❝ইক্কিউ কেবল অদ্ভুত স্বভাবের গুরুই ছিলেন না, ছিলেন জেন ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও
অদ্ভুত চরিত্র। জাপানি শিশুদের কাছে তিনি এক রূপকথার নায়ক। জাপানের বাচ্চারা যে ‘ইক্কিউ-
সান’ নামে বিখ্যাত এনিমে সিরিজ দেখে বড় হয় সেটা ইক্কিউ সোজুনের চরিত্র থেকেইঅনুপ্রাণিত—
যেখানে এক শিশু সন্ন্যাসীকে দেখা যায় বুদ্ধিমত্তা ও চালাকির ছলে সবসময় সামুরাই ও শিক্ষকদের
বোকা বানায়, পরাস্ত করে। একজন জেন বৌদ্ধ গুরুর এই জনপ্রিয়তা অকল্পনীয়।
ইক্কিউ সোজুন (Ikkyū Sōjun; 一休宗純; ১৩৯৪-১৪৮১)—জাপানের মধ্যযুগীয় একজন অদ্ভুত স্বভাবের অন্যন্য ও প্রথাবিরোধী জেন-গুরু, কবি, দার্শনিক ও ক্যালিগ্রাফার। এমনিতেই আধ্যাত্মবাদী গুরুদের হেঁয়ালি ও রহস্যময়তার স্বভাব থাকে তূরীয় মার্গে। তাঁর উপর ইক্কিউর পাগলাটে চরিত্র;—যে কারণে তাঁকে ‘উন্মাদ ঋষি’ নামে ডাকা হতো। অবশ্য ইক্কিউ নিজেই নিজের নাম দিয়েছিলেন ‘পাগল মেঘ’(Kyōunshū/ Crazy Cloud)। ইক্কিউর স্বভাবের একটা নমুনা রাখছি তাঁর এই উক্তিটাতে,
“বুদ্ধ তো কবেই মরে গেছে। এখন তাঁর পচা হাড়গোড় দিয়ে ওরা মন্দির গড়ে।”
অথচ জাপানি শিল্প ও সাহিত্যে তাঁর অবদান অন্যতম এবং এখনো জনপ্রিয়। জেন-ভাবনা ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গি তিনি কবিতায় সুষমভাবে মিশিয়ে দিতে পারঙ্গম ছিলেন।
ইক্কিউ-র জন্ম ১৩৯৪ সালে কিয়োটো শহরের এক ছোট শহরতলিতে। বলা হয়ে থাকে, তিনি সম্রাট গো-কমাতসুর অবৈধ সন্তান ছিলেন (সেই হিসেবে ‘রাজপুত্র’ ছিলেন বটে)। তাঁর মা ছিলেন দরবারে কর্মরত নিম্নস্তরের একজন নারী। পরিস্থিতির শিকার হয়ে দুইজন বাধ্য হন সাগা-তে (জাপান) পালিয়ে যেতে। সেখানে ইক্কিউ দাসদের তত্ত্বাবধানে বড় হন।
পাঁচ বছর বয়সে ইক্কিউ মায়ের কাছে থেকে আলাদা হয়ে কিয়োটোর রিনজাই জেন মঠ (জেন এর শাখা) ‘আনকোকুজি’-তে শিক্ষানবীশ হিসেবে যোগ দেন। ওই মঠের গুরুরা চীনা সংস্কৃতি ও ভাষা শিক্ষা দিতেন—এই পদ্ধতিকে বলা হতো ‘গোজান জেন’। মঠ থেকে তাঁর নাম দেওয়া হয় ‘শুকেন’। ওখানে তিনি চীনা কবিতা, শিল্প ও সাহিত্য শিখতেন।

তেরো বছর বয়সে ইক্কিউ কিয়োটোর ‘কেননজি’-তে (রিনজাই ধারার বৌদ্ধ মন্দির) প্রবেশ করেন, যেখানে এক বিখ্যাত ভিক্ষুর কাছে জেন অধ্যয়ন শুরু করেন।
