ঘাস বিচালি ২ : গৌতম চৌধুরী

গহন অরণ্য সে নয়। নয় আবার যত্নে রচা কোনও বাগিচা। রয়েছে কিছু গাছপালা। তাদের ছায়া। আর ফাঁকফোকর দিয়ে ঝরে-পড়া মসৃণ রোদ্দুর। একটু দূরে ঘন কালো নিবিড় এক জলাশয়। দীঘি না বিল না বাওড়, কে জানে! যার ওপারে আবার ঝুপঝুপ্পুস গাছ গাছালির প্রাকার। এদিকে জমিন লতা গুল্ম ঘাসে ঢাকা। তার ওপর বিছিয়ে রয়েছে রাশি রাশি শুকনো পাতা। তবে কি হেমন্তকাল! দুটি বালক-বালিকা ছুটোছুটি ক’রে খেলছে। ছেলেটির নাম স্মরণ আর মেয়েটি কল্পনা। খেলতে খেলতে মাটিতে গড়িয়ে পড়ছে তারা। খিলখিল ক’রে হাসতে হাসতে পোশাক থেকে শুকনো পাতা ঝেড়ে উঠে দাঁড়াচ্ছে আবার। আবার খেলায় মেতে উঠছে নিজেদের ছন্দে। আনন্দে চিৎকার করছে। গান গেয়ে উঠছে কোমল গলায়। হঠাৎ ধোঁয়া ধোঁয়া একটা কুয়াসা কোথা থেকে যেন। দীঘি না বিল না বাওড়, তার ওপার থেকেই বুঝি। একটু একটু ক’রে এসে ছড়িয়ে পড়ছে হাওয়ায়। জলের ওপর সরের মতো ভাসতে ভাসতে ছড়িয়ে পড়ছে সেই কুয়াসা। ওপারের ছবি ঢেকে যাচ্ছে তার আড়ালে। তারপর সেই আড়াল ক্রমেই এগিয়ে আসছে। ঢেকে ফেলছে জল, জলের ওপর শাপলাপাতা, শাপলাপাতার ওপর ফড়িং। সব ঢেকে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। খেলা থামিয়ে অবাক হয়ে দেখছে সেই দৃশ্য। ছেলেমেয়েদুটি। স্মরণ আর কল্পনা। দেখতে দেখতে, মেয়েটি বলল : চল্‌, ওইদিকে যাই। ছেলেটি তার হাত চেপে ধরল। মেয়েটি বলল : ভাবিস কী, চ অ ল্‌।  বলেই ছুট লাগাল জলের দিকে। ছেলেটিও ছুটল পিছু পিছু। যত এগোচ্ছে, সামনেটা সামান্য স্পষ্ট হচ্ছে, আর পিছনটা হয়ে যাচ্ছে ঝাপসা। জলের কিনারে এসে পড়ল তারা। যেন একটা গুহার ভেতর ঢুকে পড়েছে তারা। চারিদিকে কুয়াসার আস্তরণ। শুধু সর-পড়া জলের উপরিতল খানিক দেখা যাচ্ছে। জলের ওপর শাপলাপাতা, শাপলাপাতার ওপর ফড়িং। যেন জল নয়, সবই ডাঙা। তুই চুপ ক’রে দাঁড়া, আমি আস্তে ক’রে গিয়ে একটা ফড়িং ধরে আনি। বলে, খিলখিল ক’রে হাসল কল্পনা। তারপর পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল জলের দিকে। যেন জল নয়, সবই ডাঙা। স্মরণ চেঁচিয়ে উঠল : যাস কই, জল যে! হিহিহিহি, পিছন ফিরে হাসে কল্পনা। এস্তোনিয়ায় জমে যাওয়া সমুদ্রের ওপর দিয়ে গাড়ি ছুটে যাচ্ছে এক দ্বীপ থেকে আরেক দ্বীপে, দেখিস নি? মুখ ফিরিয়ে হাঁটা দিল সে, শাপলা পাতায় পদ্ম পাতায় পা রেখে রেখে। দাঁড়া, ফড়িং ধরেই ফিরে আসছি এখুনি। কুয়াসায় ধীরে ধীরে মিলিয়ে যেতে থাকল তার ছায়া। ধীরে ধীরে কুয়াসাতেই সর্বস্ব লীন হয়ে গেল যেন। ডেকে ডেকেও আর তার সাড়া পেল না স্মরণ। এবার যেন কুয়াসার মোড়ক তাকেও এসে ঢেকে দিতে চাইছে। মুছে-যাওয়া জলের কিনার থেকে পায়ে পায়ে ফিরে আসতে নিল স্মরণ। এক্কেবারে একা। যেন আর বালক নেই সে। কৈশোর যৌবন কবেই পেরিয়ে গেছে তার। টেবিল ল্যাম্প জ্বেলে মাঝরাতে জেগে বসে আছে। সামনে ছড়ানো তিনটি ফ্যাকাশে পোস্টকার্ড।

২.

