কালবৈশাখীর কবলে ★ রাজু নূরুল

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তখন শান্তিনিকেতনে ভীষণ ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। যেহেতু বাংলা ১৩১৮ সালের কথা, মানে তার মাত্র নয়-দশ বছর আগে শান্তিনিকেতনের গোড়াপত্তন হয়েছে, ফলে বিশাল কর্মযজ্ঞ সামলাতে হচ্ছে কবিকে। সঙ্গে সাঙ্গপাঙ্গেরও নিশ্চয় অভাব ছিল না! অত বড় কর্মযজ্ঞ সামলানো তো সহজ কাজ নয়; ফলে এদিকটা সামলে উঠলে ওদিকটায় ভুল হয়ে যায়। ওরকম একদিনে তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, সন্ধ্যায় মন্দিরে সব কর্মী যখন জড়ো হবে, তাদের উদ্দেশে কিছু কথা বলবেন।

সেদিন আর সেই ”কিছু কথা” তিনি বলতে পেরেছিলেন কি না জানা যায় না। কারণ, “এমন সময় দেখতে দেখতে উত্তর-পশ্চিমে ঘনঘোর মেঘ করে এসে সূর্যাস্তের রক্ত আভাকে বিলুপ্ত করে দিলে। মাঠের পরপারে দেখা গেল যুদ্ধক্ষেত্রের অশ্বারোহী দূতের মতো ধুলার ধ্বজা উড়িয়ে বাতাস উন্মত্তভাবে ছুটে আসছে। আমাদের আশ্রমের শালতরুর শ্রেণী এবং তালবনের শিখরের উপর একটা কোলাহল জেগে উঠল, তার পরে দেখতে দেখতে আমবাগানের সমস্ত ডালে ডালে আন্দোলন পড়ে গেল, পাতায় পাতায় মাতামাতির কলমর্মরে ভরে গেল—ঘনধারায় বৃষ্টি নেমে এল।”

ঠিকই ধরেছেন, কবি কালবৈশাখীর কথা বলছেন। সেদিন বিকেলে শান্তিনিকেতনে হঠাৎ করে কালবৈশাখী হানা দিয়েছিল। শুধু ওইটুকুই নয়, সঙ্গে ছিল বিদ্যুতের চমক, বাতাসের দমকের সঙ্গে তীব্র বর্ষণ। রবীন্দ্রনাথ তার বর্ণনা দিচ্ছেন এভাবে, “তারপর থেকে এই চকিত বিদ্যুতের সঙ্গে থেকে থেকে মেঘের গর্জন, বাতাসের বেগ এবং অবিরল বর্ষণ চলেছে। মেঘাচ্ছন্ন সন্ধ্যার অন্ধকার ক্রমে নিবিড় হয়ে এসেছে। আজ যে-সব কথা বলবার প্রয়োজন আছে মনে করে এসেছিলুম সে-সব কথা কোথায় যে চলে গিয়েছে তার ঠিকানা নেই।”

যাক, আমাদের আর সন্দেহ রইল না যে, সেদিন রবীন্দ্রনাথও কালবৈশাখীর স্রোতের সঙ্গে নিজেকে ভাসিয়ে দিয়েছিলেন। কর্মীদের উদ্দেশ্যে যা বলতে চেয়েছিলেন, তার আর কিছুই বলা হলোনা।

গ্রীষ্মের দহন যখন ধীরে ধীরে মাটি ও মানুষের শরীরে জমে ওঠে, তখনই বাংলার প্রকৃতি নীরবে প্রস্তুতি নিতে থাকে কালবৈশাখীর জন্য। কালবৈশাখী শুরু হওয়ার আগের মাসগুলোতে প্রকৃতিতে এক ধরনের ধীর কিন্তু স্পষ্ট রূপান্তর দেখা যায়। শীতের বিদায় আর বর্ষার আগমনের মাঝামাঝি এই সময়টাকে বাংলার ঋতুচক্রে এক অদ্ভুত উত্তেজনার সময় বলা যায়। সাধারণত চৈত্রের শেষ ও বৈশাখের শুরুর দিকেই এই পরিবর্তন সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে।