এই সময় থেকেই ইক্কিউ অপ্রচলিত ছন্দে কবিতা লিখতে শুরু করেন। তাঁর অভ্যাস ছিল, রাখঢাক না রেখেই কেননজি-র নেতৃত্বের কড়া সমালোচনা করা। কারণ তিনি শ্রেণি বৈষম্যের বিরুদ্ধে ছিলেন এবং এই মঠে আধ্যাত্মিক অনুশীলনের যথেষ্ট অভাব রয়েছে বলে মনে করতেন।
১৪১০-তে ষোল বছর বয়সে ইক্কিউ কেননজি ছেড়ে ‘মিবু’ মন্দিরে যান, যেখানে আচার্য ছিলেন সেইসো। ভালো না লাগায় কিছুদিন পর সেখান থেকেও চলে যান ‘সাইকিনজি’-তে, লেক বিওয়ার অঞ্চলে। সেখানে গুরু কেন’ও-র একমাত্র ছাত্র ছিলেন তিনি,—এই গুরু সত্যিকারের রিনজাই জেন শেখাতেন বলে ইক্কিউ মনে করতেন। কেন’ও-র শিক্ষা ছিল আচমকা ও কঠোর প্রকৃতির, আর তিনি জাজেন (ধ্যান)-এর শ্রেষ্ঠত্বে বিশ্বাস করতেন।
১৪১৪ সালে গুরু কেন’ও মারা যান। ইক্কিউ-র বয়স তখন একুশ। ইক্কিউ অন্ত্যেষ্টি সম্পন্ন করে সাত দিন উপবাস করেন। গুরুর মৃত্যুতে তিনি গভীর হতাশায় লেক বিওয়াতে আত্মহত্যারও চেষ্টা করেন। কিন্তু ভাগ্য সুপ্রসন্ন, তীরে থাকা ইক্কিউর মায়ের এক পরিচিত ব্যক্তি তাঁকে আত্মহত্যা করা থেকে বিরত করেন। এ-নিয়ে তাঁর একটি কবিতা আছে :
মৃত্যুর দরজা খুলে ভেতরে ঢুকেছি।
ফিরেও এসেছি, গিয়েছি আবারও। আবার ফিরেছি। তখন—
হাওয়ায় তেজ। উষ্ণ বৃষ্টি। ভোর—চাঁদটা বিবর্ণ হচ্ছে।
এরপর ইক্কিউ ‘কাসো’ নাম্নী একজন নতুন গুরু খুঁজে পান—যার শিক্ষার ধরনও ছিল কেন’ও-র মতো। ইক্কিউ সেখানে বহু বছর ধরে কঠোরভাবে কোয়ান* অনুশীলন করতেন আর জীবিকা নির্বাহের জন্য কিয়োটোর এক বণিকের জন্য পুতুল তৈরি করতেন। ১৪১৮ সালে তাঁকে ‘মুমনকান’-এর ১৫ নম্বর কোয়ান সমাধান করতে দেয়া হয় (সফলও হন)।
(*কোয়ান (公案) : জেন শিক্ষার কৌশল। যা স্বচরাচর বিরোধাভাসপূর্ণ, বিভ্রান্তিকর, পাল্টা প্রশ্ন-ধাঁধা-উক্তি ও গল্প-মূলক। একটা বিখ্যাত কোয়ান যেমন- ‘এক হাতে বাজানো তালির শব্দ কীরকম?’ ইত্যাদি।)