তিনটি পোস্টকার্ড। তাদের এক পিঠে এক রাজার মুকুট-পরা মুণ্ডু আঁকা। মুণ্ডু বাঁ দিকে ফেরানো। মুণ্ডুর চারিদিকে পুরনো কালের সাজের টেবিলে লাগানো আয়নার মতো ডিম-চেহারার ফ্রেম। ফ্রেমে রং নীল। রাজার রঙও নীল। রাজা! এ কোন্‌ রূপকথার রাজা? ওই যে, ছবির বাঁ দিকে রাজার রাজকীয় সিলমোহর ছাপা। আরে, এ যে বিলেতের রাজবংশের চিহ্ন। সিলমোহরের মাঝখানে রয়েছে একটা চৌখুপি ঢাল (শিল্ড)। দুটো খোপে তিনটে ক’রে সিংহ, ইংল্যাণ্ডের প্রতিনিধি। আরেক খোপে একলা এক সিংহ, স্কটল্যান্ডের। অন্যটায় বীণা, আয়ারল্যান্ডের। ঢালের দুইপাশে তার সমর্থনে দাঁড়িয়ে আছে, বাঁদিকে সিংহ (ইংল্যান্ডের প্রতীক) আর ডানদিকে শৃংখলিত ইউনিকর্ন (স্কটল্যান্ডের প্রতীক)। ঢালের ওপর সোনার শিরস্ত্রাণ সবার ওপরে আবার এক মুকুট পরা সিংহ। আর লেখা আছে দুটি আপ্তবোল। ঢালের নিচে লেখা – ঈশ্বর এবং আমার অধিকার। আর ঢাল ঘিরে লেখা – এ ব্যাপারে যে মন্দ কিছু ভাবে তাকে ধিক্কার। হায় রে রূপকথার রাজা! মন্দ কথা ভাবার সাধ্য কী। রাজা তো নয়, সম্রাট। সম্রাট ৫ম জর্জ। সাত সমুদ্দুর তের নদীর পারে কোন্‌ প্রাসাদের কোন্‌ তখত তাউসে তুমি বসেছিলে। আর এখানকার পোস্টকার্ডে ছাপা হচ্ছে তোমার ফ্রেমে বাঁধা ছবি। ফ্রেমের ওপর দিকে ইংরেজিতে লেখা : ইন্ডিয়া পোস্ট। নিচে লেখা পোস্ট কার্ডের দাম : কোয়ার্টার আনা। মানে এক আনার সিকি ভাগ। ওই তো ছবির ফ্রেমের দু’পাশেই লেখা – ১/৪ আনা।

   নীল  রঙের ফ্রেমের ভেতর নীল রঙের রাজা। ১৯১০ থেকে ১৯৩৬ অব্দি ছিল তোমার রাজত্ব।  তার ভেতরেই কত কাণ্ড ঘটে গেল গোটা দুনিয়ায় আর এই পোড়া দেশে। ১ম বিশ্বযুদ্ধ। ১৯১৪তে শুরু হয়ে থামল গিয়ে ১৯১৮তে। তুমি বোধহয় জানতেও পার নি, ১৫ লক্ষ ভারতীয় সেনা লড়েছিলেন তোমাদের হয়ে। তার ভেতর মরে ফৌত হয়েছিলেন ৭৪, ১৮৭ জন। বদলে ভারতের মানুষ কী পেল? রাওলাট আইনের গুঁতো! প্রতিবাদে সারা দেশের মানুষ উঠল খেপে। তোমার এদেশি সাগরেদরাও চুপ ক’রে বসে রইল না। ধরপাকড় চলতেই থাকল। গুলিগোলাও। পাঞ্জাবের জালিয়ানওয়ালাবাগে ঘটে গেল নৃশংস গণহত্যা। তারিখটা, ১৩ এপ্রিল ১৯১৯। কত যে মানুষ মরল, তার হিসেব নেই। এসব খবর চেপে যাওয়াই রেওয়াজ। সব দেশে সব কালে। নেতারাও সব চুপ। রাগে ক্ষোভে এগিয়ে এলেন বাংলার একলা একজন কবি। তোমার দেওয়া উপাধি ফিরিয়ে দিলেন চিঠি লিখে। বছর ঘুরতেই সারাদেশে শুরু হয়ে যাবে অসহযোগ আন্দোলন। তার সাথে জুড়ে যাবে খিলাফত আন্দোলনও। এর মধ্যে করাচির সেনা ছাউনি থেকে চাকরি ছেড়ে দেশে ফিরে এসেছেন বাংলার আর এক কবি। তখন ১৯২০।

   ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া তিনটি পোস্টকার্ড। ছড়িয়ে আছে টেবিলে। রাজার মুণ্ডুর ছবি ছাপিয়ে চোখ চলে যাচ্ছে ডাকঘরের সিলমোহরে। স্মরণ দেখতে পাচ্ছে কল্পনাকে। গাছপালার আলোছায়ায় হুটোপুটি করছে তারা। হঠাৎ একটা কুয়াসা এসে ঢেকে দিল সব। ১৯২০। ১৯২১।

৩.

রাজা-রাজড়া আর বড়মানুষেরা সব দীনদুনিয়ার কুলুঙ্গি আলো ক’রে বিরাজ করেন। তেনাদের কীর্তিকলাপের তলে তলে বয়ে চলে পিপীলিকা মানুষের হার মানতে না-চাওয়া জীবন। তবু ময়ূরের কলাপের মতোই বড়দের কীর্তীরও কিছু তো লীলা আছে। সেই লীলা এসে এফোঁড় ওফোঁড় করতে থাকে পিপীলিকাদের স্বপ্ন দেখার খায়েশ। হালুম জুলুম তো আছেই। তা বাদেও অভাব অনটন রোগ ভোগে নিত্য জেরবার দিন। এই যেমন নীল রাজার দেশ যুদ্ধে মাতল, আর তার কড়ি যোগাতে হল ভারতকে। কার খরচ কে মেটায়! যুদ্ধের শেষে ভারতের ঘাড়ে ঋণের বাড়তি বোঝাই চেপে গেল ৩০ লক্ষ টাকার। তা মেটাতে গিয়ে আমদানির ওপর মাশুল বাড়ল। রোজের দরকারি জিনিসের ওপরেও কর বাড়ল। ফের আক্রা হল জিনিসপত্রের দাম। যুদ্ধের সময় কারখানায় তৈরি জিনিস রপ্তানি হচ্ছিল দেদার। কিন্তু লড়াই-ফ্যাসাদের ময়াদানে চাষির ফসলের তেমন দাম নেই। তাই কাপড় তেল আর কেরোসিনের জন্য দেশের চাষিদের দাম বেশি গুণতে হচ্ছিল। কিন্তু বদলে নিজেদের তৈরি চাল নীল বা পাটের দাম বেশি পেলেন না তাঁরা। তার মধ্যে আবার যুদ্ধের পরে পরপর দু’বছর ফসল হল কম। ফলে, ১৯১৪ থেকে ১৯২০-এর মধ্যে খাবার ফসলের দাম বেড়ে গেল প্রায় ৯৩%। আরও এক মজার (?) কথা, সরু চাল বা গমের থেকে অনেক বেশি ক’রে বাড়ল মোটা চালের দাম। গরিব মানুষ যা খেয়ে বাঁচেন। একটা হিসেবে দেখা যাচ্ছে, ১৯১৪ সালে বাজারে ১০০ টাকায় যত জিনিস পাওয়া যেত ১৯২০তে সেটুকুর জন্যই দিতে হল ২০১ টাকা। ডবলেরও বেশি। কার খরচ কে মেটায়! অন্য দিকে যুদ্ধের পরিখা থেকে সেসময় এক ভয়াবহ মহামারী ছেয়ে ফেলেছিল গোটা দুনিয়া। ইনফ্লুয়েঞ্জা। অনেকে বলতেন স্প্যানিশ ফ্লু। ফেব্রুয়ারি ১৯১৮তে শুরু। কমতে কমতে এপ্রিল ১৯২০। লড়াই-ফেরতা সিপাহীদের মারফত ভারতেরও শহর গ্রামে ছড়িয়ে পড়ল সেই মারণজ্বর। মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় ১কোটি ২০লক্ষ থেকে ১কোটি ৩০লক্ষ। কার খরচ কে মেটায়!

