জন্মজনপদ থেকে ছিন্ন হওয়া মানুষ সারাজীবন বুকের ভেতরে বয়ে নিয়ে চলে সেই জন্মস্থান, বয়ে নিয়ে চলে শৈশব কৈশোরের নদীটিকে। যেমন নিরন্তর বয়ে চলা নদী তিস্তাকে আমিও বয়ে যাচ্ছি ক্রমাগত। এই কলকাতা শহরে আমি যেখানে থাকি, তার পাশ দিয়ে চলে গেছে টালিনালা। মজে যাওয়া, দুর্গন্ধময় সেই টালিনালার পাশে আমি মনে মনে বইয়ে দিই তিস্তাকে। বৃষ্টির কলকাতায় পাড়ায় পাড়ায় জমে ওঠা জলের মধ্যেও উঠে আসে বিধ্বংসী তিস্তার সর্বগ্রাসী বন্যার ছবি। যেন দুটো আলাদা প্রকৃতিতে বাস করে যাচ্ছি দীর্ঘ দীর্ঘ দিন। কলকাতায় ঝলমলে হেমন্তকাল এসে পড়লে আমার মনের মধ্যে উঁকি দেয় আমার ফেলে আসা জলশহরের উত্তরের সীমানা জুড়ে রুপোলি কাঞ্চনজঙ্ঘা। সেখানকার শীতের রোদে সেঁকে নেওয়া উষ্ণ লেপ কম্বলের পরতের গল্প, বা শীতের স্যাঁতসেঁতে দিনে উঠোনের আগুন পোহানো গল্পগাছাগুলো কলকাতার অলিগলিতে আমার সঙ্গে সঙ্গে চলে। চা-বাগানের শেড ট্রিগুলোতে ফুটে ওঠা ফুলে বসন্তর এসে পড়ার সঙ্গে আমি মিলিয়ে দিই কলকাতার দু-একটা কৃষ্ণচূড়াকে। জন্মজনপদ থেকে বিচ্ছন্ন হওয়া মানুষ মাত্রই জানে এই দ্বৈত জীবনযাপনের যন্ত্রণা।
কেউ একজায়গা থেকে ছিন্ন হয়ে অন্যজায়গায় শেকড়হীন বাঁচার চেষ্টায় পার করে দেয় জীবন। কেউ কেউ ভেসে বেড়ায় মেঘের মতো এদিক ওদিক, কোথাও আর সহজে থিতু হওয়া হয় না। শুধু বুকের মধ্যে আঁকড়ে থাকে তার জন্মজনপদটি।
এইরকম একজনের সঙ্গে আমার দেখা হয়ে যায় কালিম্পঙের রাস্তায়, ভ্যান ম্যাননের দেওয়া ক্যামেরা নিয়ে তিনি ছবি তুলে বেড়াচ্ছিলেন। এই রকম একজন যাঁর ভেসে বেড়ানো ছাড়া কোনো উপায় ছিল না। তাঁরও ছিল নিজস্ব খরস্রোতা তিস্তা, তাঁরও ছিল কাঞ্চনজঙ্ঘার আলো। সেই হাফ চিনা হাফ তিব্বতি মানুষটাকে আমি দেখছি এতবছর পেরিয়ে। খরস্রোতা তিস্তার ওপর যেখানে মেল্লি ব্রিজ, সেখানে তখন বাঁশের সাঁকো পেরচ্ছিলেন তোয়ান।
আমাদের চিরচেনা রাস্তা কালিঝোরা, সেবক ব্রিজ দিয়ে যখন তোয়ান নেমে আসছেন শিলিগুড়ির দিকে, তখন আমি সঙ্গ ধরলাম তাঁর। আমরা যেখানে পিকনিক করতে যেতাম, কুড়িয়ে আনতাম রং-বেরঙের পাথর, ১৯২৬ কিম্বা ১৯২৭ সালে সে জায়গার বর্ণনা দিচ্ছেন তোয়ান য়ঙ।