একদিন অন্ধ গায়কদের একটা দল গান গাইছিল আর সেই সঙ্গীতে ডুবে থাকাকালে ইক্কিউ কোয়ান-১৫ এর রহস্য উপলব্ধি করেন। এই অন্তর্দৃষ্টির স্বীকৃতি হিসেবে কাসো তাঁকে নতুন ধর্মীয় নাম দেন—“ইক্কিউ”, যার অর্থ “এক মুহূর্ত”। ১৪২০ সালে, লেক বিওয়াতে নৌকায় বসে ধ্যান করার সময়, কাকের ডাক শুনে তিনি সাতোরি (এনলাইটেনমেন্ট) লাভ করেন। কাসো তাঁর এই জাগরণ স্বীকার করেন এবং তাঁকে ইঙ্কা (জেন স্বীকৃতি) প্রদান করেন। কিন্তু এর ফলে তাঁর সহ-শিক্ষার্থী ইয়োসো হিংসাত্মক হয়ে ওঠে—পরবর্তীতে যে কিনা মঠের নেতৃত্ব পায়। ইক্কিউ তাঁর কবিতায় ইয়োসো-কে এমন এক চরিত্র হিসেবে দেখান, যে জেন বিক্রি করে ধন-সম্পদ গড়ছে। এর বিস্তারিত আলাপ বরং থাকুক। শুধু উল্লেখ করি, ৪৭ বছর বয়সে ইক্কিউ নিজের সাতোরি-র সমস্ত সনদ পুড়িয়ে ফেলেন।
ইক্কিউ প্রায়ই ঝামেলায় পড়তেন। অতিরিক্ত মদ্যপান করায় অতিথিদের সামনে কাসোর অসন্তুষ্টির কারণ হতেন। শেষমেশ কাসো ‘ইঙ্কা’ প্রদান করেন ইয়োসো-কে এবং তাঁকেই উত্তরাধিকারী করেন। এতে ইক্কিউ মঠ ছেড়ে দেন এবং বহু বছর ভ্রাম্যমাণ জীবন কাটান। তবুও তাঁর চারপাশে সবসময় কবি ও শিল্পীরা থাকতেন।
এই সময়েই তিনি এক অন্ধ গায়িকা “মোরি”-র সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোলেন, যিনি ছিলেন তাঁর শেষ বয়সের প্রণয়িনী। লেডি মোরি-কে নিয়ে একটা কবিতা রাখছি :
ছিল পত্রহীন গাছ—তাতে বসন্ত দিয়েছ এনে।
এখন অঙ্কুর দীর্ঘ সবুজ, ফুল ও পল্লবিত হয়ে।
মোরি, তোমার এ-ঋণ যদি কখনো ভুলি—
আমি পথ খুঁজে খুঁজে নিজেই নরকে বাড়াব পা
(মোরির প্রতি)
(*কবিতাটিতে প্রেমিকা লেডি মোরি-র প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন ইক্কিউ, যিনি এক কঠিন সময়ে পাশে দাঁড়ান, দিকনির্দেশনা দেন। কবিতার সারল্য ও সরাসরি বলা বাক্য কবির অকপট আন্তরিকতা ও কৃতজ্ঞতা চিহ্ন।)
ইক্কিউ সবসময় চেয়েছিলেন জেনকে প্রতিষ্ঠানের বাইরে বাস্তব জীবনে বাঁচতে। তবে, “ওনিন যুদ্ধ”-এর সময় দাইতোকুজি ধ্বংস হয়ে যায়। পরে ইক্কিউকে সেখানে অধ্যক্ষ (অ্যাবট) হিসেবে নিযুক্ত করা হয়—যা তিনি অনিচ্ছায় গ্রহণ করেন। এর মাধ্যমে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে রিনজাই জেন বংশের একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিতে পরিণত হন।
ইক্কিউর গুরুত্ব ও জীবন- যাপন :
