বিলের বালক, জলের বাদ্য : রাণা রায়চৌধুরী

স্কুল জীবনে ছিপ দিয়ে মাছ ধরা আমার নেশা ও খেলা ছিল। স্কুল থেকে এসেই ছিপ নিয়ে পুকুরঘাটে দৌড়েছি – বাঁধানো ঘাটের কাছে এসে দেখি, পুকুরের জল থেকে এক বিরাট সাপ একেবারে আমার মুখোমুখি। আমি তখন বালক, ছিপ হাতে ভয়ে স্থির দাঁড়িয়ে আছি – সাপের চোখের দিকে তাকিয়ে। দীর্ঘ সাপও আমাকে স্থির তাকিয়ে দেখছে, অনেকক্ষণ। আমার গায়ে কাঁটা দিচ্ছে, পা কাঁপছে। তারপর সে আমার পাস দিয়ে তার দীর্ঘ দেহ নিয়ে জঙ্গলে চলে গেল। সে যাওয়ায় কি ভয়ঙ্কর সৌন্দর্য যে ছিল, আজও ভাবলে অবাক লাগে।
গ্রামে আমাদের ভাড়া বাড়ির পাশে এক বিরাট পুকুর ছিল। বলতে গেলে, আমাদের বাড়িটা বড় বড় পুকুরেই ঘেরা ছিল একটা দ্বীপের মতো। পুকুর নামক এই বিরাট জলাশয় আমার কাছে ছিল এক রহস্য। বাড়ির পাশের পুকুরটি তো ছিল প্রায় আমার এক ক্লাসের বন্ধু। সে আমাকে সাঁতার শিখিয়েছে, সে আমাকে সুন্দরের দিকে তাকিয়ে থাকা শিখিয়েছে, কত তার যে রূপ ছিল তা অবর্ণনীয়!

সবসময় যে সাঁতার কেটে তার প্রতি অত্যাচার করতাম তা নয়, মাঝেমাঝে তার পারে দাঁড়িয়ে তার সৌন্দর্য দেখতাম। ভোরে তার এক রূপ, শীতে অল্প কুয়াশা-মাখা যেন ঘোমটা টানা লাজুক নারী রয়েছে স্থির হয়ে, নিজেকে আড়াল করে। বেশ ছমছমে পরিবেশ তার চারধারে। পুকুরের জল ঠান্ডা। সবুজ শ্যাওলা তার বসন, দামী শাড়ি যেন তার অঙ্গে। চারিদিকে নির্জনতার মধ্যে সে আরও নির্জন। নির্জনতার ভেতর তার জলে অজস্র মাছ তারাও যেন সবে ঘুম ভেঙে পৃথিবীর আলো দেখার অপেক্ষায় রয়েছে। হঠাৎ সব আড়াল ভাঙল, বা তার মগ্নতার ঘোর কাটল, নারকেল গাছ থেকে এক অল্পবয়সী নারকেল ঝরে পড়ল তার জলে। ঢেউ উঠল পুকুরে। মাছেরা ভয়ে আরো গভীরে লুকোলো।

দুপুরবেলা স্তব্ধতায় তার আরেক রূপ। চৈত্র বৈশাখের দুপুরে পুকুরের ওপরের জল বেশ গরম, কিন্তু তার গভীরে ঠান্ডা, শীতল জল। যেন ঠান্ডা জলের নিচে কোনো রূপসী রাজকন্যা ঘুমোচ্ছে শান্তিতে, নিশ্চিন্তে।

গভীর রাত্রে পুকুর থেকে বিরাট ও বিকট শব্দ আসত। নজরুলদা বলেছিল, বড় বড় মাছে ঘাই মারছে। মানুষ এইরকম ঘাই মারে না। মাছ গভীর রাতে আনন্দে ঘাই মারে, আর তাতে জলে ঢেউ ওঠে। মানুষের জীবনে যেমন নানান ঢেউ আছে, শোকের দুঃখের আনন্দের – তেমন মাছের জীবনেও আছে তা। সে রাত বাড়লে তার সখীকে খোঁজে। সারা পুকুর সে সখীর খোঁজে পুকুর তোলপাড় করে। মাছের যৌন-আনন্দ পুকুরের জলে আনন্দ বয়ে আনে। সেই শব্দ আমরা অধিক রাতে ঘুম ভেঙে গেলে শুনতে পাই। আমার বালকমন আনচান করে ওঠে। কিছুটা ভয়ে সে মায়ের আরো কাছে চলে আসে আশ্রয়ের জন্য।

