ছাতা হারিয়ে গেলে যে সর্বনাশ হয় ★ স্নিগ্ধা বাউল

আমাদের উনসংসারে পাঁচ ভাইবোনের জন্য একটা ছাতা ছিল। বিস্তৃত উঠানের এই মাথা ওই মাথায় দৌড়াদৌড়ি করে আমাদের সারাদিন কেটে যেত। উঠানের মাঝ বরাবর একটা চালতা গাছে ফুল এলে আমরা জানতাম তীব্র গরম পড়তে যাচ্ছে। আমের মুকুলেরা তখন গুঁটিআম হয়ে গাছে সবুজ পতঙ্গের মতো ঝুলতে শুরু করে। বৈশাখ মাসের আকাশে আচমকা মেঘ দেখা দিলে আমাদের আনন্দের শুরু হতো; ঠিক এই বাড়ি ওই বাড়ির আম গাছের তলায় পড়ে থাকা আম কাড়াকাড়ি করে জামার কোছ  ভরে নিয়ে আসার অভ্যাস ছিল আমার। এক কোছ আম ঘরে রেখে আবার দৌড়ে যেতাম আমতলায়। বিচিত্র সব আমের নাম ছিল, বৈশাখী আম, কালা আম, কাচমিঠা আম, ব্যাটারি আম, কাডাইরা আম, ঠাম্মার উঠানের আম, জ্যাঠার দরজার আম, সিন্দুইরা আম, চামেলিদির বাগানের আম। সিন্দুইরা আমের আলাদা একটা সৌন্দর্য ছিল; মগডালে রোদ পড়ে আমের রঙ হয়ে যেত সিঁদুরের মতো। বাড়ির সেদিকে কয়েকটা সমাধি থাকায় আমাদের যেতে যথেষ্ট ভয় হত। বৃষ্টির পরে চোখ বন্ধ করে সাপের মাসি পিসিকে ভুলে লাল টকটকে আম নিয়ে যে বিশ্বজয়ী দৌড় আমরা দিতে পারতাম তা আজকের দিনের জন্য জমা করা ছিল সম্ভবত।

আমাদের পাঁচ ভাই বোনের সংসারে একটাই ছাতা ছিল। ঝড় এলে বালিতে ভরে যেত আমাদের মাটির ঘর। মা আবার সব পরিস্কার করে নিতেন। কিন্তু আমাদের ভয় ছিল বৃষ্টি নিয়ে। বৃষ্টি হলেই আমাদের ডানা ভাঙা রোদ আচমকা স্বপ্নভঙ্গের মতো হাজির হতো ঝরঝরে জল। আমাদের টিনের চালায় ছিল অসংখ্য ছিদ্র! অন্ধকার রাতে আমাদের ঘরের একটা অংশ থেকে দেখা যেত তোমাদের মহাকাশ; যদিও বাবা কারেন্ট চলে গেলে আমাদের দেখাতেন সপ্তর্ষীমন্ডল কিংবা শুকতারা আর কালপুরুষ। রাতের মেঘলা আকাশ মাকে আচমকা বিচলিত করে দিত; আমাদের ঘুম পাড়িয়ে বসে থাকতেন অন্ধকার ঘরে। ঘোর বৃষ্টি নেমে এলে মা আমাদের ঘুমন্ত ভাই-বোনদের আস্তে করে আলাদা করে দিতেন আর সেখানে সিলভারের হাঁড়ি বসিয়ে দিয়ে বৃষ্টির জলে একটা সারগাম শুরু হলে আমরাও উঠে বসতাম। মাকে তখন মনে হতো মায়াবী যেন রূপকথার সাহসী নারী; দুঃখের সুন্দর নিয়ে বসে আছে মাপাখি ডানা মেলে।

আমাদের টানপোড়েনের সংসারে একটাই ছাতা ছিল। সরল আমার বাবার ছুটি ছিল শুক্রবার। বর্ষার দিনে বাবা কোথাও থেকে একটা লোক নিয়ে আসতেন টিনের চালা সারাই করার জন্য। মন খারাপ করে মাথা নিচু করে বসে থাকা লোকটার শতছিদ্র ছাতায়ও গল্প ছিল অনেক। পুটিং লাগানোর কাজ করতে এসে সে প্রথমেই আলকাতরা, ধুপ আর কী কী যেন মিলিয়ে নিয়ে একটা আঠালো জিনিস তৈরি করত। তারপর ঘরের পিছনের হোমড়া সাইজের আমগাছ বেয়ে উপরে উঠে যেতে যেতে লোকটা কেবল বাবাকেই ভরসা করত। আমাদের বাবা তখন বিশাল কিছু করে ফেলার সাহস নিয়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে থাকতেন আর মার দিকে তাকিয়ে জলের মতন বয়ে যেতেন যেন বা আবার ভুল করে বসলেন! ঠিক হপ্তা দুই পরে রাতের বৃষ্টির জল গড়িয়ে নামতে শুরু করলেই মা বকবক করে উঠতেন রাতের অন্ধকারে। আমরা আবারও কাঁথা গুটিয়ে মায়ের পাশে গিয়ে শুয়ে পড়তাম অবোধ শিশুর মতন।