শুরুতেই বলেছি, ইক্কিউ ছিলেন জেন ইতিহাসের অদ্ভুত চরিত্রের কিন্তু অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জেন গুরু। জাপানি শিশুদের কাছে তিনি এক রূপকথার নায়ক। জাপানের বাচ্চারা যে “ইক্কিউ-সান” নামে বিখ্যাত এনিমে সিরিজ দেখে বড় হয় সেটা ইক্কিউ সোজুনের চরিত্র থেকে অনুপ্রাণিত, শিশু সন্ন্যাসীকে দেখা যায় বুদ্ধিমত্তা ও চালাকির ছলে সবসময় সামুরাই ও শিক্ষকদের বোকা বানায়, পরাস্ত করে। একজন জেন বৌদ্ধ গুরুর এই জনপ্রিয়তা অকল্পনীয়।
ইক্কিউকে জাপানি চা অনুষ্ঠান ও কালিচিত্রকলার অন্যতম প্রভাবক হিসেবেও গণ্য করা হয়। ইক্কিউর শিষ্য মুরাতা জুকো এই চা অনুষ্ঠান চালু করেন। ইক্কিউ তাঁকে বলেছিলেন, চা বানানোও জেন-এর অংশ। বিখ্যাত বৌদ্ধ মন্দির ‘দাইতোকু’ (যে মন্দিরটিকে ধ্বংস করা হয় যুদ্ধের সময়) সবসময়ই চায়ের আনুষ্ঠানিকতার কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। বহু মহান গুরু এখানে চা খেতে এসেছেন। তবে এই চা অনুষ্ঠানের নেপথ্যের গল্পটি মজার—
ছোটবেলায় ইক্কিউ তাঁর গুরুর খুব পছন্দের একটা পুরনো চায়ের কাপ ভেঙে ফেলে, অবশ্যই অনিচ্ছাকৃতভাবে। গুরু যখন হাজির হচ্ছিলেন, ইক্কিউ কাপের ভাঙা অংশগুলো লুকিয়ে ফেলল। প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে বলল, ‘গুরুজি, মানুষ মারা যায় কেন?’
‘এটাই স্বাভাবিক, প্রাকৃতিক,’ গুরু জবাব দিলেন, ‘সবকিছুরই নির্দিষ্ট সময় থাকে, আয়ু থাকে, তার স্থায়িত্বও নির্দিষ্ট। মৃত্যু নিয়ে দুঃখ করা উচিত না; এটা জীবনেরই অংশ।’
ইক্কিউ হাসতে হাসতে ভেঙে যাওয়া কাপটা সামনে এনে বলল, ‘গুরুজি, আপনার চায়ের কাপের মৃত্যুর সময় এসেছিল।’
এসব থেকে দূরে, রিনজাই জেন প্রথায় তিনি একই সঙ্গে বিধর্মী ও সাধু হিসেবে গণ্য ছিলেন। এলোমেলো জীবন-যাপন, চুল-দাড়ি বা পোশাকের প্রতি বেখেয়াল, ঐতিহ্য ও নিয়মের তোয়াক্কা না করার স্বভাব সম্পর্কে আগেই ধারণা দেয়া হয়েছে। যেমন :
১। পাথরের বুদ্ধ (প্রাণহীন)
পাখিদের মল সব তার গায়ে যেন নামে।
আমার জীবন্ত হাত (প্রাণময়)
হাওয়ায় ফুলের মতো, দুদিকের পাপড়ি।
২। কেউ মরে গেলে তাঁকে কেন ‘বুদ্ধ’ বলে?
কেননা সে অভিযোগ করে না এটা-ওটা নিয়ে
কারো বাড়া ভাতে ছাই দেয় না, পাকা ধানে মই দেয় না।
কারো অশান্তি সাজে না সে।
৩। মিথ্যা বলে দেখো একটা; পড়বে নরকে গিয়ে।
ভাবি, বুদ্ধের কী হাল হবে? বলে কিনা, সব মায়া, ভ্রম!
