আপন জাহ্নবীর ঘাট: ১ : শংকর লাহিড়ী

কখনো আমার মনে হয়, আমাদের মনের গভীর অবচেতনে যে অবিরাম দোলক আছে, তার দোলন নির্দিষ্ট হ’য়ে আছে একটা ধীর লয়ে। বাইরের জীবনের গতি যত বাড়ে ততই আমরা মানিয়ে নিতে সমস্যায় পড়ি। তখন আমরা আশ্রয় নিই একলা ঘরে, স্যানাটোরিয়ামে, নির্জন সমুদ্রতীরে, জঙ্গলের কোর এরিয়ায়। কখনো বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যায় একটা বিরাট পেইন্টিং-এর সামনে। রাগ মালকোষ, রাগ মারু বেহাগ। সমস্ত শিল্পে সাহিত্যে সঙ্গীতে ভাস্কর্যে চিত্রকলায় আমরা চেষ্টা করি প্রত্যেক যুগের সুপারসনিক গতি-জ্যামিতির মধ্যে থেকেও ওই গহন দোলনের আন্তরিক লয়ের সঙ্গে মিশে একবার সমে পড়তে।

কীভাবে তৈরি হয় লেখার প্ররোচনা, বিষয়, শব্দ, যতি, নিজস্ব স্টাইল। কতটা ভুমিকা থাকে শৈশবের ও কৈশোরের অনুভবগুলোর, পঠনপাঠনের, আনন্দ-আহ্লাদ-যন্ত্রণা-বিষাদের। কীভাবে সে কথা বলা শিখেছে, কী পরিবেশে। কানে বেজেছে কোন সুর, ধ্বনি। তাদের ফোনেটিক নোটস, স্বরলিপি ও সরগম। কীভাবে আবিষ্কার ও বিস্ময়– জীবনে প্রথম জল পড়ার শব্দ, ঝর্ণার শব্দ, ঝড়ের শব্দ, কাঠ পোড়ার শব্দ। আর তার নিজস্ব সিন্দুকে সঞ্চিত যাবতীয় বিশেষ্য পদগুলো। যাবতীয় বিশেষ্য ও সর্বনামের মধ্যবর্তী সম্পর্কের সব টানাপোড়েন। কীভাবে জন্মের সাত পাউন্ড ওজন থেকে ক্রমে বেড়ে উঠেছে ওই দু’শো ছয়টা হাড়, বল-জয়েন্ট, মাংসপেশি, মসৃণ ত্বক, গ্রীবা, যুগল আঁখি, ভ্রুপল্লব, স্তন ও যোনি, বাহুবল্লরী, ওষ্ঠাধর ও স্নায়ুগ্রন্থি সকল।

আমাকে আজও অবাক করে, কীভাবে মায়ের কোলে চ’ড়ে মেটারনিটি হোম থেকে বেরিয়ে আসে রোঁয়া-ওঠা কুসুমের মতো শিশুরা। ক্রমে তারা মায়ের কোল থেকে নেমে হামাগুড়ি দিয়ে, টলমল পায়ে উঠে দাঁড়িয়ে, দুধের শিশি ছেড়ে, এক পা দু’পা ক’রে হেঁটে, দৌঁড়ে, তালে তাল দিয়ে, একটা সম্পূর্ণ নতুন ভাষায় কথা বলা ও বর্ণমালা শিখে, আদর হিংসে বায়না ও বজ্জাতির রহস্য ভেঙে, কতশত বিশ্বাস অবিশ্বাস শিক্ষা ছলনা ও আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে ক্রমে পূর্ণ মানুষ হ’য়ে উঠে দাঁড়ায়, মাত্র কয়েক বছরে! –এই সবই আলোচ্য, যার মধ্যে নিহিত রয়েছে যাবতীয় রচনার আবৃত রহস্যের উৎসমুখ। কী কথা তার সাথে এক মারণ রোগের? কী সম্পর্ক তার সঙ্গে মাঝ রাতের হিম হাওয়ার, খাল-বিলের জলজ গন্ধ, ঝরাপাতা আর অন্ধকার সিঁড়ির? কীভাবে ভ’রে উঠেছে তার দীর্ঘ দিনের অর্জিত ব্যাগেজ, যাতে আছে ব্যক্তিগত ফাঁকা কফির টিন, ভঙ্গুর ফ্রুটবোল, দিব্য কাঁসা, প্রবল বারুদ, চতুর্দশপদী গন্ধ, উন্মাদের তীব্র আফটার শেভ, ব্রোঞ্জের ডানা, গুঞ্জনময় জল, দেওয়াল ও বিছানা, হিম পেন্ডুলাম, চাবুক ও হারপুণ! –জীবনের জানা অজানা অনেক অভিঘাত থেকে ক্রমে তৈরি হয়েছে তার বোধ, বাচনভঙ্গি, শব্দচয়ন। তার পায়ে চলার ছন্দ, তার সুরের কম্পোজিশান। তার ছবি ও কবিতার বুনট, টেক্সচার, রঙ– যা ছড়িয়ে যায়, দোলা দেয়, ভাবায়। নিজেকে মুগ্ধ উদাসীন আপ্লুত করে, আর প্রচুরের রঙ লাগে মন-পেন্টিয়ামে।

