আনন্দশৈশব ★ সুকুমার মণ্ডল

সে এক গ্রামের বাড়ি ছিল আমাদের। মাটির গাঁথনি, কুড়ি ইঞ্চির মোটাসোটা প্রতিটি দেওয়াল। নীচে একটিই মাত্র ঘর, আর তার উপরে আরেকটি। চিলেকোঠা নেই, বৃষ্টির সময় ছাদের সমস্ত জল সিঁড়ি বেয়ে নীচে নামত এঁকেবেঁকে। এ-ছাড়া একচিলতে উঠোনে ছিল সামান্য একটি টিনের চালা, এখানেই হত মায়ের যাবতীয় রান্নাবান্না ও আমাদের খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন। নীচুতলার ছাদটি বালিসিমেন্টের ছিল না— কাঠ, কড়িবরগা ও মাটি দিয়ে তৈরি। এবং সেটি ছিল এমন একটি ছোট্টো অন্ধকার শীতল ঘর, যেখানে একটি জানালা বা এমনকি ঘুলঘুলিও নেই। দুপুরের খাওয়া শেষ হলে বাবা আমাকে সেখানে ধরে নিয়ে আসত। বাবার মতে, তখন গ্রীষ্মকাল, বাইরে ব্রহ্মদৈত্যের মতো কড়ারোদ। এই ঘরের মেঝেতে বিছানা পেতে আমাকে ঘুম পাড়ানোর চেষ্টা করত। বাবা নিজে ঘুমিয়ে পড়ার আগে আমার একটি পা তার কোমরে চাপিয়ে নিশ্চিন্ত হতে চাইত। কিন্তু সারা দুপুর এমন একটি ঘরে বন্দী থাকার বান্দা আমি ছিলাম না। বাইরে অপেক্ষা করছে যতীন, কাঞ্চন, হীরালাল এবং আরও কতশত বন্ধুজন। তাহলে উপায়? বাবা কখন ঘুমিয়ে পড়বে, তার অপেক্ষা। আমি ঠিক টের পেয়ে যেতাম বাবার হাতখানা কখন নিস্তেজ হয়ে আসত। আর এই সুযোগে আমি বাবার হাত থেকে নিঁখুত কৌশলে নিজের বন্দী-পা মুক্ত করতাম। পা টিপে টিপে, খুব সাবধানে ঘর থেকে বাইরে বেরোতাম। সে কী যে এক মুক্তির আস্বাদ! কিন্তু এমন এক-দু’দিন হতো, যখন বাবার চালাকিও ছিল বিস্ময়কর। ঘুমোনোর ভান করে জেগে থাকত বাবা, আমি বন্ধনমুক্ত হতে উ্যদ্যত হলেই খপ করে ধরে ফেলত অমার আমার যাবতীয় কৌশল। ‘আমি হিসি যাব’— এই যুক্তিটিই সবসময় পেশ করতাম বটে, কিন্তু মনে হয়, সেটি একেবারেই অবিশ্বাসযোগ্য ছিল বাবার কাছে। আজ নিজে দুই সন্তানের বাবা হয়ে বুঝতে পারি, কী মহার্ঘ্য ছিল আমাদের এই লুকোচুরি!

আমাদের বাড়ি থেকে সামান্য দূরেই ছিল বিশাল একটি তেঁতুল গাছ। গাছটি  তার বাহুসর্বস্ব ঝুলিয়ে রেখেছে চারপাশে। সে-সব ডাল মাটিতে দাঁড়িয়েই নাগাল পাওয়া যায়। একডাল দিয়ে উঠে আমরা সব দলে দলে কখনো অন্য ডাল দিয়ে ঝাঁপিয়ে নামছি অনায়াসে, কখনো গাছের কাঁধে নিশ্চিন্তে বসে বিশ্রাম নিচ্ছি। এখন ভাবলে অবাক হই, সে কী অপূর্ব কোনো পূর্বজন্মের কথা ভাবছি এসব। এখন সামান্য একটি পেয়ারা গাছে উঠলেই পা কাঁপতে শুরু করে। কিন্তু আজ শুধু পা নয়, বুকটিও কেঁপে কেঁপে ওঠে এই ভাবনায়, কী একটা জীবন হারিয়ে এলাম শুধুমাত্র বড় হওয়ার অপরাধে!