প্রথমেই বদলে যায় তাপমাত্রা। দিনের বেলায় রোদ ক্রমশ তীব্র হতে থাকে, মাটির আর্দ্রতা কমে যায়, বাতাস শুষ্ক হয়ে ওঠে। দুপুরগুলো ভারী ও দমবন্ধ লাগতে শুরু করে। গাছের পাতায় ধুলোর আস্তরণ পড়ে, ছোট খাল-বিল ও পুকুরের পানি কমতে থাকে। মাঠের মাটি ফেটে চৌচির হয়ে যায় অনেক জায়গায়।

এই সময় প্রকৃতিতে এক ধরনের দ্বৈত চিত্র দেখা যায়। একদিকে গাছপালা শুকিয়ে যেতে থাকে, অন্যদিকে কিছু গাছ নতুন করে ফুলে-ফলে ভরে ওঠে। শিমুল, পলাশ, কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়া তাদের আগুনরঙা ফুলে প্রকৃতিকে রাঙিয়ে তোলে। আমগাছে মুকুল আসে, বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে মিষ্টি গন্ধ। গাছে গাছে কাঁঠালের শরীর বাড়তে থাকে, আমের আঁটি বড় হয়। প্রকৃতি একইসঙ্গে ক্লান্ত ও উর্বর—দুই রূপেই হাজির হয়।

কালবৈশাখীর আগে প্রকৃতির চরিত্র সেই সন্ধ্যায় রবীন্দ্রনাথের বর্ণনায় খানিকটা পাওয়া যায়। “দীর্ঘকাল অনাবৃষ্টির খরতাপে চারিদিকের মাঠ শুষ্ক হয়ে দগ্ধ হয়ে গিয়েছিল, জল আমাদের ইঁদারার তলায় এসে ঠেকেছিল, আশ্রমের ধেনুদল ব্যাকুল হয়ে উঠছিল। স্নান ও পানের জলের কিরকম ব্যবস্থা করা হবে সেজন্যে আমরা নানা ভাবনা ভাবছিলুম; মনে হচ্ছিল যেন এই কঠোর শুষ্কতার দিনের আর কোনোমতেই অবসান হবে না।”

কিন্তু সেই শুষ্কতার অবসান হয়, যার প্রথম চিহ্ন দেখা যায় আকাশে। দিনের শেষে উত্তর বা উত্তর-পশ্চিম আকাশে ধীরে ধীরে কালো মেঘ জমতে শুরু করে। দূরে বিদ্যুৎ চমকায়, তীব্র গরম কাটিয়ে হঠাৎ দমকা বাতাস বইতে থাকে। বাতাসে ধুলোর ঘূর্ণি ওঠে, তালগাছ বা বাঁশঝাড় দুলতে থাকে। অনেক সময় ঝড় নামার আগে চারপাশে এক ধরনের অস্বাভাবিক নীরবতা নেমে আসে।

ছোটবেলায় বন্ধুদের সঙ্গে ফুটবল খেলার সময় কালবৈশাখীর কবলে পড়ার কথা মনে পড়ে যায়। চৈত্রের খরতাপে দিঘি শুকিয়ে উপরের দিকে চরের মতো জায়গা তৈরি হয়েছে, সেখানে ফুটবল খেলছি। এমন সময় কথা নেই বার্তা নেই, উত্তর আকাশ ঘন কালো হয়ে এলো। এ যেনো “নীল নবঘনে আষাঢ় গগনে তিল ঠাঁই আর নাহিরে।” অথবা আমি ধূর্জটি, আমি এলোকেশে ঝড় অকালবৈশাখীর’ হয়ে খোদ নজরুল ইসলাম এসে হাজির হয়েছেন।

