পথে পথে দিলাম ছড়াইয়া : আলাউদ্দিন খোকন

আলোকচিত্র: মোহাম্মদ শাহজাহান

পর্ব: এক

দশতলা সিঁড়ি বেয়ে দু’জনে উঠলাম। একটা বই বিক্রির আশায়। সাত/আটটা অফিস ঘুরলাম। কেউ বই দেখলো, কেউ দেখতে চাইলো না, আবার কেউ পিওন বেয়ারা দিয়ে তাড়িয়ে দিলো। কেউ বই দেখার নাম করে ঘন্টা দু’ঘন্টা বকবক করে সময় নষ্ট করলো। শেষে ব্যর্থমনোরথে নেমে এলাম  দু’জনে। দিদির লিফট ভীতি ছিলো, তাই লিফট সাধারণত এড়িয়ে চলতাম। দিদির রোগা জীর্ণ, ক্লিষ্ট শরীর নিয়ে বেয়ে বেয়ে উঠতেন এইসব পাঠকদের কাছে। উদ্দেশ্য একটা বই বিক্রি, সাথে একটা আবেদন “আমার মুক্তিযুদ্ধে শহীদ দুই সন্তানের নামে একটি অনাথ আশ্রম গড়তে চাই, এই বই বিক্রির টাকায়”…

এভাবেই কত কত বছর চলে গেলো আমাদের দু’জনের! রোদ-বৃষ্টি-ঝড়-জলে, শীত-গ্রীষ্মে,  সুখে-অসুখে আমরা পথ চলেছি। পথে পথে আমাদের জীবন, আমাদের সময়ের ব্যাপ্তি ফুরিয়েছে। আমরা দিনে অফিসপাড়া, রাতে ডাক্তারপাড়া– এভাবে ছুটেছি বই নিয়ে। পথে কোনও সস্তা হোটেলে খেয়েছি যেদিন কিছু বিক্রি হয়েছে, আর নাহলে উপোষ। হয়তো চারটা পাঁচটার দিকে রুমে এসে স্টোভে চাল ডাল আলু যা ঘরে থাকতো রান্না করে খেয়ে নিতাম।

দিদির পোষা বিড়াল গুলোর জন্য একটু দুধ বা একপিস মাছ দোকান থেকে এনে মুড়ি মাখিয়ে দিতাম। চট্টগ্রাম শহরে চেরাগি পাহাড়ের লুসাই ভবনের চারতলায় দশ ফিট বাই বারো ফিটের একটি রুম ভাড়া নিয়ে আমরা কাটিয়েছি প্রায় আঠারো বছর এভাবে। 

সকাল নয়টা দশটায় পথে নামতাম বই নিয়ে। সারা শহর ঘুরতাম লোকাল টেম্পু অথবা বাসে করে। তবে বেশি সময়ই হাঁটতাম। দিদি হাঁটতেই পছন্দ করতেন। মাইলের পর মাইল আমরা হেঁটেছি বই বিক্রির আশায়। দিদি সন্তান হারানো যন্ত্রণায় খালি পায়ে, আর আমি পাশেপাশে বই কাঁধে। অনেকবার চেষ্টা করেছি দিদির মতো খালি পা হতে, কিন্তু পারিনি, আমি যে দিদির মতো মহাত্মা নই! 

খালি পা, কাঁধে ঝোলা দেখে অধিকাংশ ব্যাংকের গেটে দিদিকে আটকে দিতো। দারোয়ানগুলোই আটকাতো আর আমার সাথে তাদের ঝগড়া লেগে যেতো! আমি বলতাম, ব্যাগে কী বোমা নিয়ে এসেছি? দেখো ব্যাগে বই আছে। তাতেও কোনও লাভ হতো না। অর্ধ-শিক্ষিত সিকিউরিটির লোকগুলো বলতো, এখানে এসব চলবে না, বড় সাহেবের বারণ আছে। ফিরে চলেছি আবার অন্য কোনো অফিসের দিকে।

ভালো মানুষ যে ছিলো না তা নয়। অনেক অনেক ভালো মানুষ, ভালো পাঠকের দেখাও পেয়েছি আমরা। না হলে এই দীর্ঘ প্রায় চব্বিশ বছর শুধু বই  বিক্রি দিয়ে কীভাবে চলেছি আমরা।

এভাবেই শুরু করছি আমার পথে পথের কাব্য। চলবে অনেকদূর। দিদি একটা বই লিখতে চেয়েছিলেন- “মানুষ খুঁজে বেড়াই “। বইটি দিদি লিখে যেতে পারেননি। তবে যেভাবে লিখতে চেয়েছিলেন আমি জানতাম, তারই অংশ হিসেবে আমি লিখে রাখছি পথে পথে দিলাম ছড়াইয়া।

পৃথিবীতে রমা চৌধুরী একজনই জন্মেছিলেন। একজনই বীরমাতা শহীদ সন্তানের স্মরণে খালি পায়ে ঝোলা কাঁধে পথে পথে ঘুরেছেন। এ ইতিহাসে আমি সঙ্গী হয়ে, সাক্ষী হয়ে রইলাম। আমিও পথে পথে ছড়াইয়া দিলাম আমার ভালোবাসা।

মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না। আবশ্যক ঘরগুলো * দিয়ে চিহ্নিত করা হয়েছে