কুঁড়ের গল্প: স্নিগ্ধা বাউল

AI দ্বারা তৈরিকৃত ছবি।

প্রায়শই আমার মনে হয় আমি জীবনের সবচেয়ে বেশি গল্প শুনেছি আমার মায়ের কাছে। আমার মায়ের যেকোনো গল্প শুরু হয় বীজ থেকে। মানে হলো মূল গল্পের সাথে শাখা গল্প জুড়ে দিয়ে দিয়ে মা আমাদের রাতের ঘুম এনে দিতেন। আমার মায়ের গল্পের সাথে লেগে আছে তার বাবার বাড়ির গল্প। আমার দাদু যার নাম ছিলো শ্রীমান চানমোহন দেবনাথ, আমি তাকে দেখেছি কিন্তু আমার স্মৃতির বাইরে তিনি রয়ে গেছেন। মায়ের কাছে গল্প শুনে শুনে আমার দাদুকে নিয়ে যে চরিত্র আমার কল্পনায় এসেছে তাতে তিনি প্রচণ্ড ব্যক্তিত্বসম্পন্ন একজন মানুষ যার মানবিক বোধ চূড়ান্ত। মায়ের কাছে শুনেছি আমার দাদুর বোনকে বিয়ে দেবার পর তিনি যখন মারা যান তখন তার স্বামী আবার দ্বিতীয় বিয়ে করেন; সেই সংসারে দুটি সন্তান আসার পর সেই দম্পতিও মারা যান। এতিম দুটি শিশুকে আমার দাদু যারা তার বোনের সতীনের সন্তান তাদের সস্নেহে দায়িত্বে নিজের কাছে আনেন চানমোহন দেবনাথ। আমার দাদু ছিলেন পেশায় তাঁতি। ঘরের ভিতরে মাটি কেটে আসন বানিয়ে বসানো ছিল হাতে টানা তাঁত। আমার শৈশবে সেই তাঁতের কথা মনে আছে। টানা আর পোড়েনের গল্পে জুড়ে আছে আমার মা মাসিদের জীবন। আমার দাদুর কোনো ছেলে সন্তান নাই, চার মেয়ে নিয়ে নিতান্ত কষ্টের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে তাদের জীবনভর। নিজের মেয়েদের বিয়ে দিয়েছেন সাথে সেই ভাগ্না আর ভাগ্নিকেও পাত্রস্থ করেছেন দায়িত্ব নিয়ে। আসলে গল্পের কিংবা স্মৃতির কোনো মাথা-মুণ্ড নাই, যেমন নাই আমার ভাবনার সাথে আমার। কথা হচ্ছিল বিল নিয়ে, অথচ আমি নদীর পাড়ের মানুষ। মেঘনা নদীটা একটা বাঁক নিয়ে আমাদের শহরে ঢুকে আবার চলে গেছে আরেক প্রান্তে, আর সেই বাঁকের মুখে শহরের লঞ্চঘাট আর নৌকায় যাত্রারপথ বহুদূর। এখন স্পিডবোট আর ব্রিজ হবার পর লঞ্চঘাট হয়ে গেছে কঙ্কালসার আর আমাদের শৈশবের নদীটা শুকিয়ে মরে যাচ্ছে বাঁধের বাহানায়।

আমাদের সেই মাসির বিয়ে হলো নদীঘেরা এক গ্রামে। আমার মা তার বাবার মতো আত্মীয়দের প্রতি দায়িত্ব পালনের সমূহ কর্তব্য পালন করে গেছেন সবসময়। সে হিসেবে বছর দুই এক পরপর আমরা মাসির বাড়ি যেতাম, আমার আমার সেই মেসোমশাই ছিলেন সুন্দরতম পুরুষ। নজরুলের মতো ঝাঁকড়া চুল আর সারিন্দা বাজিয়ে গান করতেন অসাধারন। আমার স্মৃতিতে তাদের উঠানে লতানো মিষ্টি আলুর ক্ষেত লকলকে সবুজ বাতাসে এখনো দুলছে। বর্ষায় আমরা সেই গ্রামে পৌঁছে যেতে লঞ্চ থেকে সরাসরি নেমে যেতাম নৌকায়। ভরা বর্ষায় নৌকা ছুটে চলতো দূরের বটগাছের তলার ঘাটে। নদীঘেরা সেই গ্রামে শুনেছি পাকিস্তানিরাও যেতে সাহস পায়নি। বটগাছের তলায় নামার আগেই প্রতিবার মা দূরে আমাদের কিছু একটা দেখাতেন, আর ইঞ্জিনের শব্দে সে গল্প হারিয়ে যেত মেঘনার কাটাজলে।