ইক্কিউর যৌনতা বিষয়ে যাবার আগে প্রেম নিয়ে তাঁর সারল্য সম্পর্কে উল্লেখ করা প্রয়োজন। নয়ত সামান্য ভুল বোঝাবুঝির সুযোগ হবে। অবশ্য এখানে পুঁথিগত পণ্ডিতদেরও ব্যাঙ্গ করেছেন :
প্রতিদিন, প্রতিনিয়ত, পুরোহিতরা
ধর্মগ্রন্থ বিশ্লেষণ করে আর পাঠ করে জটিল যত সূত্র।
যদিও মন্ত্র জপার আগে পড়তে শিখতে হবে—
হাওয়া আর বৃষ্টির, চাঁদ আর তুষারের লেখা প্রেমপত্র।
ইক্কিউ বলতেন, যৌন অভিজ্ঞতা তাঁর জাগরণের গভীরতা বাড়িয়েছে। তিনি পতিতালয়ে যেতেন কালো সন্ন্যাসবস্ত্র পরেই। কারণ তাঁর মতে যৌন মিলনও ছিল ধর্মীয় অনুশীলন। তাঁর এই কবিতাটি থেকে কিছুটা ইঙ্গিত পাওয়া যায় :
একজন নারী স্নানরত, কী মনোরম একটা দৃশ্য :
তোমার ফুলের মতো মুখ—আদুরে শরীর ঘষে—
সাফ করো আর এক বুড়ো ঋষি উষ্ণ জলে বসে
দেখে চীনের রাজার চেয়ে ধন্য ভাবছে নিজেকে।
ইক্কিউ বলতেন, “জীবনকে বুঝতে হলে সবকিছুর স্বাদ নেবারই দরকার আছে।”
তবে তিনি জেন-কে রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক দুর্নীতি থেকে দূরে রাখতে সাবধান করতেন। ইক্কিউর জীবদ্দশায় জাপানে ছিল গৃহযুদ্ধ, অস্থিরতা ও সহিংসতা। বিশেষ করে ওনিন যুদ্ধ (১৪৬৭-১৪৭৭) যুদ্ধের ভয়াবহতা ইক্কুকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। তিনি তার কবিতায় সংঘাত এবং মানব আগ্রাসনের বোকামির প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করেছিলেন। ইক্কিউর কবিতায় পৃথিবীর বিশৃঙ্খলার প্রতি নিন্দা করা বাক্য, তার সঙ্গে জেন অন্তর্দৃষ্টির সামঞ্জস্য তাঁর কবিতায় উঠে আসে। এই যুদ্ধকালে চা-অনুষদ খ্যাত দাইতোকু মন্দির ধ্বংস হয়ে যায়। ব্যথিত ইক্কিউ লিখলেন—
“পঞ্চাশ বছর/ এক মুক্ত ভবঘুরে/ এখন লাঞ্চিত/ গাঢ় বেগুনি পোশাকে।”
(*গাঢ় বেগুনি পোশাক – জেন বৌদ্ধে উচ্চপদস্থ গুরুপদে আসীন বা স্বীকৃত ধর্মগুরুর পোশাক।)
একটি কবিতায় সরাসরি যুদ্ধের অসারতা উঠে আসতে দেখি :
‘এটা তো জেনের সময় না। / শেখানোর সময় না, শেখার সময়ও না।/ বরং একটা লাঠি হাতে নাও/ আক্রমণকারীদের ঘাড়ে ঘা বসাও…’
তিনি ফুকে সম্প্রদায়ের ওপর প্রভাব ফেলেছিলেন, কারণ তিনি মধ্যযুগীয় জাপানের অন্যতম বিখ্যাত বাঁশির সন্ন্যাসী ছিলেন। বিখ্যাত সঙ্গীত “মুরাসাকি রেইবো” তাঁর রচনা বলে ধরা হয়। ইক্কিউর শিক্ষা ছিল, হাসি-তামাশা ও স্বাধীনচেতা একটি পবিত্র ব্যাপার। বলতেন, “কর্মই প্রকৃত ধ্যান, বিভিন্ন আসনে চুপচাপ বসে থাকা ধ্যানের চাইতে হাজারগুণে শ্রেয়।” তিনি বিশ্বাস করতেন, জেন কোনো পলায়নবাদ না, বরং জীবনকে পূর্ণরূপে বাঁচা।
