স্মৃতি এবং বিভ্রমের অ্যা বিউটিফুল মাইন্ড: জোনায়েদ রশিদ

Memoir বা স্মৃতিকথা নির্ভর ছবি চলচ্চিত্র শিল্পের একটি উল্লেখযোগ্য ধারা। বলে রাখা ভালো স্মৃতিকথা ধারার সিনেমা ঠিক বায়োগ্রাফিক্যাল নয়, দিন তারিখের শতভাগ একুরেসি বজায় রাখার বালাই নাই তাতে। কল্পনার রং এবং ইতিহাসের সত্য দুই-ই মিলেই স্মৃতির মিশেল, তাতেই তৈরি হয় Memoir বা স্মৃতিকথা নির্ভর ছবি। সিনেমা এবং ভালোবাসা নিয়ে একজন চলচ্চিত্র নির্মাতার শৈশবের নষ্টালজিয়া নিয়ে নির্মিত অতি বিখ্যাত Cinema Paradiso এর কথাই ধরা যাক, তাতে পরিচালক জুসেপ্পে তোর্নাতোরের শৈশব কতটুকু আর কতটুকু তার কল্পনা তাতে একজন দর্শকের কী-ই বা আসে যায়। এইসকল তথ্য একজন দর্শকের সিনেমার রসাস্বাদনে কোন বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। নাতিদীর্ঘ এই লেখায় Memoir ধারার আরেকটি অসামান্য চলচ্চিত্র A Beautiful Mind নিয়ে দু’কথা বলা যাক।

সত্য কেবল তথ্য নয়

জন ন্যাশ (১৯২৮-২০১৫), ছিলেন একজন প্রখ্যাত আমেরিকান গনিতবিদ যিনি গেম থিওরি, ডিফারেনশিয়াল জিওমেট্রি- এ অবদানের জন্য বিশ্বজোড়া পরিচিতি পান। অর্থনীতিতে গেম থিওরির ব্যবহার এবং ন্যাশ ইকুইলিব্রিয়াম তত্ত্বের জন্য ১৯৯৪ সালে নোবেল পুরষ্কার পান তিনি। প্রিন্সটনে শিক্ষকতার সময়- তাঁর বয়স তখন ৩০ এর আশেপাশে- থেকেই তার মধ্যে প্যরানয়েড সিজোফ্রেনিয়ার (Paranoid Schizophrenia) লক্ষণ প্রকাশিত হতে শুরু করে। এরপর প্রায় দীর্ঘ ২৫ বছর তিনি এই রোগে ভোগেন। অদম্য চেষ্টায়, স্ত্রীর সহায়তায় ১৯৮০ সাল থেকেই তিনি ধীরে ধীরে পুনরায় তাঁর একাডেমিক কাজে অংশ নিতে থাকেন। ১৯৯৮ সালে প্রকাশিত হয় সিলভিয়া নাসের কর্তৃক লিখিত জন ন্যাশের আত্মজীবনীমূলক বই অ্যা বিউটিফুল মাইন্ড, যার উপর ভিত্তি করে ২০০১ সালে নির্মিত হয় অ্যা বিউটিফুল মাইন্ড চলচ্চিত্রটি।

এইটুকু গৌড়চন্দ্রিকা, এবার সিনেমায় আসা যাক। যেখানে তথ্যের প্রয়োজন ফুরায় সেখান থেকেই চলচ্চিত্রের শুরু; অবশ্য সেটা কেবল চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রেই নয়, বরং যে কোন শিল্পের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। সিনেমায় শুরুতেই দেখি জন ন্যাশরূপী রাসেল ক্রো ছাত্রাবস্থায় হোস্টেলে ওঠেন, রূমমেট হিসেবে পান চার্লস হারমেনকে, যিনি ধীরে ধীরে তার একমাত্র বিশ্বস্ত এবং প্রকৃত বন্ধু হয়ে ওঠেন। হারমেন মানুষের সাথে স্বাভাবিক ভাবে মিশতে না পারা ন্যাশের একমাত্র নিখিলেশ, ন্যাশ ও হারমেন, হারমেন ও ন্যাশ তারা চারজন হরিহর আত্মা। অবশ্য আমরা পরবর্তীকালে আবিষ্কার করব হারমেন নামে আদতে কেউ নেই, ছিলনা কোন কালে, সেটা ন্যাশের সিজোফ্রেনিক মনের সৃজন মাত্র। যেমন নেই হারমেনের ভাগ্নি পার্চি কিংবা সিআইএ’র এজেন্ট উইলিয়াম পারচার। পারচার কর্তৃক ন্যাশকে যে দায়িত্ব দেয়া হয় সোভিয়েত ইউনিয়নের গোপন কোড ভাঙার সেটাও ন্যাশের কল্পনা মাত্র। বাস্তব ন্যাশকে পেন্টাগন কখনো এমন কোন বিশেষ দায়িত্ব দেয়নি। আর্থাৎ সিনেমায় যে দৃশ্যাবলী তৈরি করা হয়েছে তা মূলত পরিচালকের সত্য, চিত্রনাট্যকার/পরিচালকের কল্পনা- যা ন্যাশের সিজোফ্রেনিক মনের দৃশ্যায়নের দারুণ সৃজনশীল উদ্ভাবন। এখানে তথ্যের সত্য নয় তৈরি হয়েছে অনুভবের সত্য। ইতিহাসের উৎপাদন নয় বরং স্মৃতির বিনির্মাণ।

