত্ন নিও, আর আকাশের গান হয়ে থেকো।