কে জানত আমার দেখা শুকিয়ে যাওয়া কালিঝোরা তখন বৃষ্টির দিনে ডুবিয়ে দিতে পারে একটা আস্ত মোটর গাড়ি! ভেসে যাচ্ছিলেন তোয়ান। তোয়ানের সঙ্গে সঙ্গে আমিও একটা পাথর আঁকড়ে ধরে ভেসে যাওয়া থেকে বাঁচালাম নিজেকে। তখন ওইটুকু রোগা ছেলে তোয়ান ওই পাথরটুকু হাতের সামনে না পেলে ভেসেই যেতেন সে-যাত্রায়। কোনো ক্রমে পাঞ্জাবি মালিকের সঙ্গে সেবক স্টেশনে পৌঁছতে পেরেছিলেন তিনি। সেই তোয়ানের প্রথম রেলগাড়ি দেখা। এইখানে অপরাজিতর অপুর সঙ্গে বিস্ময়ের কোনও পার্থক্য নেই চাইনিজ বয় তোয়ানের। হ্যাঁ নিজেকে চাইনিজ বয়ই বলতেন তোয়ান। তোয়ানের বাবা ছিলেন একজন চিনা সৈনিক, মা তিব্বতি। ১৯১১ সালে চিন -তিব্বত যুদ্ধের সময় তিব্বতিদের হাতে বন্দি হয়ে তিনি ভারতে পালিয়ে আসেন। আরও কিছু সঙ্গী সাথীর সঙ্গে তোয়ানের বাবা-মা ঘাঁটি গাড়েন কালিম্পঙে। কালিম্পঙে এসে থিতু হয়েছিলেন তাঁরা। কালিম্পঙেই জন্ম তোয়ান এবং তার ছোট বোন মিমিলার। তাই নেপালি ভাষাটাই ভালো করে জানতেন তোয়ান। তখন তো তিনি জানতেন না, এর পরের জীবনে টিকে থাকতে হলে বারবার তাঁকে পাল্টাতে হবে ধর্মপরিচয়, বারবার বদলাবে তাঁর ভাষা এবং নামও।
কালিম্পং থেকে সেবকে নেমে আসা রাস্তা দিয়ে তোয়ান য়ঙ প্রথমবার কলকাতার দিকে রওনা দিয়েছিলেন সেবার। হিসেব কষে দেখলে বোঝা যায় তখনও সেবকে তিস্তার ওপর করোনেশন ব্রিজ তৈরি হয়নি। তাই তোয়ানের লেখাতেও তার উল্লেখ পাওয়া যায় না। বাবা-মা মারা যাওয়ার পর আট বছরের তোয়ানের দায়িত্বে থাকা অন্য এক চিনা পরিবার ওঁকে তিন বছরের চুক্তিতে বিক্রি করে দিয়েছিলেন মাত্র পঞ্চাশ টাকায়। যাকে বিক্রি করলেন, সেই শিখ পরিবার সেই পাহাড়ি ছেলেটাকে নিয়ে চলেছেন সুদূর পাঞ্জাব প্রদেশের লাহোরে। তোয়ান লিখেছেন, সেবক থেকে কোন্ একটা ট্রেন ধরে শিলিগুড়ি যাওয়ার কথা। তারপর শিলিগুড়ি জংশন থেকে কলকাতায় যাওয়ার ট্রেনে উঠেছেন তিনি। তখন দার্জিলিং মেলের রেলপথ ছিল শিলিগুড়ি জংশন থেকে জলপাইগুড়ি স্টেশন পার হয়ে চিলাহাটি ( বর্তমানে বাংলাদেশ) হয়ে।
জলপাইগুড়ি স্টেশন থেকে তাঁকে পুরি তরকারি কিনে দিয়েছিলেন শিখ মালিক। আমার শহরের ছোট্ট স্টেশনটি পার হয়ে তোয়ান সে-যাত্রায় শেষবারের মতো বিদায় জানিয়েছিলেন তিস্তাকে! তোয়ান কি জানতেন, সেই মেল্লি থেকে তাঁর সঙ্গে সঙ্গে এতদূরে ছুটে এসেছে তিস্তা! তোয়ান যখন ১৯২৫ কি ২৬ সালে জলপাইগুড়ি স্টেশন থেকে চ্যাপ্টা রুটি কিনে খাচ্ছেন ঠিক তখনই আমি দেখলাম কয়লার ইঞ্জিনটা বদলে একটি ডিজেল ইঞ্জিন এসে দাঁড়িয়েছে স্টেশনে। এই ট্রেনটিও কলকাতায় যাবে, কিন্তু চিলাহাটির পথ দিয়ে নয়। চিলাহাটি আর হলদিবাড়ির মাঝখানে এখন কাঁটাতার এসে দুটো আলাদা দেশ হয়ে গেছে এতদিনে। অন্য দেশে চলে গেছে