আমারও একটা বিল ছিল: ফুয়াদ হাসান

AI দিয়ে তৈরি ছবি

আমারও একটা বিল ছিল একদিন। কোনও নামডাক ছিল না তার।

কখনও সে শুকিয়ে চৌচির হয়ে যেতো, ধুলো উড়তো, কখনও হয়ে যেতো সে এক ঝিল, সাদা বকের দল এসে নামতো তার বুকে, কখনও আবার কী নিবিড় সবুজ হয়ে থাকতো, কখনও সোনালি, কখনওবা হলুদ আবার কখনও ধূসর।

কোনো-কোনো দিন ভোরের কুয়াশা চুইয়ে নামতো আলের গা বেয়ে। পথিক হেঁটে যেতো বিলের আঁকাবাঁকা পথ ধরে। লোডশেডিংয়ের মতো রাত নেমে আসতো তার আঁচলে। প্রতি ঋতুতে চেহারা বদল হতো তার, নানারূপে ধরা দিতো সে আমাদের কাছে।

ভোরের সেই প্রশান্তিময় বাতাস, রৌদ্রগন্ধমাখা শুনশান দুপুর, বিকেলের ছায়া ও মায়ার খেলা, সন্ধ্যার অচেনা এক বিষণ্নতা, রাতের জোনাকি মিছিল — কখনও আর ফিরে আসবে না।

কস্মিনকালেও আর ফিরে পাবো না, গ্রীষ্মের হারিয়ে যাওয়া বিকেলগুলো,বর্ষায় জমে থাকা জল, প্রেমিক ব্যাঙের ডাক, হেমন্তের সোনালি রঙে ছেয়ে যাওয়া চারপাশ, দলবেঁধে ধান খেতে আসা একদল আবাবিল। চড়ুই-শালিকদের পাশাপাশি আমাদের মতো এদিকসেদিক ঘুরে বেড়ানো ঘাসফড়িং। কোথায় পালিয়ে গেলো তারা। কোনওকোনও সময় আবার সর্ষেফুলে হলুদ হয়ে থাকতো সারা বিল আর আমরাই হয়ে যেতাম মধুমৌমাছি। নেচে গেয়ে বেড়াতাম, সেই ফুলের তীব্র ঝাঁঝ উপেক্ষা করে। ছুটে যেতাম বিলের একপাশ থেকে অন্যপাশ।

শীতের শিশির এসে মুক্তার মতো জমে থাকতো যে কচি ঘাসে, সেই সবুজ, সেই ধুলো, সেই নরম কাদামাটি এখন কোথায় হারিয়ে গেছে সেই চাঁদরঙা রাত। খোলা বিলে যে চাঁদ এখন আর আমার পিছুপিছু ছুটে না। ধান কাটা হয়ে গেলে সেই মাঠ এখন আর আমাকে খেলতে ডাকে না।

অথচ, ধান তুলে নেয়ার পর কত রঙবেরঙের খেলায় দিনভর মেতে থাকতাম আমরা, হাত-পা ছিড়ে যেতো নাড়ায়। ধুলোমাটিতে একাকার হয়ে সন্ধ্যের সাথে ঘরে ফিরতাম। বর্ষায় আল ধরে দৌড়ে যেতে গিয়ে কতবার পড়ে গেছি কাদায়, কত রাতে বাজার থেকে ফিরতে পথ হারানো ভূতে ধরেছে আমাকে। আবার মাঘের কুয়াশা ভেঙে মাথার সিঁথির মতো বিলের আঁকাবাঁকা সেই চেনা পথ ধরে চলে যেতাম দূরের কোনো মেলায়।

চাঁদনি রাতে গোল্লাছুট, রুমালচুরি খেলায় মেতে উঠতাম কখনও। ফসল কাটা হয়ে গেলে আরও কত নাম না জানা খেলার আয়োজন হতো। খাবারের সময়টুকু ছাড়া সারাদিন কেউ আর ঘরেই  ফিরতাম না।

একটু দুপুর হলেই দলবেঁধে চলে যেতাম পাশের ধুরংখালে গোসল করতে। বালি দিয়ে বানাতাম ঘর, ভাঙতাম আবার। শুকনো মৌসুমে সাঁতার কেটে চলে যেতাম ওপারে, হাত দিয়ে, জামাকে জাল বানিয়ে মাছ ধরতাম, খালের চরের তরমুজ ক্ষেতে ঢুঁ মারতার কখনও, বাঁশঝাড়ের শো শো শব্দের ছায়ায় জিড়িয়ে নিয়ে, পাখির বাসা থেকে ছিনিয়ে নিতাম নীলাভ ডিম, কুমারপাড়া পেরিয়ে, পানের বরজের পাশ ঘেঁষে মাটির রাস্তা দিয়ে হেঁটে চলে যেতাম বাঁধের পার। সেটা ছিল আমার শৈশবের একমাত্র পার্ক— বেড়ানোর জায়গা।

বর্ষা এলেই ভয়ে থাকতাম ধুরংখালকে নিয়ে। কখন যে সে এসে দুকূল ভাসিয়ে নিয়ে যায়! এমনিতে নদীটি খুব শান্ত, নিরিবিলি প্রকৃতির কিন্তু দূর পাহাড়ে একটু বৃষ্টি নামলেই ভয়ানক এক স্রোতস্বিনী রূপ ধারণ করতো। তখন তাকে আর চেনাই যেতো না একদম। নৌকা পারাপার বন্ধ হয়ে যেতো। দুপারে দাঁড়িয়ে থাকতো মানুষ। সাহসী কেউ কেউ ঢেউয়ের মধ্যে নেমে ভেসে যাওয়া গাছ খুঁজে আনতো।

