কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার শিক্ষকজীবনে স্মৃতির ভার ও ভর এতটাই, আমার আজন্ম লালিত শিক্ষা সম্পর্কিত ধারণাকে ওলটপালট করে দিয়েছে এই বিশ্ববিদ্যালয়। ভালোমানষী, দাপুটে শিক্ষকতা নীতিনৈতিকতায় কঠোর থাকা যে বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে পরিবর্তিত পশ্চিমবঙ্গে, ভাবিনি কখনো। অতি দ্রুত ছাত্র-প্রিয় অধ্যাপক হয়ে ওঠা, গড় মাপের অধ্যাপকদের মাঝে অধিক-পাঠের ঔজ্জ্বল্য, মনীষা, বহু স্বনামধন্য সাহিত্য সংস্কৃতির ব্যক্তিত্বের সান্নিধ্য, বহু স্বনামধন্য সাহিত্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও যোগাযোগ ইত্যাদি প্রভৃতি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে স্বল্প সময়ের মধ্যেই আলাদা গুরুত্ব পেয়ে যাওয়াই ছিল আমার একিলিসের গোড়ালি। অনেকেই আমাকে মুসকিল আসানের মাধ্যম ধরে নিয়ে ছিলেন। মুখে প্রশংসা ও শ্রদ্ধা দেখালেও ভেতরে ভেতরে অনেকেই হিংসা করতেন, তাঁরা চাইতেন আমার প্রভাব প্রতিপত্তির পতন হোক। আমার ভ্রান্তি সাহিত্য সংস্কৃতি চর্চা ছাড়িয়ে প্রশাসনিক পরিসরে ঢুকে যাওয়া। এত সর্বব্যপ্ত দুর্নীতি অসহনীয় হয়ে পড়েছিল আমার কাছে।
নতুন বিশ্ববিদ্যালয়, নতুন বাংলা বিভাগ, তাকে সঠিক তাৎপর্যে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে, প্রতিষ্ঠিত করতে হবে বিভাগের মর্যাদা— এটাই ছিল আমাদের সমবেত লক্ষ্যে। সবাই কি ডেডিকেটেড ছিলেন? মনে হয়, না। আমি কিন্তু বিভাগের উন্নয়নে মনপ্রাণ ঢেলেই কাজ করেছিলাম। যে বিষয়টি অন্য অধ্যাপকরা পড়াতে চাইছেন না, সেটাই আমি পড়িয়েছি। পড়াতে ভালোবাসি, ছাত্রছাত্রীদের সংসর্গে থাকলে মন ভালো থাকে, নিজের ঘাটতিগুলো বুঝে নিতে পারি। কোনো কোনো মাসে ৫০/৬০-টা ক্লাশ নিলেও ক্লান্তি অনুভব করিনি, বরং উজ্জীবিত হয়েছি। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা আসে আসানসোল, আসানসোলের আশেপাশের এলাকা থেকে, কিছু বাঁকুড়া পুরুলিয়া বীরভূম হুগলি জেলা থেকে। সবাই প্রায় গ্রামগঞ্জের। ট্রেনে বাসে ডেলি প্যাসেঞ্জারি, কেউ কেউ মেসে থাকে, কেউ ঘর ভাড়া নিয়ে নিজেরাই রান্না করে পড়াশোনা করে। অর্থাৎ ছাত্রছাত্রীদের অধিকাংশই নিম্নবিত্ত পরিবারের সদস্য। তাদের কলেজ পড়াশোনা মফস্বলের কোনো কলেজে, পর্যাপ্ত পরিকাঠামো হয়ত নেই সে কলেজে, সিলেবাসের বাইরে কোনো লেখাই পড়েনি, সিলেবাসের বাইরে কোনো লেখক কবির নামটাও হয়তো শোনেনি। কলেজের শিক্ষকও সিলেবাসের বাইরে হয়তো কিছু বলেননি। প্রায় সকলেই কেবলমাত্র নোটভিত্তিক পড়াশুনায় অনার্স পাশ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে। এই সমস্ত অতি মাঝারি মাপের ছাত্রদের সাহিত্যের প্রকৃত সমঝদার বানানো অতি নয়, অতীব কঠিন। আমি ওদের সাহিত্যের পাঠ দিতে চেয়েছিলাম। সাহিত্যকে এদের কাছে প্রিয় করে তুলতে চেয়েছিলাম। এদের সাহিত্য মনস্ক করে তোলার একটিই পন্থা বলে আমার মনে হয়েছিল বই থেকে কবিতা গল্প উপন্যাস প্রবন্ধ পড়ানোর আগে রক্তমাংসের কবি গল্পকার ঔপন্যাসিক প্রাবন্ধিককে তাদের সামনে নিয়ে আসা। কল্লোল যুগের লেখক প্রেমেন্দ্র মিত্র থেকে সাম্প্রতিক সময়ের লেখক কবিদের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও যোগাযোগ ছিল, নিজে লেখালেখি করি বলে, সম্পাদনার সঙ্গে যুক্ত ছিলাম বলে, কমলকুমার মজুমদারের ওপর গবেষণা করেছি বলে। প্রেমেন্দ্র মিত্র, অন্নদাশঙ্কর রায়, সুভাষ মুখোপাধ্যায় থেকে একালের হেন লেখক কবিটি নেই যার সঙ্গে আমার পরিচয় ছিল না। তাঁদের কথা যখন বলতাম, ছাত্ররা মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনতো, লেখকদের কবিদের কথা বলতে বলতে কখন যে সিলেবাসের লেখাটিতে ঢুকে গেছি ওরা বুঝতেই পারতো না। আমি জানতাম, ছাত্ররা আমার লেকচার মোবাইলে রেকর্ড করে রাখত। কখনো বারণ করিনি। একদিন এক ছাত্র নিজেই বললো, স্যার আপনার বক্তৃতাগুলো হারিয়ে যাবে, এগুলো মহামূল্যবান সম্পদ, তাই আমরা রেকর্ড করে রেখে দিয়েছি। আপনার অনুমতি ছাড়াই রেকর্ড করেছি, জানি আপনি রাগ করবেন না। বললাম, শোনা, কী লেকচার দিই।
একটু শুনিয়েছিল এক ছাত্র।
ক্লাশে কখনো গম্ভীর হয়ে লেকচার দিইনি, মজার মজার অভিজ্ঞতার কথা বলতাম। বহুঘাটের জল খাওয়া জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে তাদের স্তরে নেমেই, তাদের বোধ ও বোধিকে, তাদের কৌতুহলকে জাগ্রত করতে এটাই হবে প্রকৃষ্ট পন্থা উপলব্ধি করেছিলাম। অধ্যাপক মশাইকে নেমে আসতেই হবে ছাত্রদের সমতলে, তা না হলে, বিদ্যা দানের আউটকাম হবে পরীক্ষায় পাশ করা। সহজ সরল ছেলেমেয়েগুলি বড়ো বড়ো চোখ দিয়ে তাকাতো, বড়ো নৈকট্য অনুভব করতাম ওদের সারল্যে। বন্ধুর উষ্ণতায় তাদের কাছে জটিল সাহিত্য তত্ত্ব জটিল মনোবিকলন তাত্ত্বিক উপন্যাস, আধুনিক কবিতা, আধুনিক প্রবন্ধ, আধুনিক গল্প উপন্যাসকে যথাসাধ্য জলবৎ করতে পেরেছিলাম ওই বন্ধুত্বের কারণেই। আমার ক্লাশে অমনোযোগী ছাত্র আমি দেখিনি, বুঝতে পারেনি এমন কোনো ছাত্রও আমি পাইনি, ভরভরন্ত ক্লাশরুম, খুব অসুবিধা অথবা অসুস্থতা ছাড়া প্রায় সকলেই উপস্থিত থাকতো আমার ক্লাশে। সেটা শুধু পড়ানোর গুণে নয় সম্ভবত। ব্যক্তি আমিও তো কিছুটা কারণ নিশ্চিত। তারা নির্ভয়ে নির্দ্ধিধায় বলতে পারতো তাদের ঘাটতি, তাদের দুর্বলতা, তাদের অসুবিধা, একান্ত ব্যক্তিগত সমস্যার কথাও। তারা এতটাই অন্তরঙ্গ হয়ে উঠেছিল, টিফিন আওয়ারে আমাকে না খাইয়ে নিজেরা টিফিন খেতো না কোনোদিন। সবিস্ময়ে লক্ষ্য করেছি, কোনো কাজে হয়তো ব্যস্ত আছি, হয়তো একটু ক্যাম্পাসের বাইরে গেছি, হয়তো মিটিং-এ আছি, তারা টিফিন না খেয়ে অপেক্ষা করেছে আমার জন্য। আমি যত কাজেই ব্যস্ত থাকি, তাদের আনা টিফিনের এক চামচ খেয়ে আসতে হোতই, কেবলমাত্র তাদের উপোষী না রাখার জন্য। ছাত্ররা আমাকে ভীষণ ভালোবাসতো। এখনো তারা আমাকে ফোন করে, বিয়েতে নেমতন্ন করে, তাদের সন্তানদের ফটো পাঠায়, ভিডিও পাঠায়। ছাত্রছাত্রীদের এই ধরনের আন্তরিক ভালোবাসা কিন্তু সমস্যাও সৃষ্টি করেছে অনেক সময়।
ব্যক্তিগত পরিসরে ছাত্রদের বেশ কিছু অসমাধানযোগ্য সমস্যা থাকে বিশ্ববিদ্যালয় পাঠকালে। এই সমস্ত সমস্যাগুলি তাদের জীবনশৃঙ্খলাকে চুরমার করে দিতে পারে। একজন অধ্যাপক যদি অভিভাবকতুল্য মমতায় তাদের পরিসরে ঢুকে যেতে পারেন, তাদের জীবনধারাটাই বদলে যায়। এমনি অনেক সমস্যার সমাধান করতে হয়েছে আমাকে। একটি দুটি উদাহরণ দিই :
একদিন ক্লাশের শেষে রুহিদা খাতুন আমার পিছু পিছু এসে জানালো, আমার এমএ পাশ করা হলো না স্যার।
—কেন? টাকার প্রবলেম?