আমরা নিশ্চিত যে প্রকৃতিতে তখনও দিনের অনেকটা বাকি। হঠাৎ উত্তর দিক থেকে শোঁ শোঁ শব্দ শোনা যেত। আমরা কান পেতে বোঝার চেষ্টা করতাম কোথা থেকে শব্দ ভেসে আসছে। এরই মধ্যে মায়ের ডাক আসত—“দ্রুত বাড়ি ফিরে আয়।” তারপর এক দৌড়ে মায়ের পিছুপিছু বাড়ি।

মা ব্যস্ত হয়ে পড়তেন তার সংসার সামলাতে। ঝড়ের মধ্যে উঠানের এ মাথা থেকে ও মাথা দৌড়াচ্ছেন মা। হাঁসের ছানাগুলো ঘরে ফিরেছে কি না, মুরগির বাচ্চাগুলো যে ভিজে একাকার হয়ে গেল! বাছুরটা এখনো ফিরল না কেন? গোয়াল ঘরের দরজাটা কি আটকানো হয়েছে? কাছারিঘরের জানালা বন্ধ না করলে যে বাতাসে সব এলোমেলো হয়ে যাবে! মা ততক্ষণে ভিজে একাকার হয়ে গেলেও আমাদের ঘরের চৌকাঠ মাড়ানো বারণ। ততক্ষণে ঝড় থেমে গেছে, শুরু হয়েছে অঝোর ধারায় বৃষ্টি। আমরা দরজার ফাঁক দিয়ে, জানালার কপাট অল্প একটু ফাঁক করে ঝড়ের তান্ডব আব বৃষ্টি দেখতাম।

ঝড় সামলাতে মায়ের এই নাজেহালের কথা মনে পড়লে অমল হোমের স্মৃতিতে শান্তিনিকেতনের এক বিকেলে রবীন্দ্রনাথ কীভাবে কালবৈশাখীর কবলে পড়েছিলেন, সে কথা মনে পড়ে যায়। “বৈকালিক চা পান সবে শেষ হয়েছে, এমন সময় ঘোর কালবৈশাখী মেঘে ছেয়ে গেল আকাশ। দিগদিগন্ত ধুলোয় ঢেকে ছুটে এল ঝড়। দেখি, সেই ঝড়ের মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথ ছুটে আসছেন—তাঁর বেশবাস, তাঁর শ্মশ্রুকেশ উড়ছে, জোব্বাটা চেপে ধরেছেন বাঁ হাতে, আর ডান হাতে চেপে ধরেছেন চোখের চশমাটা। আরেকটু এগিয়ে আসতেই শুনতে পেলাম গলা ছেড়ে তিনি গাইছেন, ‘যেতে যেতে একলা পথে নিবেছে মোর বাতি।’ বারান্দাতে উঠে দিনেন্দ্রনাথকে তাঁর এই সদ্য লেখা গানটি ধরিয়ে দিলেন। তারপর নামল বৃষ্টি মুষলধারে। কবির কণ্ঠে সেদিন গানের বান ডেকেছিল।”

ঝড়ে রবীন্দ্রনাথের নাজেহালের দৃশ্যের কথা ভেবে ঠোঁটের কোনো যে একটু হাসি জমে ওঠেনা, সেকথা স্বীকার না করলে মিথ্যে বলা হবে। আবার মনের মধ্যে এটুকুও উঁকি দেয় যে, আমরা কি ছোটবেলায় কালবৈশাখীর কবলে পড়ে কখনো গান ধরেছিলাম? নাহ্! ওরকম স্মৃতি মনে পড়ে না। তবে বড়বেলায় এসে ঠিক ওরকম অনুভূতি হয়েছে কয়েকবার; সে কথায় পরে আসছি। তার চেয়ে বরং ঝড়ের কবলে পড়ার গল্পে ফিরে যাই।

