পৃথিবী অনেক বড়। অনেক মানুষের বাস। মানুষের মধ্যে যেমন মিল সৌহার্দের অন্বেষা, আবার অশান্তিও তো কম না। মানুষ চায় পরস্পর যোগাযোগ রক্ষা করে চলতে। আর এজন্য নানা মাধ্যম প্রয়োগ হয়েছে। সাধারণভাবে দীর্ঘসময় ধরে আত্মীয়-স্বজন, পরিচিতজন বা অন্যক্ষেত্র বিশেষে যোগাযোগের মাধ্যম ছিল চিঠিপত্র। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একগুচ্ছ চিঠি সাহিত্যে পরিণত হয়েছে। এরকম ঘটনা অনেক। পৃথিবীর অনেক বিখ্যাত বিখ্যাত মানুষ চিঠি লিখেছে। জহরলাল নেহরু, ইন্দ্রিরা গান্ধীর পত্রালাপ সাহিত্যের রূপ পেয়েছে। । রোজেনবার্গের পত্রগুচ্ছ আরো অনেকের কথাই বলা যাবে। নাজিম হিকমতের “কেলেখানার চিঠি’ স্পধারা আশরের চিঠি না হলেও কবিতা আকারে একটি অসাধারণ লেখা
আমাদের কালে অর্থাৎ ছাত্র শিক্ষকের কথাই যদি বলি তা হলে দেখা যাবে খ্যাতিমান শিক্ষকের সঙ্গে ছাত্রের পত্রের যোগাযোগ স্থাপন। এক্ষেত্রে আমি গর্বিত যে আমার সঙ্গে আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শিক্ষকের দীর্ঘদিন পত্রালাপ চলেছে। ড. মুস্তফা নূরউল ইসলাম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্সে আমাদের নাটক পড়াতেন, বিদ্যাসাগর পড়াতেন। তিনি আমার টিউটোরিয়ালেরও টিচার ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষে কলেজে অধ্যাপনায় যুক্ত হয়েছি। স্যার বিদেশে গিয়েছেন, স্বাধীনতার পর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে বেশ কিছুদিন ছিলেন। এরপর বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক। একটা সময়ে পেশাগত অবসর জীবন শেষ। স্যারের ইচ্ছে হলো নতুন করে একটা পত্রিকা প্রকাশ করবেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী ও মুস্তফা নূরউল ইসলাম যুক্তভাবে একটা অসাধারণ ভালো সাহিত্য পত্রিকা ‘পূর্বমেঘ’ প্রকাশ করতেন। নতুন পত্রিকা এককভাবে শুরু করলেন। এর নাম রাখলেন ‘সুন্দরম’। ‘সুন্দরম’ পত্রিকার সুবাদে স্যারের সঙ্গে আমার নতুন করে যোগাযোগ। মাঝে মাঝে পত্রালাপ হতো। পত্রিকা সম্পর্কে পাঠকের আগ্রহ, মতামত জানাতাম। স্যার চিঠি দিতেন নিয়মিত। অনেকগুলো চিঠির মধ্যে দু’টো চিঠির কথা উল্লেখ করছি।

স্নেহ বরেষু,
আকাশ প্রদীপ
৫২/৩ ইন্দিরা রোড, ৮.৩.৮৭