চিলাহাটির পথটি। তাই ডিজেল ইঞ্জিনটা দাঁড়িয়ে আছে তোয়ানের ট্রেনটির ঠিক উল্টোদিকে মুখ করে। কিশোরী আমি তল্পিতল্পা নিয়ে উঠে যাচ্ছি সেই ট্রেনে। নিজের শহর ছেড়ে, তিস্তা ছেড়ে, হেমন্তের কাঞ্চনজঙ্ঘা ছেড়ে, নিজেকে উপড়ে নিয়ে চলে যাচ্ছি কলকাতার দিকে। তোয়ানকে অনুভব করতে পারছি আমি, আবার কবে ফিরে আসব নিজের জায়গায় জানি না। যেমন জানতেন না তোয়ান য়ঙও।
কনফুসিয়ান ধর্মে বিশ্বাসী তোয়ানের বাবা স্ত্রীর অসুস্থতার সময় চিকিৎসার সুবিধে পাওয়ার জন্য পরিবার সমেত খ্রিস্টান হয়ে গিয়েছিলেন। তবুও বাঁচানো যায়নি তোয়ানের মাকে। একই সঙ্গে খ্রিস্টান আর কনফুসিয়ান ধর্ম পালন করতে করতে শৈশব কাটছিল তোয়ানের। কালিম্পংএ ছোট্ট একটি বেকারি চালাতেন তোয়ানের বাবা। ওইটুকু বয়সেই দীর্ঘ দীর্ঘ পাহাড়ি পথ হেঁটে বেকারির জিনিসপত্র বিভিন্ন জায়গায় পৌঁছে দিতেন তোয়ান। কাজ করতে, দীর্ঘ পাহাড়ি পথ পাড়ি দিতে, ভালো লাগত তাঁর। শুধু ভালো লাগত না পড়াশোনা করতে, তাই স্কুল পালাতেন নিয়মিত।
তোয়ানকে এখানেও যেন চেনা চেনা লাগে আমার। স্কুল পালানোর উপায় তো আমার ছিল না। তবে! আমিও কি পালাতাম না পড়াশোনা থেকে? ক্লাশে বসে থেকেই জানলা দিয়ে মনটা নিয়ে পালিয়ে চলে যেতাম না? করলা নদীর পাড়ে আমাদের স্কুলের জানলার ওপারে যখন ধোপারা দল বেঁধে কাপড় কেচে কেচে শুকোতে দিচ্ছে আমিও কি তখন বইয়ের পাতা ছেড়ে, ব্ল্যাকবোর্ডের লেখা ছেড়ে, ওদের পাশে বসে গল্প জুড়ে দিতাম না! তখন যদি তোয়ানকে চিনতাম তবে নিশ্চিত আমিও সঙ্গী হতাম ওঁর।
ইংরেজিতে লেখা তোয়ান-এর এই আত্মজীবনীটি একেবারে মনের ভেতর থেকে উঠে আসা অনুভূতিগুলোকে সহজ সরলভাবে সামনে এনে দাঁড় করায়। পড়তে পড়তে যেন অনেক বছর পেছনের সেই দিনগুলোতে পৌঁছে যাই আমরা। লাহোর থেকে পেশোয়ার, পেশোয়ার থেকে গাজিয়াবাদ, গাজিয়াবাদ থেকে কিয়ামারি দ্বীপ হয়ে দিল্লি, বোম্বে, কলকাতা পর্যন্ত তোয়ান এর সঙ্গে সঙ্গে থাকি। এই কঠিন জীবনের মধ্যেই তোয়ান কোথাও কোথাও সুর খুঁজে নেন। মাউথঅর্গানে যেকোনো গান খুব কম দিনেই তুলে ফেলতে পারেন তিনি। আমেরিকান স্টেপড্যান্সার মালিকের কাছে শেখা শুরু করে স্টেপ ড্যান্স। যদিও প্রথম দিকে তাঁর কাজ ছিল বাসন মাজা, কুয়ো থেকে জল তোলা, কাপড় ধোয়া, বাজার থেকে জিনিসপত্র আনা আর বাচ্চা সামলানো। এই আমারিকান ডান্সারের কাছে এসেই তাঁর কাজের ধরন বদলানোর শুরু। এতসবের মধ্যেও তিনি মনে মনে বাঁচিয়ে রাখেন তাঁর শহর কালিম্পংকে। বারবার সুযোগ খোঁজেন সেখানে যাওয়ার। আমেরিকান স্টেপ ডান্সারের সঙ্গে কলকাতায় আসার পর অবশেষে সে সুযোগও জোটে।