ছোটবেলায় কালবৈশাখী ঝড়ের কবলে বহুবার পড়েছি। সব দিন কি আর ঠিকঠাক বাড়ি ফেরা যেত? কোনো কোনোদিন পথেই আটকা পড়তাম। আশ্রয় নিতাম বিরাট কোনো গাছের নিচে কিংবা কারো ঘরের কার্নিশের ছায়ায়, কিংবা কোনো ছোট্ট খুপড়ি দোকানে। মাঝেমধ্যে মনে হতো, দোকানঘরের ছাউনি বোধহয় উপড়ে গেল। গ্রামে বড় হওয়ার এই ছিল মজা।

ঘরের বাইরে, মায়ের আশ্রয়ের বাইরে ঝড়ের কবলে পড়লে কী অবস্থা হয়, সেটি বোধহয় সাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক বেশ গুছিয়ে বলেছেন। তিনি লিখেছেন, “একবার আমি বড় চাচার সাইকেল নিয়ে বাড়িতে ফিরছি। কমপক্ষে আড়াই মাইল দীর্ঘ একটা মাঠ পেরোতে হবে। একটা গ্রাম থেকে আরেকটা গ্রাম, মাঝখানে কিছু নেই। এই মাঠের মাঝখানে যখন এসেছি—রাস্তায় গ্রীষ্মকালে জমির ধান বয়ে বয়ে গরুর গাড়ি নানা রকম রাস্তা তৈরি করে ফেলেছে। ওই রাস্তা ধরে সাইকেল চালাতে বেশ মজাই লাগত। যখন আমি আসছি, মাঝামাঝি যখন এসে পড়েছি, তখন দেখছি পূর্বদিক থেকে একটা ঝড় আসছে। আমি শুধু ভাবছি, সাইকেলটা চালিয়ে নিয়ে সামনের গ্রামটার মধ্যে কোনো রকম ঢুকতে পারলে জানে বেঁচে যাব।”

“হঠাৎ বাতাস আমাকে এমন কাবু করে ফেলল, প্যাডেল করার আর দরকার হচ্ছে না। মনে হচ্ছে সাইকেলটা উড়ছে। তখন প্যাডেল করা বন্ধ করে দিয়ে সাইকেলটাকে কন্ট্রোল করতে আমি হ্যান্ডেল দুটো চেপে ধরে আছি, তা না হলে সাইকেলসহ আমাকে উড়িয়ে নেবে। গ্রামে ঢুকতে পারলাম না, তার আগেই বৃষ্টি নামল। সামনেই একটা বড় গাছের নিচে আশ্রয় নিলাম। রাত হয়ে গেছে। বাড়ি ফিরতে হবে। সাইকেল নিয়ে ফেরা মুশকিল। এঁটেল মাটির রাস্তার কাদায় সাইকেল অচল হয়ে গেল। সাইকেলটা রাস্তার পাশে রেখেই বাড়ি চলে এলাম। পরের দিন গিয়ে দেখি, আমার যেমন সাইকেল তেমনই পড়ে আছে। এ রকম কিছু অভিজ্ঞতা আমার আছে। এখন আর তেমন করে কালবৈশাখী দেখি না।”

কালবৈশাখীর শুধু রূপ নয়, তান্ডবের কথাও মনে পড়ে। ওরকম একদিনের গল্প মনে করা যাক। তখন কলেজে পড়ি। তিন সপ্তাহ পরপর মেস থেকে একবার বাড়ি যেতাম। ওরকমই একবার বাড়ি ফিরে দেখি, গ্রামের এক মাথা থেকে আরেক মাথা পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে। গাছগুলোর শরীরে আর পাতার চিহ্ন নেই, শুধু নগ্ন কাণ্ড দাঁড়িয়ে আছে। কোনো কোনো গাছ মাঝখান থেকে ছিঁড়ে কয়েক টুকরো হয়ে পড়ে আছে। কারও ঘরের চাল উড়ে গেছে, মাঠের ধান কাদার সঙ্গে মিশে একাকার। বড় বড় শিলাবৃষ্টিতে টিনের চালে অসংখ্য গর্ত। কালবৈশাখীর তাণ্ডবের পরে মানুষের সেই দুঃখভরা মুখগুলো এখনো চোখে ভাসে। সবার মনে একটাই প্রশ্ন, এবছর তারা ভাত পাবে কোথায়? খাবে কি?

