তখন আগুনের নদী বয়ে যাচ্ছিলো আমাদের কৈশোরের শেষ ও যৌবনের শুরুর সময়ে। সে আগুনের নদীর তীরে বসে পরস্পরের ডানা পুড়িয়ে একে অন্য-কে উত্তাপ যোগাতাম। তখন ভোরবেলা, খবরের কাগজ খুলতেই আট-দশটা তরুণের লাশ সশব্দে মাটিতে ঝরে পড়তো প্রতিদিন। ভয়, আর্তনাদ ও পুলিশের বুটের শব্দে পশ্চিমবঙ্গের প্রতিটি শহর ও গ্রাম কাঁপছে ।
একদিন সকালে এয়ারপোর্টের শিবমন্দিরের মাঠে দেখেছিলাম এক যুবকের মৃতদেহ, কপালে গুলির গর্ত, তার উপর ঘুরে ঘুরে একটা কাক ডাকছে। কা-কা-কমরেড। তারপর বাড়ি ফিরে বমি করেছি। সারাদিন জল পর্যন্ত খেতে পারিনি।
১৯৭১ সাল। ক্লাশ নাইনে প্রমোশন পেলাম। না, পরীক্ষা দিতে হয় নি। আসলে স্কুলে পরীক্ষা নেবার পরিস্থিতিই ছিলো না। তাই সকলেই প্রমোটেড টু নেকস্ট ক্লাশ। যেহেতু ক্লাশ নাইন থেকে স্থির করে নিতে হতো সাইন্স, কমার্স বা আর্টস যে কোনো একটা বিভাগে যেতে হবে তাই ক্লাশ এইটের ফাইনাল পরীক্ষা খুব শক্ত হতো। তা আমাদের তো পরীক্ষাই হয় নি। অতএব গার্জিয়ানেরা স্কুলে এসে যেমন চাইলেন স্কুল থেকে তেমন বিভাগেই ছাত্রদের ভর্তি করে নেওয়া হলো। আমার বাবা আমাকে কমার্সে ভর্তি করালেন।
এদিকে প্রতিবেশি দেশ তখনকার পূর্ব-পাকিস্তানে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। সেখানকার বাতাসেও বারুদের গন্ধ, মৃত্যুর গন্ধ, ভয়। লক্ষ লক্ষ শরণার্থী বর্ডার পেরিয়ে প্রাণ বাঁচাতে এদেশে চলে আসছেন প্রতিদিন। কেবল হিন্দুরা নয়, বাঙালি মুসলমানেরাও নিরাপদ নন পাকিস্তানি ফৌজের নির্মমতার কাছে। আমার যৌবনের শুরুটাই হয়েছিল এমন বীভৎসতায়। তাই তো ভালো লেখা, মধুর লেখা জীবনে আর লিখতে পারলাম না। নিজের বাঁকাচোরা, ভাঙা লেখার দিকে তাকিয়ে আপসোষ করেই কেটে গেল দিন।
এপারের মেধাবী ছাত্রেরা যেমন বিপ্লব করে ভারতীয় বুর্জোয়া শাসন ব্যবস্থাকে বদলাতে চাইছিলেন, ওপারের বুদ্ধিজীবিরাও জাতিসত্তা রক্ষার জন্য পাকিস্তান নামক সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছিলেন। ফলে দুই দেশেই বেছে বেছে মেধারীদের একে একে হত্যা করা হচ্ছিলো। একবার কোথাও লিখেছিলাম সত্তর দশকের পর বাঙালি মেধার স্বল্প যোগানের কারণ দুইপারের গণহারে মেধাবীদের সেই হত্যালীলা।
কী অদ্ভুত মিল! এপারে ভারতীয় সেন্ট্রাল রিজার্ভ পুলিশ সংক্ষেপে সি.আর.পি তারা বাংলা ভাষা জানে না। পশ্চিমবঙ্গে শহর-গ্রামের গলিঘুঁজি, মানুষজন কিছুই চেনে না। ওপারের পাকিস্তানি ফৌজ তাদেরও একই দশা। তারাও বাংলা জানে না। পূর্ববঙ্গের মানুষ, জায়গার কিছুই জানা নেই। তাদের সমস্যার সমাধানে সাহায্য চলে এলো বাঙালিদের থেকেই। এপারে খোচর, ওপারে রাজাকার, তারাই চেনালো রাস্তা। কাদের হত্যা করা দরকার বুঝিয়ে দিলো। আমি তখন ক্লাস নাইন, কমার্স নিয়ে পড়াশোনা শুরু করবো।
