আজ হিজাব ছাড়ার গল্প বলতে আসি নি: শিউলি শবনম

আজ হিজাব ছাড়ার গল্প বলতে আসিনি….
‘সেদিন বাতিঘরের সামনে দাঁড়িয়ে ছাত্র ইউনিয়নের এক বন্ধু বলল, ‘সাম্যবাদ ছাড়া চূড়ান্ত মুক্তি অসম্ভব ‘/
আমি হাসি, সাম্যবাদের চেয়ে নভেরার রুদ্রাক্ষ মালা বেশি জীবন্ত লাগে আমার…’
স্যার, আমার ডায়েরির পাতা উল্টে একটা করে কবিতা পড়েন আর একবার করে আমার দিকে তাকান। আমি চট্টগ্রাম কলেজে ইন্টারমিডিয়েট ১ম বর্ষের ছাত্রী। সদ্য হিজাব পরতে শুরু করেছি তখন। মানে, মাথায় বিশেষ কায়দায় স্কার্ফ জড়িয়ে রাখি।
কিছুক্ষণ পরে বুঝলাম, স্যার আমার দিকে তাকিয়ে কী বোঝার চেষ্টা করছেন আসলে! স্যার আরেকটা কবিতা পড়ছেন…’সুদূর সাইপ্রাস থেকে এক বন্ধু লিখল ‘Another world is possible. ‘  আমার ডায়েরির পৃষ্ঠা জুড়ে মার্কসবাদে অনুরক্ত এক ছাত্রীর কবিতা পড়ে এবং স্যারের টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা তাঁর এই ছাত্রীকে দেখে তিনি কিছুটা দ্বিধান্বিত। কলেজের ম্যাগাজিনে প্রকাশের জন্য স্যার কবিতা বাছাই করবেন। বাংলা বিভাগের শিক্ষক হিসেবে দায়িত্বটা তাঁর কাঁধেই।
মেজবাহ স্যার। আমি স্যারের মুখটা এখনো স্পষ্ট মনে করতে পারি, অবাক হয়ে আমার চোখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন, এসব কবিতা তুমি লিখেছ? কিন্তু তুমি হিজাব পরো? পরক্ষণেই হেসে চোখ নামিয়ে ডায়েরির পাতা উল্টাতে উল্টাতে আবার বললেন,  ওহ, এটাতো এখন ফ্যাশন।
বলা ভালো আমরা ক’বন্ধু মিলে তখন প্রতিযোগিতা দিয়ে মাথা ন্যাড়া করি। ন্যাড়া মাথা ঢাকতে বিশেষ কায়দায় মাথায় স্কার্ফ পরি এবং আরো স্পষ্ট করি, তখন চট্টগ্রাম  কলেজের কমনরুমে ছাত্রী সংস্থার বৈঠক, কোরআন মাহফিল এসবে যোগ দেওয়া আমাদের জন্য একপ্রকার বাধ্যতামূলক ছিল। কমনরুমে গেলেই ছাত্রী সংস্থার সিনিয়র আপুরা খুব মিষ্টি করে ডেকে, আদর করে তাদের বৈঠকে নিয়ে যেতেন। আমার মতো ১৫/ ১৬ বছরের অনেক কিশোরীরই সেই ডাক উপেক্ষা করার সাধ্য ছিল না। সেখানে আমরা কোরআন, সালাত, পর্দার ফজিলত এসব শুনতাম। শুনতে শুনতে একদিন ন্যাড়া মাথা ঢাকতে যে স্কার্ফ জড়িয়েছিলাম সেটা তখন হিজাবে পরিণত হয়। গ্রাম থেকে শহরে পড়তে আসা এক সরলসিধা কিশোরী হিজাব পরতে শেখে প্রথম।
কিন্তু আমার শিরায় ছিল আরো এক ভিন্ন স্রোত, যা হিজাব পরার চেয়েও তীব্র। ২০০১ এর গল্প। আমার কিছু চমৎকার বন্ধু ছিল। আমরা অনেকেই সে সময় মার্কসবাদ দ্বারা অনুপ্রাণিত হই। পত্রিকায়, লিটল ম্যাগাজিনে লিখতাম নিয়মিত।  রক্তে তারুণ্যের আগুন।
হিজাব বনাম মার্কসবাদের দ্বন্দ্ব কি আমি বুঝতাম তখন? পুরোটা না বুঝলেও স্যারের কথায় আমি মনে মনে সেদিন লজ্জিত হই। এটা টের পাই আমার মাথায় মোড়ানো বস্তুটি আমি নিজের বিশ্বাস থেকে পরি না।  ভালোবেসে পরি না। তবে কেন পরি?
ধীরে ধীরে কমনরুমে পত্রিকা পড়তে যাওয়া ছেড়ে দিই। ওখানে গেলেই আপুরা বৈঠকে যাওয়ার জন্য পীড়াপীড়ি করবেন। হিজাবের ফজিলত বোঝাবেন। চুল বড় হতে হতেই একদিন আমি স্কার্ফ খুলে ফেলি। স্কার্ফ কিংবা হিজাব খুলতে পারার যে প্রথম ধাক্কা, সেটা স্যার আমাকে দিয়েছিলেন, সেদিনের সেই আশ্চর্য চাহনি দিয়ে। কিছুদিন পরই স্যার অন্য কলেজে বদলী হন। ইন্টারমিডিয়েটের পর মেজবাহ স্যারের সাথে আমার কোনোদিন দেখা হয়নি।
আমার আজন্ম কৃতজ্ঞতা স্যারের প্রতি।

মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না। আবশ্যক ঘরগুলো * দিয়ে চিহ্নিত করা হয়েছে