বিখ্যাত সুইস লেখক মনোবিজ্ঞানী ও দার্শনিক কার্ল গুস্তাভ্ ইয়ুং (১৮৭৫-১৯৬১)– মানুষের জটিল ব্যক্তিসত্তা ও সামগ্রিক চেতনার প্রবক্তা তিনি। পরবর্তী কালে পূর্বসূরি ফ্রয়েডের থেকে বেশি গ্রহণযোগ্য এবং প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তাঁর মতবাদ; মানুষের চেতন-অবচেতনের রহস্যময়তা, তার সকল স্মৃতিচিত্র ও স্বপ্ন-বিশ্লেষণ। ইয়ুং-এর মতে প্রত্যেক মানুষের মনোজগতের গভীর অবচেতনে আধৃত রয়েছে জগৎ-সৃষ্টি-সংহিতার একটা সামগ্রিক বোধ (‘কালেক্টিভ আনকনশাস’)। শিশু বয়স থেকে বেড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে ক্রমে তারই ভিত্তিতে তৈরি হয় গভীর অন্তর্জগত (ইনারসেল্ফ) ও পরিবেশগত ব্যবহারিক জীবনের দুই পৃথক সত্তা। –ওই ইনারসেল্ফ, যাকে তিনি ‘অ্যানিমা’ বলেছেন, তা যেন পুরুষের মনোজগতের গভীর অবচেতনে শান্ত ফেমিনিন লাবণ্যে ভরা এক নির্বাক উপস্থিতি। আর মেয়েদের অবচেতনের গভীরে যে পুরুষের উপস্থিতির অনুভব, তাকেই বলেছেন ‘অ্যানিমাস’। কিন্তু সে কোনো প্রেরণাদায়ী ঐশী শক্তি বা মিউজ নয়, সে যেন আমাদের জন্ম থেকেই নীরবে বহন করছে অবচেতনের ভাণ্ডারে রক্ষিত বিপুল অতীতের সামগ্রিক বোধ ও অনুভবের নির্যাস। আমাদের সকল সৃষ্টিশীল কাজে ও রচনায় আছে গভীর অন্তর্লোকের সেই অবয়বহীনা মনোবাসিনি, যাকে স্পর্শ করা যায় না। কিন্তু সারা জীবন সে নিঃশব্দ অনর্গল কথা বলে যায় আমাদের চেতন-সত্তার সঙ্গে (“চাহনি মদির নয় কিন্তু অনর্গল / নিঃশব্দ কথা বলো /…স্পর্শ করো না কেন? শরীরে কি অসঙ্গতি আছে?”– বই: ‘মুখার্জী কুসুম’), আর সামনে এনে ধরে অজানা ও সুদূর অতীতের অভিজ্ঞানগুলো। আমাদের সম্মত করে, চঞ্চল ও বিভ্রান্ত করে, উদ্বুদ্ধ করে। ইয়ুং বলেছেন–‘জীবনে এগিয়ে চলায় আমার যা কিছু বাহ্যিক পরিবর্তন এসেছে তা সবই মূল্যহীন, অবান্তর। নিজেকে চেনার জন্য মূল্যবান হচ্ছে ওই আমার অন্তর্গত অ্যানিমা; তার সঙ্গে যা কিছু এতদিন ঘটে এসেছে আমার অন্তরে, যা দিয়ে আমি চিনতে পারি নিজেকে’।

মনোবিদ কার্ল গুস্তাভ্‌ ইয়ুং-এর কথা আমি জেনেছিলাম যৌবনে, যখন আমি জামশেদপুরে টাটা স্টীলের কারখানায় কর্মরত ইঞ্জিনীয়ার। তখন টাটার ম্যানেজমেন্ট ক্লাসে ‘ক্রিয়েটিভিটি এবং ড্রিম অ্যানালিসিস’ নিয়ে আমাদের পড়াতে আসতেন বিশেষজ্ঞরা। সে কথায় পরে আসবো। তবে শৈশব থেকে বিস্ময় আমার চিরসঙ্গী। কৈশোরে হাতে এসেছিল কতরকমের গল্পের বই, যা আমার সামনে উন্মুক্ত করে দিয়েছিল এক বিস্ময়কর জগৎ। বাংলাভাষায় লেখা সেইসব অমর সাহিত্যমালা– লেখক অবন ঠাকুর, রাজশেখর বসু, উপেন্দ্রকিশোর, সুকুমার রায়, অন্নদাশংকর, প্রবোধ সান্যাল, প্রেমেন্দ্র মিত্র, বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়, আরও কত।

এই বিভূতিভূষণের যেদিন মৃত্যু হয়, ঘাটশীলায় সুবর্ণরেখা নদীর ধারে, সেদিন ১ সেপ্টেম্বর ১৯৫০। তার ঠিক ১৮-দিন পরে, ওই সুবর্ণরেখা নদীর ধারেই, কিছুটা উজানে, ‘দলমা’ পাহাড়ের নীচে ‘সাকচি’ নামের গ্রামটিতে আমার জন্ম।– এই সামান্য তথ্যের মধ্যে কোনো অস্বাভাবিক কিছুই নেই, তবু একদিন এটা খেয়াল ক’রে আমি বেশ বিস্মিত বোধ করেছিলাম। অল্প বয়সে এমন কত সাধারণ ব্যাপারেও বিস্মিত হতাম আমি। খুব ছোটবেলায় বাবা কখনো রেগে গিয়ে আমায় বলতেন: ‘তুমি একটা হাঁ-করা ছেলে’। তো, এই ডায়ালগ আমি পরে বিভূতিভূষণের উপন্যাসেও পেয়েছি; বালক অপুকে বলছেন তার বাবা হরিহর। আসলে, বাল্যকালে অনেকেই এমন; যা দেখে যা বোঝে তাতেই বিস্মিত হয়, হাঁ করে থাকে। তবে বিজ্ঞানীদের কথা আলাদা, বিশেষতঃ তিনি যদি পদার্থবিদ বা জ্যোতির্বিজ্ঞানী হন। তাঁদের কাজকর্ম আজীবন বিস্ময়ে ভরা। কবিদেরও তাই। কবিত্বের মূলেই আছে বিস্ময় ও রহস্যময়তা। এই নিয়েই কবিদের জগত। অবশ্য একেক কবির জগত একেক রকম। কবিমনকে আলোড়িত করে বিশ্বজগতের ক্ষুদ্র ও বিশাল, যা-কিছু রহস্য-বিস্ময়ে ভরা।

আমরা যারা ১৯৫০ সালে ভারতবর্ষে জন্মেছি; সদ্য স্বাধীনতা পাওয়া সেকালের যুবক যুবতীদের হৃদয়ে তখন এক বিস্মিত হিন্দোল। সেই এক জটিল ও উল্লসিত সময়ের প্রেমের ফসল আমরা। কলকাতা শহর তখন মাত্র কয়েক বছর আগে জাতি-দাঙ্গা থেকে ফিরেছে। আর দেড়শো মাইল দূরে, জামশেদপুরের লৌহনগরী তখন আস্তে আস্তে ভুলতে চেষ্টা করছে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের ধোঁয়াটে দিনগুলো। সেই সফল সময়ে আমার বাবা মায়ের বিয়ে হয়ে গেল; তখন ১৯৪৯ সাল।