   বাংলার আর এক কবি লিখেছিলেন, মন্বন্তরে মরি নি আমরা মারী নিয়ে ঘর করি। এত মৃত্যু সত্ত্বেও বাংলার জনসংখ্যা কিন্তু ১৯০১ থেকে ১৯২১-এর মধ্যে বেড়েছিল প্রায় ১১%। সবই হয়তো রাজাধিরাজের রাজত্বের মহিমা। সেই একই মহিমায় কিন্তু ওই বিশ বছরে প্রকৃত চাষ জমির মোট পরিমাণ কমে গিয়েছিল ৯%। ফলে চাষজমির ওপর চাপ বেড়েছিল বিপুল। বেড়েছিল ঋণগ্রস্ত চাষির সংখ্যা। গ্রামীণ অর্থনীতিতে গভীর মন্দা। গরিব চাষিরাই শুধু নন, সেই মন্দার কবলে পড়েছিলেন মধ্যসত্ত্বভোগীরাও। সকল কাহিনিই শুধু দারিদ্র্যের। টেবিলের ওপর ছড়ানো ১/৪ আনা দামের তিনটি ফ্যাকাশে পোস্টকার্ড। ১/৪ আনা জুড়ে ছড়ানো শুধু ফ্যাকাশে দারিদ্র্যের মন্থর বয়ান। আর মুকুট-পরা রাজার ছবি। ছবির রং নীল।

৪.

নীল জলের মধ্যে দিয়ে সাঁতার কাটতে কাটতে স্মরণের মনে পড়ে, জলটা কীভাবে যেন স্থির হয়ে গেল। শাপলা পাতা পদ্ম পাতায় অনায়াসে পা ফেলে ফেলে ফড়িং ধরতে চলে গেল কল্পনা। আর কুয়াসায় ঢেকে গেল বাতাস। কুয়াসায় ঢেকে গেল আকাশ। স্মরণ ভাবে, স্মরণাতীত কথাটা ওই রকম কুয়াসার মতো। একটু এগলেই খানিক দেখা যাচ্ছে, তারপর আবার সব ঝাপসা। কিছুতেই মাপা যাচ্ছে না ঠিক কোথা থেকে তার শুরু। একটা মানুষের আয়ুর গজফিতে দিয়ে মাপলে, তার সময়ের আগের সবই স্মরণাতীত। তাহলে কি কল্পনাকে ডেকে আনতে হবে আবার। যতই হারিয়ে যাক, তাকে তো লাগেই। বারবার লাগে। তবু একটা মানুষের আগেও তো আছে আর একটা মানুষ। কুয়াসায় ঢেকে-যাওয়া। সে আবার দেখতে পেয়েছে খানিক। তার আগে আরেক মানুষ। সেও দেখেছে। তাদের দেখাগুলোর ছবি তোলা থাকলে তো স্মৃতির কুয়াসা ভেদ করতে সবটাই কল্পনা লাগে না। ওইসব ছবিগুলো যতদূর পাওয়া যায়, তাদের নেড়েঘেঁটে দেখাই যায়। সব ছবি পরপর সাজালে, তৈ্রি হয়ে যায় একটা ইতিহাস। তাতেও কল্পনা মিশে থাকে বই কি। তা থাক। তবু, ইতিহাসের সেইসব ছবির অ্যালবাম বেয়ে স্মরাণতীতকে পিছিয়ে দেওয়া যায় অনেক দূর।

  এইভাবে কিছুটা ইতিহাস বানিয়ে ফেলতে পারলে সেটা তো তখন স্মৃতিরই অংশ হয়ে যায়। ভাবে, স্মরণ। সেই গেঁথে-ফেলা ইতিহাসের বাইরেটুকুতেই তখন পড়ে থাকে স্মরাণাতীত। তবু হঠাৎ ক’রে একদিন মাটি খুঁড়তে গিয়ে বেরিয়ে আসে একটা মহেঞ্জোদারো, একটা মহাস্থানগড়। তখন আবার আতশ কাচ নিয়ে বসতে হয় আলোর নিচে। কুয়াসার জট কাটিয়ে ভরে তুলতে হয় স্মৃতি। কুয়াসার আড়াল থেকে খিলখিল ক’রে হাসে কল্পনা।

   এই পোস্টকার্ড তিনটিও তো মহেঞ্জোদারো বা মহাস্থানগড়েরই মতো। এক মাস আগেও এরা স্মৃতির একচুল অংশ ছিল না। যেন সময়ের অন্ধকার কোণ থেকে হঠাৎই মুখ বাড়াল। মহেঞ্জোদারো বা মহাস্থানগড়েরই মতো। কাজেই টেবিলে বিছিয়ে বসতে হয় তাদের। আতশ কাচ নিয়ে আলোর নিচে। তিনটে কার্ড। মানে, তিনটে চিঠি। পাঠাচ্ছেন একই মানুষ। অবিভক্ত নদিয়া জেলার কোনও গ্রাম ধোড়াদহ থেকে। তিনটে চিঠিই যাচ্ছে অবিভক্ত পাবনা জেলার সিরাজগঞ্জ শহরে। তিনটে চিঠিই পাচ্ছেন একই মানুষ। অল্প ক’মাসের মধ্যেই তিনটে চিঠি। প্রথমটির তারিখ :  ৫ অগ্রহায়ণ [১৩২৭] = ২০ নভেম্বর ১৯২০। ২নং : ২৬। ৯। ২৭ [২৬ পৌষ  ১৩২৭] = ১০ জানুয়ারি ১৯২১। ৩নং :  ২৬ ফাল্গুন ১৩২৭ = ১১ মার্চ ১৯২১।

