মানুষের নিরন্তর যাত্রা তার অন্তর্লোকের দিকে। স্মৃতি ও সত্তার মিলনেই অন্তর্লোকের নির্মাণ। স্মৃতিচারণ, বিশেষ করে জীবনের সুখস্মৃতি চারণ হলো অন্তরের গভীরে সঞ্চিত স্মৃতির বৃষ্টি জলে আরেকবার অবগাহন। আজ বসেছি আমার সেই সারল্যসুন্দর, স্নিগ্ধতা কোমল অনাবিল কৈশোরে যাপিত বিদ্যালয় এর স্মৃতির ভুবনের দিকে খানিকটা হলেও ফিরে তাকাতে। চট্টগ্রাম শহরের কেন্দ্রে অবস্থিত তৎকালীন অপর্ণাচরণ উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে পড়েছি মাধ্যমিক পর্যায়ে। বিদ্যালয়টি ১৯২৭-শে প্রতিষ্ঠিত। অদূর অতীতে এটি চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের অধীনে আসে। স্কুলটি তার একাডেমিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ঋদ্ধ ঐতিহ্য নিয়ে আজও সমান বহমান।
প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্নাতক ও স্নাতকোত্তর স্তরের সকল শিক্ষক আমার গভীর শ্রদ্ধার ও পরম আদরের, আমার জনক-জননী যেমন। শিক্ষকদের শ্রদ্ধার্ঘ্য দিই, এই বলে যে, তিনিও স্তন্য দেন, যিনি বিদ্যা দেন। তিনিও যশস্বী জনক, যাঁর মেধায় লালিত মানুষের মেধা ও মনন। আমার জীবন-জীবিকার সফলতার বীজতলা এই স্কুল। যতবার স্মৃতির ভেতর দিয়ে মনে মনে প্রত্যাবর্তন করি এই জগতে, দেখি এর আলো অম্লান, অক্ষয়।
দিদিমণিদের, মাস্টারমশাইদের বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান, সমাজ বিজ্ঞান ক্লাসগুলোতে শিক্ষকদের প্রাণস্পন্দন আমার বুকে প্রতিধ্বনিত হয়। দিদিমণি তো নয়, মাস্টারমশাই তো নয় যেন তারা উজ্জ্বল সব প্রদীপশিখা। তাঁদের প্রত্যেকের পাঠদান পদ্ধতি নিজস্বতায় ভাস্বর। দীপ্তি দিদিমণি ও যোগেন স্যারের ইংরেজিতে দক্ষতা, পাঠদান শৈলীর সৌন্দর্য ছাত্রীদের প্রতি গভীর আগ্রহ বা মনোযোগ সত্যিই সুশিক্ষকের পরিচয় বহন করে। আমি তাঁদের আন্তরিকতায় মুগ্ধ হয়ে থাকতাম, যতক্ষণ তাঁরা আমার ক্লাসে থাকতেন। সেই থেকে সম্ভবত শুরু আমার ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষক হবার ইচ্ছের উন্মীলন। দীপ্তি দিদিমণি এতটাই আন্তরিক ছিলেন যে, ছাত্রীদের কাছ থেকে পড়া আদায়ে তিনি মরিয়া হয়ে উঠতেন। আদায় করতে না পারলে শিক্ষক হিসেবে নিজেকে ব্যর্থ মনে করতেন এবং এই ব্যর্থতার জ্বালা সহ্য করতে হতো ছাত্রীদের। দিদিমণি তাদের বেণী ধরে ঝাকুনি দিতেন, কখনো ঠাস ঠাস ঠাস শব্দে প্রত্যেকের গালে একটা করে চড় বসিয়ে দিতেন। এই বিষয়ে দুর্বলতর মেয়েরা, মার খাওয়ার শঙ্কায় ম্রিয়মান থাকতো। বেঁচে গেলে স্রষ্টাকে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তাদের ক্লাস শেষ করতো। তখনকার সমাজে বাবা-মা ও শিক্ষকদের মধ্যে একটি ইংরেজি প্রবাদ প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল যে, spare the rod, spoil the child. বেতের বাড়ি না পড়লে যেন শিক্ষার্থীদের মস্তিষ্কের ক্ষেতে ফসল ফলে না। মনে হয় আমাদের দীপ্তিদির খুব প্রিয় ছিল এই উক্তিটি। তবে আমরা যারা ইংরেজিতে তুলনামূলক ভালো ছিলাম, আমরা এটার আওতামুক্ত ছিলাম।
