সরল প্রকৃতিপাঠ: হামিরউদ্দিন মিদ্যা

ছবি: এ আই

 

হবিগঞ্জের জালালি কইতর…সুনামগঞ্জের কুড়া…

সুরমা নদীর গাঙচিল আমি, শূন্যে দিলাম উড়া…(হেমাঙ্গ বিশ্বাস)

রেডিওটা বাজছে। এই সময় প্রত্যেকদিন আঁজির তলায় মেচেতে বসে বসে আব্বা গান শুনে। সবে সকাল হয়েছে,দরমার হাঁস-মুরগীগুলোকেও এখনও ছাড়েনি মা। এবার উঠে থালাবাসনগুলো বের করে কলতলায় নামিয়ে, বাসীভাত আর কুঁড়ো দিয়ে গুলে হাঁসগুলোকে খেতে দেবে, মুঠোখানেক খুদচাল ছড়িয়ে দেবে মুরগীগুলোর জন্য। ভরপেট খেয়ে হাঁসগুলো হেলতে দুলতে আবু তাহেরের পুকুর পানে চলে যাবে। মুরগীগুলো কারও সাঁড়কুড়ে, কারও ঘরের পাঁদাড়ে মাটি আঁচড়াবে, ফিরবে সেই সাঁঝ নামার মুখে। গোয়াল থেকে গোরুগুলোকে বের করে বাঁথানে বেঁধে ছানি দেবে ডাবাতে। তারপর ঘর-উঠোন ঝাঁট দিয়ে থালাবাসন ধুয়ে ঘরে উঠবে মা। এইভাবেই একটা দিনের শুরু হয়। আব্বা তখনও বসে থাকে, যতক্ষণ না চা খেতে ডাকছে মা।

আব্বা ফজরের আজান দিলেই উঠে পড়ে। ওজু-টজু সেরে মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়ে আসে। তখনও মুখ আঁধারি থাকে। আব্বা শোয় না আর। হেমাঙ্গ বিশ্বাস, আব্বাসউদ্দিন, মনসুর ফকির, শাহ আবদুল করিম, লালন ফকিরে বুদ হয়ে থাকে। চোখ বুজে ঝিমায়। কোথায় যেন তলিয়ে যায় মানুষটা।

আমাকে ছোটতে আব্বা প্রায়ই বলত, এত বেলা করে উঠিস না খোকা। ভোরের বেলা উঠে পড়বি, দেখবি মন শরীর দুইই ভালো থাকবে। ভোরের বাতাসের ঔষুধী গুন আছে, গায়ে লাগলে শরীরে ছাড় দেয়।

ছোট থেকেই আমি ছিপছিপে রোগা-পাতলা মানুষ। গায়ে মাংস লাগবে শুনে সকালেই উঠে পড়তাম।  আর গোসল করার সময় চেয়ে চেয়ে নিজেই নিজের শরীরখানা পরখ করে দেখতাম, একটু মোটিয়েছি কিনা। আব্বা যে বলেছে ভোরে উঠলে গায়ে ছাড় দেয়!

তখন সেই বাচ্চা বয়সে এত অনুভব ক্ষমতা ছিল না। তবে সত্যিই ভোরে উঠে মনটা ভালো হয়ে যেত। সবে দুনিয়ার জীবকুল জাগতে বসেছে। পাখিরা কিচির মিচির করে বাসা ছেড়ে চরতে বের হচ্ছে, উঠোনের পাশে ঘাষ জমিতে খালি পায়ে হেঁটে বেড়াতাম। লাল-নীল রঙের সরু সরু ফড়িংগুলোর পিছু পিছু ছুটতাম, তবে ধরতে পারতাম না। বাঁশপাতা শাক, মধুচুষী গাছে ছোট ছোট ফুল ফুটত। হেঁট হয়ে মধুচুষী ফুল তুলে চুষে চুষে মধু খেতাম। মুখটা মিষ্টি হয়ে যেত। কোনও দিন রবে দাদোর সঙ্গে মাঠ দেখতে যেতাম। জিওলনালার মাঠে প্রচুর বালিহাঁস, জলকাক নামত তখন।

রবে দাদোই ছিল আমার প্রকৃতিপাঠের শিক্ষক। কত পাখি, কত গাছ আমাকে চিনিয়েছে। আমাদের পাশের পাড়াতেই বাড়ি, আমার নিজের দাদোর ইয়ার দোস্ত ছিল। সারাটা দিন আমাদের বাখুলেই পড়ে থাকত। আমি খুব ‘লাগাটে’ ছিলাম রবে দাদোর। মানে কাছঘেঁষা।

আমাকে হাত ধরে ধরে রবে দাদো নিয়ে যেত যেখানেই যেত। আর আঙুল বাড়িয়ে বাড়িয়ে দেখাত, ওই যে ঠ্যাঁঙ-লম্বা পাখিগুলো গলা উঁচিয়ে হেঁটে বেড়াচ্ছে, ওগুলো হাট্টিমা ট্টিম পাখি, ওই যে গাছের টুগডাল থেকে ঠক ঠক আওয়াজ পাচ্ছিস, ওটা বসন্তবৌরী।