   টেবিলে বিছানো চিঠি তিনটির তারিখের দিকে তাকিয়ে থাকে স্মরণ। আর ঘনিয়ে উঠতে থাকে কুয়াসা। কুয়াসার ভেতর দিয়ে স্মরণ চলে যায় স্মরাণাতীতে। ১৯২০-২১-এর নদিয়ায়, পাবনায়। না না, স্মরণাতীত কেন হবে। ছবিগুলো তো গাঁথা আছে এলোমেলোভাবে। ইতিহাস যেমন থাকে। ওই যে সেই মারণজ্বরে মৃত্যুর খবর। সারা বাংলাদেশে সংখ্যাটা হল ১১ লক্ষ ৪৪ হাজারেরও বেশি (১৯২০)। বর্ধমান আর প্রেসিডেন্সি বিভাগে জ্বরে মৃত্যুর হার আগের দশকের (১৯০১-১১) গড়ের থেকে এবছর ৩০% বেশি। অবিভক্ত নদিয়া আর মুর্শিদাবাদ তো তখন প্রেসিডেন্সি বিভাগের অংশ। রাজশাহী বিভাগে, যার মধ্যে ছিল পাবনা, মৃত্যুহার অবশ্য আগের ওই গড় থেকে ২০% কমেছিল। কিন্তু তার মধ্যে আবার সিরাজগঞ্জ ছিল এমন এক পুরসভা, যেখানে জনসংখ্যার হাজারকরা ৩০ জন এই জ্বরে মারা গিয়েছিলেন।  ১৯১৯এ এই মৃত্যুহার ছিল তুলনায় অনেক কম, মাত্র ৮জন প্রতি হাজারে। অনেকে ভাবেন, সিরাজগঞ্জে রেলপথ বসেছিল বলেই এমনটা হল।

  ওই যে, সারা বাংলাদেশ জুড়ে ১৯১৯ থেকেই চলছে জমি জরিপের কাজ। তারই একটা অংশ হল ট্র্যাভার্স জরিপ। নদিয়াতে ১৯২০তে এসেও সেকাজ চালু। এবছর সেখানে মোট ৭৬৯ বর্গ মাইল জমির মাপজোক শেষ হয়েছে। আর পাবনাতে সেকাজ এবছরই শুরু হয়ে, জরিপ শেষ হয়েছে ৬৯৫ বর্গ মাইল জমির। নদিয়ার আবার একটা বিশেষ সমস্যা উৎবন্দি প্রজাসত্ত্ব। এই সত্ত্বে রায়ত জমির অস্থায়ী দখল রাখলেও, খাজনা দিতে হত শুধু যতটা জমি চাষ দেওয়া হল, তার ওপর। এসবের হিসাব নিকাশের জন্য জরিপের কাজ কেবলই জটিল আর মন্থর হয়ে পড়েছিল।

   নদিয়ায় এবছর (১৯২০-২১) কোনও বন্যা হয় নি। ইটভাটা আর অন্য শ্রমিক বাড়ার ফলে দিশি মদের বিক্রি বেড়ে হয়েছে ১৬০১ গ্যালন। ৫টা আফিমের দোকানও সে-জেলায় বেড়েছে। চাকদহের পালপাড়া মন্দির সংস্কারের জন্য সরকার খরচ করেছে ৩,৫২৭ টাকা ১৪ আনা।

   এবছর সারা বাংলায় ৭জন অস্থায়ী অতিরিক্ত সেসন জাজ নিযুক্ত হয়েছেন। তার মধ্যে একজন পাবনায়। সিরাজগঞ্জে মহকুমা আদালতে এসেছেন একজন অস্থায়ী অতিরিক্ত মুনসেফ। দেখা যাচ্ছে, ফৌজদারি অপরাধের অভিযোগ পাবনা জেলায় কমে গেছে। আবার সেসন কোর্টে আসা মামলা আর তার নিষ্পত্তির সংখ্যা সারা বাংলায় কমলেও, পাবনায় তা বেড়েছে। পাবনা জেলায় হোসিয়ারি উৎপাদন বেড়েছে। কিন্তু সরকারি ইস্কুল আর ছাত্রের সংখ্যা কমে গেছে।

