” শিক্ষক হলেন এমন একজন যিনি শিক্ষার্থীদের শুধুমাত্র পুঁথিগত বিদ্যা শেখান না, বরং জীবনের জটিল সত্যের পথও দেখান” – আমেরিকান নাট্যকার জর্জ বার্নার্ড শ এর এই উক্তিটি আমার খুব প্রিয়।
জীবনের এতগুলো দিন পেরিয়ে আসার পর হঠাৎ হঠাৎ যখন ভাবি এই পথ-চলাতে কতজনার কত উৎসাহ ছিল, প্রেরণা ছিল, অভয় ছিল!
আমার এই ক্ষুদ্র জীবনের পথচলাতে আমার শিক্ষকগণের ভূমিকা ছিল আকাশের মতো উদার। সেই প্রাইমারি স্কুল থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় জীবন পর্যন্ত আমার প্রিয় শিক্ষকদের সহযোগিতা, উৎসাহ, উদ্দীপনার কথা বলে শেষ করা যাবে না। আমার চিন্তা, চেতনা, মনোজগতের বিকাশের ক্ষেত্রে কত মানুষের কত ভূমিকা!
মানুষ হিসেবে নিজের মধ্যে যে নৈতিকতা ধারণ করে চলছি তার বীজ তো বুনে দিয়েছিলেন সেই শৈশবে আমার শিক্ষক মিলি আপা। মিলি আপাই তো বলেছিলেন, মানুষের রূপ ধরে থাকা সবাই আসলে মানুষ নয়। মানুষের পরিচয় হয় মনুষ্যত্ব দিয়ে৷ মানুষে মানুষে বিভাজন হবে শুধু নীতি নৈতিকতায়। ধর্ম, বর্ণ, অর্থ, বিত্ত দিয়ে মানুষের মূল্যায়ন হয় না। মিলি আপা আমাদের গল্প শোনাতেন। লিও টলস্টয়ের গল্প, ঈশপের গল্প…। সাথে শোনাতেন মোরালিটি। অনেক ছোট ছিলাম বলে হয়তো মিলি আপার সব কথার গভীরতা বুঝতাম না। কিন্তু মিলি আপার ভঙ্গির কারণে কথাগুলো শুনতে ভালো লাগতো।
আমার হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক বাবু সাধন চন্দ্র খাস্তগীর স্যার আমাদেরকে পড়ানোর ফাঁকে ফাঁকে উদাহরণস্বরূপ মানব জীবনের গল্প বলতেন। বলতেন, আজ আমরা যারা শ্রেণিকক্ষে আছি তারা অনেক সৌভাগ্যবান, কারণ আমাদের বয়সী অনেকেই এখন ভাগ্যের অসহায়ত্বে জীবিকার অন্বেষনে পথে পথে ঘুরছে।
আমাদের স্কুলে একটা পাঠাগার ছিল। সেই পাঠাগার থেকে প্রতি বৃহস্পতিবার একটা বই বাসায় আনার সুযোগ ছিল। আমরা কয়েকজন পাঠাগার থেকে বই আনতে যেতাম। সবাই আবার যেতো না। একবার আমি পদ্মা নদীর মাঝি বইটা আনতে গিয়েছিলাম। সেদিন খাস্তগীর স্যারের সাথে করিডোরে দেখা। স্যার আমার পাশের সহপাঠীর দিকে বললেন, তোমার হাত খালি কেন? তুমি বই নাওনি? ও বললো, স্যার, বই পড়ার চেয়ে নাটক – সিনেমা দেখতে বেশি ভালো লাগে। পদ্মা নদীর মাঝি তো সিনেমা হয়েছে। আমি সিনেমা দেখবো স্যার। খাস্তগীর স্যার বললেন, সিনেমা দেখবে তাতে সমস্যা নেই। কিন্তু বই পড়ার আনন্দ কি জানো, এই কুবের মাঝির চেহারাটা কেমন হবে, হোসেন মিয়ার ময়না দ্বীপ কেমন হবে, তুমি তোমার ইচ্ছা মতো ভাবতে পারবে। কিন্তু নাটক -সিনেমাতে ওরা যা দেখাবে তোমার চোখে তা-ই সেট হয়ে যাবে। মানে, তুমি তোমার মতো ভাবতে পারবে না।
বড় হওয়ার পর স্যারের এই কথাগুলোর সাথে আমি আমার ভাবনার সম্পৃক্ততা খুঁজে পাই। আসলেই তো, ভালো বই নিজেই তো এক আশ্চর্য বিস্ময়।
ইতালিয়ান সাংবাদিক ওরিয়ানা ফাল্লাচির লেখা বই “হাত বাড়িয়ে দাও” (আনু মুহাম্মদ এর অনুবাদে) পড়ে আমি কতবার কতভাবে ওই মায়ের মুখটি এঁকেছি আমার কল্পনায়!
