আমার মা লুৎফুন্নেসা ওরফে খুকি ঢাকার রায়েরবাজার হাই স্কুলে শিক্ষকতা করতেন। প্রভাতী শাখার সময় খুব বেশি নয় , সকাল সাতটা থেকে দুপুর বারোটা পর্যন্ত। তবে তারপর শুরু হতো দজ্ঞযজ্ঞ। খাতা দেখা, প্রশ্ন করা, মিটিং । এসব করেও আম্মা রান্না করতো। মফস্বল থেকে আগত অতিথী সামলান, বাড়ির বড় মেয়ে হিসাবে নানা দায়িত্ব। আব্বা দার্শনিক মানুষ। বাংলাদেশ আণবিক ( বর্তমানে পরমাণু ) শক্তি কমিশনে চাকরি করে সন্ধ্যার সময়টা বন্ধুদের সাথে আড্ডায় কেটে যেত, বইপড়া আর নানা বিষয়ে আলোচনা করতো বন্ধু এবং জ্ঞানীজনদের সাথে । বাসায় অনেক আড্ডার চল ছিল। অগত্যা আমাদের পড়াশোনার ভার পড়লো একজন ব্যাংক কর্মকর্তার কাঁধে। আশির দশকে একজন চাকুরীজীবির পক্ষে বেতনের টাকা দিয়ে সংসার চালানো খুব কঠিন ছিল। আমাদের পড়ালেখার জন্য যিনি গৃহশিক্ষক হিসেবে নিয়োজিত হলেন তিনি আম্মার স্কুলের কলিগের চেনা-পরিচিত। তখন সম্ভবত ঊনিশশত বিরাশি সাল। আমি তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্রী, ছোট ভাই শেলী দ্বিতীয় শ্রেণীর ছাত্র। ঢাকার ধানমন্ডির কাকলি হাই স্কুলে পড়তাম। আমাদের গৃহ -শিক্ষক তার ব্যাংকের দায়িত্ব শেষ করে সন্ধ্যার দিকে শংকর জাফরাবাদের বাসায় আসতেন। তখন ছোট ছিলাম স্যারের নাম জানার চেষ্টা করি নি, যে কারণে আজও তার নাম অজানা রয়ে গেছে। তবে আমি খুব করিৎকর্মা, যে কোনো বিষয়ে তদন্ত শুরু করলে তার সুরাহা করে ছাড়ি। স্যারের নাম সংগ্রহ করে ফেলবো আশা করি। স্যার সন্ধ্যা বা বিকালে যখন বাসায় আসতেন তখন হয়তো আমরা বাসার সামনের উঠানে খেলতে থাকতাম বা পাড়া বেড়াতে ব্যস্ত থাকতাম। স্যার বাড়ির সদস্যদের মতো এসে কিছুটা সময় বিশ্রাম নিয়ে নাস্তা করতেন। তখনকার দিনে নাস্তা বলতে চা, বিস্কুট , মুড়ি অথবা নুডুলস, সুজি , সেমাই। ওই সময়ে ঢাকায় নতুন নতুন নুডলস খাবার চল হয়েছে। আমরা ধুমসে নুডুলস খেতাম। আম্মা ডিম, পেঁয়াজ , কাচামরিচ আর ছোট ছোট করে আলু কেটে তা দিয়ে নুডুলস করতো। মাঝে মাঝে টেস্টিং সল্ট দেয়া হতো। খুব ভালো লাগতো। এখনো মুখে সেই স্বাদ লেগে আছে। স্যারকেও নুডুলস দেয়া হতো।
স্যার আমাদের দু -ভাই বোনকে এক সাথে পড়াতেন। আব্বা আম কাঠ দিয়ে বড় একটা টেবিল বানিয়ে এনে বেডরুমে রাখলো। ডাইনিং টেবিলের চেয়ার দিয়েই পড়া চলতো । স্যার সব বিষয় পড়াতেন। তাকে আমরা ভয় পেতাম না বরং নানারকম গল্প করতাম। স্কুলে সারা দিন কি হতো তা বলতাম। স্যার আমাদের স্নেহ করতেন , কখনো বকা দিয়েছেন বলে মনে পড়ে না। স্কুলের ফলাফল দেখে উৎসাহ দিতেন। সারাদিনের অফিসের কাজের পর স্যার মাঝে মাঝে ক্লান্ত হয়ে পড়তেন।