   ওই শোনো, ১৯২০-২১ বছরের একেবারে শেষদিকে এক জোরদার গুজব। রটে গেছে, গান্ধীর ডাকা অসহযোগ আন্দোলনের ফলে পোস্টকার্ডে আঁকা রাজাধিরাজের রাজত্ব খতম। আর কেউ চুপ ক’রে বসে থাকতে পারে? রাজশাহীতে ৬৬৯ জন রাজবন্দি জেল ভেঙে বেরিয়ে গেলেন (২৪ মার্চ ১৯২১)। পরে অবশ্য অনেকে ধরাও পড়ে যান। একই সময় সিরাজগঞ্জ সাবজেলেও ঘটে গেল ছোট আকারে একই  রকম জেল ভাঙার ঘটনা। আর কিছুদিন পরেই বাংলার আকাশে বাতাসে আছড়ে পড়বে সেই আগুন ঝরা গান – কারার ওই লৌহকপাট ভেঙে ফেল কর রে লোপাট। এবার সত্যিই স্মরাণাতীতে চলে যায় স্মরণ। কল্পনাই তখন ফিরিয়ে আনে পড়ার টেবিলে। সেখানে করুণভাবে অপেক্ষা করছে তিনটি পোস্টকার্ড। সময়ের লৌকপাট ভেঙে বেরিয়ে এসেছে তারা। এসো, পাঠ করো…

৫.

চিঠি নং ১

 

 সামনের পৃষ্ঠায় লিখন  

 

      ওঁ মা কালী সহায়                                                      ধোড়াদহ  ৫ অগ্রহায়ণ  

প্রাণাধিকেষু : –
পরম শুভাশীর্ব্বাদ কল্যাণঞ্চ বিশেষঃ –
তোমার Reply Card এর উত্তর দেওয়া হইয়াছে বোধ হয় পাইয়া থাকিবা। আমার
চক্ষের
বিষয় অবগত হইয়াছ। পূজার পর হইতে স্কুল খুলিয়া ৪। ৫ দিবস কার্য্য
করিয়াছিলাম। দিন
দিন চোখের অবস্থা যেরূপ হইতেছে লেখাপড়ার কার্য্য আর
করিতে পারিব না।
বর্ত্তমান চশমা অপেক্ষা  power-ful চশমা হইলে কিরূপ দৃষ্টি
হইতে পারে তাহা বলিতে পারিনা। বাটীস্থ বালক বালিকারা সকলেরই জ্বর হওয়ায়
অর্থাভাবে চিকিৎসার ব্যবস্থা করিতে না পারায় অদ্য ৫ দিন হইল সকলকেই
যমশেরপুর পাঠান হইয়াছে। ঠাকুরের পালি পড়িয়াছে । একাকী সব কাজ আমাকে
করিতে হইতেছে অপারক সত্ত্বেও আমাকে ঐ সমস্ত কাজ করিতে হইতেছে।
আমি অত্যন্ত বিপন্ন হইয়াছি এরপরে
আমার অদৃষ্টে যে কি আছে বলিতে পারিনা
শেষ কালে আমি যে খুব কষ্ট পাইব তাহা বেশ বোঝা যাইতেছে। ইহা অনুতাপ করিয়া
আর কি করিব! 

 

ঠিকানার পৃষ্ঠায় লিখন

সত্বর কিছু খরচ পত্র না পাঠাইলে আমার আর উপায় নাই। নতিয়াডাঙ্গা নিবাসী গণপতি সান্যাল
মহাশয় আপুনার (?) কন্যার বিবাহের জন্য বিশেষ অনুরোধ করিয়া বলিয়াছে মেয়েটী সুন্দরী ১২।
১৩ বৎসর বয়স নগদ ও গহনাদি ছয় সাত শত টাকা দিবে যদি তোমার মত কর সত্বর আমাকে
লিখিবা যদি বিবাহ করা মত হয় তবে townএ না করিয়া এ দেশে করায় ভাল। যে মতামত হয়
সত্বর লিখিবা – তোমার ও শ্রীমান গোপাল ভায়ার শারীরীক কুশল সংবাদে নিশ্চিন্ত করিবা।

 ঠিকানার পৃষ্ঠায় উলটোমুখে লিখন

অন্যান্য

বাটীর অন্যান্য সকলে ভাল আছে শ্রীমান বামাচরণ ভায়া ৪ ৷ ৫ দিন হইল বাটী আসিয়াছে মধ্যে ২ পত্র দ্বারায় আমাকে নিশ্চিন্ত করিবা

