হলুদ ট্যাক্সি আর এমজি রোড : অনিমিখ পাত্র

AI দ্বারা তৈরি

 

হলুদ বনে বনে-

নাক-ছাবিটি হারিয়ে গেছে সুখ নেইকো মনে-

মাঝেমধ্যে মনে হয়, স্মৃতির জ্যামিতি এঁকে খাতা ভর্তি করার জন্যই এই পায়ে পায়ে জীবনপথে এতদূর আসা। এই পা তোলা আর পা ফেলা। গ্রামজীবনে, বর্ষায় উঠোন কাদা হয়ে গেলে, লাইন করে পাতা ইঁটের ওপর দিয়ে টালমাটাল হাঁটার মতন। মাথার ভেতরে অনির্দিষ্ট জিবি হার্ড ড্রাইভ এই। প্রকৃত কবিদের নাকি ‘সাইনেস্থেশিয়া’ বলে একটা ব্যাপার থাকে। একে সক্ষমতা বললে সক্ষমতা, অসুখ বললে অসুখ। মানে, তখন বর্ণ-ঘ্রাণ-স্পর্শ-স্বাদ-শব্দ এইসব মৌল অনুভূতিগুলি একে অন্যকে প্রতিস্থাপিত করে দেয়। সেইসব ভূতে পাওয়া লেখক-শিল্পী তখন পেয়ে যান রঙের স্পর্শ, গন্ধের স্বাদ কিংবা শব্দের স্পর্শসংবেদন। আলিবাবার ম্যাজিক গুহার মত একটা অনাস্বাদিত আশ্চর্য প্রদেশ তাদের সত্তার ভেতরে হঠাৎ খুলে যায়। তাদের রচনাও সাধারণ পাঠকের কাছে কিঞ্চিৎ দুরূহ ঠেকে তখন। এই ঘটনা যখন ঘটে তখন স্রষ্টা নাকি এক দৈবী আবেশ বা ট্রান্স এর মধ্যে চলে যান। ‘flashing eyes and floating hair’ এইরকম একটা রূপবর্ণনা ইংরেজ রোমান্টিক কবি কোলরিজ চিত্রিত করেছিলেন তার ‘কুবলা খান’ কবিতায়। স্রষ্টাকে তখন নাকি সত্যিই উন্মাদের মতো দেখায়, সে তবে ঈশ্বর নাকি শয়তান তখন?

স্মৃতির ক্ষেত্রেও এরকম হয় অনেকসময়। স্মৃতি এক সতত কুহক। দূরত্ব যত বাড়ে, তার রঙগুলোও তত উল্টেপাল্টে যায়। কখনও কখনও ব্যস্ততম জীবনপটের মাঝখানে কিংবা আনমনা কোনো সান্দ্রসময়ে হঠাৎ আলোর ঝলকানির মত তার অন্তর্ঘাত ঢুকে পড়ে। গা শিরশির করে। ভয় করে। ভয় আমার সবচেয়ে মৌল অনুভূতি। ওই যে হাওয়া ওই যে রঙ সে কি আমারই? অবান্তর স্মৃতির ভেতর যে বালকের মুখ, তার দিকে ভালো করে তাকাতে গেলে হাত পা পেটের ভেতর সেঁধিয়ে যায় কেন?

তখন, সেই ছাত্রজীবনে, কলেজ স্ট্রিটের মেস থেকে গ্রামের বাড়ি ফেরার একটা গন্ধ ছিল। আবার, সেই মফস্বল থেকে কলকাতায় ফেরার রঙ ছিল আরেকরকমের। অনেকসময়ই হাওড়া ব্রিজের মুখটুকু অবধি বাস কিংবা অটোয় চেপে এসে নেমে পড়তাম টুক করে, নীচে বয়ে যাওয়া নিরবধি গঙ্গার জল, ঘরফেরতা মানবস্রোতের সঙ্গে পা মিলিয়ে ব্রিজের ওপর দিয়ে ওইটুকু হাঁটাপথটা যেন শেষপাতে সরিয়ে রাখা স্বাদু ব্যঞ্জনের মতো। ওই 44 নম্বর বাস, এমজি রোডের ট্রাম আর ওই হলুদরঙের ট্যাক্সি। এরা যেন নিরাপত্তার একেকটা স্থায়ী ল্যান্ডমার্ক। হায়, তখন কী আর জানতাম স্থায়ী বলে কোত্থাও কিছু হয় না!