ভালোবাসাই একমাত্র সত্য

জেনিফার কোনেলি অভিনিত এলিসিয়া চরিত্রটি যেন ভালোবাসার প্রতিমূর্তি। যদিও বাস্তবে স্ত্রী এলিসিয়ার সাথে জন ন্যাশের সম্পর্ক পর্দার মত অত মসৃণ ছিল না, তাতে ছিল নানা উত্তান- পতন, জটিলতা। সিনেমার এলিসিয়ার প্রেম, সহমর্মিতা, সেবা ন্যাশের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার ক্ষেত্রে নিয়ামক ভূমিকা পালন করে। সিনেমার শেষ দৃশ্যে আমরা দেখি ন্যাশ নোবেল ভাষণে স্ত্রীকে ধন্যবাদ জানাচ্ছেন আজীবন তার পাশে থাকার জন্য- দৃশ্যটা যদিও টিপিক্যাল হলিউডি ড্রামাটিক, পুরো সিনেমায় আমার বিবেচনায় সবচেয়ে দূর্বল অংশ।
চলচ্চিত্র বাস্তবতাকে প্রতিফলিত করে বৈকি- তবে সে বাস্তবতা ফটোগ্রাফিক নয়। তাতে কল্পনা থাকে, রং, রস থাকে। ফলে এর মিশেলে যে জীবনটা তৈরি হয় তা মূলত লার্জার দেন লাইফ হয়ে ওঠে। সে ঘটনা অ্যা বিউটিফুল মাইন্ড-এও ঘটেছে। এলিসিয়া-ন্যাশের ভালোবাসা জীবনের অধিক হয়ে ওঠে, সে অধিকটুকু দর্শককে ছুঁয়ে যায় নিবিড়ভাবে। অনুভব করি ভালোবাসাই একমাত্র সত্য, একমাত্র নিরাময় যার ছোঁয়ায় বাস্তব-কল্পনার বিভ্রম ফারাক করতে না পারা schizophrenia-ও নিরাময় হয়। ভালোবাসাও মূলত এক বিভ্রম বটে!

প্রতিভা একধরণের পাগলামি

ন্যাশ অসম্ভব রকম প্রতিভাবান গনিতবিদ ছিলেন। প্রতিভার সাথে অবসেশন আর পাগলামি মিশে থাকে। সিনেমার প্রথম অংশে ন্যাশের মেধার দীপ্তি আমাদের চোখ ধাঁধিয়ে দেয়, তেমনি তাঁর ভেতরের অস্থিরতা, বিভ্রম ভয়ও জাগায়। এমন জটিল, লেয়ারর্ড চরিত্রে অভিনয় করা সহজ নয়। সে জটিল কাজটি কী দূর্দান্তভাবেই না করেন রাসেল ক্রো। ন্যাশের নিঃশব্দ অহংকার, মানসিক ভাঙন আর মানবিক কোমলতার দুর্লভ ভারসাম্য এনেছেন ক্রো তার অভিব্যক্তিতে। প্রতিভার এই পাগলামি ধারণ করার জন্য নেহাৎ ভালো অভিনেতাই যথেষ্ট নয়, তা কেবল ক্রো’র মত প্রতিভাবনরাই পারেন।
রন হাওয়ার্ডের পরিচালনায়ও সে সূক্ষতা ছিল যা ভালো এবং মহৎ ছবির মধ্যকার ফাইন লাইন নির্ধারন করে। যে কারণে অ্যা বিউটিফুল মাইন্ড নিছক আত্মজৈবনিক চলচ্চিত্র হয়ে থাকে না, হয়ে ওঠে অনুভবের চলচ্চিত্র যা বাস্তবতার সত্যের সাথে কল্পনার রং মিশেল ঘটিয়ে কাব্যের সত্য হয়ে ওঠে। দর্শককে বিশ্বাস করতে শেখায় ভালোবাসা, অধ্যবসায় এবং পাগলামিতে!

মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না। আবশ্যক ঘরগুলো * দিয়ে চিহ্নিত করা হয়েছে