মাঠে গেলে বিল থেকে শালুক ফুল তুলে দিত দাদো, পদ্মের টাঁঠি এনে ছাড়িয়ে ভেতরের কচি বাদামের মতো বীজগুলো হাতে দিয়ে বলত, খা ভাই,দেখ দারুণ মিস্টি। শালুক ফুলের ভেট তুলে দিলে বাড়িতে আনতাম। ভেট ছাড়িয়ে বীজগুলো শুকোতে দিতাম। মুড়ি ভাজার সময় আমার মা-চাচীরা খোলার বালিতে ফেলে কুচিকাঁঠি দিয়ে ভেঁজে দিত। গোল গোল শোলার মত খুদে মুড়ি হত, খুব সুন্দর খেতে। আমার বড় ফুফু একবার বলেছিল লাল ভেটগুলো আনিস না খোকা, ওগুলো খেতে নেই, খেলে লাল লাল ছেলে হয়।

লাল লাল ছেলে কেমন বুঝতে পারতাম না, তবে মনের মধ্যে এক অজানা ভয় ঢুকে গিয়েছিল। একটু বড় হলে পাড়ার ছেলেমেয়েদের সঙ্গে যখন খালেবিলে খেলে বেড়াতাম, তখন কেউ শাপলার সেই জলে ভাসন্ত  ফলগুলো, যাকে ভেট বলি ,সেই ভেট তুললে, খাওয়ার আগে আমরা ছাড়িয়ে দেখে নিতাম সেটা লালবিচি, না কালোবিচির।

একদিন একটা আড়াখালে পেলাম কয়েকটা বালিহাঁসের ছা। আড়াখাল হল মাছধরার এক বিশেষ খাল, ধানখেতের আলের ধারে এক কোমর গভীর খাল কাটা হয়। সেই খালে চারটা বালিহাঁসের বাচ্চা পড়ে গিয়ে আর উঠতে পারেনি। বাচ্চাগুলো দেখে আমি কান্না জুড়ে দিই। আমার ওগুলো চাই-ই চাই।

রবে দাদো সেই খাল থেকে বাচ্চাগুলো তুলে লুঙির আচলে ভরে নিয়ে এসেছিল। কী সুন্দর গুলগুলে বাচ্চাগুলো। পাতিহাঁসের বাচ্চার মতোই, শুধু একটু কালচে ছোপ বেশি। একটা মাছধরার পলুই চাপা দিয়ে রেখেছিলাম। আনা অবধি ছাগুলো চিক চিক করে ডেকে ডেকে কান ঝালাপালা করে দিচ্ছিল। কেচো খুঁড়ে খেতে দিয়েছিলাম, তাও মুখে নেয়নি। মনমরা হয়ে ডেকেই চলেছে এক নাগাড়ে। মা বলল, ছোট কাকিদের হাঁসের বাচ্চা উঠেছে, ওদের ছানাগুলোর কাছে ছেড়ে দিতে। একসাথে থাকলে হেসেখেলে থাকবে, বড়ও হয়ে যাবে।

মায়ের যুক্তি শুনে বাচ্চাগুলো নিয়ে গেলাম বিকাল বেলা। যেই পাঁতিহাসের বাচ্চাগুলোর কাছে যেই ছেড়েছি, অমনি হাঁসের ধাড়ীটা ডানাপানা মেলে ছুটে এসে ঠুকারে মারতে লাগল। তাড়াতাড়ি করে ছাড়ালাম। একটা বাচ্চা প্রায় আধমরা হয়েই গিয়েছিল। মা-রা ঠিক নিজের বাচ্চাকে চেনে। অন্যের বাচ্চা দিয়ে বোকা বানানো যায়নি। অগত্যে বাড়িতে এনে বাচ্চাগুলোকে সেই দিন পলুই চাপা দিয়েই রেখে দিলাম।

বাচ্চাগুলোর ডাক শুনে আমার কিছুতেই ঘুম আসছিল না। মা বলল, সকালে ওগুলো যেখান থেকে এনেছিলিস, ওখানে নামিয়ে দিয়ে আসবি। কিছুই খাচ্ছেনি, সারাক্ষণ খালি চিক চিক করে ডেকে চলেছে, বাঁচবে কী করে!