আপেক্ষিকতা তত্ত্ব অর্থাৎ Relativity সম্পর্কে আমার বহুদিনের আগ্রহ। ঠিকঠাক বুঝতে পারা নাকি খুবই কঠিন, তাই বিজ্ঞানীরা আমার মত আম-পাবলিকের জন্য কিছু সহজবোধ্য উদাহরণ সামনে রাখেন। আইনস্টাইন মজা করে সাংবাদিকদের যে কিংবদন্তি হয়ে ওঠা উদাহরণটি রেখেছিলেন তা এইরকম – “একটা জ্বলন্ত উনুনে এক মিনিটের জন্য হাত রাখুন, মনে হবে যেন এক ঘন্টা। একটি সুন্দরী মেয়ের পাশে এক ঘন্টা বসুন, মনে হবে যেন এক মিনিট। এটাই আপেক্ষিকতা।”  আবার, কারো মুখে শুনেছিলাম, এই যে আপনি এই জায়গা থেকে ওই জায়গায় যাচ্ছেন- দুটো জায়গার দূরত্ব নাকি সবসময় এক নয়। মানে, ফিতে দিয়ে মাপলে হয়তো একই মাপ পাওয়া যাবে, কিন্তু তাও নিশ্চিৎ করে বলা যাবে না- স্থান কাল পাত্র ইত্যাদি অনেক ফ্যাক্টর জুড়ে নিয়ে বিভিন্নতার সম্ভাবনাকে স্বীকার করে নিয়ে বলতে হবে!
ব্যাপারটা যে গোলমেলে সন্দেহ নেই। কিন্তু হঠাৎই বিদ্যুৎচমকের মতো জ্ঞানচক্ষু খুলে যায়, হাতের কাছেই দেখি আপেক্ষিকতা তত্ত্বের জলজ্যান্ত প্রমাণ! ভণিতা থাক। খুলে বলা যাক।

এম জি রোড বা পূর্বতন হ্যারিসন রোড ধরে আপনি কলেজ স্ট্রিট কিংবা শিয়ালদহ থেকে হাওড়া স্টেশন যেতে চান? দূরত্ব সর্বদাই স্থির বা একই আছে কীনা আপনার সন্দেহ হতে বাধ্য!  এমজি রোড আসলে একটি ধাঁধা। একেক ঋতুতে কিংবা দিনের একেক সময়ে এমজি রোড ধরে শিয়ালদা টু হাওড়ার দূরত্ব বদলে বদলে যায়। বাসের রেঞ্জ গড়ে ৩৫ মিনিট, কিন্তু দিনের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নরকম। হেঁটে গেলেও লাগবে কমবেশি ঐ আধঘন্টাই। এইবার পুজোর আগে-পরে আপনাকে সম্পূর্ণ অন্য মনোভাব অবলম্বন করতে হবে। একটু দার্শনিকতা আমদানি না করলে আপনি হাওড়া পৌঁছতে পারবেন না। মনে করতে হবে আপনি এই বিপুল সংসারসমুদ্রে অর্থাৎ পথসমুদ্রে সামান্য খড়কুটোটি। নিজেকে নিরুদ্বেগে সেই সমুদ্রে ভাসিয়ে দিতে হবে। বিরক্তি? তাহলেই তাল কেটে যাবে। তারপর পরিস্থিতি সহায় থাকলে ১ ঘন্টা, ফাঁপরে পড়লে দেড় ঘন্টাও লেগে যেতে পারে। কে না জানে, ফিলোসোফি আর ফিজিক্স পরস্পর বন্ধুস্থানীয়! তখন যতই গুগ্‌ল ম্যাপ দূরত্বটা একই দেখাক (৫ কিমি), আপনি মানবেন কেন?