সামনের পৃষ্ঠায় উলটোমুখে লিখন

আশীর্ব্বাদক
শ্রী প্রাণচাঁদ শর্ম্মণ চৌধুরী
ধোড়াদহ

প্রাপকের ঠিকানা –

Sriman
Pramathanath Choudhuri
C/O Babu Akshoy Chandra Lahiri BL

                                Pleader

P.O Sirajganj (Pabna)

চিঠি পাঠানোর ডাকছাপ : DHORADAHA/20 NOV 20/NADIA
চিঠি বিলির ডাকছাপ : SIRAJGANJ/ 21 NOV 20/ 7.30 AM

চিঠি নং ২

 

সামনের পৃষ্ঠায় লিখন

৭ জানুয়ারী                              ২৬। ৯। ২৭        ধোড়াদহ         

প্রাণাধিকেষু –
পরম শুভাশীর্ব্বাদ কল্যাণঞ্চ বিশেষঃ –
তোমার পত্র পাইয়া অবগত আছি প্রেরিত তোমার ৫৲ টাকা প্রাপ্ত হইয়াছি। তোমার শারি[রী]রিক
অসুস্থ সংবাদে চিন্তিতাছি। শরীর সম্বন্ধে বিশেষ রূপে যত্ন করিবা – এবং ঔষধাদি ব্যবহার করিবা –
শরীর সম্বন্ধে কোনরকম অবহেলা করিও না। শ্রীমান গোপাল ভায়ার আমাশয় হইয়াছে সংবাদে
বড়ই চিন্তিতাছি  আরোগ্য সংবাদে নিশ্চিন্ত করিবা। শ্রীমান ভায়ার গোপাল নাম রাখা হইয়াছে
ঐ নাম রাখা ঠিক হয় নাই। কারণ আমার ঠাকুরবাবার নাম সাহেব পাড়ার যে জমি আছে তাহা
সেটেলমেন্টের জরিপে আমার নাম

ঠিকানার পৃষ্ঠায় লিখন

 

উঠিয়াছে ঐ জমি জমায় নাম খারিজা দাখিল হয় নাই। তাহার কোন নিদর্শন আমার নিকট নাই।
জমিদারের সেরেস্তায় আমার নাম খারিজা করিয়া দাখিল করিতে হইবে শ্রীযুক্ত কান[নু]নগো
বাবুকে সাক্ষী দেখাইতে না পারিলে দখল পাইব না  নাম খারিজায় উপস্থিত ১০৲ টাকার দরকার
অবশ্যই টাকা বাটী পাঠাইবা। আমার চক্ষু অপেক্ষা ঐ জমি রাখা নিতান্ত প্রয়োজন  এই বিবেচনা
করেও চক্ষু সম্বন্ধে যাহা ব্যয় হইবে আপাততঃ সেই টাকাটা এই স্বার্থে অবিলম্বে [?] ব্যয় কর।

সামনের পৃষ্ঠায় উলটোমুখে লিখন

উক্ত জমিতে ফসল খুব ভালো আছে  ১ সপ্তাহ মধ্যে নাম খারিজা করিতে হইবে। নইলে কার্য্য
নষ্ট হইয়া যাইবে। ইহাই বিবেচনা করিও অত্রস্থ সর্ব্বদা তোমার কুশলাদিপ্রার্থী

সামনের পৃষ্ঠার পূর্বলিখনের নিচে প্রেরকের সাক্ষর  

আঃ শ্রী প্রাণচাঁদ শর্ম্মণঃ চৌধুরী

প্রাপকের ঠিকানা –

প্রাণাধিক
শ্রীমান প্রমথ নাথ চৌধুরী
বাপা দি[দী]র্ঘজি[জী]বেষু
পোঃ সিরাজগঞ্জ

[সম্ভবত ডাকবিভাগ লাল কালিতে লিখে দিয়েছে] Sirajganj
শ্রীযুক্ত অক্ষয় চন্দ্র লাহীড়ী উকিল বাবুর বাসা (পাবনা)

চিঠি পাঠানোর ডাকছাপ : DHORADAHA/10 JAN 21/NADIA
চিঠি বিলির ডাকছাপ : SIRAJGANJ/ 11 JAN 21/ 7.30 AM

