আমাদের ছাদের ঘরে একটা ছাতা রাখা ছিল বহুদিন। লাল রঙের ছাতা। প্যারিস থেকে দাদাইয়ের কোনো এক বন্ধু নিয়ে এসেছিলো। দাদাই বলেছিলো, প্যারিসে না গেলে শিল্পী জীবন বৃথা। ওসব ভাবনা থাকে এক বয়সে, নয় কি?
এখন নিশ্চয়ই দাদাই-ও এমন করে ভাবে না।
ঝড় এলে মন আকুল হয়। জগতের সব মুখ একসাথে উথলে উঠে। রাগ হলে মনে হয় সমস্ত রাগ নিয়ে চারপাশ অন্ধকার হয়ে আছে। বিষাদ জমলেও তাই।
বারান্দা আমার ঝড়ে আলুথালু, এইরকম অন্ধকারে ঘুম ভাঙলে সকাল হয়। সকাল তখন ভ্রম। আলো নেই। গর্জনে ভেসে যাচ্ছে কামিনি গাছ, ফুল না ফোটা দোলনচাঁপা, নয়নতারার ঝাড়।
কালশি বস্তিতে আগুন লাগলো ভর সন্ধ্যায়। বস্তি সব আগুনে পুড়ে যায় এই শহরে, নোংরা মানুষেরা পুড়ে গেলে হাইরাইজ হয়, ব্যবসা হয়। সড়কে মরে পড়ে থাকা লাশের পাশে কাঁদতে কাঁদতে সঙ্গী বলে, ও আমাকে হাত দিয়ে সরিয়ে দিলো যখন ওর মাথা ট্রাকের নিচে তখন।
আহা! প্রেম। আহা!
বর্ষা এ জ্বালা নেভাতে পারবে না।
আমাদের পেটমোটা বাড়িতে পাগলপারা কালবৈশাখীতে আম গাছ থেকে থোকা থোকা আম পড়ে। সুপারি গাছের মাথা দোল খায় নতুন বসতে শেখা মানুষের ছানার মতোন। এইরকম এক রাতে হারিকেন হাতে ছাদে উঠলাম ভর সন্ধ্যায়, কাপড় তুলতে। ধোয়া কাপড়, হুইল সাবানের গন্ধমাখা কাপড়। এরপর থেকে ঝড় আর হুইল সাবানের গন্ধ একসাথে হলেই সেই ভর সন্ধ্যা নেমে আসে বুকজুড়ে।
তোর নামে দাদাই? তুই যেখানে সেখানে তো আর কালবৈশাখী নেই। ঠান্ডার দ্যাশ। জমে যাস না শীতে?
ছাতার স্মৃতি যাদের থাকে তারা অভিশপ্ত। এক জীবনে তাদের বহুবার বহু কালবৈশাখীর সামনে দাঁড়াতে হয়। অনেকবার বজ্রপাত থেকে বেঁচে ফেরা মানুষ জানে, চোখের সামনে বটগাছে আগুন জ্বলা দেখতে কেমন লাগে।
এইসব মানুষের জন্যই লেখা রয়েছে প্রবাদে যে, ঘরপোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে ডরায়।
আমিও, ভীষণ, জানিস তো। মন উচাটন করলেই, শরীর টানলেই, ডরাই।
গ্রীষ্মের ঝড় কিংবা বর্ষা আসবে আসবে এমন সময়ে, ছাতার স্মৃতি উছলে উঠলেই, ভীষণ ডরাই। চোখ বুজলেই দেখি, ঠান্ডা রাতে, পাঁচিলের পাশে, চোখেরা জেগে আছে। আর আমার কাচের চুড়ি ভেঙে যাচ্ছে তোর হাতের মুঠোতে। কী সাধের নীলচে রেশমি চুড়ি আমার! ঘোর বর্ষায়।
চুড়ি ভাঙার শব্দ অনেকটা গাছের ডাল ভাঙার শব্দের মতোন মড়মড়ে। মায়েরা বকবে, চোখ পালিয়ে চোখেদের চোখের সাথে দেখা করতে হবে – এমন কাল পেরিয়ে আমরা বড় হয়ে গেলাম। এতো বড় যে ভয়গুলোও বড় হতে হতে অশ্বত্থের ছায়ার মতোন বিশাল কালো। অথচ আমরা ভেবেছিলাম বড় হলে ভয়গুলো ছোট হবে। এখন নিজেদের চোখ নিজেরা মাড়াই, পাড়াই, লুকোই নিয়ত।
বর্ষা আসবে এই ভূমিতে দাদাই। ছাদের মেঝেতে আধ হাত সমান পানি জমবে। পানি যাওয়ার রাস্তায় পড়ে থাকবে গাছের ডাল, পাতা, ফল। পিচ্ছিল শ্যাওলার ভয়ে কেউ ওদিক মাড়াবে না পুরো একদিন। সবাই কি আর তুই?
আমারও এখন সহজে পা মচকায়, হাড় বুড়ো হচ্ছে মনে হয়।
তবু কিছু জিনিস একই থাকবে, এই যেমন বাসায় হৈ-হুল্লোড় করে বানানো হবে কাঁচা আমভর্তা নাগা মরিচ মিশিয়ে। চারকোনা গাছবাকল রঙের আমসত্ত্ব রাখা হবে বোয়ামে, ভাই-বোনেরা এ শহর সে শহর থেকে ফিরে গিয়ে খাবো বলে। এখনো আম-ডাল রান্না হয় খুব যত্ন নিয়ে শুধু আমার জন্যে।
ঝড় আসলে আমার কোহেন মনে পড়ে,
“Suzanne takes you down
To her place near the river…”
মনশ্চক্ষুতে ভাসে সুজেন কাকে যেন তুমুল ঝড়েও নদী পার করে নৌকো ঘাটে ভিড়িয়ে নিয়ে তুলছে কাঠের এক ট্রি-হাউসে। কত ক্ষমতা সুজেনের ভাবো। কত দৃঢ়তা, কত বল।
এমন বোহেমিয়ান নারীর জন্যে এ ভূমিতে এমন পাগলপারা ঝড় আসে, ঝড় আর জল!
