ঝড় শব্দটির সঙ্গে আমাদের সবারই কমবেশি পরিচয় আছে। ঝড় ভয় ধরায়—কখনো প্রকৃতিতে, কখনো জীবনে। প্রকৃতি ও জীবন আবার সবুজে হয়, আনন্দগানে মাতে, বেদনার রুদ্ধশ্বাস হাহাকার ফুঁড়ে। আজ প্রকৃতিতে যে ঝড় আসে, তার স্মৃতি ধরার চেষ্টা করব। অনুরোধ করেছেন কবি রিমঝিম আহমেদ। আমি গদ্য খুব একটা লিখি না। কিন্তু শব্দশিল্পীর ডাক—সে কি উপেক্ষা করা যায়?
ঝড়কে তুফানও বলা হয়। আমরা চট্টগ্রামের ভাষায় বলি ‘তুয়ান’। এই তুফানের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় হয় খুব ছোটবেলায়। সে সময় আমরা নানার বাড়িতে থাকতাম। যতদূর মনে পড়ে, ঝড় শুরু হয়েছিল সন্ধ্যার পর। আমি ভয় পাব বলে নানা আমাকে জড়িয়ে বুকের ভেতর নিয়ে ঘরের এক কোণে বসে থাকেন। আধাপাকা ঘর, টিনের ছাউনি। গাছের বড় বড় ডাল ভেঙে টিনের ওপর পড়ছিল। তাতে বিকট শব্দ হচ্ছিল। শুনে নানার বুকের ভেতর থেকেও আমি কেঁপে কেঁপে উঠছিলাম। আড়চোখে যতটা দেখেছি, বাইরে বজ্র-বিদ্যুতের চমকে ঝলমল করছে ভয়ঙ্কর আলো। ঝড় থামে গভীর রাতে। পরে তো ঘুমিয়েই পড়েছিলাম। সকালে ঘুম ভাঙলে দেখলাম, উঠোনের কলাগাছ, আমগাছ, কাঁঠালগাছ—সব আধভাঙা হয়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। শিশুকালের সেই স্মৃতি এখনো মন ধরে রেখেছে।
বলছিলাম ১৯৬৩ সালের ঝড়ের কথা। পরবর্তীতে ছোটখাটো অনেক ঝড় হয়েছে। তবে ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বরের ঘূর্ণিঝড়ের রূপ ছিল ভয়ঙ্কর। তখন তো স্কুলে পড়ি। সারাদিন গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি ঝরছিল। সেদিন স্কুল একটু তাড়াতাড়িই ছুটি হয়। আমাদের ঘর ছিল ছনের ছাউনি ও কারুকার্যময় বাঁশের বেড়ার। পুরোনো ঘর, দাদার সময়ে নির্মিত; ফলে একটু নড়বড়েই বটে। সেদিন বাবা অফিস থেকে একটু তাড়াতাড়িই ফিরেন। উনি এসেই দেখলাম, ঘরের চারদিকে বাঁশের খুঁটি গেড়ে ঠেস দিয়ে শক্ত দড়ি দিয়ে টান দিচ্ছেন। সেসব শেষ হতে না হতেই… সন্ধ্যার পরপর বাতাসের বেগ বাড়তে থাকে। সেদিন রাতের খাওয়া-দাওয়া আমরা সন্ধ্যা নামতেই শেষ করি। ধীরে ধীরে বাতাস ভীতিকর হয়ে ওঠে। মধ্যরাত নাগাদ ঝড় আরও জোরে বইতে থাকে। একসময় বিকট শব্দে চালের এক পাশ উড়ে যায়। তাতে বাতাসের ধাক্কা ও বৃষ্টি ঘরের ভেতরে ঢুকে যাচ্ছিল। সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎ চমকানোর তীব্র আলো এসে ঘরে প্রবেশ করছিল। মনে হচ্ছিল, প্রকৃতি বোধহয় আকাশে বিশাল ও ভয়াল টর্চ জ্বালিয়ে আমাদের দেখছে।
চালা উড়ে যাওয়ার কারণে ঘরের যে দিকে বৃষ্টি পড়ছিল, মা সেদিক থেকে জিনিসপত্র অন্যদিকে সরিয়ে রাখেন। আমরা ভাইবোনরা ভয়ে কাঁপতে থাকি। সবাই মিলে দোয়া-দরুদ পড়ছিল। বালা-মুসিবত দূর হওয়ার জন্য কোনো কোনো ঘরে মরদ-জোয়ানরা আজান দিচ্ছিল। আরও একটু বয়স হলে বুঝেছি, এসবে তো আর ঝড় যায় না! সম্ভবত মনের ভয় অনেকাংশে কমে। যাহোক, রাত আর শেষ হয় না। বিপদের রাত্রি নাকি দীর্ঘ হয়। সকাল হওয়ার একটু আগে ঝড়ের বেগ কমে আসে।