ঘটনাচক্রে এই আমেরিকান ডান্সারের সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে যাওয়ার পরে কলকাতায় কোথায় কোথায় না থেকেছেন তোয়ান! চিনে পাড়ায় আফিমের ডেনে পর্যন্ত মাথা গুঁজতে হয়েছে তাঁকে। না। তোয়ানের জীবনের এসব কঠিন পর্বের সঙ্গে আমার কোনও মিল নেই, আমি শুধু দূর থেকে বিস্ময়ের সঙ্গে দেখি তোয়ানের জীবন। হেরে না যাওয়া একটা মানুষ সেই ত্রিশের দশকে কলকাতার আনাচ কানাচ চেনান আমাকে। তিনি চিনা মালিকের জুতোর দোকানে কাজে লাগেন, আবারও বাচ্চা সামলানোর কাজ পেয়ে সেটা ছেড়ে দেন। কপর্দকহীন ছেলেটি শুধুমাত্র মালকিনের অপমান সহ্য করতে না পেরে বিনা বাক্যবায়ে কাজ ছেড়ে দিতে পারেন হঠাৎ। সামনের অজানা দিনগুলোর জন্য কোনো সঞ্চয় রাখেন না। এ যেন নিজেকে নিয়ে ছেলেখেলা করতে করতে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করতে করতে পথ চলা। যেন তিনি জানতেন, কোনও একদিন এই সঞ্চয় করা অভিজ্ঞতাই কাজে লাগবে তাঁর, লিখে ফেলবেন একটা গোটা বই। অথচ ছেলেটা তখন লিখতেই জানতেন না।
একেবারে শূন্য থেকে জীবন শুরু করেছিলেন তোয়ান। প্রথম যখন শিখ পরিবারটির সঙ্গে তিনি লাহোরের উদ্দেশে যাত্রা করেছিলেন, প্রথমে এলেন কলকাতায়৷ তারপর বেনারস। বেনারসে গিয়ে তোয়ানের চুল ন্যাড়া করে একটা ছোট্ট টিকি রেখে তাঁকে সাজানো হ’ল হিন্দু ব্রাহ্মণ। এই প্রথম তোয়ানের ধর্ম পরিচয় বদলালো। এর পর কত কতবার যে কত কত মালিকের কাছে থেকেছিলেন তোয়ান। একেকজন মালিকের একেক ধর্ম পরিচয়, একেক ভাষা। নিজেকে বদলাতে বদলাতে, বিভিন্ন ভাষা শিখতে শিখতে একটু একটু করে বড় হচ্ছিলেন তিনি। কখনো তাঁর নাম চাঁদ মহম্মদ তো কখনো জন। চাঁদ মহম্মদ নাম নেওয়ার পর নিয়মিত নামাজ আদায় করতেন তোয়ান, খুশি মনে রেখেছিলেন রোজাও। যখন যে ধর্ম পালন করেছেন তখন তার ভালোটা মন দিয়ে উপলব্ধি করার চেষ্টা করেছেন। জন হয়ে যেতেন ক্যাথেলিক চার্চে।
কর্মজীবনের শুরুতে তোয়ান য়ঙ, নেপালি বলতেন। পরিস্থিতি তাঁকে হিন্দুস্তানি এবং পাঞ্জাবিকেও কাজের ভাষা হিসেবে শিখে নিতে বাধ্য করেছিল আশ্চর্যের বিষয় চিনা ছেলে তোয়ান অল্পস্বল্প চিনা শব্দ জানলেও চিনা ভাষা কিন্তু শিখেছিলেন কলকাতায় এসে এক চিনেম্যানের জুতোর দোকানে কাজ শুরু করে। সামান্য ইংরেজিও বলতে জানতেন তিনি। এত প্রদেশে এতরকম পরিবারে কাজ করতে করতে যখন তোয়ান শেষ পর্যন্ত ডাচ পণ্ডিত জোহান ভ্যান ম্যানেনের কাছে এসে থিতু হন তখন তার বয়স মাত্র ১৭। সেসময়ের এসিয়াটিক সোসাইটি বাংলার সেক্রেটারি তার ডাচ গুরু ম্যাননের সংস্পর্শে এসে তোয়ানের জীবনের মোড় ঘুরতে থাকে।