নজরুলদা ছিল পুকুর বিল এইসবের বিশেষজ্ঞ। নজরুলদারা অন্ধকার থাকতে ভোর রাতে যেত মাছ ধরতে। ওদের অনেক পুকুর লিজ নেওয়া থাকত। আমি অবশ্য সেই বয়সে ‘লিজ’ শব্দের মানে বুঝতাম না। শুধু জানতাম, অন্ধকার রাতে নজরুলদারা এক রহস্যময় পুকুরে জাল ফেলতে গেছে, মাছ ধরবে বলে। আমার ওদের সঙ্গে যেতে ইচ্ছে করত। পুকুরের অন্ধকার রূপ, তার গা ছমছমে সৌন্দর্য দেখব বলে। কিন্তু শাসনের দেয়ালে তা সফল হয়নি আজো।

‘লিজ’ এক বাণিজ্যিক শব্দ। এখন বুঝি। মানুষের বাণিজ্য আছে। পুকুরের বাণিজ্য নেই। মাছের বাণিজ্য নেই। এরা নিরীহ জীবনযাপন করে। লিজ-এর খপ্পরে মাছের প্রাণ যায়। লিজ এক অন্ধকারাচ্ছন্ন শব্দ। তাকে দেখা যায় না। তাকে টাকা দিয়ে গোনা যায়। নজরুলদা ও তার ভাইয়েরা গোনে, পেটের দায়ে লিজের টাকা গোনে। অর্থাৎ খাল বিল পুকুর আমাদের অর্থনৈতিক সমাধান হয়ে ওঠে।

পুকুরের চারধারে ঝোপ জঙ্গল। তাতে সাপের গর্ত। সজনে গাছের ছায়া। সজনে গাছের পাতা পড়ছে পুকুরের জলে। জলে সজনের পাতায় সে এক আলপনা তৈরি হয়েছে। সঙ্গে সবুজ শ্যাওলার আচ্ছাদন। আমরা সেই সবুজ সরিয়ে সরিয়ে পুকুরের এপার ওপার করতাম। জীবনের এপার থেকে ওইপারে যাওয়ার অভ্যাস সেই বালককাল থেকেই পুকুরের জল আমাদের মধ্যে তৈরি করে দিয়েছিল।

আমাদের বাসা বাড়ির সামনে দিয়ে যে রাস্তা গিয়েছিল তা পাকা পিচের রাস্তা ছিল। তারপর মাটির রাস্তা। সরকারি ডাক্তারখানার পর থেকেই মাটির কাঁচা রাস্তা চলে গেছে অনেক দূর দূর গ্রাম অবধি। আমার মা সেই মাটির রাস্তা ধরে গ্রামের স্কুলে পড়াতে যেত। সেই মাটির রাস্তার ধারে ধারে চলেছে এক ছোট বিল। বিলের ধারে শ্মশান। কালীমন্দির। কালীমন্দিরের লাল বস্ত্র পরিহিত পুরোহিতকে আমার কাপালিক মনে হত, ছোটবেলা ভয় ভয় লাগত তাঁকে। একেবারে নির্জন সেই বিলের ধারে পুরোহিত সেই মন্দিরেই থাকত রাতের বেলাতেও। পাশে শ্মশান। শিয়াল ডাকত গভীর রাতে। বিলের পাখিও ডাকত মধ্যরাতে।

একদা এই বিল নাকি ইছামতী নদীর শাখা ছিল। নৌকো চলত। এখন কচুরিপানায় ভরা সবুজ-রঙা বিল, সরু, কিন্তু মাইল মাইল তার ধীর গতি। কচুরিপানার নিচে মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীদের বসবাস। বিলের ধার দিয়ে যে রাস্তা তা দুপুরবেলায় গা-ছমছমে এক স্তব্ধতায় ভরা। রাস্তার মাটির রং সাদাটে। পাশের জঙ্গলে শিয়াল ও সাপেদের সুখের সংসার। গাছে নানান পাখির সুর।