চিঠি নং ৩

সামনের পৃষ্ঠায় লিখন

ওঁ কালী                 ১৩২৭ সন         ২৬ ফাল্গুন                                

প্রাণাধিকেষু –

পরম শুভাশীর্ব্বাদ কল্যাণঞ্চ বিশেষ। –

গত ২৪শে তোমার পত্র পাইয়া সকল অবগত হইলাম। তোমার ২১ ফাল্গুনের প্রেরিত
১৫৲ টাকা অদ্য প্রাতে পাইলাম  গত ৫৲ পাঁচ টাকা পাইয়াছি  গত ২৩ শিবরাত্রি হইয়াছে
তোমার পত্র না পাইয়া পূজার যোগাড় করিতে পারি নাই  আগামী চৈত্র সংক্রান্তি ভিন্ন পূজা
হইবে না  দশটাকা রাখিলাম কিন্তু পনরটাকা খরচ হইবে। তুমি সংসার খরচের বাবদ পাঁচ
টাকা দিয়াছ  প্রতি মাসে পাঁচ দিতেছ  ইহাতে কি হয়  মাসিক পনরটাকা খরচ  নিতান্ত পক্ষে
দশ টাকার কম হইতে পারেনা  তুমি মাসিক দশ টাকা না দিলে চলিতে পারেনা আর পাঁচ টাকা
কোনপ্রকারে জুটিতে পারে, যাহা তোমার বিবেচনা হয় করিবা  শ্রীমান হারাণরা বহরমপুর
পরীক্ষা দিতে গিয়াছিল  গোপাল ভায়াকে দেখিয়া আসিয়াছে  ভাল আছে  তুমি দোলের সময়
খাগড়া যাইবে  যদি পার বাটী আসিবা সেটলমেন্টে কান[নু]নগু[গো] বাবুর নিকট জমি পাইয়াছি
ফসল এ পর্যন্ত পাই নাই  মাড়া হয় নাই  তাহাতে একটু গোলযোগ আছে  যাহা হয় পরে লিখিব
খাজানা পাইব বলিয়া নায়েবকে বলায় নায়েব মহাশয় ভাগদারের কাছে মৌজুত বায়াখাত

 

ঠিকানার পৃষ্ঠায় লিখন

 

বলিয়াছেন  এন্‌কওয়ারী করিয়া দেওয়া হইবে  যাহা হয় পরে লিখিব। জমি লওয়া সম্বন্ধে
তোমার কি মত লেখিবে এখানে রাখাল মৈত্রের শালির সঙ্গে
তোমার বিবাহ কথা বলে
মেয়েটী মন্দ নহে বয়স্থা  তোমার হ’লে স্থির করা
হইবে। উপেন বাটীতে আছে শরতের
বাটীর সকলে ভাল আছে ফসল যাহা
পাইব খাজানা ও দেনায় যাইবে  কিছু যদি ঘরে আসে
পত্রের উত্তর দিবা  ঐ
সময়ে শিবপূজা দেওয়া হইবে

 

সামনের পৃষ্ঠায় উলটোমুখে লিখন

আশীর্ব্বাদক শ্রী প্রাণচাঁদ চৌধুরী            ধোড়াদহ

প্রাপকের ঠিকানা –

Sriman
Pramathanath Choudhury
P.O Shirajganj
C/O Babu Akshoy Chandra Lahiri.
Pleader
 Dt. Pabna

চিঠি পাঠানোর ডাকছাপ : DHORADAHA/11 MAR 21/NADIA
চিঠি বিলির ডাকছাপ : SIRAJGANJ/ 14 MAR 21/ 7.30 AM

৬.

‘তখন সন্ন্যাসী তাঁহার ঝুলি হইতে কাপড়ে-মোড়া একটি তুলট কাগজের লিখন বাহির করিলেন। কাগজখানি দীর্ঘ, কোষ্ঠীপত্রের মতো গুটানো। সন্ন্যাসী সেটি মেজের উপর খুলিয়া ধরিলেন। হরিহর দেখিল,তাহাতে নানাপ্রকার চক্রে নানা সাংকেতিক চিহ্ন আঁকা – আর সকলের নিম্নে একটি প্রকাণ্ড ছড়া লেখা আছে তাহার আরম্ভটা এইরূপ’—

ওপরের চিঠি তিনটে নিশ্চয়ই ‘নানাপ্রকার চক্রে নানা সাংকেতিক চিহ্ন আঁকা’ কোনও গুপ্তধনের হদিশপত্র নয়। কাজেই এ-যাত্রা কোনও পাদটীকা জোড়া হল না। কেবল একটা কথাই প্রিয় পাঠিকা আর পাঠককে মনে করিয়ে দেওয়ার। গোপাল নামে একটি চরিত্রের উল্লেখ তিনটি চিঠিতেই আছে। গতবারে উৎকলিত চিঠিটির সাথে ওই গোপালই হলেন এবারের তিনটির সেতুবন্ধন।

বাকি কথা পরের দফায়। সকলে ভালো থাকুন।

মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না। আবশ্যক ঘরগুলো * দিয়ে চিহ্নিত করা হয়েছে