তবে কালবৈশাখী শব্দটা মনে এলে প্রথমেই ঝড়ের কথা মনে এলেও, ঝড়ের আগে যে আকাশ ঘন অন্ধকার হয়ে আসে, আকাশ থেকে গোঙানির যে শব্দটা ভেসে আসে, সেটা ভীতিকর। এরপর নেমে আসে অঝোর ধারার বৃষ্টি। প্রকৃতিতে জমে থাকা সমস্ত ক্লেদ ধুয়ে-মুছে সাফ করে দেওয়ার মতো বৃষ্টি। সেদিন ঝড়ের পরে যখন প্রবল বৃষ্টি এসে দুকূল ভাসিয়ে দিয়ে গেল, সেটিও রবীন্দ্রনাথের চোখ এড়ায়নি। “এমন সময় এক সন্ধ্যার মধ্যেই নীল স্নিগ্ধ মেঘ আকাশ ছেয়ে ছড়িয়ে পড়ল; দেখতে দেখতে জলে একেবারে চারি দিক ভেসে গেল। ক্রমে ক্রমে নয়, ক্ষণে ক্ষণে নয়, চিন্তা করে নয়, চেষ্টা করে নয়—পূর্ণতার আবির্ভাব একেবারে অবারিত দ্বার দিয়ে প্রবেশ করে অনায়াসে সমস্ত অধিকার করে নিলে।”

বহুদিনের পরে আসা ঝড় এবং প্রশান্তির বৃষ্টি আমাদের প্রাণে যে শীতলতার পরশ বুলিয়ে দিয়ে যায়, সেটি বুঝতে পারতাম। এক্ষেত্রে বড় হয়ে যাওয়ার পর ঢাকার কালবৈশাখীর স্মৃতি মনে পড়ে।

কাজের সূত্রে বহু বছর ঢাকার বনানীতে যাতায়াত করেছি আমি। শহরে এ অংশে বড়বড় দালানকোঠা, রাস্তায় গাড়ি ভিড়। এরকম চৈত্রের শেষ বা বৈশাখের বিকালে হঠাৎ করে গোটা শহরটা অন্ধকারে ঢেকে যেত। অথচ দুপুর অব্দি বাইরে কী ঝলমলে রোদ ছিল! কিন্তু কথা নেই বার্তা নেই, দুপুর গড়াতেই ঘনঘোর অন্ধকার। যেন পৃথিবীতে রাত নেমে এসেছে। আমার হুট করে ভয় লাগত এই ভেবে যে, এই অন্ধকার বুঝি আর কখনো শেষ হবে না। আজই বুঝি পৃথিবীর শেষ দিন। মনে হতো, এই পৃথিবীতে আলো আর ফিরে আসবে না। মোহিতলাল মজুমদারের “কালবৈশাখী” কবিতার চরণের মতো—

“মধ্যদিনের রক্ত নয়ন অন্ধ করিল কে!
ধরণির ’পরে বিরাট ছায়ার ছত্র ধরিল কে!
কানন-আনন পাণ্ডুর করি
জলস্থলের নিশ্বাস হরি
আলয়ে-কুলায়ে তন্দ্রা ভুলায়ে গগন ভরিল কে!”