প্রতি বর্ষায় কোনো না কোনো জায়গায় নদী ভাঙতো। চায়ের মতো ঘোলা একদল পানি এসে নিমিষেই সবকিছু এলোমেলো করে দিতো। ভেঙে যেতো প্রায় সবকটা কাঁচাপাকা ঘরবাড়ি। নদী, পুকুর, বিল, রাস্তা, দোকানপাট সবকিছু একাকার হয়ে যেতো। সারাদিন ভেজা শরীরে ঘুরতে থাকতাম এ-বাড়ি থেকে ও-বাড়ি। নদীর পানির স্বাদ পেলেই পুকুরের সব মাছ বের হয়ে যেতো। বড়দের সাথে জাল নিয়ে বেড়িয়ে যেতাম তখন, কারো হাতে লোটা, খালুই।

জল নেমে গেলে পুরা বিল ঢেকে যেতো পলিমাটিতে। নরম পলিতে চা ডুবিয়ে কী যে সব খুঁজে বেড়াতাম দিনমান! পলিমাটির ঘ্রাণে

ফসলে-ফসলে আবার ছেয়ে যেতো চারপাশ।

তখন বিলের মাঝখান চিরে নতুন পাকা সড়ক হয়েছে মাত্র। সে রাস্তা চলে গেছে দূর পাহাড়ে। একপাশে ধুরুংখাল অন্যদিকে বাজার।

সড়ককে মাঝ বরাবর রেখে বিলের দুপাশে দু’ দলে ভাগ হয়ে মাটির ঢেলা মেরে যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলতাম আমরা। নতুন মহাসড়ক দিয়ে প্রায় সময়ই সেনাবাহিনীর গাড়ি যেতো পাহাড়ের দিকে, আমরা কখনও বিলের কাদাজলে শুয়ে মুক্তিযোদ্ধা সেজে মিছামিছি হামলা চালাতাম সৈন্যদলকে। কখনও চোখে পড়লে তারা হাসতো, আবার কখনও তারাও ভান করতো গুলি করার।

বাঁশের তৈরি তীর-ধনুক, গুলতি নিয়ে কোনওকোনও নির্জন দুপুরে বেরিয়ে যেতাম পাখি শিকারে। একবার এক শালিককে মেরে দু’দিন জ্বরে ভোগার পর জীবনে কখনও আর শিকারে যাইনি।

তখনকার বিলে এখনের মতো সারাবছর চাষ হতো এমনও নয়। বছরে তখন একবারই ধানচাষ করা হতো। আলপথ দিয়ে হাঁটতে-হাঁটতে ধানের ছড়া হাতে নিয়ে রস চিবিয়ে খেতাম। সেই কচিধানের দুধটুকু চিবিয়ে খেতে কী যে মজা লাগতো!

কখনও জমিতে ফেলন লাগানো হতো, চাষ হতো মরিচ, বেগুন, মূলা, চমেটো আর খিরা! সেই সময়ের পাকা টমেটোর স্বাদ আজকাল আপেলেও পাওয়া যায় না! ক্ষেত থেকে নিয়ে কত টমেটো ও খিরা খেয়েছি। কার ক্ষেত, কার জমি সেদিকে কোন খেয়ালই ছিল না কারও। কেউ তখন ডাকও দিয়েছে বলে মনে পড়ে না। আজকাল সবকিছু থেকেই যেন স্বাদ উঠে গেছে।

আমাদের একটা বিল ছিল, বিশাল, নাতিদীর্ঘ, ছোটো… আমার একটা বিল ছিল। দেখা যেতো না এপার থেকে ওপার। আর এখন চোখ থেমে যায় বারবার, আটকে থাকে নাগরিক কোলাহলে। এখন আর কোনো বিল নেই, ইট-পাথরের জঙ্গল, কোন ক্ষেত নেই, মানুষের দঙ্গল। আমাদের এখন আর কোনও বিল নেই। পুরো দেশটাই তো এখন প্রায় শহর হয়ে গেছে। সমগ্র পৃথিবীটা এখন একটা বাজার। আমার এখন আর কোনও বিল নেই।

আমার সন্তানদের কল্পনায় কোনো বিল নেই।

One thought on “আমারও একটা বিল ছিল: ফুয়াদ হাসান

  1. বিল! কতো স্বাধীন, মজার হৈ হুল্লোড় ভরা সেই বিলের দিনগুলো। মনে করিয়ে দিলেন। আমারও একটি বিল ছিলো। বাড়ির দক্ষিণে বলেই ” দইনা বিল” নামে সবাই চিনতো। শীতের দিনে মরিচ, টমেটো, কুমড়া, শসা, কিরা এবং জিভে জল ঝরানো তরমুজ এর ফলন হতো। পাকা টমেটো ছিঁড়ে কাঁচা মরিচ ও ধনে পাতায় বড় কলা পাতার উপরে মেখে খাওয়ার সুখ স্মৃতি এখনো আনন্দ দেয়।
    বর্ষার দিনে জলকেলি, মাছ ধরে জলকাদায় জড়াজড়ি করে দূরন্ত কৈশোর ফুরিয়েছে।
    হারিয়ে যাওয়া বিল মনের স্মৃতিতে বেঁচে থাকুক ‘ গুমাই বিল’ এর কল্যাণে। শুভ কামনা রইলো সবার জন্য

মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না। আবশ্যক ঘরগুলো * দিয়ে চিহ্নিত করা হয়েছে