আমরা টেলিভিশনে টারজান সিরিজ শুরু হলে অস্থির হয়ে যেতাম দেখার জন্য। এছাড়াও আরো কিছু অনুষ্ঠান দেখার জন্য মাথা খারাপ লাগতো। স্যার সেটা বুঝতেন, তিনি আমাদের সাথে নিয়ে ড্রইং রুমে গিয়ে টেলিভিশনে সেই অনুষ্ঠান দেখে আবার আমাদের পড়াতেন। মাঝে মাঝে আব্বার সাথে গল্প করতেন। বাড়িতে যেসব অতিথি আসতেন সবার সাথে স্যারের পরিচয় ছিল , দ্রুত ঘনিষ্ঠ হয়ে যেতেন। তখনকার দিনে একজন গৃহশিক্ষককে বাহিরের লোক হিসাবে দেখা হতো না। পরিবারের একজন সদস্যর মতো তিনি মিশে ছিলেন সবার সাথ , এটা তখনকার সময়ের রেওয়াজ ছিল। শিক্ষকতা পেশাকে সম্মান দেয়া হতো, তারা বাড়ির সন্তানদের শুধু লেখাপড়া শিখাতেন না একজন সৎ, ভালো মানুষ হিসাবে গড়ে তুলতে চেষ্টা করতেন। একবার টেলিভিশনের একটা ইংরেজি সিরিজ দেখার জন্য আমি আর আমার ভাই একটা বুদ্ধি বের করলাম। আমরা যে ঘরে পড়তাম সে ঘরের জানালা দিয়ে টেলিভিশন দেখা যেত। আমরা একটা আয়না ফিট করলাম জানালার সাথে। পড়ার সময় টেলিভিশন ছেড়ে জানালার সাথে লাগানো আয়নায় টেলিভিশন দেখতে লাগলাম। খুব ভালো করে দেখাও যায় না , শব্দও তেমন শোনা যায় না। তবু প্রাণপণ দেখার চেষ্টা। স্যার বিষয়টা খেয়াল করলেন। বললেন এভাবে লুকিয়ে কিছু না করে উনাকে আমরা বললেই পারতাম কি দেখতে চাই। এরপর থেকে আমাদের প্রিয় সব অনুষ্ঠান স্যার আমাদের নিয়ে দেখতেন। মাঝে মাঝে অনেক রাত হয়ে যেত। তখন আম্মা স্যারকে রাতের খাবার খাইয়ে দিতেন। বিশেষ কিছু নয় সাধারণ দল – ভাত , মাছ বা ঘরে যা থাকতো। তখন আমাদের ঘরে রেফ্রিজারেটর ছিল না। সেজন্য বাজার থেকে মাছ আনলে তা কেটে হলুদ -লবন দিয়ে জ্বাল দিয়ে রাখা হতো। কাঁচা শাক, সবজি তরকারি রান্নাঘরে ঝুড়িতে থাকতো। একবার আমাদের বাসায় যে মেয়েটি আম্মাকে কাজে সহজ করতো তাকে সন্দেহ করা হলো আমার খালার সোনার আংটি চুরি করেছে। এই ঘটনায় আমাদের বাড়িওয়ালার ছেলে গৃহকর্মীকে মারধর করে। আমি এবং আমার ভাই খুব কান্নাকাটি করি। মেয়েটিকে মাফ করে দিতে বলি। স্যার আমাদের কান্না দেখে এবং মেয়েটির প্রতি আমাদের অনুভূতি দেখে বিহ্বল হয়ে পড়েন। তিনি বাসার সবাইকে অনুরোধ করেন আমাদের অনুভূতিতে আঘাত না করতে। তিনি বলেন অল্পবয়সী কোমলমতি শিশুদের মনে মানুষ সম্পর্কে খারাপ ধারণা ঢুকিয়ে দেয়া খুব খারাপ, ফলাফল খারাপ হয়। স্যারের কথায় মেয়েটিকে ক্ষমা করে দেয়া হয়। এই ঘটনার পর স্যারের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা, ভালোবাসা বহুগুন বেড়ে যায়। অল্প বয়সে ঐরকম একজন মানবিক মানুষের সাহচার্য পেয়েছিলাম যা কোনোদিন ভোলার নয়। স্যার অনেক আর্থিক অসংগতির মধ্যে থাকতেন, মনে আছে সাদার মধ্যে হালকা নীল বিন্দুর মতো একটি শার্ট পরে আমাদের পড়াতে আসতেন। নতুন শার্ট পরতে দেখতাম বলে মনে পড়ে না। কিন্তু আমাদের কাছে তিনি নমস্য ছিলেন। বন্ধুর মতো ছিলেন আবার গুরুজনের মতো ছিলেন। এখনকার যান্ত্রিক পৃথিবীতে এমন সম্পর্কগুলো দিন দিন বিলীন হয়ে যাচ্ছে। টাকা পয়সা আর নিক্তি দিয়ে সব কিছু পরিমাপ করা হয়। স্যারকে হারিয়ে ফেলেছি , জানি না তিনি এখন কোথায় আছেন, কেমন আছেন। রায়েরবাজারের হাতেমবাগ লেনে ভাড়া থাকতেন। কলেজে পড়ার সময় একবার স্যারের বাসায় গিয়েছিলাম মনে পড়ে। হাজার ঘটনার মতো, হাজার মানুষের মতো তিনি স্মৃতি হয়ে আছেন কিন্তু তার ভেতর মানবিকতার যে পরিচয় পেয়েছিলাম আজ প্রায় চল্লিশ বছর পরও তা ভুলি নি। স্যার যেখানেই থাকুন , ভালো থাকুন।
