আমি চুয়াত্তর সালে ক্লাস নাইনে ভর্তি হই গহিরা এ জে ওয়াই এম এস বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ে। সময়টা ১৯৭৪ সাল। সে বছরের ফেব্রুয়ারিতে আমরা গ্রামের বাড়ি রাউজান উপজেলার গহিরা গ্রামে ফিরে আসি। এর আগে ‘৭৩ সালের শেষ দিকে বাবা সরকারি চাকরি থেকে অবসর নেন।
স্বাভাবিকভাবে প্রথম প্রথম স্কুলে মানিয়ে নিতে কষ্ট হতো আমার। আমি কিছুটা অন্তর্মুখী। বেশিদিনের পরিচিত না হলে সহজে মিশতে পারতাম না। বড় সমস্যা ছিল ক্লাসের সবাই এমনকি অধিকাংশ শিক্ষকও চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলতেন। এরমধ্যে বাংলার শিক্ষক হারুন উর রশীদ স্যার মাঝেমধ্যে আঞ্চলিক বললেও বাংলায় কথা বলতেন। অবশ্য সে সময় হেড স্যার ও অ্যসিসট্যান্ট হেড স্যারও আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলতেন না।
ক্লাসে প্রথম মাস ছয়েকের মতো আমার জন্য বড় জ্বালাতন হয়ে উঠেছিলেন হারুন স্যার। প্রায় প্রতিদিনই তিনি আমার নামধামসহ নানা বিষয়ে জানতে চাইতেন। আমার এ অবস্থায় সহপাঠীদের মধ্যে কেউ কেউ আনন্দও পেতো তা বুঝতে পারতাম। বেশ পর স্যার আমাকে বলেছিলেন, বাচনভঙ্গি ভালো লাগত বলে তিনি আমার কথা শুনতে চাইতেন।
স্যারের পোশাক-পরিচ্ছদ, চালচলন ছিল খুবই সাধারণ। সেকেন্ড হ্যান্ড, যেটাকে আমরা টালকোম্পানি বলি, পোশাক পরতেন। পায়ে থাকত টায়ারের স্যান্ডেল। অবশ্য গত শতকের সাত দশকের মাঝামাঝিতে একজন বেসরকারি স্কুল শিক্ষকের পক্ষে এরচেয়ে ভালো পোশাক পরা সম্ভবও ছিল না যদি না তাঁর পৈত্রিক অবস্থা স্বচ্ছল না হতো কিংবা প্রাইভেট পড়ানোর মতো বাড়তি আয়ের ব্যবস্থা না থাকত। তিনি প্রাইভেট পড়াতেন বটে তবে টাকা আয়ের উদ্দেশ্য নয়। তিনি পড়াতেন টাকার অভাবে যারা প্রাইভেট পড়তে পারত না তাদের।
স্যারের জন্ম হয়েছিল একটি নিম্ন ও রক্ষণশীল পরিবারে। কাজেই দারিদ্র্য ছিল তাঁর নিত্যসঙ্গী। তা সত্ত্বেও দারিদ্র্য বা অভাব-অনটন তাঁর জ্ঞানার্জনের অভিপ্সার প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। প্রচণ্ড অভাবের মধ্যেও তিনি নিয়মিত বই কিনতেন। প্রচুর পড়াশোনা করতেন বলে যেখানে বই আছে সেখানেই তাঁর উজ্জ্বল উপস্থিতি ধরা পড়ত।
স্যারের বইকেনা নিয়ে একটি ঘটনার কথা শুনেছিলাম। একদিন বিকেলে বাজারে গেছেন চালসহ কিছু অতি প্রয়োজনীয় পণ্য কেনার জন্য। কিন্তু বাজারে গিয়ে বইয়ের দোকানে ঢুকেই ভুলে গেলেন সব। অথচ সে রাতে রান্নার চালও ছিল না ঘরে। তিনি ফিরলেন রাতে শূন্য থলে আর এক বান্ডিল বই নিয়ে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে যা ঘটার তাই ঘটেছিল। সে কথা বলে কাউকে বিব্রত করা সমীচীন হবে না। বই আর বউয়ের দ্বন্দ্ব থেকে স্যারের রেহাই মেলেনি কখনও।
স্যার লেখালিখি করতেন। পূর্বকোণের সাহিত্যপাতায় তাঁর প্রবন্ধ নিয়মিত প্রকাশিত হতো। কবিতা লিখতেন তবে তা পত্রিকায় প্রকাশ করতেন কিনা জানি না। তবে নিয়মিত পড়ার কারণে তাঁর জানার ভাণ্ডার ছিল সমৃদ্ধ। দৃষ্টিভঙ্গি ছিল উদার। কিন্তু ব্যবহারে ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী।