তোমার চিঠি পেয়ে ভারি খুশি হলাম। এখন বয়স হয়ে গেছে, স্বাভাবিক স্মৃতি শক্তি স্মিমিত হয়ে আসছে। কতো নিকট জনকে হঠাৎ করে খেয়াল করতে পারি না। নিজেরি লজ্জা লাগে। তুমি মনে করিয়ে দিয়েছ, এখন মনে পড়ছে। তুমি আমার কাছে পড়েছ, তুমি আমাদেরকে রংপুরে নিয়ে গিয়েছিলে। রংপুর খুব ভাল লেগেছিল। তা কেমন আছ? তোমার কল্যাণ কামনা করি। দেশটা দেখতে দেখতে কেমন হয়ে গেল? ক্লেদাক্ত পরিবেশ, দূষিত বায়ু, নষ্টকাল। আমাদেরও জীবনের আয়ু ফুরিয়ে আসছে। একটা শেষ চেষ্টা করতে চাই অবশ্য ক্ষুদ্র, সীমিত ক্ষমতায়। ‘সুন্দরম’ বার করেছি তেমনি এক তীব্র মনোভাব থেকে। অন্তত: এই প্রজন্মের জন্যে কিছু একটা যদি করা যায়। দ্যাখ রংপুরে তুমি কতটা কী করতে পার। গাইবান্ধার খন্দকার আজিজুল ইসলামের চিঠি এখনো পাইনি। কুড়িগ্রামের তপন কুমারের চিঠি পাইনি।
জাকারিয়াকে পত্রিকা পাঠাবার ব্যবস্থা করছি। সুন্দরম ১ম, ২য় সংখ্যা আমার কাছে আর নেই। ঢাকায় কাউকে চিঠি লিখতে পার তিনি নিউ মার্কেটে ‘নলেজ হোমে’ খোঁজ করে দেখতে পারেন।
মুস্তফা নূরউল ইসলাম
মূলত: সুন্দরমকে কেন্দ্র করেই চিঠি আদান প্রদান হতো। যদিও এখানে পত্রিকাটা পাঠকের কাছে পৌঁছানো এবং পত্রিকার দাম আদায়ের ব্যাপারটা মুখ্য মনে হলেও আমি স্যারের চিঠিতে আমার প্রতি তার স্নেহ, ভালোবাসা এবং বিশ্বাস খুঁজে পেতাম, আমি একান্তভাবে ধন্য হতাম।
মুস্তফা নূরউল ইসলাম
সম্পাদক সুন্দরম
আকাশ প্রদীপ ৫২/৩ ইন্দিরা রোড, ঢাকা-১২১৫ টেলিফোন ৩১৯৫৪৯ ৩.১১.৮৮

স্নেহ বরেষু,
সুন্দরম ৯৫ শীত সংখ্যা (৩য় বর্ষ, ২য় সংখ্যা) যথাসময়েই এ মাসের মাঝামাঝি বেরোচ্ছে। অধ্যাপক মোহাম্মদ জয়নুদ্দিন তাঁর ৮.১০.৮৮ তারিখের চিঠিতে শীত সংখ্যা থেকে তোমাকে ১৫ কপি করে পত্রিকা পাঠাতে লিখেছেন।
তোমার পূর্ববর্তী চিঠিতে ‘৯৪ গ্রীষ্ম-‘৯৫ গ্রীষ্ম সংখ্যা পর্যন্ত হিসাব পাঠিয়েছ। ইতিমধ্যে ‘৯৫ শরৎ সংখ্যা বিক্রি হয়ে থাকলে শরৎ পর্যন্তই হিসাবটা মিটিয়ে ফেলা ভাল। তাহলে ৬ সংখ্যার মোট ৬০ কপির দাম থেকে ২৫% হারে কমিশন বাদ দিয়ে এবং তোমার ইতিপূর্বে প্রেরিত [১৪৫/-+২০০/-+২০০/-] টাকা ৫৪৫/- adjust করে বাকি টাকাটা মানি অর্ডার করে পাঠিয়ে দিতে পার।
কুড়িগ্রামে সুন্দরম পাঠানোর ব্যবস্থা করা যায়নি। আমি চিঠি লিখেছিলাম। সম্ভব হলে তোমার ঘনিষ্ঠ পরিচিত কারোর মারফৎ ব্যবস্থাটা করে দিয়ো। গাইবান্ধায় এবং নীলফামারিতে অবশ্য হয়েছে। কল্যাণ কামনা করি।
মুস্তফা নূরউল ইসলাম
একটা সময় চিঠি পাওয়ার আলাদা একটা আনন্দ ছিল। পত্রমিতালি ছিল। পত্র প্রাপ্তির জন্য ডাকপিয়নের আগমনের অপেক্ষায় দিনগনা, পথের দিকে তাকিয়ে থাকা। এখন এবং আগামীতে আমরা বহুভাবে যন্ত্রের ভিতরে আটকা পড়বো। আমাদের অনেক কিছু, অনেক হারিয়ে ফেলবো।