কবিতায় ইক্কিউ :
ইক্কিউ হাজারের অধিক কবিতা লিখে গেছেন কানবুন ধারায় (ক্লাসিক্যাল চাইনিজ)। ইক্কিউর কবিতার বৈশিষ্ট্য সংক্ষেপে বললে : জেন আধ্যাত্মবাদী, আত্মপলব্ধিগত জ্ঞান, নিত্যতা ও অনিত্যতা, প্রকৃতি, প্রেম ও কামনা, বিদ্রুপাত্মক ও রসিকতাপূর্ণ, মৃত্যু ও মুক্তি, সংক্ষিপ্ত, সরল ও সরাসরি বা অলঙ্কারমুক্ত বা জটিলবাক্যমুক্ত, অথচ গভীর—বিশেষত জগতের নশ্বরতা, নির্জনতার চিত্র, কখনো বিরোধাভাসপূর্ণ হলেও জেন দর্শনের সহজাত বিষয়কেন্দ্রিক। যেমন- অস্তিত্বের স্বভাব, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা-কেন্দ্রিক জ্ঞান এবং দৈনন্দিন সহজাত বিষয়। তাঁর অধিকাংশ কবিতাই নান্দনিকতায় অমনযোগী। নিজের কবিতা নিয়ে যে উচ্চাকাঙ্ক্ষী ছিলেন, তাও না। সেই ইঙ্গিত পাই এই কবিতায় :
১। লিখে যাও, যত যা জানার, যত প্রশ্ন
এর উপরে ঘুমিয়ে যাও
জেগে উঠে দেখবে—তুমি আর নাই।
এর আরেকটা ভার্সন আছে :
লেখো, আর রেখে যাও পিছে—এই স্বপ্নে।
জেগে উঠে দেখবে তা পড়ার মতো কেউ নাই।
২। আকাশে তাকাও, দৈনিক দুনিয়া দেখো।
লাল মাংস, সাদা হাড় :
এ দুইটার ভেতরে তোমার যে চাপা পড়া
ভ্যাবারাম শুধু বেঁচে থাকা।
(*শরীরের ভেতরে জীবাত্মার এই চ্যাপ্টা অবস্থাকে ব্যাঙ্গ করার খেয়াল নশ্বরতা সম্পর্কে সচেতন করে।)
৩। এই স্বপ্ন এত সুন্দর কেন যে, এত উন্মাদনা কেন?—কেন?
৪। এই হলো আমাদের জগত-সংসার—
এইখানে আমরা খাইদাই, হাগি, জাগি, আবার ঘুমাই।
এ নিয়েই আমাদের জগত-সংসার।
এইসব জগতদারি শেষে আমাদের
মরে যাওয়া ছাড়া কাজ নাই।
৫। যে পৃথিবী দেখছি তা আমার মতোই ক্ষয়ে ধস্ত অনুজ্জ্বল ও নষ্টে যাওয়া;
বার্ধক্যে পৃথিবী তার ঝঞ্ঝাগ্রস্ত আসমান। ঘাস শুকিয়ে, ঘাসের ইয়ে—
নাই, হাওয়া নাই, এখনো বসন্ত তবু—হাওয়া নাই। আছে হিম শুধু আর
আমার কুটিরটাকে গিলে ফেলা শীত।
একটা বিষয় লক্ষণীয় যে, ইক্কিউর কবিতা সচরাচর লিরিক্যাল না হলেও একেবারেই যে না, তা নয় :
এই হৃদয়, চেতনাটা কী?
হাওয়ায় কাঁপা বন পাইনের সুর—
অনিচ্ছায় না আঁকা চিত্র নাকি?
ঐ চিত্র থেকে মন আর কতদূর?