একদিন প্রাইভেট পড়ানো শেষে স্কুলের একটি রুমে স্যারের সঙ্গে কথা বলছিলাম, বলে রাখা ভালো, আমি সুযোগ পেলেই স্যারের সঙ্গে আলাপ জমাতে সেখানে ধর্ণা দিতাম। সে সময় স্কুলের এক প্রাক্তন ছাত্র স্যারের সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন। ছাত্রটি সরকারি কমার্স কলেজে ভর্তি হয়েছে সবেমাত্র। সম্ভবত সেটাই জানাতে এসেছিল সে। তার সঙ্গে আলাপের একপর্যায়ে ছেলেটিকে স্যার বললেন, ‘এখন অনেক বড় বড় শিক্ষকের সংস্পর্শে আসবে আর বুঝতে পারবে আমরা কত কম জানতাম।’
সমাজতন্ত্রের দীক্ষাটাও দিয়েছিলেন তিনি। একবার বললেন, ‘বিপ্লব, যত ছোট করেই হোক, নিজ এবং নিজের পরিবার থেকে শুরু করতে হবে। তুমি যদি নিজেকে এবং নিজের পরিবারকে সবার আগে পরিবর্তন করতে না পারো সমাজ পরিবর্তন করবে কীভাবে? তখন আমাদের স্কুল পরিচালনা পরিষদের সভাপতি ছিলেন, আবদুল্লাহ আল মামুন চৌধুরী। তিনি বললেন, এঁদের পরিবারের সবার নাম জানো? সেসময় সম্ভবত আমরা কয়েকজন ছিলাম। আমরা বললাম, আবদুল্লাহ আল হারুন চৌধুরী, আবদুল্লাহ আল নোমান চৌধুরী, আবদুল্লাহ আল আহসান… । এভাবে শেষ পর্যন্ত বলার পর স্যার বললেন, নোমান সাহেবের নামের পরে চৌধুরী নেই, আর সবার নামের সঙ্গে আছে।’
আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, নোমান সাহেব কমিউনিস্ট পার্টি করেন। তাই তাঁর কাছে এ ধরনের বংশ মর্যাদার কৃত্রিমতা পছন্দনীয় নয়।’
স্যার বললেন, ‘এ কারণে বললাম আগে নিজেকে বদলাতে হবে।’
আমার চরিত্র, বিশ্বাস, দর্শন সর্বোপরি মানস গঠনে স্যারের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। তিনি ক্লাসে বা ক্লাসের বাইরে হঠাৎ এমন সব কথা বলতেন যা উঠতি বয়েসী তরুণদের সহজ-সরল বিশ্বাসে প্রবল ধাক্কা দিত। পছন্দ না হলেও শিক্ষক বলে অনেকে সামনাসামনি প্রতিবাদ করতো না বটে তবে তাদের কেউ কেউ আড়ালে স্যারকে নাস্তিক বলে মন্তব্য করতে ছাড়তো না।
তাঁর সমাজবীক্ষণ তথা ধর্ম, প্রচলিত বিশ্বাস ও মতবাদ বড় তীক্ষ্ণ ছিল। তবে সে আলোচনায় আক্রোশ বা আক্রমণ থাকত না। তিনি অনুত্তেজিত, ধীর অথচ দৃঢ় কণ্ঠে তাঁর শাণিত যুক্তি তুলে ধরতেন। মাঝেমধ্যে কেউ দ্বিমত পোষণ করলে খুব বিনয়ের সঙ্গে তা শুনতেন। আমি তাঁকে কখনও ক্রুদ্ধ, ক্ষুব্ধ হতে দেখিনি।
স্যারের চিন্তাধারা যে আমাকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছিল তা পরিণত বয়সে এসে বেশ বুঝতে পারি। প্রচলিত সমাজব্যবস্থায় আমরা অকপটে মত প্রকাশ করতে পারি না। আগেও কারো নিস্তার মেলেনি, এখনও মেলে না। মতামত প্রকাশ করতে না পারার বিষয়ে তাঁর সঙ্গে একবার আলাপ হয়েছিল। তিনি সে সময় এক বিস্ফোরক তথ্য দিয়েছিলেন আমাকে। বলেছিলেন, আমার সঙ্গে একমত পোষণ করেন এমন অনেক মাওলানা, মুফতিও আছেন। উদাহরণ হিসেবে তিনি একটি বিখ্যাত মাদরাসার তৎকালীন প্রিন্সিপালের নাম উল্লেখ করেছিলেন।
আমি শহরে বাস করছি অনেক বছর ধরে। ফলে স্যারের সঙ্গে যোগাযোগ একেবারেই কমে গিয়েছিল। মাঝেমধ্যে বাড়ি গেলে স্কুল সাপ্তাহিক বন্ধ থাকায় দেখা হতো না। গত শতকের নব্বই দশকের শেষের দিকে তাঁর বাড়ি গিয়েছিলাম প্রথমবারের মতো। তাঁকে আমার বাসায় এনেছিলাম আমন্ত্রণ জানিয়ে। আমার খুব ইচ্ছে ছিল স্যারের অন্তত একটা বই প্রকাশ করার। তাঁর লেখাগুলো জড়ো করে দেওয়ার অনেক অনুরোধ করেছিলাম কিন্তু শেষ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। তাঁর মৃত্যুর পর আমি অন্যদের সাহায্যে লেখাগুলো সংগ্রহ করার চেষ্টা করেছি, তা-ও পারিনি।