কমল চক্রবর্তীর কবিতায় আছে– ‘সিংভুম পেরিয়ে গেলে কবিতার রম্যভুমি শেষ’। তো, বিহারের সেই সিংভুম জেলাই আমার জন্মভূমি, পরবর্তীকালে যা বিহার থেকে বেরিয়ে এসে ঝাড়খণ্ডে পড়েছে। একশো বছেররও আগে এখানকার শাল-জঙ্গল আর লাল মাটির দেশে ঘুমিয়ে ছিল একটা আদিবাসি গ্রাম, যার নাম ‘সাকচি’। এখানেই জামশেদজি টাটা একটি ইস্পাত কারখানা তৈরি করার স্বপ্ন দেখেন, যা তাঁর মৃত্যুর পরে গড়ে ঊঠেছিল। সেই হোল ভারতের প্রথম লৌহ ও ইস্পাত কারখানা। তাকে ঘিরেই গড়ে উঠেছিল একটা ছোট শহর, যার নাম জামশেদপুর। সেকালে বেঙ্গল-নাগপুর রেলপথে এই শহরের জন্য ‘কালিমাটি’ নামে একটা ছোট্ট রেল-স্টেশান ছিল। পরে তারই নাম হয় ‘টাটানগর’। শহরের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে এক সোনালি জলের নদী, নাম সুবর্ণরেখা, আর নদী পেরোলেই বিস্তৃত দলমা পাহাড়।

দলমা পাহাড়ের নীচে পলাশ ফুটেছে

জামশেদপুরে, সেই পাহাড় আর নদীর কাছেই ‘সাকচি’-তে ১০ নং ট্যামারিয়া রোডে আমার দাদু-দিদিমা থাকতেন। টাটা-কোম্পানির সেই ছোট্ট কোয়ার্টারে কাঁঠাল গাছের ছায়ায়, ১৯৫০ সালের আশ্বিনে, এক আদিবাসী ধাইমা-র হাতে আমার জন্ম হয়েছিল।

দাদুর বাড়ির উঠোনে দুটো ছাগল বাঁধা থাকতো। দু-পাশে প্রতিবেশী ছিল তেলেঙ্গি আর পাঠান। ছিল কাল্লু মিয়াঁর পরিবার। পেছনের গলি-দরোজায় চুড়িওয়ালীর কাছ থেকে তাদের মেয়েরা কাচের চুড়ি পড়তো। কালো বোরখার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসতো তাদের ফর্সা হাত। রাতের আকাশ মাঝে মাঝেই লাল হয়ে উঠতো ইস্পাত কারখানার গলিত স্ল্যাগের আলোয়। দাদামশায় চাকরি করতেন টাটার কারখানায়। সোলার টুপি মাথায় দিয়ে সাইকেল চড়ে কারখানায় শিফ্‌ট ডিউটিতে যেতেন। তিনি এগারোটি সন্তানের পিতা; তাদের সবাইকে স্কুল-কলেজে পড়িয়েছেন, কাউকে ডাক্তার অথবা ইঞ্জিনিয়ার তৈরি করেছেন, দেশ-বিদেশে পাঠিয়েছেন সংসার সামলিয়ে। দোষে গুণে মোলায়েম, শিশুর মতো সরল, কৌতূহলী, তেমনি জটিল হিসেবি, আবার দারুণ ক্রিয়েটিভ। অমন কারিগর আমি দেখিনি। পূর্ববঙ্গীয় বাঙাল ভাষা আর বিহারী হিন্দি মিশিয়ে তৈরি হয়েছিল তাঁর ‘লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা’। আমার চোখে তিনি ছিলেন ‘সাংসারিক’ হিরো।

বাড়িতেই ছিল তাঁর নিজস্ব একা-হাতের ওয়ার্কশপ। কত রকমের হাতুড়ি, ছেনি, করাত, ভাইস, নেহাই, নাট-বোল্ট-ওয়াশার, পেন্ট, উকো, বাটালি, র‍্যাঁদা, শিরীষ কাগজ, তারপিন তেল, সীসে, দস্তা, অ্যাসবেস্টস, তামার তার, রাংঝাল, কাঠকয়লা, হাপর– কী নেই সেখানে! কত কী-ই যে নিজের হাতে বানাতেন, সংসারের প্রয়োজনে। সারাদিন ডিউটি শেষে সেই ময়মনসিংহের ছেলে, এক অক্লান্ত বিশ্বকর্মা, প্রতিদিন কিছু না কিছু তৈরি করে চলেছেন। অবসর সময়ে সেই তিনিই আরাম-কেদারায় চোখ বুঁজে গড়গড়ায় নিবেদিত, আর আমরা গল্প শুনছি– গোয়ালন্দ থেকে বিকেলবেলা স্টিমার ছাড়ার শব্দ।

দাদুর জন্ম হয়েছিল ময়মনসিংহে, সম্ভবতঃ ১৮৯৫ সালে। দেশভাগের অনেককাল আগেই ওপার ছেড়ে এপারে কলকাতায় চলে এসেছিলেন। ছাত্রাবস্থায় বন্ধুদের নিয়ে, ‘ভারতবর্ষ’ কাগজ প্রণেতা দ্বিজেন্দ্র লাল রায়ের বাড়ীর বাগানে সম্রাট জর্জ দি ফিফ্‌থ-এর তৈলচিত্র কবর দিতে গিয়েছিলেন; সেকথা আমি ওঁর ডায়েরিতে পড়েছি, সম্ভবত সেটা ১৯১২ সাল। তারপরে একদিন ট্রেনে চড়ে জামশেদপুরে এসে, টাটাদের লোহা কারখানায় চাকরি। সেসময়ে টাটা স্টেশনেই ছিল ‘টিসকো রিসিভিং সেন্টার’ নামে টাটাদের ছোট্ট একটা অফিসঘর, যেখানে ট্রেন থেকে নেমে নাম লেখালে একটা চাকরির ব্যবস্থা হয়ে যেত। সেইদিন থেকে তাঁর জীবনের শেষ অব্দি কেটেছিল এই শহরেই।

কারখানায় দাদুর ছিল আজীবন শিফ্‌ট ডিউটি। বিশাল বয়লার হাউসের কয়লাবাহী কনভেয়র, কোল বাঙ্কার, সুবিশাল ফার্নেস আর তপ্ত স্টীমের পাইপলাইনের মাঝখানে আমার দাদামশায়। কারখানায় যাওয়ার আগে নিজে হাতে সাইকেলে পাম্প ক’রে, খাকি রঙের শোলার টুপি আর হাফপ্যান্ট-পরা দাদুর কথা খুব মনে আছে। পকেটে থাকতো টর্চ আর খৈনির ডিব্বা। খৈনি পিষে-পিষে হাতের তালুতে শাদা দাগ হ’য়ে গেছিল। সেই বাড়িতে সাত মামা আর তিন মাসি। রাত-ডিউটির পর ভোরবেলা দাদু কোয়ার্টারে ফিরে খেয়েদেয়ে ঘুমোলে, সারা বাড়িতে আর টুঁ-শব্দ করা চলতো না।