 কিন্তু শুকনার দিনে আমাদের সে যাত্রার গল্প হয়ে যেত একেবারেই ভিন্ন। লঞ্চ থেকে নামার পরেই ফসল কেটে যাওয়া নদীর বিস্তীর্ন ভুমি। বর্ষায় নদীতে মিলিয়ে যাওয়া বিলেরা তখন সাপের লেজের মতো কিলবিল করে চলে গেছে পথের রেখার মতো। সে পথে হাঁটতে হাঁটতে পায়ের তলায় পড়ে যেত পাকা টমেটো, জালি কুমড়ার লতা, মিষ্টি আলুর সবুজ ডগা আর সদ্য কেটে নেয়া ধানের খড়। এই পথে বটগাছটা কাছে এসে এসে দূরে যেতে থাকে মরীচিকার মতো। মা বলতো এই আর একটু পথ। আর তখন বাতাসে বাতাসে শুরু হতো মায়ের গল্প। লঞ্চ থেকে নেমে হাতের ডানে এগিয়ে গিয়ে গ্রামের পথের বাঁক ঘুরেফিরে আসে দিগন্তের কাছে, ঠিক পিছনে ফেলে আসলেই হাতের বামদিকে পড়ে বিশাল এক জলাধার! শুনেছি মেঘনা নদীর জল মিশে যায় না এই জলের সাথে আবার বিলগুলোও সরে যায় এই জলাধার থেকে, স্থানীয় ভাষায় এর নাম কুঁড়। কুঁড় পেরিয়ে মা পিছনে তাকাতে বারণ করতেন  আর শুরু করতেন কুঁড় তৈরির গল্প।

 ঠিক কুঁড়ের এই স্থানে ছিল একটি পরিবার, সেই পরিবারে একদিন এক বৌ আসে নতুন সংসার করতে। টানাপড়েনের সংসারে কখনো ভালো কখনো মন্দ চলছিল সেই নারীর জীবন। সারাদিনের কাজ শেষে বৌ দূরের বিল থেকে জল ভরে আনতো কলস দিয়ে। মাটির ঘরের মেঝেতে জলের কলস রাখতে রাখতে সেখানে তৈরি হয় এক গর্ত ঠিক যেখান থেকে ভেসে আসতো এক কন্ঠস্বর। অজানা কেউ একজন নতুন বৌয়ের সাথে গল্প করতো, নতুন বৌ তার দুঃখ আর কষ্টের গল্প করতো পাতাল পুরীর অজানা কারো সাথে। তারপর একদিন অজানা-কণ্ঠ দুখি বৌকে সাহায্য করতে শুরু করে। তার সংসারে অভাব কমে আসে। কেননা আমাদের বৌয়েরা সংসারের বাইরে ভাবতে পারে না কোনোদিন। তবে পাতাল পুরীর অজানা কণ্ঠের শর্ত ছিল তার কথা কাওকে বলা যাবে না; বললেই আসবে চরম বিপদ। কিন্তু নারীর যাত্রা কখনো সহজ হয় না; বৌকে নিয়ে শুরু হয় গল্প। নিশ্চয়ই বৌয়ের চরিত্র ভালো না, নয় সে কীভাবে অভাব দূর করে! তারপর শুরু হলো অত্যাচার আর নির্যাতন। এক পর্যায়ে নতুন বৌ বলে দেয় পাতাল পুরীর গল্প আর ঠিক সে রাতেই ভেসে যায় পুরো গ্রাম আর নতুন বৌয়ের বাড়ি হয়ে যায় কুর। কুঁড় মূলত পুকুরের মতো জলাশয় কিন্তু অতল। মা বলছিল, গভির রাতে স্থানীয়রা  শুনতে পায় বৌবাড়ির বৌয়ের কান্না।

মা বলতে থাকেন একটানা গল্প; কারো বাড়িতে বিয়ের থালা বাসন লাগলে কুঁড়ের কাছে এসে মানত করে যেত আর পরদিন ভোরেই মিলত কাঁসার থালা বাসন। কোনো একবার একটি কাঁসার বাসন চুরি হয়ে গেলে কুঁড় বাসন দেয়া বন্ধ করে দেয়…।

আমরা মায়ের গল্প শুনতে শুনতে পথ প্রায় এগিয়ে চলছি তখন, মা বলে দিয়েছে পিছন ফিরে তাকালেই অমঙ্গল; তাকিয়ে তাই দেখছি না দূরে মিশে যাওয়া কুঁড় বরং তখন সামনে দৃশ্যমান মাসির বাড়ির বাজারের বটতলা।

আর এখন ভাবছি না জানি কত বেদনা নিয়ে হারিয়ে গেছে সেই বৌ! সে কি নিঃসঙ্গ ছিল? কথা বলতে শুরু করেছিল নিজের সাথে! সে রাতে কী এমন কোনো দুর্যোগ এসেছিল যে পুরো বাড়ি ডুবে গেলো আর তার দায় এসে গেলো নিষ্পাপ বৌয়ের জীবনে! এই দুপুরে আমি জানছি জীবনের গল্পে সিজোফ্রেনিয়া থাকে নয়তো আমি কেন স্মৃতি ভেঙে চলে যাচ্ছি পাতাল পুরীর কণ্ঠের কাছে! কেন ভেঙে যাচ্ছে দুপুরের রোদে শেয়ালকাঁটা আর পরিবাহসূত্রে জমে যাচ্ছে শীতল শ্যাওড়া গাছের পাতা। আপাতত বিচ্ছেদের সময়; বিল ভরা জলে মাছের কাঁধে জমে উঠেছে যে গল্প তারে পৃথিবীর ভাষায় ইতিহাস বলা যাচ্ছে কেননা আমার মা মিথ্যা বলতে পারে না; বড়োজোর তা রূপকথা হতেই পারে।

মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না। আবশ্যক ঘরগুলো * দিয়ে চিহ্নিত করা হয়েছে