আমার  চোখে ঘুম আসছিল না। বিছানায় এপাশ ওপাশ করছিলাম। রাতটা পেরবে তো! সকালে উঠেই যদি দেখি মরে গেছে! ঘুমের ঘোরেই বিছানায় উঠে বসলাম। মা-আব্বা ঘুমিয়ে গেছে। আব্বার সিথান তল থেকে টর্চটা নিয়ে দরজাটা ঠেলে বারান্দায় নামলাম। শেয়াল কুকুরের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য পলুইয়ের ওপরে একটা ভারী পাথর চাপিয়ে দিয়েছিলাম, যাতে পলুই তুলে খেতে না পারে। টর্চটা যেই জ্বেলেছি পলুইয়ের ওপর, অমনি দেখি দুটি হাঁসের মতো পাখি পলুইটার কাছে দাঁড়িয়ে আছে। টর্চের আলো পড়তেই পাখিদুটো ভিড়কে গিয়ে খানিক সরে পড়ল। বাচ্চাগুলোর গলার আওয়াজ আরও বেড়ে গেল। আমি টর্চ বন্ধ করে উঠোন থেকে সট করে বারান্দায় উঠে এলাম। বাইরে হালকা জ্যোৎস্না। সেই চাঁদের আবছা আলোতেই আমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে দেখতে লাগলাম পাখিদুটোকে। এত রাতে কারও হাঁস ছাড়া থাকার কথা নই, আর যদি ছাড়াও থাকে তারা পুকুরে গিয়ে নামবে। আমি সরে যেতে পাখিদুটো হাঁটতে হাঁটতে আবার পলুয়ের কাছে চলে এল। জিওলনালায় দূর থেকে চরতে দেখেছি এমন হাঁস,কাছে গেলেই উড়ে যায়। পলুইয়ের কাছে আসতেই বাচ্চাগুলোর গলার আওয়াজ ধীরে ধীরে থেমে গেল।

চারিদিক নিস্তব্ধ। কেউ কোথাও জেগে নেই।  আমার চোখের পাতা স্থির হয়ে গেল। দেখলাম পাখিদুটো একে অপরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করল একবার, তারপর পলুয়ের ভেতরের বাচ্চাগুলোর দিকে নীরবে চেয়ে রইল। হঠাৎ একটা হাঁস গলায় অদ্ভুত একটা আওয়াজ করল। অনেকটা কান্নার মতো। সেই আওয়াজ শুনেই অন্য হাঁসটা পাগলের মতো পলুইয়ের বেড়ার কাঁঠিতে ঠোঁক্কর মারতে লাগল তার শক্ত চঞ্চু দিয়ে। যেন ভেঙে ফেলবে নিমেষেই।

ওদিকে আমাকে বিছানায় দেখতে না পেয়ে মা ভয় পেয়ে গেছিল। খোকা খোকা-আ করে ডাকতে ডাকতে বাইরে বেরিয়ে এল। মায়ের বাঁজখাই গলার আওয়াজে পাখিদুটো ঝটপট করে ডানা ঝাপটিয়ে ভয়ে উড়ে গেল। আমাকে হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল মা। অনেক বকুনি দিল। তারপর শুয়ে শুয়েই বললাম পুরো ব্যপারটা। মা শুনে বলল, বাচ্চাগুলোর ডাক ওরা শুনতে পেয়েছে। তাই উড়ে এসেছে। জানিস, ছেলেরা যেখানেই কাঁদুক, মা-রা ঠিক বুঝতে পারে।

সকালে রবে দাদো এলে বাচ্চাগুলোকে মাছরাখার খালুইয়ে ভরে সেই মাঠটাতে নিয়ে গেলাম। আমি আড়াখালে ফেলতে যাচ্ছিলাম, দাদো বাধা দিয়ে বলল, ধুর পাগল! খালে পড়েই তো উঠতে পারেনি। আবার খালেই ফেলবি? আমরা না দেখলেও যার আড়াখাল সে সন্ধ্যেবেলা আড়া দিতে এলে দেখতে পেত, হয়তো সেও বাড়ি নিয়ে যেত। জমিতে ছেড়ে দে বাচ্চাগুলোকে। ওর মা ঠিক খুঁজে পেয়ে যাবে। এদের নিয়ে যাওয়া আমাদের উচিত হয়নি রে!

বাচ্চাগুলোকে জমিতে ছেড়ে দিতেই যেন ধড়ে জান এল। ভিং ভিং করে ছুটে তলিয়ে গেল ধান খেতের ভেতরে। আমরা জিওলনালার ঢিবিতে উঠলাম, রবে দাদো হাতে একটা বস্তা, আর কাস্তে এনেছিল সঙ্গে করে। ঘাষ কাটতে লাগল। ঢিবির ওপর একটা আদ্যিকালের শিরিষগাছ। আমি সেই শিরিষতলায় গিয়ে দাঁড়ালাম। চারিদিকে ধানখেত, ওই দূরে দূরে গাঁ। আমাদের গ্রামের গোরস্থানের গাছগুলো দেখা যাচ্ছে এত দূর থেকেও।

আমি সেই মাঠটার দিকে ফিরে ফিরে তাকাচ্ছিলাম। হঠাৎ দেখি কোথা থেকে দুটো বালিহাঁস উড়ে এসে সেই মাঠটাতে নামল। আমার বুক ঠেলে বেরিয়ে এল একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস। যাক, ওরা ওর বাবা-মাকে ফিরে পেল।

মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না। আবশ্যক ঘরগুলো * দিয়ে চিহ্নিত করা হয়েছে