ছেলেবেলায় কলকাতার স্কুলজীবনে যখন হাঁপিয়ে উঠতাম, তখন পূজোর ছুটিতে দাদুর বাড়ি ট্রেনে চড়ে বেড়াতে আসা ছিল আমার কাছে স্বপ্নের। তখন আমার বয়স আট-দশ। হাওড়া স্টেশন থেকে টাটানগর অব্দি ৪১-টা স্টেশনের নাম আমি তখন প্রায় মুখস্থ রেখেছি। কলকাতায় বসে মন খারাপ হ’লে সেই স্টেশনের নামগুলো মনে মনে বলি।… হাওড়া, রামরাজাতলা, সাঁতরাগাছি, মৌরিগ্রাম, আন্দুল, সাঁকরাইল, আবাদা, নলপুর, বাউরিয়া, চেঙ্গাইল, ফুলেশ্বর, উলুবেড়িয়া, বীর শিবপুর, বাগনান, দেউলটি, কোলাঘাট।… মনে পড়ে, এইখানে মাঝরাতে রূপনারায়ণ নদীর প্রকান্ড ব্রিজের ওপর দিয়ে ঝমঝম শব্দ করে ট্রেন চললেই, সেই আওয়াজে ঘুম ভেঙে যেত।… এরপর মেচেদা, ভোগপুর, পাঁশকুড়া, হাউর, বালিচক, শ্যামচক, মাধপুর, যকপুর, তারপরেই খড়গপুর। এখানে বেশ কিছুক্ষণ থেমে থাকা। ক্রমে শিহরণ হত। কারণ, এর পর থেকেই স্টেশনের নামগুলো কেমন পালটে যাবে, হঠাৎই দেখা যাবে মাটির রঙ লাল!… কলাইকুন্ডা, সরডিহা, ঝাড়গ্রাম, গিধনি, চাকুলিয়া, কোকপারা, তারপর ধলভূমগড়; শৈশবের রোমাঞ্চকর এই নামটা। রাঁচি এক্সপ্রেসে সারারাত জানলার পাশে জেগে, বিশাল স্টিম এঞ্জিনের কয়লার গুঁড়োয় ধোঁয়ায় জলবাস্পে মথিত হয়ে, ভোররাতে ধলভুমগড় স্টেশনে থেমে শিশিরে-ভেজা লালমাটি আর মহুয়া-নিম-সজনে-শিরিষ ফুলের অপার্থিব গন্ধে মনে হোত– ‘এলেম নতুন দেশে’!… এরপর ঘাটশীলা, গালুডিহ্‌, রাখা মাইন্স, আসানবনি, শালগাঝরি। এবার ‘গোলপাহাড়ি’-তে আউটার সিগনালে ট্রেন দাঁড়িয়ে। অদূরেই টাটানগর স্টেশন; তখন ভোর হয়ে এসেছে। ইঞ্জিনের জলবাস্প ক্রমে শান্ত হলে, প্ল্যাটফর্মের টিনশেডের শেষে, লাল মাটির ওপরে আদিবাসী সাঁওতাল মেয়ে মদ্দ। এই আমার ছেলেবেলার স্বপ্নের দেশ। এখানেই ভারতের প্রথম ইস্পাত কারখানা বানিয়েছেন জামশেদজি নাসেরওয়ানজি টাটা।

আমার জন্মের অনেক আগে, বিশ্বযুদ্ধের দিনগুলোয় জামশেদপুরে বোমারু বিমানের আক্রমণ থেকে সপরিবারে বাঁচার জন্যে, ভেতর-বাড়ির উঠোনের একপ্রান্তে দাদু মাটি খুঁড়ে বানিয়েছিল একটা ছোট বাঙ্কার। শৈশবে আমি সেখানে খেলাও করেছি। মাটির নীচের সেই ঘরে সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেলে, ভেতরে আলো জ্বালানো যেত।

যুদ্ধের সময় দাদুর বাড়ির উঠোনের পাঁচিলে লেখা সেই ট্রেঞ্চে যাওয়ার দিকনির্দেশ

উঠোনের পাঁচিলে আলকাতরা দিয়ে তীর চিহ্ন এঁকে, ইংরিজিতে বড় ক’রে লেখা ছিল ‘টু দি ট্রেঞ্চ’। সুদূর আমস্টার্ডামে অ্যান ফ্রাঙ্কদের পরিবার যখন নাৎসিদের গ্যাস চেম্বার থেকে বাঁচার জন্যে আত্মগোপন ক’রে আছে, বিশ্বযুদ্ধের সেই ভয়াবহ দিনগুলোতেই জামশেদপুরে নিজের পরিবারের জন্য দাদু তৈরি করেছিল এই অবিশ্বাস্য ট্রেঞ্চ। ছোটবেলায় আমার খুব ভালো লাগতো মেঘ-ডাকা ব্যাং-ডাকা বৃষ্টির দিনগুলো। জামশেদপুরে মামার বাড়িতে মেজমামা গুনগুন করে একটা গান গাইতো, ‘এই মেঘলা / দিনে একলা / ঘরে থাকে না তো মন’।– তখনও তার বিয়ে হয় নি।

যুদ্ধের দিনগুলোর কথা মনে পড়লে দাদু প্রায়ই গাইতেন– ‘ভয় কি মরণে / রাখিতে সন্তানে / মাতঙ্গী মেতেছে আজ সমর রঙ্গে’। কখনও নেচে নেচে, মুষ্টিবদ্ধ দুই হাত শূন্যে তুলে, পুর্ববঙ্গীয় উচ্চারণে দাদু শোনাতো সেই গান।