আমি তখন ক্লাস সেভেন হব, আমার এক বন্ধুর বাবা মারা গেলে, তাকে সন্ধে রাতে ওই শ্মশানে দাহ করতে গ্রামের লোকেরা গেল, এবং দাহ করে ফিরেও এল। আমি গভীর রাতে শুয়ে শুয়ে ভাবছি, আমার বন্ধুর বাবা এখন ওই নির্জন বিলের ধারে শ্মশানে শুয়ে আছে। ভাবতেই ভয় ঘিরে ধরল। থমথমে কালীমন্দির, একটা প্রদীপ জ্বলছে, পুরোহিত হয়ত তন্ত্র সাধনায় বসেছেন। আর বিল হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছে। তার পাশে আমার বন্ধুর বাবা – সেও একা শুয়ে আছে শ্মশানে। আগুনের মধ্যে আগুন হয়ে তিনিও হয়তো তন্দ্রাচ্ছন্ন। শিয়ালের ডাকে সেই পরিবেশ অনেক প্রাকৃতিক বাদ্যযন্ত্রের মতো বেজে চলেছে নিশিপ্রহরে। সেই বিলের ওপর জায়গায় জায়গায় বাঁশের সাঁকো। সরকারি ডাক্তার সেই সাঁকোর ওপর দিয়ে বিলের এপার থেকে ওপারের গ্রামে যায় সাপে কাটা রুগী দেখতে।

সেই বিল বা কালো জলের খাল আজও আমার জীবনে বয়ে চলেছে গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে। আমি এখন শহরে থাকলেও, আমার ভিতরে আজো এক নির্জন গ্রাম ও তার খাল-বিল বাস করে। আমি টের পাই।

আমাদের বাড়ির সামনে এক দিগন্ত বিস্তৃত ধানখেত ছিল। আল দিয়ে ঘেরা টুকরো টুকরো ধানা জমি একেকজন মালিকের, কিন্তু সেগুলো মিলে এক বিশাল ধানখেত। আমাদের বাড়িতে ইলেক্ট্রিক পাখা ছিল না। আমরা সেই ধান খেতের হাওয়াতেই গ্রীষ্মকাল কাটাতাম।

আর বর্ষাকালে সেই ধানখেত জলে ভরে বিশাল বিলের মতো লাগত। সাদা সমুদ্রের জল যেন, তাতে স্রোতও বইত। যেন এপার ওপার দেখা যায় না। সেই বিশাল জলাধারের পাশে পাশে আমবাগান, ছোট ছোট গ্রাম। জলাধার পার হলে আমাদের স্কুলের খেলার মাঠ।

রাতের বেলা ঘুটঘুটে অন্ধকারে সেই বিলের মতো জলাধার কেমন যেন থম মেরে থাকত। যেন তাকে গানে পেয়েছে, কিন্তু ঠিকঠাক সুর সে খুঁজে পাচ্ছে না। সুর সে পেত যখন বিদ্যুৎ চমকে আরও তীব্র বৃষ্টি নামত জগত জুড়ে। চারিদিকে কিছু দেখা যেত না, কেমন যেন কুয়াশার মতো ঠান্ডা বাতাস বইত সেই সাময়িক বিলের ওপর দিয়ে। ধান-গাছগুলো তাদের সব সবুজ নিয়ে ডুবে থাকত। শুধু কাকতাড়ুয়া দাঁড়িয়ে থাকত এক বুক জলে। একটা নয় অনেক কাকতাড়ুয়া চাষীরা তাদের জমিতে পুঁতে রাখত। বাঁশের কচার মাথায় এক বিরাট মাটির হাঁড়ি, তাতে মানুষের চোখ আঁকা নাক আঁকা। তারা ওই বর্ষার জলে ঠান্ডায় হিহি কাঁপত।