আমাদের সংসারে একটাই ছাতা ছিল। আমাদের মায়ের যত সংকট ছিল এই বর্ষাকালে। মাটির চুলায় মা রাঁধতো শুকনা পাতা দিয়ে। ঝড়ে ঝরে-পড়া পাতা রোদে শুকিয়ে মা রেখে দিত বস্তায় ভর্তি করে। রান্নাঘরের লাগোয়া পরিত্যক্ত ঘরটায় বস্তাগুলো রেখে দিলেও বৃষ্টির ছাঁটে ভিজে যাওয়া পাতা আবারও শুকানোর জন্য রোদের দিকে তাকিয়ে থাকতে হতো। ভেজা পাতার গন্ধে মায়ের চোখে তীব্র কষ্ট আমাদের পড়তে বসতে বাধ্য করে দিত। তবে আমাদের বৃষ্টির দিনে সবচেয়ে কষ্ট ছিল, বাইরে খেলতে যেতে না পারা। জানালার শিকে ধরে অমলের মতো বাইরে তাকিয়ে আকাশে বৃষ্টির ঝরে পড়া দেখে দেখে কেটে যেত দিনের বেশিরভাগ সময়। তখন গোয়াল ঘরের মিটমিটে আলোয় ঘোরলাগা সন্ধ্যা নেমে যেত চোখের পলকে। বইয়ের পাতায় বর্ষনমুখর সন্ধ্যা রচনা পড়তে পড়তে ঝিম লেগে গেলে মা পাত বেড়ে দিত আলুভর্তা আর গরম ভাত। বৃষ্টির সাথে সাথে খিচুড়ির ধোঁয়া আমাদের গ্রামীন কালচারের কোনো স্মৃতিতে কোনোদিনই ছিল না। বরং আমরা জেনেছি চালে ডালে সহনশীল জীবনের বাইরে মায়ের মুখের নাম আমাদের ছাতা।

আমাদের সর্বাঙ্গীন জীবনে একটাই ছাতা ছিল। বৃষ্টি নামার আগেই আমরা দৌড়ে চলে যেতাম জেঠার ঘরে। বড়ো ঘরটার টিনের চালায় বড়ো বড়ো বৃষ্টির ফোঁটা সশব্দে পড়তে শুরু করলে আমাদের মন নেচে উঠতো; মূদ্রাহীন আমাদের আনন্দ সবসময় জেঠার কাছেই লাই পেয়েছে। তখন শুরু হত আরেক খেলা। ঘরের ভিতর ঘর বানিয়ে সেখানে বসে বসে রান্না বাড়ি খেলছি আমরা আর মা দৌড়ে খুঁজে বেড়াচ্ছে আমাদের এইদিক ওইপ্রান্ত আর, আমরা তখন রূপকথার রাজ্য গড়ে বসে আছি।

আমাদের দৈনিক জীবনে কেবল একটা ছাতা ছিল। ছাতার নাম অ্যাটলাস। কালো লম্বা কাঠের হাতলসহ ছাতাটা আমার চাইতে লম্বা ছিল। আমরা বৃষ্টি ছাড়া রোদে ছাতা ব্যবহার করতে জানতাম না কোনোদিন। একবার আমাদের ছাতাটা নিয়ে চলে গেলেন কেউ।

ছাতা হারিয়ে আমার মা দিশেহারা, রান্নাঘরে যেতে ভিজে যাচ্ছেন, আধভেজা হয়ে রান্না করা পটলের ঝোলে বৃষ্টির জল পড়ে বাড়ন্ত হয়ে যাচ্ছে হলুদের রঙ। ভেজা শাড়ি মায়ের শরীরে শুকিয়ে যাচ্ছে দেখে দেখে আমরা বড়ো হতে শুরু করলাম। মা ভিজে যাচ্ছে সাথে ভিজে যাচ্ছে একটা বুড়ো কদম গাছ। আমাদের ছাতাটা হারিয়ে গেলেও বাবার মাইনে বাড়লো না, তাই আর নতুন ছাতা কেনা হচ্ছিল না। বাবা ভিজে ভিজে ঢাকার পথ ধরছেন, মা বাবাকে এগিয়ে দিয়ে এসে শাড়ির আঁচল মেলে ধরে শুকিয়ে নিচ্ছেন সংসারের বৃষ্টি। আমাদের ছাতাটা হারিয়ে গেলে আমরা স্কুলের ব্যাগ পলিথিনে মুড়িয়ে নিচ্ছি। বেতন কার্ডে লালদাগ পড়া শুরু করলে বাবা জানিয়ে দিলেন এরপর আগামী বর্ষায় ছাতা কিনবেন।

আমাদের একটাই ছাতা ছিল। দাদা টিউশনির মাইনে পেয়ে একটা ছাতা কিনে আনলো। আমাদের সেই ছাতাটাও হারিয়ে গেছে। ছাতা আসলে হারিয়ে যায়। মাথার উপরে থাকার মতন ভার কতক্ষণ আর বয়ে বেড়ানো যায়!

মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না। আবশ্যক ঘরগুলো * দিয়ে চিহ্নিত করা হয়েছে