শুধু, খুব সকালে শেয়ারে ট্যাক্সি ছোটে হাওড়ার দিকে। দশমিনিট লাগে। বিশ্বাস হতে চায় না। হলুদ ট্যাক্সি তখন উড়ছে। ট্যাক্সি ধরা একটা আর্ট। কে যাবে আর কে যাবে না আন্দাজ করা একটা প্রতিভা। আমহার্স্ট স্ট্রিটের ধারে ওই যে ট্যাক্সি দাঁড় করিয়ে রেখে ঝিমোচ্ছেন যে চালক তিনি কিছুতেই যাবেন না কোত্থাও। ক্কচিৎ গেলে, ট্যাক্সি চালকের সঙ্গে একটু আধটু ভাব জমানো। আজকাল আমার মনে হয়, সব হলুদ ট্যাক্সির চালকই বুড়ো কিংবা মাঝবয়েসী। মনের ভুল? তা, হবে! এইভাবে, ক্রমে, আমি কলকাতার। তবু কলকাতা আমার হল কি?

সামান্য এই যে কবিতা লেখার চেষ্টা করি, বন্ধুদের সঙ্গে গোল হয়ে বসে লেখা শোনাই, শুনি, তর্ক তুলি- কোনো একদিন এই সৎ প্রতিবেশটিকেই শাশ্বত বলে ভ্রম হয়েছিল। তখনও শিখিনি যে প্রত্যেক ভালো জিনিসেরই একটা এক্সপায়ারি ডেট থাকে। কোনো একদিন গর্ব করে বন্ধুদলের গুণগান গেয়েছিলাম ওই এক ট্যাক্সির ভেতরেই। আমার নিজের কথাগুলো আমার নিজের কানে বিদ্রূপ হয়ে ফিরে আসে আজ। সেই ভাড়ার ট্যাক্সির ভেতরে সেই মুহূর্তসময় ফ্রিজশট হয়ে থেকে যায়। তার রঙও হলুদ। হলুদ আসলে একটা অছিলা।

স্মৃতির ভেতর সমস্ত যানবাহনের রঙই হলুদ। স্মৃতির ভেতর তবে সকলই কি বসন্তপর্যায়? নয় তো! তবু, হাতড়াতে গিয়ে দেখি, হলুদ ট্যাক্সির ভেতর সব স্মৃতি সততই উজ্জ্বলরঙের। এই মহানগরের ভেতর কিয়ৎক্ষণ ছিনিয়ে আনা ব্যক্তিগত স্বর্গ আমাদের। না, ছোটগল্পের মতো হলুদ ট্যাক্সিতে প্রেম আমাদের হয়নি। তখন অতো পয়সা ছিল না। শেয়ার করে, বইমেলা ফেরতা কখনো বা। কলেজ থেকে সহপাঠিনীর লিফট। দ্বিতীয় হুগলি সেতু পেরিয়ে মন্দিরতলা। এক স্পর্শহীন অ্যালবামের পাতায় বন্ধুরা সব জড়ো হয়ে আছি। অভিমানের মেঘ থেকে বৃষ্টি হবার দিনে সেই বন্ধুদলের তুমুল হইহল্লা। এখন আর মেঘ নেই। এখন খুব ঠাণ্ডা বরফ।

শীত করে। বুড়ো হতে থাকার মতো সাদা রঙের ওলা উবের ঢুকে পড়ে জীবনের ভেতর। সেইসব ঠাণ্ডারঙ ক্যাবের ভেতর থেকে এখন আমি হলুদ ট্যাক্সির ছবি তুলি খুব।

মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না। আবশ্যক ঘরগুলো * দিয়ে চিহ্নিত করা হয়েছে