পুরনো বন্ধুর খোঁজে: নাহিদ ধ্রুব

AI দিয়ে তৈরি ছবি

যখনই নিজেকে উল্টেপাল্টে দেখি, কোন এক ক্লান্ত দুপুর কিংবা বিকেলে, যখন এই কসমোপলিটন হাওয়ায় ভার হয়ে আসে বুক, যখন মনে হয় সব গ্রাস করে নিচ্ছে পুরনো অসুখ, যখন মনে হয় সকলই নিরর্থক আর জীবনের দিকে ফণা তুলে আছে শীর্ণ সাপ, যখন মনে হয় আর কিছু নয়, কিছুটা শুভ্রতা ছড়ানো যাক, যখন নিরিবিলি বসে থাকি নিজের কাছে, মনে হয়, ফিরে যাই — যদি যেতে পারতাম শৈশবের দিকে। শৈশব মানে গ্রাম, ধুলোমাখা পথ ধরে বেড়ে ওঠা। শৈশব মানে বৃষ্টির দিন, ঈশানকোণে কালো মেঘ, শ্রাবণধারা। আরও অনেক লেখায় বলেছি, আবারও বলি, এই দেশ ছেড়ে যদি কোনদিন চলে যেতে হয়, যদি চলে যাই তবে এই দেশের বর্ষার জন‍্য আমি জনম জনম কাঁদবো। শৈশবে গলা ছেড়ে পড়া, ‘বর্ষণমুখর সন্ধ্যা’ রচনার মতো, আজও বর্ষা, শুধু বর্ষাই যেন তাড়িত করে আমাকে। প্রাণ খুলে আমি ঘোষণা করতে পারি, আমি এক বর্ষাহত মানুষ।

এই স্মৃতিগদ‍্য বর্ষা নিয়ে নয়। তবু, বর্ষার কাছে হাত পেতেছি কিছু শব্দের খোঁজে কেনো না, বর্ষার পেট থেকে যেন বেরিয়ে এসেছে আমাদের শৈশবে দেখা সে-ই অপার্থিব সুন্দর এক বিল। আমার গ্রামের বাড়ির কথা বললে, এখন হয়তো অনেকেই চিনতে পারবেন, দেশের নানান প্রান্ত থেকে মানুষ এখন এখানে বেড়াতে আসে। শাপলার বিল নামে পরিচিত, বরিশালের সাঁতলা / বাগধা গ্রামেই জন্মেছিল আমার বাবা, ওখানেই আমার দাদাবাড়ি, ঐ গ্রামেই চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন আমার দাদা/দাদী। না, ঐ গ্রামে আমার শৈশব কাটেনি, আমি যেন চিরকালই নগরমুখী মানুষ, কিন্তু জীবনে যে অল্পকিছু মধুর স্মৃতি খুব যত্ন করে গুছিয়ে রেখেছি মনে, সেসবের সাথে ঐ গ্রাম মিশে আছে অবিনশ্বর কোন গন্ধের মতো আর ঐ গ্রাম মানেই তো আমাদের নিজস্ব বিল।