তখনই শুরু হতো ঝড়। মনে আছে, আমি অফিসকক্ষের জানালা খুলে দিতাম। আমার কক্ষের দিকটা ঝড়ের উল্টো দিকে হওয়ায় বাতাসের ঝাপটা এসে ঘরে ঢুকত না বটে, কিন্তু রাস্তায় ধুলোর উড়াউড়ি দেখতাম। আর দেখতাম রিকশা, সাইকেল, মানুষের হুড়োহুড়ি। কোথাও আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা।

একসময় ঝড় থেমে যেত। তারপর শুরু হতো বৃষ্টি। একনাগাড়ে দীর্ঘক্ষণ বৃষ্টি। বৃষ্টির সঙ্গে সঙ্গে যেন আকাশের গায়ে জমে থাকা কালো অভিমান নেমে আসত পৃথিবীতে। ধীরে ধীরে অন্ধকার কেটে যেত। পৃথিবীটা আবার আলোয় ভরে উঠত। এখানেও মোহিতলাল মজুমমদারের কবিতার লাইন স্মরণ করা যেতে পারে: “নেমে আসে যেন বাঁধ-ভাঙা জল, ম্লান হয়ে আসে মেঘকজ্জল, আলোকের মুখে কালো যবনিকা এতখনে হল ছিন্ন।”

কিন্তু ততক্ষণে বৈশাখের কোমল বৃষ্টির অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ত সারা শরীরে। সে অনুভূতির প্রকাশের ভাষা পেতাম না। তার চেয়ে বরং রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকেই ধার নেওয়া যাক। “এই পরিপূর্ণতার প্রকাশ যে কেমন—সে যে কী বাধাহীন, কী প্রচুর, কী মধুর, কী গম্ভীর—সে আজ এই বৈশাখের দিবাবসানে সহসা দেখতে পেয়ে আমাদের সমস্ত মন আনন্দে গান গেয়ে উঠেছে। আজ অন্তরে বাহিরে এই পরিপূর্ণতারই সে অভ্যর্থনা করছে। আজ আর কিছু নয়, আজ মনকে সম্পূর্ণ নিস্তব্ধ করে পেতে দিই তাঁর কাছে। আজ অন্তরের অন্তরতম গভীরতার মধ্যে অনুভব করি সেখানটি ধীরে ধীরে ভরে উঠছে। বারিধারা ঝরছে ঝরছে—সমস্ত ধুয়ে যাচ্ছে, স্নিগ্ধ হয়ে যাচ্ছে; সমস্ত নবীন হয়ে উঠছে, শ্যামল হয়ে উঠছে। বাইরে কেউ দেখতে পাচ্ছে না, বাইরে সমস্ত মেঘাবৃত, সমস্ত নিবিড় অন্ধকার, তারই মধ্যে নেমে আসছে তাঁর নিঃশব্দচরণ দূতগুলি, ভরে ভরে নিয়ে আসছে তাঁরই সুধাপাত্র।”

সেদিন অফিস থেকে বাড়ি ফেরাটাও অন্যরকম হতো। বেরুতে বেরুতে সন্ধ্যা হয়ে আসত। রাস্তায় গাড়ির জট কম। ঝড়ের বৃষ্টির কবলে পড়ে ফুটপাত ফাঁকা হয়ে গেছে। আগে আগে বাড়ি ফিরে গেছে সবাই। গাড়ির জানালা নামিয়ে রাখতাম। ধুয়ে-মুছে সাফ হয়ে আসা ঢাকার বাতাসে কোমল গন্ধ। সে বাতাসে শরীর জুড়িয়ে যেত। এ যেন—“আজি ঝড়ের রাতে তোমার অভিসার, পরাণসখা বন্ধু আমার।”

কালবৈশাখী তো শুধু ঝড় নয়। ঝড়ের সঙ্গে সঙ্গে এ দেশে নেমে আসে বৈশাখ। বৈশাখ মানেই নতুন বছর, পান্তা-ইলিশ, নতুন জামা, হালখাতা, পাড়ায় পাড়ায় উৎসব, এখানে-সেখানে মেলা। আমাদের ছোটবেলায় বৈশাখ মানে আমের মুকুল বড় হয়ে গেছে, এবার আর কাঁচা আমের কষে মুখ পুড়ে যাবে না। বৈশাখ এলে মা নানা রকম ফলের বিচি ভেজে রাখতেন, আমরা গোল হয়ে খেতে বসতাম। নানা ফলের এসব বিচি ভেজে খাওয়া হলো বলে সারা বছর ফোঁড়া-পাঁচড়া থেকে আর ভয় নেই। যাক, বাঁচা গেল বাবা।