এর মধ্যেই কোনো একদিন সচকিতে আকাশ তার রূপ বদলায়। কেউ বলে ‘ভয়ঙ্কর, পালিয়ে চল’, পালিয়ে চল’। আর আমি দেখি অপরূপ! রোদের গনগনে আলো দপ্ করে নিভে গেল। আকাশের এককোণ থেকে কালো মেঘের পাহাড় দ্রুত তার ডালপালা মেলেছে সমগ্র আকাশে। শুরু হল দমকা বাতাস। তেঁতুলগাছের গা থেকে অসংখ্য পাতারা ডিগবাজি খেতে খেতে ঝরছে, রাস্তার ধুলোবালি সব ওলটপালট করছে নিমেশেই। আকাশ জ্বলেপুড়ে ছাই হয়ে গেছে। ঝরে পড়ছে তার ছাইভস্ম রঙ। সবকিছু মিলেমিশে একাকার। আনন্দে কী যে করব আমি, খুঁজে পাচ্ছি না। এর মধ্যেই আওয়াজ করে শুরু হয় বিদ্যুতের চমক। এইবার বাড়িফেরা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না। বাড়িফেরা মানেই কিন্তু তখনই ঘরের মধ্যে ঢুকে-পড়া নয়; বরং আমাদের ঘরের পিছনে বাগানবাড়িতে ছুটে চলে যাওয়া। সেখানের ছোট্ট ঝিলের চারপাশের বাঁশঝাড় ও তালগাছগুলো নুয়ে পড়ছে মাটির দিকে, জলের দিকে। মাটি থেকে তুলে নিচ্ছি শুকনো তালপাতার টুকরো আর একটি নিমপাতার শক্ত ডাটি। তালপাতার মাঝখানে সরু নিমকাঠিটি গুঁজে দুই আঙুল দিয়ে বাতাসের দিকে তুলে ধরতেই বনবন করে ঘুরতে শুরু করেছে আমাদের অলৌকিক ঘূর্ণি। নিজের তৈরি করা এমন একটি অপরূপ— ঘুরছে তো ঘুরছেই! অবাক বিস্ময়ে দেখি, কীভাবে একটি এবড়োখেবড়ো তালপাতার টুকরো এমন মসৃণ আর নিখুঁত ভাবে ঘুরতে পারে! আমার আঙুলের ডগায় এই অপার্থিব ঘূর্ণনঅবাক বিস্ময়ে দেখতেই থাকি, যতক্ষণ না বৃষ্টির সঙ্গে হঠাৎ করে আকাশ থেকে পড়তে শুরু করেছে সাদা সাদা পাথর, যাদের আমরা এখন শিলাবৃষ্টি বলি। এই সাদাশুভ্র পাথর  ঘাসমাটির উপর কী অপরূপ সাজে নিজেদের বিছিয়ে রেখেছে! তার থেকে দু-চারটি মুখে পুরে নিজেকেই ঈশ্বর বলে মনে হত।

অবশেষে বাড়ি ফিরে আমাদের রান্নাঘরের মধ্যে বাড়ির সবাই এসে দাঁড়াতাম। আজ আর কোনো বকাঝকা নেই। ছাদের জল যথারীতি এঁকেবেঁকে সিঁড়ি দিয়ে নীচের ঘরে নামছে, মিশে যাচ্ছে উঠোনের জলে। মা-বাবা, দাদা-দিদিরা সবাই খুব খুশি। রান্নাঘরের ছাদে কালবৈশাখীর নৃত্য। পৃথিবীর সমস্ত আনন্দগান যেন মিলেমিশে একাকার, যার একটি সুরও আমার জানা হয়ে ওঠেনি। সেইসব কালবৈশাখির সঙ্গে আমাদের আনন্দশৈশব আজ কোথায় উড়ে চলে গেছে!

মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না। আবশ্যক ঘরগুলো * দিয়ে চিহ্নিত করা হয়েছে