নিজের হাতে দাদু একটা বড়ো কাঠের বন্দুকও বানিয়েছিল, তাতে গুলি ভরার ব্যবস্থা ছিল না, কিন্তু তার ট্রিগার টানা যেত। বোমারু বিমানের জন্য নয়, দাদু ওটা বানিয়েছিল যুদ্ধ শেষ হ’লে সারাদিন পাঁচিলে বসা কর্কশ দাঁড়কাকগুলোর জন্যে। উঠোনের মাঝখানে এক হাঁটু মুড়ে, খাকি হাফপ্যান্ট আর সোলার টুপি পরা দাদু সদর্পে সেই বন্দুক বাগিয়ে ধরতো পাঁচিলের কাকগুলোর দিকে, আর একটু দূরে আড়াল থেকে আমার ছোটো মামা একটা তারে-বাঁধা লোহার খোলে এক চিমটে বারুদ ঠেসে দেওয়ালে আছড়ে সশব্দে ফাটিয়ে দিত। দাদুর ট্রিগার টানা আর মামার শব্দবাজি একযোগে হলে কাকের দল তারপরে শুধু বন্দুক দেখলেই উড়ে পালাত, আমরা দেখেছি। উঠোনে সজনে গাছের ডালে দাদু ঝুলিয়ে রাখত বন্দুকটা। আমার জীবনের স্মরণীয় ভিশুয়ালগুলোর মধ্যে কবেকার এই দারুণ সিনেমাটিক দৃশ্যটা আজও রয়ে গেছে।

আমার মা ছিল স্কুলের বেসবল টিমের প্লেয়ার। সাম্যবাদী। প্রিয় কবি নজরুল। আর প্রিয় গান ‘কদম কদম বাড়ায়ে যা, খুশি কি গীত গায়ে যা…।’ সামান্য প্ররোচনাতেই আধো লজ্জায়, আধো নিবেদনে, মা গেয়ে দিত এই গানটা। সম্ভবত এইটাই ছিল শিশু বয়সে আমার শোনা প্রথম গান। এই গান দিয়ে মা আমাকে পৃথিবীর আলোয় নিয়ে এসেছিল।

দিদিমা ছিলেন ঢাকা বিক্রমপুরের। আমার জন্মের মাত্র দু-মাস আগে দিদিমাও সন্তান প্রসব করেন। এগারোটি ছেলেমেয়ের মধ্যে সেই তাঁর সর্বশেষ, সেই আমার ছোট মাসি। জামশেদপুরে দাদুর বাড়িতে ধাইমার হাতে প্রসূত দুই ছেলে-মেয়েকে প্রতিদিন তেল মাখিয়ে, উঠোনে সেই ট্রেঞ্চের খুব কাছেই হেমন্তের নরম রোদে সজনেগাছের ছায়ায় একটা পরিত্যক্ত ক্যারম বোর্ডের ওপরে পাশাপাশি শুইয়ে রেখে সংসার সামলেছে আমার মা ও দিদিমা। বাড়িতে একটা সাঁওতাল মেয়ে কাজ করতে আসতো। তার কালো চিকন গায়ে নিম তেলের গন্ধ। বহুদূরে ‘ডিমনা’ লেকের কাছে কোনো এক অজপাড়াগাঁ থেকে পাহাড় ডুংরি শালজঙ্গল পেরিয়ে, প্রতিদিন আট-দশ মাইল হেঁটে সে আসতো। আকাশের বিস্তৃত নীলিমায় ভাসমান মেঘের কিউপিড, আর অনেক নীচে সিংভুমের লাল মাটির নিকোনো উঠোনে ক্যারম বোর্ডের ওপর পাশাপাশি শুয়ে দুই শিশু। সেই থেকে নীলাকাশ আমার চোখে লেগে গেল। কত মেঘের শব্দরূপ ও ধাতুরূপ। স্বপ্নে দেখি, আমার পাশে শুয়ে ঘুমায় মেঘবালিকারা, পরনে তাদের ঘুমফ্রক।

তারপর আরও কত ‘কোদালে মেঘের মউজ’ উঠলো, আর ‘আকাশের নীল গাঙে হাবুডুবু’ খেল কত তারা। জীবনে তারপরে কত মেঘের সংসারের ভেতর দিয়ে কতরকম বিমানে উড়ে গিয়েছি আমি। নীচু মেঘের মধ্যে দিয়ে কখনো ফকার, সেসনা, কিং এয়ার, বীচক্র্যাফট্ বোনাঞ্জা। কখনো মেঘের অনেক ওপর দিয়ে বিশালাকায় জেট প্লেন। এয়ারবাস, বোয়িং। মেঘও কত রকমের–- ল্যামিনেটেড, রেখায়িত, বিচ্ছুরিত আলোর মেঘ। কখনো তারা পেঁজা তুলো, ক্ষীরসমুদ্র, উড়ন্ত সিফন। কালো পাথরের বিশাল চট্টান, আর ভারী দূর্গের মতো বজ্রগর্ভ, ঝলকানো মেঘ। যেন তারা রিলকের কবিতায় ডুইনো দুর্গের দেবদূত পর্যায়ের সেই শ্রেণীবদ্ধ শ্রোতারা।– ‘কে আমি চীৎকার করে উঠি যদি, তবে শ্রোতা শ্রেণীবদ্ধ ওই দেবদূত পর্যায়ের মধ্য থেকে’। (কবিতা: ‘ডুইনো এলিজি’ / অনু : বুদ্ধদেব বসু)।

চাকরি থেকে অবসর নিয়ে, দাদু নিজের বাড়ি করেছিলেন ‘বারোদুয়ারি’-তে। বাগানে আম গাছ, পেয়ারা, পেঁপে। মাচায় আঙুরলতা। গেটের পাশে শিউলি, মাধবীলতা, ফর্সা দীর্ঘদেহী ইউক্যালিপ্টাস। মামার বাড়িতে সাহিত্যচর্চা বা কবিতার কোনো রেওয়াজ ছিল না। তবে দিদিমা অনেক প্রাচীন ছড়া জানতেন, আর দাদুর সঙ্গে কখনো রাগে অভিমানে ঝগড়ায় খুলে যেত তাঁর পূর্ববঙ্গীয় ঢাকা বিক্রমপুরের লোককথা আর প্রবাদের ভান্ডার। মেজমামার পছন্দ ছিল রামলীলার পালা, আর কাওয়ালি গানের আসর। মামাবাড়ির উল্টো দিকে, বিহারী-বাড়ির তিনতলার খোলা ছাদে, প্রতি বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় দেহাতি গানের আসর বসতো। গায়কদের পরনে ছিল হেঁটো ধুতি, ফতুয়া, আর কাঁধে গামছা। বাতাসে সজনে ফুল আর নিম ফুলের গন্ধ। অনেক রাতে ঢোল খঞ্জনি সহযোগে, সমবেত কন্ঠে সেই সব রামগানের বিলম্বিত ও ক্রমিক দ্রুতলয়ের অপার্থিব ভোজপুরি ঝনঝনা ছড়িয়ে পড়তো দূরে দূরে। বালক বয়সে রবীন্দ্র-নজরুল-বাউল গানের চেয়েও অনেক বেশি সারল্য ও মাদকতা ছিল সেই সব দূরগামী দেহাতি সুরে, লয়ে, তানে।