এবার একটা মজার ঘটনা বলি। ইক্কিউ কৌতুক করে তাঁর আশ্রমের নাম দিয়েছিলেন ‘অন্ধ গাধার কুটির’। বছরের পর বছর যখন গেল, ততদিনে তাঁর আশ্রমে মানুষের ভিড় বাড়ল। যাদের অধিকাংশই সাধারণ সংসারী মানুষ, একটু ধ্যান-জ্ঞানের আশায় আসত। এসে দ্বিধায় পড়ত নাম দেখে। মৃত্যুশয্যায় শুয়ে ইক্কিউও ভাবছিলেন মজা করে, তাঁর দর্শন/মত/ধর্মের নাম কি শেষমেশ ‘অন্ধ-গাধা’ রাখলেন? স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে লিখলেন :
আজকাল সিদ্ধ ভিক্ষু যারা দীর্ঘ প্রশিক্ষিত—
নিজের বয়ানে হয় আত্মমুগ্ধ আর
ভাবে কী হনু, কী হনু (দক্ষতায়)।
আর এই মেঘ পাগলের কুটিরে যে দক্ষতা বলে কিছু নাই শুধু
সত্যের সামান্য ঘ্রাণ, তাও পুরানো হাড়িতে রাঁধা ভাতের গন্ধে চাপা পড়া।
এছাড়াও প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মকে ব্যঙ্গ করে লিখেছেন :
গুরুর সত্য মাপা যায় না ফিতায়। তবু—
পূজারিরা জিহ্বাটা নাচায়। আর জেন নিয়ে বকবক করে।
আমি, এই বুড়া ভিক্ষু—বাহ্যিক ধর্মাচারে কভু দিই নি পাত্তা। শুধু
বুদ্ধের সম্মুখে জলন্ত ঐ ধূপে নাক সিটকানো ছাড়া
আর কিছু পালন করিনি।
ইক্কিউ ছিলেন একজন প্রকৃত সন্ন্যাসী। স্বভাববশত নির্জনতাকে ভালোবাসতেন। এর প্রমাণ মেলে এখানে :
১। কেউ যদি না আসে, বেশি ভালো লাগে।
বরং সঙ্গী ঝরাপাতা, ফুল ঐ হাওয়ায় কাঁপা।
একজন জেন ভিক্ষুর এই যেটুকু বাঁচা—
আর শুকনা বড়ই গাছে হঠাৎ যেভাবে আসা
শত শত ফুল।
২। পাগল মেঘ- এখানে বন্দি।
যেখানে তিনটি কক্ষ—সাতটা প্রাসাদ তুচ্ছ করে।
রাত্রি এখানে গভীর হয়
আমি একা নিজের মাঝেই।
গভীর রাত্রিকে মুছে দিতে চাইতেছে অই চাঁদটি।
৩। পুঁথির বিদ্যা আর কঠোর ধ্যানে তুমি হারিয়ে ফেলতে পারো আদি মন, স্বকীয়তা।
অথচ, একটা জেলের উদাস সুরও অকৃত্রিম ও অমূল্য রত্নের ভাণ্ডার হতে পারে।
গোধূলিবেলার বৃষ্টি, নদীর উপরে, আর মেঘের ফোঁকরে উঁকি-ঝুঁকি অই চাঁদটার—
শব্দের অতীত এ-সৌষ্ঠব—তার মাঝে আপন মনের সুর—কতদূর যায়, সারারাত্রি।
(*এটা ইক্কিউর সোজুন একটি বিখ্যাত কবিতা। জ্ঞানের সন্ধানে ধ্যান ও বাস্তব অভিজ্ঞতার পার্থক্য তুলে এনেছেন। ‘আদি মন’ : জেন-এর মূল ধারণা (本心/honshin)—মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত, জাগ্রত ও নির্মল মনকে বোঝায়। ইক্কিউর স্বভাবসিদ্ধ বিদ্রোহী জেন ভাবনার দেখা মেলে এখানে, ‘বই না, বোধই পথ।’ যা জেলেটির প্রকৃত অভিজ্ঞতা ও প্রকৃতির সঙ্গযাপনে দেখানো হয়েছে সেই আদি-মন; যেটা ধ্যানের আচারনিষ্ঠার শুষ্কতায় হারিয়ে যায়।)
৪। পথে, পাইনের কাঁটা বিছিয়ে রাখো, যে কেউ তোমার ধ্যানের কুটির খুঁজতে আসবে না।
ইক্কিউর আধ্যাত্মবাদ :
১। কেউ ফুলকে ফুটতে বলে না। কেউ বলে না কখন ঝরতে হবে বসন্ত ফুরালে।
২। দোহাই, দোহাই! ঘাবড়ানোর মতো কিছু নাই।
কতবার বলব এ কথা?
