ওয়াসা মোড় দিয়ে পশ্চিমে হাইলেভেল রোড শেষে একবার ডানে ঘুরে বামে মোড় নিলে সরু একটা গলি- তার নাম বাঘঘোনা। বাটালি হিল রেঞ্জের মধ্যেই পড়ে এটা। এরপর আরো সরু গলি , একে খান পাহাড়ি স্টেট । নগরের মধ্যে ছোট্ট এই নিসর্গের ছোঁয়া পেতে আমি প্রায়শই আমার স্কুটিটা নিয়ে ঘরে ফিরি আমবাগান পাহাড়তলি হয়ে। এভাবেই একদিন ফিরছিলাম , হঠাৎ শীতের আমেজ গায়ে লাগতেই, নস্টালজিক এক অনুভূতি গ্রাস করল। অনেকটা পথ আসার পর মনে পড়ল এই সরু সড়কের স্মৃতিগুলো।
সময়টা নব্বইয়ের শেষদিকের কথা। আমরা তখন স্কুল শেষে কলেজের দিকে এগুচ্ছি। একটু সাহিত্য প্রীতি থাকার কারণে বাংলা বইয়ের সব গল্প কবিতা পড়ে ফেলতাম। এমনকি পরবর্তী ক্লাসের বাংলা বইটা জোগাড় করে একটু একটু পড়া শুরু করে দিতাম। এভাবে আটানব্বই সালে উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তি হয়েই বাংলা বইটা আঁকড়ে ধরলাম কেননা আমি ছিলাম বিজ্ঞানের দুর্বলতম ছাত্র। সে বইটার প্রতিটা গদ্য এবং কবিতার আলোচনা ও শব্দার্থ টীকা এতটা সুলিখিত ছিল যে আজ অব্দি সে বইটা কেউ অতিক্রম করতে পারে নি। সে বইয়ের সম্পদনায় ছিলেন ড. মাহবুবুল হক। তৎকালীন সহকারী অধ্যাপক, বাংলা বিভা্ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। উচ্চ মাধ্যমিকে বিজ্ঞান থেকে অত্যন্ত খারাপ রেজাল্ট নিয়ে নানা চরাই উতরাই পেরিয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে ভর্তি হই। ক্লাস শুরুর অনেক আগেই ডিপার্টমেন্ট দেখতে গেলাম কেবল ড. মাহবুবুল হকের কক্ষ কোনটা দেখব বলে। স্যার তখন ৩ জনের একটা রুমে বসতেন। যদিও উনাকে তখনো দেখি নি। ২০০১ সালের ফেব্রুয়ারির ১০ তারিখ ছিল আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ক্লাস। প্রথম ক্লাসের স্যারকে দেখে আমি অবাক , কালো ব্লেজার গায়ে দিয়ে হালকা চুলের একজন সুদর্শন শিক্ষক , বয়স পঞ্চাশের সামান্য এদিক ওদিক হবে। কী শান্ত তার ব্যবহার, প্রতিটা ছাত্রদের নাম ধাম জিজ্ঞাসা করলেন। যেমন একজনের বাড়ি গাইবান্ধা, আরেকজনের টাইটেল গোস্বামী এভাবে মজা করতে লাগলেন। আমাকে বললেন তোমার নাম কী? আমার নামে ভূঁইয়া আছে শুনে বললেন তুমি কি বাংলার বারো ভূঁইয়াদের একজন? এভাবে জ্ঞানদীপ্ত কথাবার্তার এক পর্যায়ে বললেন তোমাদের উচ্চ মাধ্যমিক বইটা আমার করা ছিল! আমি ত অবাক এই সেই মাহবুব স্যার? ছোট শহর থেকে এসেছি বলে হয়তো বিস্ময়টা বেশি ছিল, এমন একজন লেখককে সামনাসামনি দেখছি!!