অবাধ্য সন্তানদের শাসন করার জন্য দেওয়ালের হুক থেকে দাদু টাঙিয়ে রাখতো দু’তিন রকমের বেত, চাবুক, হান্টার; যেভাবে বাদশাহর মসনদের পেছনে ঝোলানো থাকে নানা মাপের তরোয়াল, বর্শা, বাঘনখ। শেষবয়সে কতবার দিদার ওপরে রাগ করে, ‘খামু না’ বলে বিছানায় বসে থেকেছেন। লুঙ্গি, ভুঁড়ি, আদুর গা। খুব রেগে গেলে মাথায় ভিজে গামছা চাপিয়ে বসে থাকতেন। সন্ধেবেলা রেডিওতে বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের খবর আর ‘বঙ্গবন্ধু’-র দৃপ্ত কন্ঠস্বর তাঁকে চাগিয়ে তুলতো। ‘তোমরা আমায় দাবায়ে রাখতে পারবা না’–- বিছানায় ট্রানজিস্টর কানে আঁকড়ে, উত্তেজনায় বসে থাকতেন ময়মনসিংহের দাদু!!

দিদিমা পেটের ক্যান্সারে ১৯৭৯-তে মারা যাওয়ার পরে দাদু আর মাত্র এক বছর বেঁচে ছিলেন। সবার অলক্ষ্যে একটা দেশলাই বাক্সের মধ্যে লুকিয়ে রেখেছিলেন মৃতার শরীরের ব্যান্ডেজ থেকে নেওয়া এক টুকরো তুলো। কখনো দিদিমার ছোট্ট একটা ছবি কোলে নিয়ে শিশুর মতো কাঁদতেন।– সেই দাদু মারা গেলেন ১৯৮০ সালে, পঁচাশি বছর বয়সে, দিদিমার শোকে। দাদুর মৃত্যুর পরে নিউ বারোদুয়ারীর সেই বাড়িও একদিন প্রমোটারের হাতে ভেঙ্গে তৈরী হয়েছে ফ্ল্যাট বাড়ি। আমার শৈশবের রূপকথার মতো দিনগুলো হাতুড়ি শাবলের ঘায়ে টুকরো হয়ে ভেঙ্গে পড়ছে, একে একে জানালা দরজা দেওয়াল ছাদ চলে যাচ্ছে স্মৃতির গভীর গহ্বরে; আমি নির্বাক হয়ে দেখেছি।

*

উইলিয়াম বারোজ বলেছেন ‘প্যারিস রিভিউ’ ইন্টারভিউতে, ‘আমাকে ওরা প্রশ্ন করছে, আমি যদি একা নির্বাসিত হতাম কোন সমুদ্র-ঘেরা নির্জন দ্বীপে, যদি জানতাম কেউ কখনো পড়তে পাবে না আমার লেখাগুলো, আমি কি তাহলে চালিয়ে যেতাম লেখালিখি? এর উত্তরে অবশ্যই বলবো, হ্যাঁ। কারণ, লেখা দিয়ে আমি তৈরি করি আমার নিজস্ব এক জগৎ, যা আমাকে সঙ্গ দেয়। যা আমার চিরদিনের, আমার বাসভূমি।’ –শিল্পে সাহিত্যে একজন পর্যবেক্ষকের কাজ ঐ নিজস্ব জগতের তৈরি হওয়ার ইতিহাসকে বুঝে নেওয়া। কীভাবে রচিত হয় সেই নিজ বাসভূমি, যা আজীবন সঙ্গ দেয়। শৈশবের নরম মাটিতে ভিত কেটে কীভাবে সময়ের সাথে ক্রমে গড়ে ওঠে তার স্তব্ধ রঙিন ঝংকৃত আলো-অন্ধকার সিঁড়ি ও বারান্দাগুলো, যা তার চিরদিনের। তার স্নান ও তৃষ্ণা, তার ভোরের সূর্য ও সাঁঝবাতি। আর সেইসব ‘জোহারি জানালা’ (Johari  windows), যার ফ্রেমের মধ্যে সীমায়িত হয়ে আছে তার অস্তিত্বের জানা ও অজানা অংশগুলো।

*

দাদু মারা যাওয়ার পরে, তাঁর হাতে-বানানো একটা পাতলা খাতায় কিছু বিচিত্র নোট্‌স, দাদুর নিজের হাতের লেখা, আমার চোখে পড়ে। বেশিটাই ওপার বাংলার টুকরো স্মৃতি। তাঁর কৈশোর আর প্রাকযৌবনের। মনে হয় সেটা একশো বছর আগের, ১৯১০ থেকে ১৯২৫ সালের সময়কাল। দাদুর সেই মলিন জীর্ণ ডায়েরিটা হাতে নিয়ে আমি বসে আছি। মাত্র ওইটুকু পরিসরে দাদু পেশ করে গেছেন সেই সময়ের এক বিচিত্র আলেখ্য, তার সকল আকাঁড়া শব্দ-চিত্র-অক্ষর-ঘ্রাণ আর অপূর্ণতাসমেত। সেই কৃশ ডায়েরিতে দাদু লিখেছেন নিজের জীবনের টুকরো কত দৃশ্য, স্মৃতি। বন্ধুদের নিয়ে ‘ভারতবর্ষ’ কাগজ প্রণেতা ডি.এল. রায়-এর বাড়ির বাগানে সম্রাট পঞ্চম জর্জের তৈলচিত্র কবর দেওয়ার কথা।

সম্রাট পঞ্চম জর্জের তৈলচিত্র

দাদুর ডায়েরিতে উল্লেখ আছে— প্রফুল্ল চাকির মৃতদেহ, স্টার থিয়েটারে দানীবাবু, অথবা, বগুড়ায় রমণী কবিরাজের সোডা বোতলের কারখানা। আর আছে সোনা মিঞার বাচ্চা হাতিতে চড়া এবং বিরাট দুই-মহলা কোঠাবাড়ির ‘কাদম্বিনী ঠাইন’।