না-থাকার (অস্তিত্বহীনতার) কোনো পথ নাই—
এই তুমি যেই হও ভাই আর যেখানেই থাকো।
৩। একা আসা। যাওয়া একা।
দুটোই ছলনা। বরং আমাকে শেখাতে দাও—
কীভাবে আসতে না হয়, আর
কীভাবে—না যেতে হয়।
৪। যে কুয়া খোদে নি কেই, পানি নাই—
তাতে কেউ ঢেউ তুলে ভারহীন নিরাকার পানি খাইতেছে
আহা! সবুজ সবুজ উইলো, কত রঙ।
আমি জানি রঙগুলা—নাই আদতেই।
৫। চেরিগাছ ভেঙে, কেটে, ভেতরে দেখো না খুঁজে
ফুল পাও কিনা—
অথচ বসন্তে, হাজার হাজার ফুল এমনি ফুটবে
৬। কোথাও যাবার যদি না থাকে, তাহলে প্রতিটা রাস্তাই সঠিক।
৭. ইক্কিউর এনলাইটেনমেন্টের কবিতা
বিশটা বছর—দ্বন্দ্ব ও উৎকণ্ঠায় আমি—রাগ আর
উত্তেজনায়। কিন্তু সময় আমার এলো…
কাক হেসে ফেলে,
সূর্যের কোমল রশ্মি এসে মুখে পড়ল—গান গেয়ে
মৃত্যু
১৪৮১ সালে, সাতাশি বছর বয়সে, ইক্কিউ ম্যালেরিয়ায় মারা যান। তাঁর শেষ কথা ছিল, ‘আমি মরতে চাই না।’ বোধিপ্রাপ্ত কারো মুখে এই কথা এক আশ্চর্য বটে। তবে তাঁর শেষ কবিতাটি ছিল :
এই জগতে, আমার জেনের কদর করার সাধ্য
কার আছে?
হসু তাং—
সেও এর এক ফুটো পয়সারও দাম বুঝবে না
[*Hsü-t’ang : চীনা (তথ্য পাইনি) চ্যানগুরু (চিনা ভাষায় ‘জেন’।) এই কবিতাও ইক্কিউর স্বভাবসুলভ বিদ্রুপ।]
মৃত্যুর পূর্বে তিনি অনুসারীদেরকে স্পষ্ট করে বলে যান, “আমার মৃত্যুর পর কেউ যদি চায় বনে বা পর্বতে যেতে, বা মদ ও নারীতে মজে থাকতে, সমস্যা নাই। কিন্তু কেউ যদি জেন-কে নৈতিক শিক্ষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়, প্রচার করে, নীতিশাস্ত্র কপচায়, তবে তারা ইক্কিউর শত্রু।” মৃত্যু নিয়ে তাঁর একটা কবিতা পাই এরকম :
আমি মরব না। যাবই না কোথাও।
চিরকাল থাকব এখানে।
কেবল তখন কোনো প্রশ্ন করে লাভ নাই।
আমি পারব না জবাব দিতে।
