পথে পথে দিলাম ছড়াইয়া- তিন : আলাউদ্দিন খোকন

মুক্তিযোদ্ধা চৌধুরীর সাথে আলাউদ্দিন খোকন

এটি ২০১৭ সালের কথা।

বই নিয়ে তপ্ত, রৌদ্রজ্জ্বল এক দিনে আমি আর দিদি গিয়েছিলাম চাকতাই এলাকার একটি ব্যাংকে। অনেক ঘুরে-ফিরে শেষ পর্যন্ত একশো টাকা দামের একটি বই বিক্রি হলো। কিন্তু বেশ কিছুদিন দিদি অসুস্থ থাকায় বই বিক্রি বন্ধ ছিল। ফলে আর্থিক অবস্থা তখন খুবই খারাপ। একদিকে লুসাই ভবনের কয়েক মাসের রুমভাড়া বাকি, অন্যদিকে গ্রামের বাড়িতে আশ্রমের ঘরের কাজ চলছে—সেখানে টাকা দিতে হবে। আছে দিদির ছেলে জহরের মাসকাবারি খরচও। সব মিলিয়ে দিদি না পারতেও সেদিন বের হয়েছিলেন।

সঙ্গে নিয়েছিলাম অনেক বই। দিদি লক্ষ্য ঠিক করেছিলেন—সেদিন অন্তত পাঁচ হাজার টাকার বই বিক্রি করতেই হবে।

চাকতাই প্রচণ্ড ঘিঞ্জি এলাকা। সরু গলি, চিপাগলি, অন্ধগলি পেরিয়ে চাকতাই খালের পাড় ধরে প্রচণ্ড গরমে ঘামে একাকার হয়ে আমরা পাঠক খুঁজে বেড়াচ্ছিলাম। আরও দুই-একটি অফিস ও ব্যাংকে ঘুরেও যখন আর বই বিক্রি হলো না, তখন চলে এলাম খাতুনগঞ্জের দিকে।

খাতুনগঞ্জ আরও বেশি ভিড়ের জায়গা। কোথায় যাব, কাকে ধরব—সেটাই খুঁজছি। আমার কাঁধে ঝোলাভর্তি বই, এক হাতেও বই, আর অন্য হাতে ছাতা। যে হাতে ছাতা ধরা, সেই হাত শক্ত করে ধরে আছেন দিদি। সব সময়ই তিনি এভাবেই ধরতেন। আমিই বলেছিলাম, এভাবে শক্ত করে ধরতে। আরও বলেছিলাম, নিচের দিকে তাকিয়ে হাঁটতে, যাতে পথে কোথাও পায়ে আঘাত না লাগে। গাড়িঘোড়া, রাস্তা-ঘাট, আশপাশ—সব আমি দেখব। কোথায় যেতে হবে, কার কাছে যেতে হবে—এসবও আমি দেখব।

কিন্তু সেদিন গরমের মধ্যে অনেকক্ষণ ঘুরেও বই বিক্রি না হওয়ায় দিদি নিজেই এদিক-সেদিক তাকিয়ে হাঁটছিলেন। দুজনেই আশপাশ দেখতে গিয়ে নিচের দিকে আর খেয়াল করা হয়নি। হঠাৎ সামনেই লোহার মতো কোনো কিছুর সঙ্গে লেগে দিদির খালি পা কেটে গেল।

দিদি চিৎকার করে উঠতেই আমি তাড়াতাড়ি তাঁকে ধরে ফেললাম। নিচের দিকে তাকিয়ে দেখি, রক্তে ভেসে যাচ্ছে পিচঢালা পথ। বুড়ো আঙুলের প্রায় অর্ধেকটা চামড়াসহ উঠে গেছে।

আমি তখন দিশেহারা। কী করব, কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। এমন জায়গায় ঘটনা ঘটেছে যে দ্রুত কোথাও যাওয়ারও উপায় নেই। চারদিকে প্রচণ্ড যানজট। আশপাশে কোনো গাড়ি নেই, নেই কোনো ফার্মেসি কিংবা ডাক্তারও। দিদির পা থেকে অবিরাম রক্ত ঝরছে, আর আমি তাঁকে ধরে অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে আছি।

ভাবছিলাম—এই তপ্ত রোদের মধ্যে, এইভাবে একজন শহীদ মা, একজন বীরাঙ্গনা, একজন মুক্তিযোদ্ধা, বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে ১৯৬১ সালে সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্জন করা একজন মানুষ—কেন, কিসের জন্য আজও এই সংগ্রাম করে যাচ্ছেন? এই জন্যই কি একদিন তাঁরা তাঁদের সবকিছু বিসর্জন দিয়ে এই দেশকে স্বাধীন করেছিলেন?