এক জায়গায় দাদু লিখেছেন– ‘প্রতিবেশী যখন ঠাকুরবাই বলে ডাক দিতেন পাশা খেলার জন্য, মাতাঠাকুরানী তখন রাগ কত্তেন’।

কবে যেন নদীর ওপারে ‘সাওতা’-গ্রামে এক যাত্রাপার্টিতে দাদু ডবল রিডের হারমনিয়াম বাজিয়েছেন, লিখেছেন সেই কথা। নদীচরের তপ্ত বালুতে পথ চলা দায় হ’লে পায়ে বেঁধে নিতেন কলাগাছের ছাল। জামশেদপুরে সুবর্ণরেখা নদীতীরে শ্মশানঘাটের গেটের বাঁদিকে আজ যে বিশাল সেগুন গাছ, সেটা দাদুর হাতে পোঁতা। কারখানার ‘বয়লার হাউস’-এর ‘হেড ফায়ারম্যান’ দেশ থেকে সেই চারা এনে দিয়েছিল।

সেই ডায়েরীর পাতায় কয়েকটা ইংরিজী শব্দ, তাতে একটাও বানান ভুল নেই। কিন্তু বাকি অংশটা দাদুর নিজস্ব বাংলায়, যতি চিহ্নহীন, ‘র’ আর ‘ড়’ সব ওলোটপালোট। এমন সত্য ও অমার্জিত বাংলা, যার সকল অসম্পূর্ণ ছত্রে ছত্রে ধরা আছে সেই সময়ের স্বাদ, গন্ধ, গ্রাম্য রসিকতা, যা গদ্যলেখক ও গবেষকের কাছে ঈর্ষণীয়। আমি আজও পড়ি, আজও প্রতিবার বিস্মিত, আমোদিত। এখানে রইলো সেই ডায়েরির অল্প কিছু অংশ। (আমি তার সব বানানই অপরিবর্তিত রেখেছি, দাদু যেমন লিখেছিলেন সেকালে।)

“১ তখন আমার বিবাহ হয়নি, চাকুরীর অন্যেষণে ১০ নং মভার রোডে ধীরেন মজুমদারে বাসায়  সামনের বারান্দায় শোয়ার স্থান পাইয়াছি, বৃষ্টি গার উপর দিয়ে গিয়াছে ওদের এক আত্মীয় মারা গিয়াছেন, সুবর্ণরেখা নদীর চড়ে নিয়ে যাওয়া হ’লো মৃতদেহ সৎকারের (ব্যবস্থা) নদীর ওপার থেকে আন্‌তে হ’লো

প্রখড় রৌদ্র মাথায় সহ্য হচ্ছে কিন্তু পায়ে কলাগাছের ছাল বেধে নিতে হলো। কথায় আছে–

       “প্রখর রোদের তাপ শীড় (মাথায়) সহ্য হয় হে / তার তেজে তপ্ত বালু পায়ে সহ্য দায় হে”।

মৃতদেহ সৎকার নির্ব্বিঘ্নে হয়ে গেল।

২ জামসেদপুরে টাটার কারখানায় বাঙ্গালী বিমল মুখার্জীর অধীনে আমার এপ্রেন্টিস হিসাবে কাজ হলো।

শীতকালে শুকিয়ে যাওয়া সুবর্ণরেখা নদী

৩ কাদম্বিনি ঠাইন, বিরাট দুই মহল্লা কোঠাবাড়ী, বৃদ্ধ মহাশয়কে মেয়েরা বাবামশাই বলে ডাকিতেন। Retired from চা বাগান। পুত্র সন্তান নেই বলে ঘড় জামাই রেখেছিলেন।

৪ পশ্চিমের ভীটীর ঘড়ে এক অতি বৃদ্ধা থাকিতেন। তাঁর কোষ্ঠকাঠিন্ন ছিল। রাম রাম খালী সিগারেট প্যাকেট দেখলাম।

৫ সাম্‌নের মহল্লায় পশ্চিমের ভিটিতে এক মহিলা থাকতেন। আমাকে খুব ভাল বাস্‌তেন। মেয়েরা আমাকে বরকনে বরকনে খেলা করে আড়ালে দেখ্‌তে আমি কী করি।

৬ সুর ধাম বাড়ী : সুরবালা হলো হোমিও ডাক্তার প্রতাপ চন্দ্র মজুমদারের মেয়ে। সুরবালার বিয়ে হয় ভারতবর্ষ কাগজ প্রণেতা দ্বীজেন্দ্র লাল রায় (D.L. Roy) এই বাড়ীর বাগানে আমরা George the 5th এর তৈলচিত্র কবর দি। আমি তখন অধর মজুমদার বাসায় ৩০নং গুরু প্রসাদ চৌধুরী লেনে থাকি।

৭ আমরা Special টীকেটে ষ্টার থিয়েটার দেখবার সুযোগ পাই ষ্টার থিয়েটারে দানীবাবুর (গিরিশ ঘোষ) ঐ সময় সুরেন ব্যানার্জির দীমত হওয়ায় জুতোর মালা পড়িয়ে দেয়।

৮ চাপড়ার বাড়ীতে বুদের বৌ আমার অসুখ হয়েছিল সেবা করে প্রাণে বাঁচায়। বিনিময়ে আমি ও সিতানাথ মজুমদার বিশ্বাশঘাত কথা করি গোকুল বাবুর ঘড়ে। ঘোসের মেয়ে “ননী” ছিল ঝি নষ্টের কারণ। মোসলমান চাকর ছিল ২/৩ টা। চাপড়ার বাড়িতে আমার দিদির দুই ননদ ছিল, বড় জন সব সময় ভিজা গামছা মাথায় রাখ্‌তেন – সিড়ি দিয়ে নাম্‌বার সময় Heart fail এ মারা যান।

৯ নাটোর এর পিসিমা: পিসা মহাশয় ডাক্তার চারিদিকে পরিখা
দুই ছেলে:  ১) দীনেশ    ২) পিক্‌লো বাঁশী
পিক্‌লো বাজাইতেন- “যা চ’লে চিতচোরা যা চলে ঘড়ে
আমি জীবন ডালি দিব জমুনা পরে”।

১০ কুমারখালী: মথুরা মোহন হাই স্কুলে খেয়া নৌকায় গৌর নদী পার হ’য়ে যেতে হ’তো। মথুরা মোহন হাই স্কুল ছিল কুন্ডু বংশ। স্কুলের অমৃত নামের পন্ডিত মশায়ই রামাভীষেকে মত্ত্ব বিহ্বলায়া কক্ষাচ্যুত জেমঘট যুবত্যা সোপান মাসাদ্য ঢকার শব্দ ঠঠাং ঠটাং  ঠং ঠটাঠং  ঠটাং চ্ছঃ-– বলতো কটা সিঁড়ি?