কিন্তু আজকাল বৈশাখ পালন নিয়েও কত কথা, কত মতভেদ। “মঙ্গল” বলব নাকি “শুভ” বলব, হালখাতায় গান বাজানো যাবে কি না, পান্তা-ইলিশ এ দেশের সংস্কৃতি কি না—আরও কত কী! সাথে উৎসব আর ধর্মকে এক করে দেখার কুতর্ক তো রয়েছেই। কিন্তু তাই বলে বৈশাখ কি এ দেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে? নাকি নেবে কখনো? বৈশাখ কি সাথে করে প্রবল ঝড়, উত্তরাকাশে কালোঘন মেঘ, প্রবল বর্ষণকে সাথে নিয়ে আসবেনা? ফলে গীতিকবি মারজুক রাসেলের এই কথাটি আমার বেশ লাগে: “আপনি পালন না-করলেও বৈশাখ নিজেই পালিত হবে। হাওয়া দেবে, ঝড় দেবে, গরম দেবে, তরমুজ দেবে, বাঙ্গি দেবে। আপনার আরবি, ফার্সি, উর্দু, ইংলিশ ইত্যাদি নামের অর্থও আপনি বাংলায়ই খুঁজবেন। নানান জায়গায় তো লিখবেনই; পাসপোর্টে লিখবেন—জন্মসূত্রে বাংলাদেশি।”

আর বাংলাদেশ থেকে কালবৈশাখী যে সহজে হারিয়ে যাবে না, সেটি তো হলফ করে বলা যেতেই পারে।

জাহাঙ্গীরনগরে পড়াকালীন সময়ের একটি গল্প মনে করে কালবৈশাখের কবল থেকে আপাতত বিদায় নেয়া যাক। ওরকম এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি কোনো একদিন হবে। তারিখটা ঠিক মনে নেই। আমরা সপ্তাহব্যাপী সাংস্কৃতিক উৎসব করলাম। এর মধ্যে একদিন সংগীতশিল্পী বারী সিদ্দিকী এলেন। সন্ধ্যার দিকে মুক্তমঞ্চে এই গুণী শিল্পীকে সম্মাননা জানানো হলো।

এরপর তিনি ধীরে-সুস্থে মঞ্চে উপবিষ্ট হলেন। একের পর এক গান ধরছেন। কখনো গান ছেড়ে সুর তুলছেন বাঁশিতে। গোটা মুক্তমঞ্চ এবং সেই বাঁশির সুর যত দূর যাচ্ছে, ততদূর এক অশরীরি মুহূর্ত তৈরি হচ্ছে।

কথা নেই বার্তা নেই, এমন সময় হুড়মুড় করে ঝড় এল। বছরের প্রথম বৃষ্টি। মুক্তমঞ্চের প্যান্ডেল কাঁপছে, দূর থেকে ধুলোবালি এসে জড়ো হচ্ছে গ্যালারিতে। তখনও বারী সিদ্দিকী গাইছেন—“আমার গায়ে যত দুঃখ সয়, বন্ধুয়ারে করো তোমার মনে যাহা লয়…” তাঁর বাঁশির সুর ওঠানামা করছে, সৃষ্টি করছে এক অপূর্ব দ্যোতনা; তার সঙ্গে ঝড়, বৃষ্টি, গ্যালারিভর্তি মানুষ—কেউ একচুল নড়ছে না।

এমন কালবৈশাখী, এমন দৃশ্য পৃথিবীর আর কোথাও হয় বলে আমার জানা নেই।

মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না। আবশ্যক ঘরগুলো * দিয়ে চিহ্নিত করা হয়েছে