জোহান ভ্যান ম্যাননের কলকাতার বাড়ির বর্ণনা দিয়েছেন তোয়ান। সে-বাড়ির জানলা দিয়ে দেখা যেত, গঙ্গা, মনুমেন্ট, জাদুঘর। সে সময়ের নামজাদা মানুষেরা আসতেন ভ্যান ম্যাননের আমন্ত্রণে। ক্রমে ভৃত্য থেকে ভ্যান ম্যাননের পালিত পুত্রের জায়গা দখল করে নেন তোয়ান। ভ্যান ম্যাননের নামজাদা অতিথিরা এলে ডাক পড়ত তোয়ানের। এসব বড় বড় মানুষের সামনে বসে তোয়ান সুর তুলতেন মাউথঅর্গানে। সে বড় সুখের সময় ছিল তাঁর। তোয়ানের মুখে তাঁর সংগ্রামের কথা শুনতে শুনতে ভ্যান ম্যানন তাঁকে অনুরোধ করেছিলেন তাঁর অভিজ্ঞতাগুলো লিখে ফেলতে। গুরুর অনুরোধে তিনি লিখে ফেললেন নিজের কথা : “Houseboy in India”। এ-বইয়ের পাণ্ডুলিপি প্রকাশের আগেই তা ভ্যান ম্যাননের মাননীয় অতিথিদের হাতে হাতে ঘুরেছে। সে-তালিকায় এমন বড় বড় নাম, যে চমকে উঠতে হয়। উপেন্দ্রনাথ ব্রহ্মচারী থেকে সামারসেট মম পর্যন্ত ছিলেন এই পাণ্ডুলিপির পাঠক। ১৩ টি অনুচ্ছেদে বিভক্ত এই বইয়ের প্রতি অনুচ্ছেদেই রয়েছে তোয়ান এর জীবনের নতুন এক একটি বাঁকের খবর। বইটির শেষ প্রকাশ ১৯৪৭ সালে। প্রকাশক John Day Company, New York।‘ বইটির প্রতি পর্বে তোয়ান য়ঙ নিজেই এঁকেছেন একটি করে ছবি।
আখ্যানটি তোয়ান এর শহর কালিম্পঙের প্রকৃতির মতোই সরল। মনোমুগ্ধকর কাঞ্চনজঙ্ঘার মতোই আকর্ষণীয়। ঘটনাগুলো যেন একেকটি পাহাড়ি বাঁকের মতো চমক জাগানো নাটকীয়। এমনকি ছোটবেলায় দেখা বিভিন্ন মানুষের চরিত্রগুলোও তোয়ান এঁকেছেন নিপুণ হাতে। সাত বছর বয়সের একটি দিনের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছে —
On summer mornings the clear sky, and the fine view of the hills lit up by the rays of the sun, the rich green of the trees, the blowing of the cool wind from the northeast, the singing of the many birds winging up and down the hillside were very pleasant for my living young soul. At this early hour there were few people around. On my way I would meet a group of four Tibetan beggars praying while clapping their hands to the tune of their prayers, and I would