সকালে ঝড় থামলে দেখলাম, ঘরের সামনের খেজুরগাছ এবং পাশের কয়েকটি আমগাছ পড়ে গেছে। এই গাছগুলো কিছুতেই থাকবে না, কেটে ফেলতে হবে—সেটা ভেবেই মন ভার হয়ে গেল। পাড়ায় অনেকের ঘর ভেঙে একেবারে চুরমার। সবাই যার যার মতো সেগুলো কুড়োতে এবং গুছাতে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। আমাদের ঘর সামান্য হেলে গিয়েছিল। তাও সবকিছু গুছিয়ে ঠিক করতে প্রায় এক সপ্তাহ লেগে গেল। সেই ঘূর্ণিঝড়ে উপকূলের বহু এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল চট্টগ্রাম, বরগুনা, খেপুপাড়া, পটুয়াখালী, চর বোরহানউদ্দিনের উত্তরাংশ, চর তজুমুদ্দিন এবং মাইজদি ও হরিণঘাটার দক্ষিণাংশে। সরকারি পরিসংখ্যানে দেখা যায়, সেই ঝড়ে প্রায় ৫ লাখ মানুষ মারা গিয়েছিল। মাছ ধরার নৌকা, শস্য, গবাদিপশু ও সম্পদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। সেবার বাতাসের গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ২২২ কিলোমিটার। জলোচ্ছ্বাসের উচ্চতা ছিল প্রায় ১০ মিটার।
বাংলাদেশ তখনো স্বাধীন হয়নি। এই দেশের নাম ছিল পূর্ব পাকিস্তান। পাকিস্তানের তৎকালীন অর্থনীতিতে সবচেয়ে বেশি অবদান রাখা সত্ত্বেও শাসকদের অবহেলায় এই অঞ্চল ছিল চরম অবহেলিত ও অনুন্নত। এই অঞ্চলের মানুষকে তারা পোকামাকড়তুল্য জ্ঞান করত। ফলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ—সব ক্ষেত্রেই নাজুক অবস্থা বিরাজ করছিল। যোগাযোগব্যবস্থা অনুন্নত হওয়ায় প্রত্যন্ত অঞ্চলে ত্রাণ বা জীবনধারণের সামগ্রী পৌঁছানোই ছিল দুঃসাধ্য। সেই ঘূর্ণিঝড়ে পশ্চিমা শাসকরা প্রয়োজনীয় সাহায্যসামগ্রী নিয়ে যথাসময়ে এগিয়ে আসেনি। কারণ, বাঙালিদের তারা সবসময় বুটের তলায় রাখতে অভ্যস্ত ছিল। খাদ্য ও চিকিৎসার অভাবে ধারণার অতিরিক্ত প্রাণহানি ও কৃষিজ সম্পদের ক্ষতি হয়েছিল। সে বছর ডিসেম্বর মাসেই পাকিস্তানে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনোত্তর ঘটনাপ্রবাহ আজ ইতিহাসের অংশ।
অবস্থানগত কারণে বাংলাদেশ একটি ঘূর্ণিঝড়প্রবণ অঞ্চল। ফলে বাংলাদেশে একসময় ঘন ঘন ঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা ইত্যাদি লেগেই থাকত। ১৯৭০ সালের পর বাংলাদেশে আরও দুটি বড় ঘূর্ণিঝড় আছড়ে পড়ে। এর একটি ১৯৮৫ সালে এবং অপরটি ১৯৮৮ সালে। সেগুলো নিয়ে এখানে আর বিশদ বলতে চাই না।
আমার দেখা ঘূর্ণিঝড়গুলোর মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবক, ধ্বংসাত্মক ও ভয়ঙ্কর ছিল ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিলের ঘূর্ণিঝড়। ম্যারি অ্যান নামের এই ঝড় ছিল মারাত্মক ও বিপর্যয়কর। এই ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড়টির প্রভাবে ২৮ এপ্রিল থেকে আকাশ ঘন মেঘে ঢাকা ছিল। বাতাসে ছিল বিপদের ঘ্রাণ। ২৯ এপ্রিল সকাল থেকে গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি হতে থাকে। বিকাল থেকে বাতাসের গতিবেগ বেড়ে যায়। সন্ধ্যা হতে হতে আকাশের রূপ আরও বদলে যায়, ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে। রাতে ভয়াবহতা আরও বাড়ে।
আমরা তখন চান্দগাঁও ওয়াসা কোয়ার্টারে থাকি, নিচতলায়। প্রচণ্ড বজ্রপাত হচ্ছিল। কাঁচের জানালা ফুঁড়ে, পর্দার ফাঁক দিয়ে বাইরে ঝড়ের তাণ্ডব, বিদ্যুতের ঝলক-নাচন, বৃক্ষের সিজদা ও উড়ে যাওয়া স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, চারতলা এই বাড়ি পুরোটাই উড়ে যাবে। গভীর রাতে অকস্মাৎ ঘরে পানির স্রোত ঢুকে পড়ে। আদর ও প্রিয় তখন খুব ছোট। তাদের ছোট ভাই আরশেদসহ একটু আগেই উপরের তলায় পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। দুই-তিন মিনিটের মধ্যেই পানি কোমরসমান হয়ে যায়। আমরা দ্রুত ঘরের দরজায় তালা লাগিয়ে উপরের তলায় চলে যাই। সঙ্গে নিয়ে যাই কিছু শুকনো কাপড়-চোপড়। মনে হচ্ছিল, এই রাত আর ফুরোবে না। শেষ রাতের দিকে ঘূর্ণিঝড়ের তাণ্ডব কিছুটা কমে আসে। সুদীর্ঘ এক রজনী পেরিয়ে বেলা বাড়তে বাড়তে ঝড়ের বেগ কমে আসে।
