খুব জোর দিয়ে বলতে পারিনা, “আমি গ্রামের ছেলে”। আমি জন্মেছিলাম কিন্তু প্রকৃত নির্ভেজাল গ্রামেই। ছ’মাস বয়সেই জীবিত মায়ের কোলছাড়া। মহাজন-বাড়ি ছেড়ে জমিদার-বাড়িতে দিদিমার অপরিসীম স্নেহচ্ছায়ায়। অনেকটা বড়ো, এক সমুদ্রপারের টিলা আর পাহাড়াশ্রয়ী আধা-শহরে। জীবনানন্দের রূপসী বাংলা বা বিভূতিভূষণের নানা উদ্ভিদের মায়াময় ঘ্রাণের ভেতর আমার উত্থান লতার মতো ততটা জড়ানো প্রশ্রয় হয়তো পায়নি, কিন্তু, আমি গ্রাম ভালোভাবেই দেখেছি, দু’চোখ ভরেই– জোর দিয়েই এটা বলতে পারি। দ্বিজেন শর্মার মতো তত গাছপালা চিনি না। তবে কিছু কিছু চিনি। তো, এসবের ভেতর দিয়ে আর টানা চার বছর, চার বছর কী! না, ‘৭১-এর এপ্রিলের শুরুর দিক থেকে তো নিজ গ্রাম ছেড়ে কেবল গ্রামের ভেতরকার গুচ্ছ গুচ্ছ গ্রামের ভেতর দিয়ে আমাদের প্রায় মহাভারতীয় পাণ্ডবসদৃশ অজ্ঞাতবাস আর পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর আক্রমণের মুখে সারা বাংলাদেশবাসীর মতো ক্রমাগত পলায়নপর জীবন।
তো, সে সময়, আমি দেখেছি তোমাকে। পরেও দেখেছি চোখ ভরে। নানা রূপে। নানা ঋতুতে। তোমার সে কী দেমাগ! বিশাল শূন্যতাকে দু’হাতে আঁকড়ে তুমি যখন পাহাড়ের কোলে বিশাল বিস্তৃতি নিয়ে নিমগ্ন, তখনও তোমাকে দেখেছি। সে তোমার এক রূপ। না ফুরানো তোমার অনন্ত এক মাত্রা। আবার যখন তোমার বিশাল বুক জুড়ে বিস্তারিত, মহাবিস্তারিত ফসল-ভারানত তুমি, দিগন্তশেষে আকাশছোঁয়া তোমার বিনীত অহংকার, তখনও তোমাকে দেখেছি। শূন্য আর পূর্ণের অভূতপূর্ব এক বিপ্রতীপ মিলনের যাদুতে তুমি তো সারাজীবন মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখলে আমায়। চোখ বুজলেই আমি তোমাকে দেখতে পাই। গুম গুম শব্দ করে নদীর ওপরে ট্রেনের সেতু পার হবার শব্দ বাজে আমার বুকে, তোমার কথা মনে হলেই।
তোমার বুকজুড়ে যখন শত শত আল দেখি, তখন মন খারাপ হয়। যেন তোমার বুক ফালাফালা রক্তাক্ত করা হলো। কিন্তু আমার নিয়তি তো পুরোটাই ইতিহাস-নিয়ন্ত্রিত। আমি যে বংগ যোগ আলের লোক! হাজার বছরের যাত্রা পেরিয়ে, কিম্বা তারও আগের পাঁচ হাজার বছরের পুরনো মানুষগুলোর হাড়ের বাজনা শুনতে শুনতে, তাদের ভাষার নানা মন্ত্র বুকে নিতে নিতে, তাদের মজ্জা-মগজের-রক্তের অদৃশ্য প্রবহমানতার ভেতর যেন আমার শূন্যতা আর পূর্ণতার যাত্রাবিন্দুর সূচনা হয়েছিলো।
তোমার ভেতর দিয়েই আমি বিশাল এপ্রান্ত-ওপ্রান্তের ভারতবর্ষকে দেখি, দেখি আমার একান্ত প্রিয় বাংলাকে দেখি। দেখি আমাকেও। দেখতে হয়। না দেখে উপায় থাকে না। যখন আমরা নিজেদের দেশ পেয়েছি, ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল পেয়েছি সেই ৭১-এ, অনেক অনেক চড়া দামে!
