ডুব: তিলোত্তমা বসু

AI দিয়ে তৈরি

আমাদের গ্রামে ছিল গানের নদী। সে নদীতে বয়ে যেত সুর । নানান রঙের । সারা দিনের সময়ের কন্ঠ থেকে নিঃসৃত হত  নানা রাগ ও রাগিনী । আবার কখনো বহুযুগ আগের কন্ঠ থেকে ভেসে ভেসে ভেসে আসত মেঘভাঙা মায়াবী  স্রোত ।

#
নদীর নাম সরস্বতী । তার ওপর দিয়ে চলে গেছে ব্রিজ । জলে আশ্চর্য বেগুনিরঙা অনিশ্চয়তা ভেসে যাচ্ছে পাপড়ি মেলে। যেন জীবনের ঠিকানাবিহীন প্রশ্ন সকল। নদীর যে পাশে সরু পথ তার ঠিক সামনেই  অঙ্কের মাস্টারমশাই বৃন্দাবন-স্যারের বাড়ি। সকাল থেকে ব্যাচের পর ব্যাচ ছাত্র- ছাত্রীদের ভিড়। এমন শাখানদীর পাড়ে বাড়ি স্যারের, তবু তিনি  অংকে ভুল হলেই স্কেলের বাড়ি দিতেন। বাড়ির পাশ দিয়ে যে গানের নদী বয়ে যায় সে বিষয়ে তিনি যেন কিচ্ছুটি জানেন না ।

#
আমার বাবুজি ওই ব্রিজ পার করে আপিস যেতেন। ভ্যানরিকশা চেপে। ঠিক ব্রিজের ওপর দিয়ে  যেতে যেতে কপালে দু-হাত জোড় করে প্রণাম জানতেন। কাকে ? গানের নদীকে ? কালের অনন্ত স্রোতকে ? প্রকৃতির সবুজ শাড়িপরা নরম-মনের দেবীকে? নাকি নীল আকাশের আড়ালে থাকা সব গ্যালাক্সিদের ? সুদর্শন- চক্রের মতন নেবুলাদের ? আমি জিজ্ঞেস করলে আবছা উত্তর পেতাম।

#
তখনো বুঝি না জলের অনেক গভীর থেকে কেন উঠে আসে সুরেলা ঘূর্ণি। মনে মনে ভাবি এই নদী কতদূর থেকে কত মানুষের আয়ু ছুঁয়ে বয়ে আসছে। তাদের জীবনের সঙ্গীত মিশে আছে জলে।

#
এই যে নীল-সবুজ, নীল-সবুজ গ্রামটি , যেখানে আমাদের লালরং বাড়ি, সেখানে আবার রয়েছে একজন রহস্যঘন- দিঘি। নাম বড়পুকুর। কার্তিকবাবু খুব ভালো হোমিওপ্যাথির ডাক্তারবাবু। তাঁর বিশাল বাগানবাড়ি আমাদের বাড়ির এক মিনিটের দূরত্বে। সেই বাগানবাড়ির মধ্যমণি এই দিঘি । অনেক রাতে শুনেছি চাঁদের আলোতে  পরিরা এসে স্নান করে সব । তারা আকাশ থেকে সুর-পথেই আসে। দিঘির জল নাকি তখন একেবারে আয়না হয়ে যায়। তল পর্যন্ত দেখা যায়। হয়ত তখন আমার ওই সবুজ দুলটাও দেখতে পাওয়া যায়। চান করতে গিয়ে যা হারিয়ে গিয়েছে। কিন্তু তখন তো আমি ঘুমিয়ে থাকি। ডুবে থাকি স্বপ্নের সিনেমায়। কী করে আর খুঁজে পাবো হারিয়ে যাওয়াকে ?

#
হারিয়ে যাওয়াকে  খুঁজেছি আমি । খুঁজতে খুঁজতে  কেঁদেছি । কাঁদতে কাঁদতে দেখেছি কান্না থেকে বয়ে যায় গানই আসলে। গানের নদী গানের দীঘি সব কিছু তবে মানুষের চোখ থেকেই বয়ে যায় !  কে জানে ?

#
ডুব-সাঁতার চিৎ-সাঁতার… জলে  সেজ-পিসেমশাইয়ের উপহার দেওয়া সিরিয়ার থেকে আনা নীল রবারের টিউব; যা বেলুনের মতন ফোলানো যায়। সেই  টিউব ধরে ভেসে থাকতে থাকতে… মনে হয় মস্ত এক শাপলাফুলের পাতায় চড়ে সারাদিন ভেসে যাই। পাড়ি দিই… দূর … বহু বহু দূর… এই দিঘিই আমার আটলান্টিক মহাসাগর কী না !