বিলের গল্প বলতে গিয়ে মনে পড়লো, দাদা’র মৃত্যুর কথা। আজ, অনেকদিন পর। স্মৃতি বড় অদ্ভুত, এখনও প্রতারণা করা শেখেনি। তখন আমি বেশ ছোট। ক্লাস ফাইভ কিংবা সিক্সে পড়ি। হঠাৎ খবর এলো, দাদা আর নেই, দোতলায় সিঁড়িতে উঠতে গিয়ে পড়ে গেছে এবং তখনই মৃত্যু। মৃত্যুকালে আমার দাদার বয়স হয়েছিল প্রায় ১০৫ কিংবা ১১০ বছর। রূপকথা মনে হলেও এটাই সত্যি। ফলে, দাদাকে আমি যখন পেয়েছিলাম, তখন তিনি পড়ন্ত বেলায়, তবে শক্ত ছিলেন বেশ। গ্রামে গেলেই তৈরি করে দিতেন পাতার বাঁশি, জগতের সমস্ত রূপকথার গল্প যেন বেরিয়ে আসতো তাঁর হৃদয়ের অলিন্দ থেকে… ভয় দেখাতো ভূতের আর আমরা তাঁকে জড়িয়ে ধরতাম আশ্রয় ভেবে। এ এমন এক খেলা, যেখানে কোন পরাজয় নেই। দাদা মরে গেল। আমরা দূরদেশ থেকে ছুটলাম সর্বস্ব হারানো দিকভ্রান্ত পথিকের মতো। তখনও ছিল বর্ষাকাল। বাড়িতে যখন পৌঁছলাম, তখন ভেঙে পড়ছিল আকাশ, মনে পড়ে।  বাড়িতে যেতে হতো অনেক সংগ্রাম করে, নদী থেকে বিল হয়ে নৌকায় চড়ে। যেহেতু বর্ষাকাল, পূর্ণ যৌবনা কোন চাঁদের মতো আমাদের বিলটা তখন ফুলে উঠেছিল। চারিদিকে শাপলা, কী মনোরম দৃশ্য। চারিদিকে কান্নার রোল মিশে যাচ্ছিল বিল থেকে উঠে আসা বাতাসের সাথে, মনে হয়েছিল আমাদের সাথে কাঁদছিল বিলটাও।

শুকনো মৌসুমে এই বিলেই ধান চাষ করতো আমার পূর্বপুরুষরা, বর্ষায় যখন ডুবে যেত ঘাসজমি, যখন শাপলায় ভরে যেত চারপাশ, যখন বেড়ে যেত পানকৌড়ির আনাগোনা, তখন তাঁরা ছোট নৌকায় ভেসে ভেসে মাছ ধরতে যেত বিলে। আমিও গিয়েছি শৈশবে। কখনও প্রমোদ ভ্রমণে, কখনও মাছ ধরার নিয়তে। এই বিলের মধ‍্যে লুকিয়ে থেকেই আমার বাবা মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন, এই বিলের মধ‍্যেই লুকিয়ে ফেলা হয়েছিল কতো লাশ। বাবার মুখে কতো গল্পই না শুনেছি এই বিল নিয়ে, আমারও রয়েছে কতো স্মৃতি!

বর্ষায় আমাদের বিলটাকে আয়নার মতো মনে হয়। যেন ওখানে তাকালেই দেখা যাবে পৃথিবীর রূপ। বিলের জলে নিজের মুখচ্ছবি দেখে কতবার নিজেকে পবিত্র ভেবেছি, সেসব গোপন কথা নাহয় অন্য কোনদিনের জন‍্য তোলা থাক। দুই পাশে থইথই জল আর মাঝখানে ফনিক্স সাইকেলে চড়ে দূর থেকে আরও দূরে চলে যাওয়ার কথাও মনে পড়ে, মনে পড়ে বিলের মধ‍্যে ছোট্ট একটা ঘরে বসে শোনা ছোট কাকার ভৌতিক সব গল্পের কথা। এখনও যখন ফিরে যাই গ্রামে, কোন এক ভরা বর্ষায়, কোন এক আনন্দভ্রমণে, বিলের দিকে তাকাই, মনে হয় বিলও তাকিয়ে আছে আমারই দিকে, মনে হয়, এমন প্রখর দৃষ্টির সামনে কোনকিছুই গোপন থাকে না। মনে হয়, এই বিলের মধ‍্যেই লুকিয়ে আছে আমার প্রিয় ছেলেভুলানো গান, মনে হয় যা কিছু সবচেয়ে সুন্দর করুণ, এই বিলের বুকেই আছে তার স্থান।

মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না। আবশ্যক ঘরগুলো * দিয়ে চিহ্নিত করা হয়েছে