সেই বিলে নৌকা চলে না। বিলের জলের রং ঘোলাটে সাদা। দীর্ঘ তার দেহ। এবং চুপচাপ একাকী সে রয়েছে, দিনে রাতে দুপুরে। এই বিলের কোনো বহতা নেই। সে স্থির। কিন্তু কাছ থেকে বা দূর থেকে দেখলে মনে হয় – সে গভীর এবং মগ্ন। সে ধ্যানস্থ এক জলের আধার, তাকে বিল বলে ভ্রম হয়। বর্ষার ঠান্ডা হাওয়ায় তার মধ্যে স্রোতেরও উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। তার জলের আড়ালে বিষাক্ত সাপ কিলবিল করে এপ্রান্ত থেকে ওই-প্রান্তে যায়।
পুরো বর্ষাকালটা এই বিলের উপস্থিতি থাকে। শীত এলে আবার ধানখেত জেগে ওঠে। তখন এই দীর্ঘ মাঠ সোনালী ধানখেতের রূপ নেয়।
একদিন একটু বেশি রাত। ঘোর বর্ষার রাত। মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। আমি আর মা আমাদের বাসা বাড়ির বিরাট বড় জানলা দিয়ে তাকিয়ে আছি ওই ধানখেতের জল জমা বিলের দিকে। দেখতে ভালো লাগছিল। কাকাতাড়ুয়া তাকেও আবছা আবছা দেখা যাচ্ছে।

হঠাৎ দেখি অন্ধকারে সেই সাদা মাথার কাকতাড়ুয়া হাঁটতে শুরু করেছে। আমি আর মা অবাক সেই দিকে তাকিয়ে আছি। গা ছমছম করছে। কাকতাড়ুয়া হাঁটতে হাঁটতে, বিলের জল ভেঙে ভেঙে সে এগিয়ে আসছে আমাদের বাড়ির সামনের রাস্তার দিকে।
কাকতাড়ুয়া কী করে হাঁটবে? তার তো পা নেই! কিন্তু সে হেঁটে হেঁটে রাস্তায় উঠল। তারপর আমাদের বাড়ির বিশাল উঠোন পেরিয়ে, আমাদের জানলার সামনে সশরীরে তার উপস্থিতি। মা আর আমি তো অবাক, কিছুটা ভীতও। দেখি আমাদের যে দুধ দেয়, সেই সুবলদা। মাঠের বিলে পেরিয়ে এসেছে এই গভীর রাত্রে। সুবল ঘোষ। যে আমাদের গ্রামের বাড়ি বাড়ি দুধ দেয় সকালে।

সুবলদা মাকে বলল, ‘দিদি আমার মেজ ছেলে অরুণ বিষ খেয়েছে। ঝগড়া হয়েছিল আমার সঙ্গে। তাকে বারাসাতের হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। আমাকে কিছু টাকা দিন।’

মা তার কাছে যা কিছু অল্প টাকা ছিল তা দিয়ে দিল সুবলদাকে। সে প্রচন্ড ঘামছিল। মা তাকে আশ্বস্ত করল, যে ছেলে বেঁচে যাবে। ‘মায়ের মন’ থেকে আমার মা এই আশ্বাস দিয়েছিল হয়তো। তারপর সুবলদা সেই অল্প টাকা নিয়ে আবার সেই ধানখেতের বিল ভেঙে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। বাজ পড়ল আবার বিরাট শব্দে। মা আর আমি কিছুক্ষণ বিমূঢ় হয়ে রইলাম। কারণ অরুণকে আমি চিনি। সে আমার থেকে দু’ক্লাস ওপরে পড়ে, আমাদেরই ইস্কুলে। তার মুখটা মনে পড়ছে বারবার।

খাল-বিল যেমন দুঃখের সংবাদ বয়ে আনে কখনো কখনো, আবার আনন্দের সংবাদও নিশ্চয় বয়ে আনে অন্য কোনো গ্রামে বা পাড়ায়। বিল পুকুর খাল এদের দুঃখ যন্ত্রণা আনন্দ ও বিষণ্ণতা এইসব নিয়েই আমার মন আজো ভিজে থাকে, মৃদু বিষণ্ণতার সুরে। বিলের অন্ধকার যেন এক অপঠিত কবিতার বই। যাকে আমার আজো পড়া হয়নি। বিল বা কোনো জলাশয় বইছে আজো আমার ভিতরে ভিতরে। যার স্রোত আমাকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে।

মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না। আবশ্যক ঘরগুলো * দিয়ে চিহ্নিত করা হয়েছে