[ যুবতীর কাঁখ থেকে কলসি পিছলে পড়েছে ঘাটের সিঁড়িতে, ঠোক্কর খেতে খেতে সেটা জলে গিয়ে পড়েছে, নানা শব্দ তুলে। পন্ডিত মশাই সেই শব্দ-বর্ণনা দিয়ে ক্লাসকে জিগ্যেস করছেন, ঘাটে কটা সিঁড়ি?– দাদু একদিন আমায় বলেছিল এই গল্প।]

১১ আমার দিদি পার্ব্বতী দের পেছনের বাড়িতে এক বিধবা ঠাকরুণকে মা বলে ডাক্‌তেন। ঐ খানে একটা লিচু গাছ ছিল, লিচু গাছের (নীচে) একটী বয়স্কা মেয়ে আস্‌তো তার সাথে অবৈধ আলাপ কত্তাম।

১২ পার্ব্বতী মজুমদারে ভগ্নির একই ছেলে ধনুষ্টংকারে মারা যায়। গোর* নদীতে স্নান কত্তে যেতে হলে চড়ে অনেক ভাং গাছ। দিদির ছিল “সুচী বাই”, জলভর্তি কল্‌সি নদী থেকে আস্‌বার সময় রাস্তায় কিছু পাড়িয়েছেন মনে করে সব জল সেখানে ঢেলে আবার নদী থেকে জল নিয়ে আস্‌তেন।

[ *গোর নদী, গৌর নদী, গৌরী নদী, বা গোড়াই নদী: কুষ্টিয়া জেলায় পদ্মা নদী থেকে উৎপন্ন হয়ে, ঝিনাইদহ, রাজশাহী, ফরিদপুর হয়ে প্রবাহিত মধুমতী নামে; ক্রমে অনেক শাখানদীর জন্ম এর থেকেই। রবীন্দ্রনাথের কবিতাতেও আছে– “গোড়াই নদীর চর / নূতন ধানের আঁচল জড়ায়ে ভাসিছে জলের পর… / রাতের বেলায় আঁধারের কোলে ঘুমায় নদীর চর / জোনাকি মেয়েরা স্বপনের দীপ দোলায় বুকের পর”]

১৩ হরিশ বাবু Retire হয়ে এসে যাত্রাপার্টী করে ছিলেন এবং নদীর ঐ পাড় সাওতা গ্রামে হয়েছিল আমি ডবল রিডে হারমোনিয়াম অনেক বছর পরে আমি বিক্রি করে দি। শৈলেন চেয়েছিল। বোউ ও মেয়েদের মাথার খোপায় চুলের কাটায় সাদা ছোট চিনা মাটীর পাখি থাক্‌তো।

১৪  সুবর্ণ রেখা  Burning ঘাট:
C B Boilar এ কাজ কত্তাম আমার মোসলমান Head Fireman তার দেশ থেকে সেগুন গাছের চারা এনে দেয়। চারাটি Gate এ লাগিয়েছি – তাই এখন মহিরুহ হ’য়েছে।

১৫ ললীত ঘোষ (টীকাদার) হরিচরণ দাস (প্রতিবেশী)
যখন ঠাকুরবাই বলে ডাক দিতেন পাশা খেলার জন্য মাতাঠাকুরানী তখন রাগ কত্তেন
হরিচরণ দাসের স্ত্রী ঘরের খামে লক্ষ্মী আক্‌তেন।

১৬ বারদোয়ারীতে মোসলমানের বাড়ী ২৬ নং সৌকত খাঁ বিক্রি করিয়া দিয়াছে হিন্দুর কাছে
এই বাড়ীতে তরফ থেকে গীতা পাঠ হয়েছিল। কাঠাল গাছ ওয়ালা বাগ্‌চি বাবুর ৪ নং বাড়ীর পাশের বাড়ী ইনায়েদ খাঁ ছিল।

১৭ বগুড়া (শিববাটী): রমণী কবিরাজ (সোডা বোতলের কারখানা)
হরচন্দ্র বর্ম্মা, সোনা মিঞা, বাচ্চা হাতিতে চড়া

১৮ প্রফুল্ল চাকীর মৃতদেহ Coronation School.

১৯ ‘নাই’ বল্‌তে নাই বারন্ত বল্‌তে হয়।

২০ করতোয়া নদী ডুব দিয়ে হাস ধরে আনতাম”।

করতোয়া নদী: মহাভারতে উল্লেখিত এই নদী অধুনা মৃতপ্রায়। ভুটানের উত্তর হিমালয় থেকে উৎপন্ন

হয়ে তিস্তার শাখানদী রূপে বাংলাদেশের রংপুর, বগুড়া, পাবনা, গাইবান্ধা অঞ্চলে প্রবাহিত।– বড় হয়ে মা-র কাছে শুনেছি, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আমার মা মাসি ও মামারা সবাই ঐ গাইবান্ধায় ছিল ছ’মাস।

সেকালের কলকাতার কবিয়াল ‘ভোলা ময়রা’-র গানে আছে— ‘ময়মনসিংহের মুগ ভালো, খুলনার ভালো কই / ঢাকার ভালো পাতাক্ষীর আর বাঁকুড়ার ভালো দই’। আমার মনে পড়ে, কবি স্বদেশ সেনও তাঁর কবিতায় লিখেছেন: ‘ঐ দেখ ময়মনসিং-এর ছেলে চলে যাচ্ছে / গরম বালি যেন টেনে নিচ্ছে গায়ে পড়া জল’।– আমার দাদু ছিলেন সেই ময়মনসিংহের ছেলে। দাদুর সেই কবেকার ডায়েরির পাতায় পাতায় আজও আমার চোখ ঝাপসা হয়ে আসে।

মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না। আবশ্যক ঘরগুলো * দিয়ে চিহ্নিত করা হয়েছে