নতুন ক্লাস কেবল নয়, সাবজেক্টগুলিও নতুন। বুককিপিং, কমার্সিয়াল ম্যাথ, ইকোনমিক্স, বিজনেস এ্যাডমিনিস্ট্রেশান। এসবের বইগুলি একটাও ক্লাস এইট পর্যন্ত কিছুই আগে পড়া নেই। অতএব হাতে আসতেই খুব সিরিয়াস বোধ করতে শুরু করি। স্যারদের কাছ থেকে ভালো করে বুঝে নিতে হবে যাতে পরীক্ষার সময় ঠিকঠাক উত্তর লিখতে পারি। কনকবাবু স্যার সেবছরই আমাদের স্কুলে নতুন জয়েন করেছেন। শুনেছি তিনি চার্টাড এ্যাকাউন্টটেন্সি পড়া মাঝপথে ছেড়ে দিয়ে কেবল ভালো ছাত্র তৈরি করার জন্যে স্কুলের কম বেতনের চাকরি নিয়েছেন। কিশোর বয়সে এসব জেনে তার প্রতি একধরণের শ্রদ্ধা ও মুগ্ধতা আপনা আপনিই জন্ম নিয়েছিল। ক্লাসে তিনি যেভাবে ডেবিট-ক্রেডিট, ক্যাশবুক, ট্রায়াল ব্যালেন্স, ব্যালেন্সশিট বুঝিয়ে দিতেন তাতে আমি তাঁর অন্ধভক্ত হয়ে গিয়েছিলাম। আমি যে পরবর্তীকালে এ্যাকউন্টটেন্ট হিসাবে জীবিকা অর্জন করতে পেরেছি তার বীজ তিনি নিজ হাতে পুঁতে দিয়েছিলেন বলেই আজও মনে করি। যদিও খুবই স্বল্পকালই তাকে পাঠ্যপুস্তকের শিক্ষক হিসাবে পেয়েছিলাম।
যদিও প্রতিদিন খবরের কাগজ পড়ে জানতে পারছি সমগ্র পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে খুন-খারাপির রাজনীতি চলছে। পূর্ব-পাকিস্তান থেকেও খবর আসছে সেখানে সৈন্যরা বর্বরভাবে হত্যা করছে সাধারণ নাগরিকদের। তারপরেও আমার সদ্য তারুণ্যে পা-দেওয়া মন ভালোবাসা পেতে চাইছে, গান পেতে চাইছে, কবিতা পেতে চাইছে। হবে হয়তো এসব হরমোনের কারসাজি । কনকবাবু-স্যার কিন্তু রূপবান ছিলেন না। গায়ের রঙ ময়লা। গলার স্বর ফ্যাঁসফেঁসে। পোষাক আধ-ময়লা। এর যখন তিনি পড়াতেন, মনে হতো তিনি যেন রূপকথার বই থেকে বেরিয়ে এসেছেন এই রক্তমাংসময় একদলা সময়ে।
কিন্তু আমার কপালে এই একঝলক রোদ্রের সুখটুকুও বেশিদিন রইলো না। হঠাৎ একদিন স্কুলে গিয়ে দেখলাম ক্লাসের দেওয়ালে দেওয়ালে আলকাতরা দিয়ে লেখা নানা শ্লোগান মাও-সে-তুং-এর স্টেনসিন করা মুখের ছবি। লেখা- চিনের চেয়ারম্যান আমাদের চেয়ারম্যান। লেখা- সেদিনের আর বেশি দেরি নেই যেদিন বড়লোকের গায়ের চামড়া দিয়ে তৈরি হবে গরীবের জুতো। বলাবাহুল্য আমার সদ্য ডিম ভেঙে বেরিয়ে আসা রঙীন প্রজাপ্রতির মতো মন এসব পছন্দ করে নি।