এরপর তিনি আমাদের বানান পড়ানোর দায়িত্ব নিলেন। এখনো সে জ্ঞান বেঁচেই খাই। তবে অল্প দিনেই জানতে পারলাম তাঁর কালচারাল একটিভিটির সাথে সম্পৃক্ততা। এক সময় ছাত্র ইউনিয়ন করতেন , রুশ সাম্রাজ্যে ছিলেন অনেক দিন। আমি ত একেবারে তাঁর পেছনে লেগে থাকতাম, ক্লাস থাকুক না থাকুক উনার রুমে চলে যেতাম, কী নিয়ে কথা বলব ভেবে পেতাম না। একসময় কলেজ লাইফে আমি ছিলাম আবৃত্তিকর্মী। সুকান্তের প্রিয়তমেষু ছিল আমার প্রিয় কবিতা, প্রায় মুখস্ত পারতাম। একদিন বললাম স্যার এটার অর্থ আমি ভাল বুঝি না। উনি মুহূর্তেই খাতা কলম নিয়ে দেখলাম বিশ্ব মানচিত্র আঁকা শুরু করলেন- তার ভেতর থেকে কমিনিজম অধ্যষিত এলাকাগুলো মার্ক করলেন । এবং চমতকারভাবে আমাকে দেখালেন সুকান্তের ঘরের ফেরার আকুতি আসলে কী! কেন নিজেকে সে দরিদ্র বাতিওয়ালার সাথে তুলনা করলেন। আমার জীবনে কেউ এমন করে কোন কবিতা বুঝাতে পারে নি। আমিও পারি নি কাউকে । এবং সেদিন বুঝেছিলাম শিক্ষা বা জ্ঞান আসলে পারস্পরিক সম্পর্ক বা প্রশ্নোত্তর ছাড়া বিকশিত হয় না। আমার পেশাগত জীবনে অনেক প্রতীক্ষা করেও এমন একজন ছাত্র পাই নি যাকে আমি এভাবে ছবি এঁকে কবিতা বুঝাতে পারব। সেদিন থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হবার স্বপ্ন আসে মাথায় , আলমারি ভর্তি বই জোগালাম , পড়ার অভ্যাস বাড়ালাম। শিক্ষক হয়েছি বটে তবে অত্যন্ত নিম্ন মানের ছাত্রদের পড়াতে হয় আবার সময়টাও বদলে গেছে অনেক! কয়েক বছর আগেও ছাত্ররা অমিত্রাক্ষর ছন্দ কিংবা সনেটের অক্ষর গণনার বিষয়টি উপভোগ করত এখন এসব পড়ালে কেমন যেন ওদের হাসি পায়। আমি যেন এক অন্ধকার প্রজন্মের আগমন দেখতে পাচ্ছি।
এভাবে স্যারের বাসায় যাওয়া আসা শুরু হয়। পরীক্ষায় রেজাল্ট খারাপ করেও স্যারকেই বিচার দিতাম! স্যার এতটা সহনশীল ছিলেন সব কিছু মন দিয়ে শুনতেন। আমাদের পরামর্শ দিতেন কীভাবে ইতিবাচকভাবে বিষয়টা নিতে হয়। এভাবে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনটা শেষ হল নানান স্মৃতিতে , দুঃখে , হতাশায়। প্রতিটা ঘটনা স্যারের সাথে শেয়ার না করলে অপুর্ণতা থেকে যেত। একসময় আমরা যেভাবে ব্যক্তিগত সুখ দুঃখ নিয়ে বাবা মায়ের কাছ থেকে দূরে সরে যাই তেমনি স্যারের কাছ থেকেও দূরে সরে গেলাম। একটা ঘটনা মনে পড়ছে খুব সিম্পল – একবার স্যারের বাসায় গেলাম । স্যার কথা বলার এক ফাঁকে আমার জন্য চা নিয়ে এলেন নিজের হাতে বানাতে বানাতে। এসে বললেন তোমার ভাবি বাসায় নেই, আজ কোন রকম খেয়ে নাও চা টা। আমি ত বিস্মিত অধ্যাপক মাহবুবুল হক আমার জন্য নিজ হাতে চা বানাচ্ছেন সেটা যেমনই হোক আমার কাছে অমৃত। আসলে ঘটনাটা মনে রাখার মতই। জীবনে প্রথমবার আমি চা খেলাম চিনি ও দুধ ছাড়া। কাপে এক চামচ পাতা তার উপর গরম পানি নাড়তে নাড়তে আমাকে দিলেন । তীব্র তেঁতো হলেও আমি টের পেলাম চা য়ের একটা নিজস্ব স্বাদ আছে। দুধ আর চিনি সেটা কেড়ে নেয়। আশ্চর্য জনক হলেও সত্যি সেদিনের পর থেকে আমি স্যারের মতই চা বানিয়ে খাই। এটা না খেলে আমার চলে না। তবে অন্য চাও খাই তবে এটা আমার সাধারণ অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। নো চিনি নো দুধ! আমরা হয়তো এভাবেই বেঁচে থাকি অন্যদের হয়ে।
ফটোগ্রাফি শুরু করার পর বহুদিন পরিকল্পনা করেছিলাম স্যারের কিছু পোর্ট্রেট তুলব। কী আজব তোলাই হল না, শুধু প্ল্যান আর প্ল্যান! একসময় ৫০ মিলিমিটার প্রাইম লেন্সটা কেনার পর চূড়ান্ত পরিকল্পনা- এবার নিশ্চিত যাব। শুনতে পেলাম স্যার অসুস্থ, একদিন স্যারের মেয়েকে ম্যাসেঞ্জারে বললাম, স্যারকে দেখতে গেলে বিরক্ত হবেন কি না? উনি আস্বস্ত করলেন , ‘বাবা যদিও অসুস্থ তবে পুরাতন ছাত্রদের দেখলে খুশি হন।‘ তবুও গেলাম না, কোন এক অজ্ঞাত কারণে। একদিন একজন ফেসবুকে গুজব ছড়ালেন স্যার নাকি মারা গেছেন!! সে নিয়ে এক আবেগ ঘন স্ট্যাটাস দিয়ে পরে সত্যটা জেনে মুছে ফেললাম, অনেকে হাসাহাসি করল। তারপরও গেলাম না ছবি তুলতে! কী অদ্ভুত ভূতুরে ব্যাপার । আগ্রহ ছিল প্রবল অথচ তা করে দেখানোর সুযোগ দিল না নিয়তি। স্যার যখন সত্যি সত্যি প্রয়াত হলেন তখন আমি বাকরুদ্ধ!! কী বলব কী দিয়ে অনুশোচনা ঢাকব!!
তাই বাগঘোনা আমার কাছে এক অস্বস্তি, অপরাধবোধ ও নস্টালজিক এলাকা যদিও আমি এসব অনুভূতিকে বাঁচিয়ে রাখতে সুযোগ পেলেই স্কুটিটা ঘুরিয়ে ঘরে ফিরি ওখান দিয়ে।