মনে পড়ে শ্যামলাবরণ দীপ্তি চৌধুরী ছিলেন ডিঙি নৌকার মতন আঁটোসাঁটো ছিপছিপে গড়নের। সুবিন্যস্ত শাড়িতে পরিপাটি। তাঁর স্মার্ট হাঁটা দেখার মতন ছিল। কতখানি দাপুটে মানুষটি অতি সামান্য কোন মজার কথায়, কি দৃশ্য দেখে হেসে গড়িয়ে পড়তেন। দিদিমণিকে নিয়ে আমি একটি মজার স্মৃতিচারণ করার লোভ সামলাতে পারছি না। দিদিমণি বন্ধু-পরিজনদের অনুরোধে অল্প বিস্তর প্রাইভেট পড়াতেন তাঁর বাসায়। পড়া বলতে না পারায় একবার এক প্রাইভেট ছাত্রীর একটি কলাবেণী ধরে ঝাঁকাতে লাগলেন। মেয়েটির মনে হল যে, দিদিমণির ডান হাতে বেণীটি ছুটে চলে যাচ্ছে। সে মনে মনে উৎকণ্ঠিত হয়ে ভাবছিল, “হায় হায় বেণী যদি দিদিমনির হাতে থেকে যায় আমি শুধু একটি বেণী নিয়ে বাড়ি ফিরবো কেমন করে!” তখনই প্রতিজ্ঞা করল যে সে কোনদিন আর দুই বেণী করে স্কুলে বা প্রাইভেট পড়তে যাবে না, একটাই বাঁধবে শুধু। অন্যদিকে এই শিক্ষকই প্রাইভেটে ছাত্রীদের স্কুলের পড়া শেষ করার আগে যে সকল বাবা-মা বা অভিভাবক তাদের বিয়ের আয়োজন করতো, তাদের সাথে তিনি জোর আপত্তি তুলে ঝগড়া-বিবাদ করতেন। ছাত্রীদের ভালো রেজাল্টে আনন্দে-আবেগে তিনি অন্য এক মানুষ হয়ে উঠতেন। তাইতো এই ভয় সঞ্চারী দিদিমণিটি কালক্রমে ছাত্রীদের খুব প্রিয় হয়ে উঠেছিলেন। স্কুল থেকে বেরিয়ে যাবার সময়ে কিংবা পরবর্তীতে বাস্তব জীবনে ইংরেজি ভাষার প্রায়োগিক গুরুত্ব অনুধাবন করে মেয়েরা মর্মে মর্মে বুঝতে পারে যে, শিক্ষক শিক্ষার্থীদের কল্যাণেই কঠোর হন। উল্লেখ্য, স্কুলের পুনর্মিলনীতে বহু কন্ঠে উচ্চারিত হয়েছিল দীপ্তি দিদিমণির মারের মধুর স্মৃতি। মনে পড়ে যায় অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত এর বিখ্যাত কবিতা ছন্নছাড়া’র শেষ লাইনটি। “কঠোরের প্রচ্ছন্নে মাধুর্যের বিস্তীর্ণ আয়োজন”
দিদিমণি আজও বেঁচে আছেন। নবতিপর। থাকেন কলকাতায়। বছর কয়েক আগে আমার জীবনের এই জ্ঞানধেনুকে একবার গিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়ে এসেছি। দিদিমনি আজও তেমনই অপর্ণা চরণ স্কুল অন্তঃপ্রাণ হয়ে আছেন। আমাকে এতোটাই জড়িয়ে জড়িয়ে ছিলেন সেদিন স্মৃতিচারণে, আমি যেন তার বুকের মাঝের স্কুলটি হয়ে তাঁর কাছে দাঁড়িয়ে ছিলাম, যতক্ষণ ছিলাম।