wooll the incense which the householders burn at this time of the morning. The distance to Payung from Kalimpong is about seven miles. I stepped out briskly towards Tirpai Hill, where there is a small village near the Tibetan monastery. From this part of the hill the view toward Kalimpong is more beautiful. Toward the north is the great Himalayan snow mountain, Kanchen junga. The sun’s rays made the snows glare and glitter, so that no eye could look longer at them than a minute. Using my stick at every step for case in walking I felt happy…
প্রকৃতির প্রতি এমন ভালোবাসা তোয়ানকে বার বার ছুটিয়ে নিয়ে গেছে নিজের শহরে। এছাড়াও সঙ্গীতের প্রতি অনুরাগ এবং পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ তোয়ানকে একজন হাউসবয় থেকে লেখক হওয়ার দিকে নিয়ে গেছে। তোয়ান যেমন চিনা হয়েও নেপালি ভাষায় ছিলেন সচ্ছন্দ। আবার তাঁর ডাচ গুরু ভ্যান ম্যানন তিব্বতি ভাষায় পণ্ডিত৷ বৌদ্ধ ধর্ম নিয়ে চর্চা করতেন তিনি। ভ্যান ম্যাননের সংস্পর্শে এসে বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি প্রবল আগ্রহ জন্মায় তোয়ানের। জীবনের নানা পর্যায়ে হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টান ধর্ম পালন করেও শেষ পর্যন্ত নিজস্ব একটি দার্শনিক সংশ্লেষণে পৌঁছন তিনি। যা সকল ধর্মীয় বিশ্বাসের সমন্বয়ে গঠিত, এর মধ্যে হয়তো তাঁর বাবার কনফুসিয়ান ধর্মমতেরও প্রভাব খানিকটা ছিল।
তোয়ান আমাকেও শেখা্ন অনেক কিছু। সব ধর্মমতের সঙ্গে মিলেমিশে পাঠ দেন মানবতার ধর্মের। তাঁর পাঠানো দূরের কাঞ্চনজঙ্ঘার আলো আমার চোখেও কিছুটা এসে পড়ে। একটা নদীই হয়তো একটি তারে বেঁধে দেয় আমাদের দুজনের সুর। মেল্লি ব্রিজের নিচে খরস্রোতা তিস্তার ভয়ঙ্কর রূপ দেখে ভাবি, বাঁশের সাঁকো বেয়ে এই নদী পেরচ্ছেন তোয়ান। তিরপাই পাহাড়ের ওপর গাদেন থার্পা চোলিং মঠ থেকে দেখছেন পুরো কালিম্পং শহরটিকে। পিঠে তাঁর বিস্কুট ভরা বাঁশের ঝুড়ি, মাথার পট্টির সঙ্গে বাঁধা। পকেটে গুলতি আর নুড়ি পাথর। একটু ঝুঁকে পথ পেরচ্ছেন বাচ্চা ছেলেটি। তাঁর সঙ্গে আমার আবার দেখা হয়ে যাবে কোনোদিন। দেখা হয়ে যাবে হয়তো আমার বন্ধুদের সঙ্গেও। তখন হয়তো গলায় ঝোলানো থাকবে ক্যামেরা। হয়তো ছবি তুলতে তুলতে পাহাড়ি পথে মাউথঅর্গানে তোয়ান বাজাবেন কোনো রবীন্দ্রসঙ্গীতের সুর।