#
বাবা অবিশ্যি প্রথমেই আমাকে সাঁতার কাটতে শিখিয়েছেন আমাদের বাড়ির ছোট্ট পুকুরে। যার গায়ের উপর  ঝুঁকে আছে পেয়ারা গাছের মোটা একটা ডাল। যার পাশে ইয়া এক শিরীষগাছ  ছায়া মেলে রাখে । বাবা আমার পেটের নিচে রাখতেন হাত আর তাতেই ভরসায় ভর দিয়ে কাগজের নৌকোর মতো এদিক-ওদিক হেলে দুলে সাঁতার শিখে গেলাম দিব্যি। যেন জলের মধ্যে আমার মাছের পুচ্ছ গজায়। আঁশ হয় রুপোর । তখন আর মানুষ নই ঠিক। একটা ঘোর হয়ে যাই আমি।  হয়ে যাই সুর।

#
জলের আছে ঘ্রাণ। নিজস্ব। অনেক্ষণ জলে থাকলে ভার হয়ে আসে গা । শরীরে আসে চাঁপাফুলের বাস । আমি বুঝি নাগিনীকন্যা? ধুৎ! মোটেই তা নয়। আমি তো এবার ছুঁতে চলেছি জীবনের অন্য এক পর্বকে । যার নাম ঝলমল-ঝলমল-জ্বর । এ জ্বরে কেমন মধুর মধুর প্রলাপ। আর বিলাপ। কোথায় সে ? কোথায় সে ? যার মাউথঅর্গ্যান -ছোঁয়া -ঠোঁট ? দূর-দূরান্তের সাগর পাড়ি দিয়ে আসছে সে প্রকাণ্ড জাহাজে চেপে। সে কী আমারই জন্যে ? তাই-ই তো  বড়পুকুরের জলে মাঝে মাঝে একা একা নামি, ডুব দিই।

#
বয়েজ-সেকেন্ডারি স্কুলটা ছিল আমাদের স্কুলের পাশে। একটা মস্ত জলের ট্যাংক তার পাশের রাস্তা দিয়ে স্কুল। যেতেই একটা পুকুর পড়ে। বেশ বড়। কে যেন বলেছিল ওই পুকুরের কাছে কখনো না যেতে। কে কবে যেন ডুবে মারা গেছে। ভালো না পুকুরটা। শুনেই ভয় চাইতাম না পুকুরটার দিকে মোটে । বাস থেকে নেমে বন্ধুদের সঙ্গে দ্রুত স্কুলের গেট । ছোটবেলায় অকারণে কত ভয়…ওই যে পুকুর তার জল যেন বেশি কালো আর গম্ভীর। কেমন একটা যেন।

#
মেঘলা দুপুরবেলায় পড়ায় কিছুতেই মন বসবে না । কোনো কাজ লাগবে না ভালো। জানলা দিয়ে জোরে জোরে বয়ে চলা বাতাস আর পাতা-ঝরে- যাওয়া দেখতে দেখতে ‘মন মোর ভেসে যায়’… তখন তো সব কিছুই রহস্যময় আর রঙের । অঙ্কের খাতায় ফেভিকলের গন্ধ-সাঁটা মলাট। বিজ্ঞান বইয়ের লাস্ট পেজে তিনবার লেখা কার যেন নাম। কুলমাখার জন্যে ঠাকুমার কাছে ঘুর ঘুর আর তার জেরেই  গলায় ব্যথা, জ্বর …অম্নি মায়ের রাগ।  কী বকুনি কী বকুনি ! ওই কালো পুকুরের জলের মতো অভিমানে বুকটা ভরে যায়। এইবার তবে পুকুরটার কাছে যাই ? কি হবে যদি জলের হাত আমাকে টেনে নেয় ? বেশ হবে। ঠিক হবে। আর বকবে কাকে, ও মা ?
কষ্ট হলেই পুকুরটার দিকে এক-পা এক-পা করে এগিয়ে যাই …এখনো। চোখ বন্ধ করে পায়ে পায়ে… মিশকালো জল ডাকে এখনো। মাঝে মাঝে । গম্ভীর বিষন্ন  সে ডাক। রোদ পড়ে এসেছে। আত্মহত্যা করলে সেই আত্মার মুক্তি নেই; রাঙা বলেছে। তাই ভয় করে। খুব। এক পা এক পা পিছোতেও থাকি আমি; এত দেরি করছ কেন অফিস থেকে ফিরতে, ও বাবুজি ! কত আপ বনগাঁলোকাল চলে গেল, কোটি তারার মানিক আকাশ ভরে দিল, সাড়ে আটটার আজান শুরু হয়ে গেল ওই…

#
জল তো জীবন ! জীবনে জলের অনেক দাবি। “আর কতকাল বাইবি তরী ভবের সংসারে, মাঝি ভবের সংসারে…” মাঝিকে গানে গানে জিজ্ঞেস করেছিলেন আমার প্রিয়, খুব খুব প্রিয় গায়ক। জল সেই উত্তর তাঁকে যথা সময়ে দিয়েছে। সমুদ্রই দিয়েছে তাঁকে কান্নায় ভরা সমাধি। তবে ! জল কি কেবলই জীবন? গানের নদী সমুদ্রে মিশে যায়। সমুদ্রকে ‘তিনি’ ভেবে জলে ঝাঁপ দেন শ্রী চৈতন্যদেব….

মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না। আবশ্যক ঘরগুলো * দিয়ে চিহ্নিত করা হয়েছে