‘বাতাস নড়ে গাট্টি বানো’ অর্থাৎ বাতাস বইছে, গাট্টি বোচকা বাঁধো। ১৯৯১খ্রি. ২৯ এপ্রিলের পর একটু জোরে বাতাস বইলে আমি এই কথা নাকি বলতাম, মা বলেছিল। জোরে বাতাস বইলে গাট্টি বেঁধে নিরাপদ স্থানে চলে যেতে হয়। সেটা একানব্বইয়ের ঘূর্ণিঝড় ভালোভাবেই বুঝিয়ে দিয়েছিল।
বয়স তখন সবেমাত্র পাঁচ। সেই ভয়াল রাত। হঠাৎ বিকট শব্দে ঝড়ো হাওয়া আর টিনের চালা উড়িয়ে নিয়ে যাওয়ার মতো ঘটনা সেবার প্রথম দেখি।
একানব্বইয়ের সেই রাত ছিল দারুণ ভয়ংকর। এমন দানবীয় হাওয়া আর কখনো বয়ে যায়নি আমার গ্রামের উপর দিয়ে।
গ্রামের নাম শেখেরখীল। চট্টগ্রাম শহর থেকে ৫০ কিমি দক্ষিণে বাঁশখালী থানার অন্তর্গত একটি গ্রাম। শেখেরখীল গ্রামের হিন্দু পাড়ায় আমাদের বাড়ি। নাপোড়া বাজার স্কুল রোড হয়ে অল্প গেলেই বাড়ি।
নাপোড়া বাজার হতে ছনুয়া গেলেই সমুদ্রের বেঁড়ি বাঁধ। দূরত্ব প্রায় ৯ কিমি। একানব্বইয়ে এই সমুদ্র কতোটা ভয়াল হলে প্রচণ্ড জলোচ্ছ্বাস নিয়ে খড়কুটোর মতো মৃত মানুষ ও পশু পাখিদের ভাসিয়ে নিয়ে এসেছিল আমাদের বাড়ির পেছনে।
পুরো শেখেরখীল গ্রামে শুধু আমাদের পুকুরে লোনা জল ঢুকেনি। গ্রামের সমস্ত পুকুরের জল ব্যবহার অযোগ্য হয়ে গিয়েছিল। শত-শত মানুষ আশ্রয় নিয়েছিল আমাদের ঘরে। শত-শত মানুষ গোসল করতো আমাদের পুকুরে।
সে রাতে আমরা কেউ ঘুমাইনি। বাতাসের বিভৎস হুঙ্কার আমাদের ঘুমাতে দেয়নি। গাছ-গাছালি আঁছড়ে পড়েছিল মাটিতে। আমাদের ছিল দুই তলা মাটির গুদাম ঘর। মাঝখানে মাটির সিঁড়ি। সিঁড়ির দুই পাশে নিচতলায় দুটি করে চারটি খণ্ড অর্থাৎ রুম। সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে দুই পাশে দুইটা রুম। মোটা পুরু গাছের কাঠের ছাদ তার উপর মাটি লেপা। উপরে টিনের ছাউনি। নিচের তলায় লম্বা বারান্দা। সেই বারান্দা আবার ছনের ছাউনি। এই বারান্দায় দুই পাশে একসাথে শ-খানিক লোক পাত পেতে বসে ভাত খেতে পারবে।
অনেক বড় বাড়ি। সামনে শান বাঁধানো পুকুর ঘাট। টিনের বানানো বিশাল ধানের গোলা। ততদিনে বাপ দাদাদের জৌলুস হারিয়ে গেছে। ধানের গোলা পরিত্যক্ত, ইঁদুর বসতি গেড়েছে। গোলার নিচে হাঁস মুরগি থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। মাঝে মাঝে বন বিড়াল এসে মুরগী টেনে নিয়ে যেত। বন বেড়ালকে আমরা মোয়াফ বলতাম।
সে রাতে ল্যাম্পের আলো ঘিরে আমরা সবাই বসে আছি জানালা দরজা বন্ধ করে। ল্যাম্পের চিমনি ঝাপসা হয়ে আসছিল। আগুনের শিখাটি অস্থিরভাবে জ্বলছিল।
মনে হচ্ছে দানবীয় কিছু এসে ঘরের দরজা ও জানালায় আঘাত করছে সজোরে। মাটির গুদাম বলে ঘর উড়িয়ে নিতে পারছে না। এমন ঝড়ো হাওয়ার রাত। মনে হচ্ছে বাইরের সব গাছগাছালি উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে। টিনের চালা খুলে উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে। বাতাসের সশব্দ উল্লাস বোঝা যাচ্ছিল। দোতালার ঘরে উঠার সাহস করছিলাম না কেউ।
সারারাত জেগেই কেটেছে। আমাদের বাবারা রেডিওতে শুনছিল আবহাওয়া সংবাদ। শুনছি ১০ নম্বর বিপদ সংকেত। তখন মানুষ এখনকার মতো এতো সচেতন ছিল না। ১০ নম্বর বিপদ সংকেত হলে তাকে ঘর ছেড়ে সাইক্লোন শেল্টারে যেতে হবে সে ধারণা ছিল না। মানুষকে সাইক্লোন শেল্টারে যাবার জন্য মাইকিং করা হয়েছিল কী না মনে নাই। তবে মানুষ ঘর ছেড়ে আসেনি সেটা বুঝতে পেরেছি সকাল হবার পর।
কী ভয়াবহ এই ঘুর্ণিঝড়! কে-ই বা ঘর ছেড়ে আসতে চায়। নিজের হাতে তিল তিল গড়া একটা বাড়ি নিমেষে ধ্বসে পড়বে অথবা উড়িয়ে নিয়ে যাবে কে জানতো!