কনকবাবু-স্যার এবার পড়ানো বন্ধ করে ক্লাসে সরাসরি নকশালপন্থার কথা বলা শুরু করলেন। বুর্জোয়া শিক্ষাব্যবস্থার পাঠ নিয়ে ভবিষ্যতে বুর্জোয়াই হয়ে উঠবে তোমরা। পরে জেনেছি আজ পার্টির নির্দেশেই তাঁর এই শিক্ষকতার চাকরি নেওয়া। এ পর্যন্ত তাও আমি মনে মনে সহ্য করছিলাম। কিন্তু যেদিন থেকে কোমলমতি ছাত্রদের নানাধরণের নাশকতা কিভাবে করতে হবে সে সব শেখাতে শুরু করলেন। যেমন সিনেমা হলের স্ক্রীনে চিনি ছুঁড়ে দেওয়া। বোমা বানাবার জন্য স্কুলের ল্যাবরেটরি থেকে মশলা চুরি করা এইসব বলতে থাকলেন, আমি আর চুপ থাকতে পারলাম না। বিশেষ করে যেদিন বললেন- সবাই একটা করে ভোজালি অন্তত সংগ্রহ করো। যদি কোনো কাউকে বুর্জোয়া বলে মনে হয় সে তোমার বাপ-দাদা- ভাই বা বন্ধুও হয় তাকে হত্যা করতে কুণ্ঠিত হবে না। এভাবেই ভারতবর্ষে বিপ্লব আসবে। রক্তক্ষয়ছাড়া বিপ্লব হয় না। আমি ক্লাসেই এসবের প্রতিবাদ করে উঠতে সহপাঠিরা হে হৈ করে আমাকে মারতে তেড়ে এলো। দু’একটা গাট্টাও কেউ কেউ মেরেছিলো ভিড়ের মধ্যে তা আজও মনে আছে। কনকবাবু-ই তাদের থামালেন, তারপর আমাকে ক্লাস থেকে বের করে দিলেন। বললেন- তার ক্লাস হলে আমি যেন না থাকি। পরে কোনো একদিন তিনি আমার সঙ্গে কথা বলবেন।
একা ক্লাশরুমে থেকে বেরিয়ে এলাম। তখনও গালে দাড়ি গজায় নি, অল্প অল্প রোম সবে দেখা দিচ্ছে। কিন্তু মনে হচ্ছিলো দেওয়ালের আলকাতরা দিয়ে লেখার কালি যেন আমার দুই গালে আমার সহপাঠিরাই লাগিয়ে দিয়েছে। তখন কতই বা বয়স আমার ১৩ বা ১৪ বছর হবে ।
দোতালা বিশাল বিল্ডিং জুড়ে আমাদের স্কুলের নানা শ্রেণীকক্ষে তখন বিভিন্ন ক্লাস চলছে। আমি একা করিডোর দিয়ে হেঁটে এসে একটা সিঁড়ির ধাপের উপর বসে আকাশ-পাতাল ভাবছি। মাথার পিছনে মাও-মে-তুং-এর স্টেনসিল করা আলকাতরার মুখ। এমন সময় আমাদের ইংরাজীর শিক্ষক গৌরীবাবু-স্যার কোনো কারণে সেখান দিয়ে যাচ্ছিলেন। আমাকে দেখে প্রশ্ন করতেই সব বললাম। তিনি বললেন- বাড়ি চলে যা! আমি দারোয়ান-কে বলে তোর ফেরার ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। আর কয়েকদিন স্কুলে আসিস না। পরে গার্জিয়ান-কে সঙ্গে করে হেডস্যারের সঙ্গে দেখা করে নিয়ে তেমন হলে অন্য স্কুলে ট্রান্সফার হয়ে যাস। পরিস্থিতি ভালো নয়।
বাড়ি ফিরে এলাম। স্কুলের ঘটনার কথা কাউকে বলি নি। তবে ভেবেছি স্কুলে যাবার পথে কনকবাবু-কে ধরে জানতে চাইবো উনি আমাকে কি বলতে চান? কিন্তু তা আর হয় নি। কয়েকদিন পরেই তিনি নৃশংসভাবে খুন হয়ে গেলেন। সমস্ত রাজনৈতিক হত্যাকান্ডের মতো তার মৃত্যুর জন্য কারা দায়ী সে রহস্য উন্মোচন আজও হয়নি। কিন্তু তারপর থেকে বুঝেছিলাম রাজনীতির ক্ষেত্র আমার মতো দূর্বলচিত্তের জন্যে নয়। আমার শিক্ষক, ছাত্রদরদী, একটু বেশি মাত্রায় স্বপ্ন দেখা যুবক স্যার-কে আমি মনে মনে এত ভালোবাসতাম? তার মৃত্যুর আগে বুঝতে পারি নি। কনকবাবু, আমাকে ক্ষমা করেছেন তো, স্যার?
