শৈশবে এক মরমি ফকির
এসে চুপিচুপি দিতেন মন্ত্র,
সেই হতে বাজে বুকের গভীরে
অচিনপুরের বাদ্যযন্ত্র ৷
তার মুখ আর মনে তো পড়ে না
অবয়ব যেন ছায়ায় মেশে,
গোপনে গোপনে মনে হয় তিনি
খোয়াজ খিজির ছদ্মবেশে ৷
ইসলামি সাংস্কৃতির বৃহত্তর ঐতিহ্যে খোয়াজ খিজির এক রহস্যময় চরিত্র। চিরঞ্জীব তিনি। আবেহায়াত তথা অমৃতের সন্ধান জানেন তিনি। যারা ওলি-দরবেশ হয়ে ওঠেন তাদের অনেককে একসময় দেখা দেন তিনি, প্রেরণা জোগান সাধনার, আহ্বান করেন আধ্যাত্মিকতার জগতে। যেমন তিনি প্রেরণা দিয়েছিলেন ইবরাহিম বিন আদহামকে। তিনি ভবিষ্যৎদ্রষ্টা। কোরান শরিফের সুরা কাহাফে মুসা নবি যেই রহস্যময় পুরুষের সাথে ধৈর্য ধরে টিঁকে থাকতে পারেন নাই, তিনিই খিজির। সবুজ বুক তার। মানে চিরনবীন। তিনি পানির অধীশ্বর হিসাবেও ভক্তি ও সিরনি নিবেদন পান আনুষ্ঠানিকভাবে। জলাশয়ে খিজিরের নামে বেড়া বা ভেলা ভাসানোর অনুষ্ঠান আজও উদযাপিত হয় গ্রাম বাংলায়। এই খিজির আসলে নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি নন। তিনি একটি ভাব, যাকে ধারণ করেন লোকোত্তর ধারায় উত্তীর্ণ কোনো কোনো মহৎ জন।
ওলিদের জীবনী ও ধর্মীয় অন্যান্য কাহিনিতে খিজির বিষয়ক বর্ণনা শুনে তাকে একটি কাল্পনিক চরিত্র মনে হয়। আসলে তিনি নিত্যবর্তমান। আমাদের সমকালেও তিনি আছেন ও দেখা দেন, যার জন্য তিনি দেখা দেওয়া দরকার মনে করেন। আমি সামান্য অভাজনও তার দেখা, সঙ্গ, স্নেহ ও আশীর্বাদ পেয়েছি।
তখন আমার নিতান্ত শৈশব। বছর পাঁচ বয়স সম্ভবত। সে সময় দুপুরের দিকে প্রায়শই এক ফকির আসতেন। আমরা থাকতাম তখন সবুজবাগে। বাড়ির নম্বর ৫৭ ছিল। টিন শেড বাড়ি। বারান্দা ছিল। আমার স্মৃতিতে নিজেকে সেই বারান্দায় দেখতে পাই। সেই ফকির এসেছেন। পরনের পোশাক যতদূর মনে পরে জোড়াতালি দেওয়া আলখাল্লা ধরনের। মলিন। আমার এটুকু মনে আছে তিনি এলে আমি একটু দ্রবীভূত হয়ে যেতাম। খুব নিম্নস্বরে কথা বলতাম। কিন্তু আমি তাকে কী বলতাম তার কিছুই মনে নাই। তিনিও আমার সাথে ঠিক কী কী বলতেন সবই ভুলে গেছি শুধু একটা কথা ছাড়া। তিনি আমাকে হয়তো মোটিভেশন দিতেন কিংবা ভবিষ্যদ্বাণী করতেন, ‘বড় হয়ে তুমি দরবেশ হবা।’
এরকম এক রহস্যজনক লোক প্রায়ই দুপুরে আসেন আর আমি নিবিড় হয়ে তার সাথে কথা বলি, এতে আমার অভিভাবকেরা সন্দিগ্ধ হয়ে উঠলেন। আব্বা এইসব জেনে আম্মাকে বললেন, ‘উনি আবার আসলে বলে দিবা সপ্তাহে একদিন এসে দুপুরে খেয়ে যেতে। এমনিতে এসে যেন ওর সাথে এভাবে কথা না বলে।’ তিনি এলে আম্মা তাকে সেই কথাই বলে খাবার আনতে ঘরে গেলেন। সেই মহাজন আমাকে তখন বললেন, ‘আমি আর আসব না। বড় হয়ে তুমি দরবেশ হবা।’
দরবেশ আমি হয়ে উঠতে পারিনি এখনও নিশ্চয়ই। কিন্তু আমার অন্তরাত্মায় তার সংসর্গ এক দিব্য স্মৃতি হয়ে নিভৃতে বিরাজমান হয়ে রইল আজ পর্যন্ত। আমার ব্যক্তিগত জলাশয়ের গোপন অধীশ্বর তিনি। তার স্মরণে অনির্বাণ এক প্রদীপ জ্বলে আমার হৃদয়ে। এ এক লোকোত্তর অনুভূতি। জয় বাবা খোয়াজ খিজির।