পাঠদান রীতি কিংবা শিক্ষার্থীদের সাথে আচরণে সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থানে ছিলেন আমাদের আরেকজন অতি আদরের, পরম শ্রদ্ধার কল্যাণী দিদিমণি। গৌরকান্তি প্রিয়দর্শিনী কল্যাণী সেন। কোমলতার বরকন্যা। স্বাস্থ্যের সৌন্দর্যে, অবয়ব মাধুর্যে, বসন-ভূষনে উন্নত রুচিতে, নিয়ত স্মিতহাসি স্নিগ্ধ ব্যক্তিত্বের বিভায় তিনি ছাত্রীদের মাঝে মুগ্ধতা ছড়াতেন। তা দ্বিগুন বেড়ে গিয়েছিল বাংলা ক্লাসে তার সহজ সাবলীল পাঠ উপস্থাপনার মাঝে। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে তাঁর পঠন-পাঠনে ছিল গভীরতা। হয়তো এই কারণে ভাষাটির ব্যাকরণ বুঝিয়ে দেবার ক্ষেত্রে তিনি ছাত্রীদের মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারতেন। এভাবেই বকা-ঝকা না করে, চড়-থাপ্পর না মেরে তিনি ছাত্রীদের মন জয় করে নিয়েছিলেন। শুধু একটি ক্ষেত্রে তাঁর মৃদু অথচ গুরুত্বপূর্ণ কটুবাক্য শুনতে হতো বাংলা কম নম্বর পাওয়া কিংবা ফেল করা ছাত্রীদের। তিনি তাদের বলতেন, “লজ্জা লাগে না তোমাদের, বাঙালির সন্তান হয়ে তোমরা বাংলায় খারাপ করো?”
দিদিমণি বকা দিতেন না বলে আমরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় থাকতাম ক্লাসে তাঁর শুভ আগমনের জন্য। তাঁর সুপ্রসন্ন উপস্থিতি সত্যিই ভোলার মতন নয়। তবে একদিন হঠাৎ তিনি আমার একজন সহপাঠীর উপর রুষ্ট হয়েছিলেন। বললেন, “এক থাপ্পর দেবো তোমাকে।” পুরো ক্লাস থতমত খেয়ে উঠলো এবং অপেক্ষা করলো দিদিমণি কী করেন দেখতে। সত্যিই তিনি কি মেয়েটিকে মারবেন বা চড় দেবেন! দেখলাম ছুটে এসে তিনি মেয়েটির কপালের সামনের একগুছ চুল আলতো করে নেড়ে দিলেন। এতোটাই আলতো যে চুলগুলোই যেন অবাক হলো। সবাই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো। আহা, ভোলা কি যায়, শিক্ষক নামের সেই উদার সবুজ শস্য প্রান্তরকে?
কল্যাণীদিকে জড়িয়ে একটি স্মৃতি, একটি দৃশ্য আমার অন্তরে অক্ষয় আসন পেতেছে। শীতকালে মাঝে মাঝে দিদিমণি একটি নীল কাশ্মিরী শাল পরতেন। এমন দ্যুতিময়ী ফর্সা গায়ে একটি সুন্দর নীল রঙের বসন জড়ানো দেখে দেখে আমার মুগ্ধতা আর নিঃশেষ হোত না। আকাশ যেন তার নীলিমাটুকু দিদিমণির চাদরে বুনে দিয়েছিল। সপ্তম শ্রেণীর কক্ষে বসে দেখতাম কল্যাণীদি একটি নীলাকাশ জড়িয়ে নবম শ্রেণীর সামনের বারান্দা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন। নবম শ্রেণীতে যখন উঠলাম তখনও তিনি সেই চাদরটি মাঝে মাঝে পরে আসতেন এবং আমার হৃদয় ছুঁয়ে যেতেন। আসলে দিদিমণির অন্তরটাই আমি দেখতাম। শিক্ষক-শিক্ষার্থীর এখানেই যথার্থ সংযোগ।
শেষ করি ক’টি লাইন বলে–
কান্তিময়ী কল্যাণী সেন দিদিমণিরও কিছু অধিক।
আহা, আবার যদি ফিরে পেতাম আমার কৈশোর, আমার বয়ঃসন্ধি! আবার যদি এসেমব্লিতে, কি বাংলা ক্লাসে কি বারান্দায় দেখতে পেতাম মমতায় অন্তঃসলিলা কল্যাণীদিকে!
কল্যাণীদি দিদিমণিরও কিছু অধিক।