আমরা ধীরে ধীরে নিচে নেমে দেখি, বাইরে ভয়াবহ অবস্থা। ঘরের দরজা খুলে চোখ ছানাবড়া—মেঝেতে প্রায় ছয় ইঞ্চি কাদা জমে গেছে। সেগুলো পরিষ্কার করতে লেগে গেলাম সবাই মিলে। ঘরে ঢাউশ একটি শিং মাছ পেলাম। পরে এটিকে পাশের পুকুরে মুক্ত করে আসি। বেচারা জলে ভেসে পথ ভুলে হয়তো ঘরে ঢুকে পড়েছিল। জলোচ্ছ্বাসের পানি সরে যাওয়ার সময় কাদার সঙ্গে রেখে গেছে।
বইয়ের তাকের দিকে তাকাতে ইচ্ছে হচ্ছিল না। কেননা সাড়ে তিন ফুটেরও অধিক উচ্চতা পর্যন্ত ভেজা আর ভেজা বইয়ের স্তুপ। এরশাদবিরোধী গণআন্দোলনকে কেন্দ্র করে একটি তথ্যভিত্তিক গ্রন্থ প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছিলাম। এর জন্য ঢাকা ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন আলোকচিত্রীর কাছ থেকে গণআন্দোলনের বহু ছবি সংগ্রহ করেছিলাম। প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষে সেগুলো বুকশেলফের নিচের তাকে রাখা হয়েছিল। সেগুলো ভিজে রসগোল্লা। কান্না করারও উপায় নেই।
এদিকে বাড়ি থেকে খবর পেলাম, কাছারি ঘরের সম্পূর্ণ চালা উড়ে পাশের বিলে গিয়ে পড়েছে। তবে টিনের কোনো অস্তিত্ব নেই। শুনলাম, উদ্ধারের অবস্থাও নেই বললেই চলে। ঘরটি ছিল মাটির নির্মিত। ফলে দেয়ালগুলো ভিজে ধসে পড়ার উপক্রম হয়েছে। আমার ভায়রা শামসুল হক খবর পেয়ে একটি বিশাল ত্রিপল পাঠিয়ে দেন দেয়ালগুলো ঢাকার জন্য।
ঘরদোরের কাদা পরিষ্কার করতে করতেই বিকেল। এর মধ্যে খবর পেলাম, পূর্বদিকে কর্ণফুলীর পাড়ের হামিদ চর সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়ে গেছে। নির্ঘুম রাত, সারাদিনের ক্লান্তি—সন্ধ্যার দিকে সব জেঁকে বসেছে। আজ আর কোথাও যাওয়া হলো না। পরদিন কান্নাভেজা হৃদয়ে নষ্ট বইপত্র ও ছবিগুলো সরিয়ে ফেলি। দুপুরের পর হামিদ চরে গিয়ে দেখি করুণ অবস্থা। তাদের অবর্ণনীয় ক্ষয়ক্ষতি দেখে নিজের ক্ষতিকে তুচ্ছই মনে হলো।
পরবর্তীতে সারা দেশের যে চিত্র পাওয়া যায়, তা আরও ভয়াবহ। বাংলাদেশের উপকূলে আছড়ে পড়া এই সুপার সাইক্লোনিক ঝড়ের গতি ছিল ঘণ্টায় ২৫০ কিলোমিটার। সে সময়ের রেকর্ডকৃত তথ্য থেকে জানা যায়, প্রচণ্ড শক্তিশালী এই ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড়টির কারণে ২০ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাস সৃষ্টি হয়েছিল, যাতে উপকূলরেখা ছাড়িয়ে সমতলের অনেকাংশ প্লাবিত হয়। সে ঝড়ে প্রায় লক্ষাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। এতে প্রায় ১ কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত, নিঃস্ব ও আশ্রয়হীন হয়ে পড়েছিল। অসংখ্য ঘরবাড়ি, গাছপালা, ফসলের খেত ও গবাদিপশু ভেসে যায়। এ ছাড়া চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল।
এই ঘূর্ণিঝড়ের দগদগে ক্ষত এই দেশ যেমন বহুকাল বয়ে বেড়াবে, আমার মনেও তেমনি বিষাদের ছায়া হয়ে বিরাজ করবে আজীবন।