আমি চারদিকে একজন মানুষ খুঁজছিলাম। এমন একটি জায়গা খুঁজছিলাম, যেখানে দিদিকে নিয়ে একটু বসাতে পারি, প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে পারি।

আমি মানুষ খুঁজতে থাকি। আমি মানুষ খুঁজে বেড়াই।

মানুষ খুঁজতে গিয়ে হঠাৎ মনে পড়ে গেল এক সদাহাস্যময় মহান মানুষ—ফারুক আহমেদের কথা।

দিদিকে নিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে চারদিকে তাকাতে তাকাতে হঠাৎ একটু দূরে চোখে পড়ল ব্যাংক এশিয়ার খাতুনগঞ্জ শাখা। দেখে বুকের ভেতর একটু সাহস ফিরে পেলাম। আমার কাঁধে ভর দিয়ে একটু একটু করে দিদিকে নিয়ে পৌঁছালাম ব্যাংকে।

ব্যাংকের ম্যানেজার (অপারেশন) ফারুক আহমেদের টেবিলে পৌঁছে যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম।

এত কষ্টের মধ্যেও দিদি হেসে বললেন,
—ভাই, তোমাকে জ্বালাতে আসলাম।

একসময় দিদি ফারুক ভাইকে ‘আপনি’ করে বলতেন। একদিন ফারুক ভাই অভিমান করে বলেছিলেন,
—আপনি আমাকে ‘তুই’ করে না বললে আমি আপনার সঙ্গে কথা বলব না।

সেই থেকে দিদি তাঁকে নিজের আপন ভাইয়ের মতো ‘তুমি’ বলে সম্বোধন করতেন। আর ভাইয়ের কাছেই করতেন সব ধরনের আবদার। ফারুক ভাইও আপন বোনের মতোই দিদির সব আবদার রেখেছেন।

তিনি তাড়াতাড়ি চেয়ার ছেড়ে উঠে এলেন। অবস্থা দেখে তিনিও কিছুটা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেলেন। আমি বললাম,
—আপনার কাছে প্রাথমিক চিকিৎসার যা আছে, দিন।

তিনি অফিসের সব কাজ ফেলে এনে দিলেন ডেটল, হেক্সিসল, পভিসেপ, গজ আর ব্যান্ডেজ। আমি দ্রুত দিদির পা পরিষ্কার করে পভিসেপ লাগিয়ে রক্ত বন্ধ করার চেষ্টা করলাম এবং ব্যান্ডেজ করে দিলাম।

এরপর ফারুক ভাই দিদির জন্য ফান্টা ও কেক, আর আমার জন্য এক কাপ চায়ের ব্যবস্থা করলেন। কিছু খেয়ে দিদির প্রাণে যেন একটু শান্তি এল। পায়ের রক্তও বন্ধ হলো। তিনি আমাকে আশীর্বাদ করলেন। এরপর ফারুক ভাই তাঁর ডাক্তার স্ত্রীকে ফোন করে কী কী ওষুধ খেতে হবে, তাও লিখে নিলেন।

এই গেল চিকিৎসা।

এরপর নিজে থেকেই একের পর এক প্রশ্ন করে সব খবর জেনে নিলেন। সেদিন বই বিক্রি হয়নি, তার ওপর দিদির এই অবস্থা—আর বই নিয়ে বের হওয়াও সম্ভব নয়।

তিনি নিজেই বললেন,
—কী কী বই আছে?