সকালে ভোরের আলো ফুটেছে। প্রকৃতি দারুণ নীরব, থমথমে। গাছের পাতা নড়ছে না। ভয়ানক রকমের একটা তাণ্ডব যে ঘটে গেছে তা বাড়ির উঠোনে এসে বুঝতে পারলাম। গাছের ভগ্ন ডাল, পাতা ও মৃত পাখিতে সয়লাব হয়ে আছে উঠোন। আমাদের বাড়ির একটা বাড়ি পর বিল। সে বিলের ধারে গিয়ে দেখি পানি আর পানি। সে পানিতে ভেসে আছে মৃত গরু, ছাগল, হাঁস ও মুরগি। শুধু তাই নয়, ভেসে এসেছে মৃত মানুষের অজস্র লাশ।
গ্রামের লোকজন এসে ভিড় করেছে সেখানে। ভেসে এসেছে ঘর-বাড়ি, দোকান-পার্ট আর ঘরের নানান আসবাবপত্র। চোখের উপর এখনো ভাসছে সে ভয়ানক ও করুণ দৃশ্যটি। মায়ের কোল আগলে থাকা শিশুসহ মায়ের লাশ। মা জানে সে ভেসে যাচ্ছে জলে তবু তার সন্তানকে ছাড়েনি। এই দৃশ্য কোনভাবে ভুলতে পারিনি আজ এতো বছর পরও।
শত শত মানুষের ভীড় আমাদের বাড়িতে। আমাদের বারান্দায় যে যেমন পারে আশ্রয় নিয়েছে। আমাদের হিন্দু বাড়িতে বসেই নামাজ পড়েছে অনেক মুসলমান। ডেকেছেন আল্লাহকে যেন এমন পরিস্থিতি থেকে তাদের মুক্তি করেন।
এই ঘূর্ণিঝড়ে চট্টগ্রামে প্রায় দেড় লক্ষ মানুষ মারা গিয়েছিল এবং বাঁশখালীতে মারা গিয়েছিল প্রায় অর্ধ লক্ষ মানুষ। অনেকে ঘুমের মধ্যেই হারিয়ে গিয়েছিল চিরতরে। কোন কোন পরিবারের সকল সদস্য প্রাণ হারিয়েছিল।
২০০০ সালে পড়াশোনার জন্য চট্টগ্রাম শহরে এসেছিলাম। সেই সময় ব্যাচেলর বাসায় এক রুমমেট পেয়েছিলাম, যার নাম ছিল মাকসুদ। মাকসুদ বলেছিল, সে তার পরিবারের একমাত্র জীবিত ব্যক্তি।প্রলয়ঙ্কারী ঘূর্ণিঝড় কেড়ে নিয়েছিল সকলকে। সে তার মামার বাড়িতে বেড়াতে এসেছিল বলে বেঁচে গিয়েছিল এমন তাণ্ডবের হাত থেকে।
এর পর মনে পড়ে ১৯৯৭ খ্রি. ঘূর্ণিঝড়ের কথা। সেবার জলোচ্ছ্বাস হয়নি। সেবার সংকেত বাড়তে থাকলে আমরা চলে গিয়েছিলাম নাপোড়া গ্রামের পাহাড়ে, মামার বাড়িতে। সেই নাপোড়া গ্রামের পাহাড়ি পথে ঝড়ে পড়া আমা, কাঁঠাল ও লিচু খেয়ে ও থলেতে নিয়েও শেষ করতে পারিনি। এক লিচু বাগানের তলায় দেখি মাটি দেখা যাচ্ছে না। ঝড়ে পড়া লিচুতে লাল হয়ে আছে মাটি। লাল বিছানা যেনো। ইচ্ছে মতো খেয়েছি আর নিয়ে গেছি মামার বাড়িতে।
সেবার সরকারের পদক্ষেপে প্রচুর মানুষকে উপকূল থেকে সরিয়ে নেয়ায় তেমন প্রাণহানি হয়নি। তখন হয়তো মানুষ শিখে গেছে বাতাস বইলে গাট্টি বেঁধে নিরাপদে সরে যেতে হবে।
মনে আছে ‘বাতাস নড়ে গাট্টি বানো’ বলেই আমরা সেবার মামার বাড়ি চলে গিয়েছিলাম। মামার বাড়ি ছিল পাহাড়ের টিলার উপর, সেখানে আর বানের জল আসবে না। বেশ কয়েকদিন থেকে আবার ফিরে এসেছিলাম বাড়িতে। সেবার তেমন ক্ষয়ক্ষতি হয়নি বাড়ির। চট্টগ্রাম উপকূলে আমার দেখা এই দুইটি ঘূর্ণিঝড় এখনো শৈশবে ফিরিয়ে নিয়ে যায়।