হাসান আজিজুল হকের আগুনপাখি পড়ে পৌঢ়ার কথা কতবার মনে করেছি! তার একটা জীবন পরিক্রমায় নিজেকে সংযুক্ত করার এক চমৎকার মায়ায় জড়িয়ে গেছি।
জীবন যাপনের ব্যস্ততায় ইদানীং নিজের জন্য আলাদা করে সময় বের করা কঠিন। তবু যদি সময় পাই আমি ভীষণ ভাবে স্মৃতির কাছে নিজেকে সঁপে দিতে চাই। সেসব স্মৃতিতে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে স্কুলের মাঠে পিটি করার পরে জাতীয় সঙ্গীত করার সময় আমার স্কুলের সহকারী প্রধান শিক্ষিকা ফেরদৌসী আপার দুই তলার বারান্দা থেকে জোর গলায় উচ্চারণ মেয়েরা, তোমরা প্রাণ খুলে জাতীয় সঙ্গীত গাও। জাতীয় সঙ্গীত আমাদের প্রাণের গান। গানের বাণী মন দিয়ে উপলদ্ধি করো। তারপর নিজেই আমাদের সাথে গলা মেলাতেন।
মাঝে দেশের অস্থিতিশীল সময়টাতে আমার কেবল ফেরদৌসী আপার কথাটা মনে হতো। জাতীয় সঙ্গীত আমাদের প্রাণের গান। মা তোর মুখের বাণী লাগে সুধার মতো… কিংবা মা তোর বদনখানি মলিন হলে আমি নয়ন জলে ভাসি…
কলেজ জীবনে মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনতাম অধ্যাপক আনোয়ারা আলম ম্যাডামের বক্তৃতা। আমাদের সময়ে আমাদের কলেজের ভাইস প্রিন্সিপাল ছিলেন আনোয়ারা ম্যাডাম। কলেজের নবীন বরন সহ যে কোনো বড় আয়োজনে আনোয়ারা ম্যাডামের কথা শোনার জন্য মুখিয়ে থাকতাম আমরা। জীবন বোধের গল্প বলতেন ম্যাডাম। নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা নিংড়ে বলা গল্পগুলো আমাদের আকৃষ্ট করতো খুব।
পরবর্তী জীবনে আনোয়ারা ম্যাডামের সাথে আমার সম্পর্কটা হয়ে গেছে মা আর সন্তানের মতো। জীবনের অনেক কঠিন কঠিন সময়ে আন্টি মায়ের ভালোবাসা নিয়ে মাথায় হাত রেখেছেন, বুকে আগলে রেখেছেন। ছাত্রীদের যে কোনো প্রয়োজনে আন্টি ঢাল হয়ে পাশে থাকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন এখনো করছেন।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে ডঃ মাহবুবুল হক স্যারের কথা আলাদা করে বলতে হয়। স্যারের পিএইচডি গবেষণা কাজে প্রাথমিক পর্যায়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সাক্ষাৎকার নেওয়ার একটা দুর্লভ সুযোগ পেয়েছিলাম আমি। অস্ত্র হাতে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করার দেশের সেরা সন্তানদের সাথে আন্তরিক আড্ডার সুযোগ করে দেওয়া এবং মুক্তিযোদ্ধাদের নিজমুখে তাদের যুদ্ধদিনের লড়াইয়ের গল্প শুনতে কখনো শিহরণ জাগছিল, কখনো ভয়ে দম বন্ধ হয়ে আসছিল আবার কখনো চোখ ভেঙে কান্না চলে এসেছিল।
আমার ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক ডঃ আনোয়ার হোসেন স্যার, ডঃ সালমা বিনতে শফিক ম্যাডাম, ডঃ জাহিদুর রহমান স্যারের সাথেও ইতিহাস, ঐতিহ্য, দেশ, মাটি, মা বিষয়ক চিন্তা শেয়ারিং করার যে সুযোগ পেয়েছি, তাদের সাথে চিন্তাভাবনা বিনিময় করার মাধ্যমে। নিজের প্রতি নিজের আস্থা বেড়েছে অনেকখানি যে মানুষের মতো সুস্থ, সুন্দর এবং সত্যের সাথে সখ্য হওয়ার পথেই চলেছি হয়তো।
পথ তো দীর্ঘ। আমি সেই দীর্ঘ পথের সাথে কদমে কদম মিতালি করতে চাই…