আমি বললাম,
—এগুলোর প্রায় সবই আপনি আগেও কয়েক সেট করে নিয়েছেন।

তিনি হেসে বললেন,
—আচ্ছা, অসুবিধা নেই।

তিনি জানতেন, দিদিকে এমনি টাকা দিলে তিনি কখনো নেবেন না। তাই বই কেনার মাধ্যমেই সাহায্য করতেন। কোনো কোনো বই একবার নয়, পাঁচ-সাতবারও কিনেছেন।

আমাদের কাছে থাকা সব বই নিয়ে ম্যানেজারের জন্য এক সেট রেখে বাকিগুলো নিজের জন্য রেখে দিলেন।

দিদি আনন্দে, কৃতজ্ঞতায় আর কষ্টে কেঁদে ফেললেন। বারবার আশীর্বাদ করলেন।

এভাবেই ফারুক ভাই দীর্ঘ বছর দিদির পাশে থেকেছেন। দিদি যখন মেডিকেলে ভর্তি ছিলেন, তখনও আমি না চাইতেই তিনি দিদির চিকিৎসার জন্য বড় ধরনের সহযোগিতা করেছেন।

সেদিন আমরা খাতুনগঞ্জ-চাকতাই থেকে ফিরেছিলাম আনন্দ আর বেদনার এক অদ্ভুত কাব্য নিয়ে।

এত কষ্টের মধ্যেও দিদি কিন্তু জুতা পরেননি।

দিদি অনেকবার বলেছিলেন, তাঁর “মানুষ খুঁজে বেড়াই” গ্রন্থে ফারুক ভাইকে নিয়ে লিখবেন। কিন্তু লিখে যেতে পারলেন না। তবে “এক হাজার এক দিন যাপনের পদ্যে” গ্রন্থে ফারুক ভাইকে নিয়ে একটি ছড়া লিখেছিলেন।

এবার আর একজন সরল মানুষের কথা লিখি—শাহজাহান ভাই।

আ. ম. ম. শাহজাহান ভাইয়ের সঙ্গে দিদির পরিচয় হয় অগ্রণী ব্যাংকের ইপিজেড শাখায়। সেখান থেকেই শুরু। এরপর তিনি যেখানেই গেছেন, দিদি আর আমি তাঁকে খুঁজে বের করেছি; আবার অনেক সময় তিনিও নিজেই আমাদের খোঁজ করেছেন।

তিনি অগ্রণী ব্যাংকের শাখা ব্যবস্থাপক থেকে আঞ্চলিক মহাব্যবস্থাপক এবং পরে ঢাকায় মহাব্যবস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে সোনালী ব্যাংকের ডিএমডি হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন।

দিদি শাহজাহান ভাইয়ের কাছেও নানা আবদার নিয়ে যেতেন। অনেক সময় বড় বড় আবদারও করতেন। যেদিন তাঁর কাছে যেতেন, প্রায় সব বইই তাঁকে দিয়ে আসতেন। কখনো বিশ-ত্রিশটি বইও দিয়ে দিয়েছেন।

শাহজাহান ভাই সব সময় হাসিমুখে, সানন্দে দিদির আবদার পূরণ করতেন।

তিনি নিজেও একজন সত্যিকারের মুক্তিযোদ্ধা। তাই দিদির কষ্ট, দুঃখ তিনি গভীরভাবে বুঝতেন।

অবসরে যাওয়ার কিছুদিন আগে তিনি একদিন দিদির রুমে তাঁকে দেখতে এসেছিলেন। দিদি শিশুর মতো সরলভাবে জিজ্ঞেস করেছিলেন,
—রিটায়ার করে কত টাকা পাবেন?

টাকার অঙ্ক শুনে দিদি বলেছিলেন,
—আমার আশ্রমের জন্য পাঁচ লাখ টাকা দিতে হবে!

নিজের জন্য একটি টাকাও চাননি।

শাহজাহান ভাই অবসর নিয়েছেন। দিদি চলে গেছেন না-ফেরার দেশে। তবে দিদির চিকিৎসাকালীন সময়েও তিনি নীরবে অনেক সহযোগিতা করেছেন।

একজন ফারুক ভাই, একজন শাহজাহান ভাই—আমৃত্যু দিদিকে যে সহযোগিতা দিয়েছেন, তা লিখে শেষ করা যাবে না। এখনো এই মানুষগুলো দিদির জন্য ভাবেন, দিদির জন্য কষ্ট পান, দিদির জন্য কিছু করতে চান।

দিদির প্রতিনিধি হিসেবে আমি এই মানুষদের স্যালুট জানাই। জানাই গভীর কৃতজ্ঞতা।

মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না। আবশ্যক ঘরগুলো * দিয়ে চিহ্নিত করা হয়েছে