—না স্যার।
তারপর সে জানালো, তার প্রেমিক বলেছে হয় বিয়ে করে নাও, নয়তো এমএ পড়ো। এখানেই প্রেমের ইতি।
গরিব মেয়েটির যাবতীয় খরচ দেয় তার চাকুরে-প্রেমিক। প্রেমিকের বাড়িতে কাজের খুব অসুবিধা, তার মা অসুস্থ। তাঁকে দেখাশুনো করার কেউ নেই। মাত্র একটি সেমেস্টার দিলেই মেয়েটি রেগুলার পরীক্ষার্থী হিসেবে এমএ পাশ করে যাবে। বললাম, তোর হবু-বরের সঙ্গে কথা বলতে পারি?
—লাভ হবেনা, খুব জেদি। আপনার কথা শুনবে না স্যার। আপনি অপমানিত হবেন, সেটা আমি সহ্য করতে পারব না।
বললাম, আমার সম্মান এত ঠুনকো নয়, দে ফোন নম্বর। ফোন করলাম। তাকে বোঝালাম, মাত্র কটা মাস, ম্যানেজ করা যায় না?
ছেলেটি আমার কথা শুনলো। মেয়েটি এমএ পরীক্ষা দিয়েই বিয়ের পিঁড়িতে বসেছিল।
সে-মেয়ে কয়েক মাস আগে ফোন করেছিল, স্যার, আমরা এখন আপনার জেলায়, রঘুনাথপুরে। ছেলেটি সাব ডিভিশনাল অফিসার। রুহিদার একটি মেয়ে হয়েছে। মেয়ের ভিডিও পাঠিয়েছিল।
আর একটি ছাত্রী, শিখা রায়, জানালো, তার বাড়িতে বিয়ের চাপ দিচ্ছে প্রচণ্ড। ইউনিভার্সিটি আসতে দেবে না আর। তার প্রেমিককে শিখার বাবা মেনে নিতে চাননা। মা-মরা মেয়েটি, টুপটুপ করে চোখের জল ফেলে।
—তোর বাবার সঙ্গে কথা বলবো?
—লাভ হবেনা স্যার। আপনি অপমানিত হবেন।
একটু অপমানিতই হবে না হয়, দে ফোন নম্বর। কথা বলেছিলাম। তার বাবা মনে হয় আমার কথা শুনেছিলেন। শিখা রেগুলার বিশ্ববিদ্যালয় আসতো। তবুও আশঙ্কা ছিল এ জুটিকে আর এক দেখতে পাবো না। নিজে তো প্রেমে সফল হইনি, মনেপ্রাণে চাইছিলাম ওদের প্রেম সফল হোক, বছর কয়েক আগে ওদের বিয়ের ছবি দেখে, আনন্দে মনটা নেচে উঠলো। পৃথিবীর সব প্রেম সার্থক হোক, সফল হোক, সুন্দর হোক।
শম্পা ঘোষ, বিবাহিত, সপ্তাহে তিন চারদিন ক্লাশ করতো, বসতো একেবারে পেছনের সিটে, ঠিক দরজার সামনে। আড়াইটার সময় ক্লাশ থেকে চলে যেতো কোনোভাবে, লুকিয়ে। সবদিন সম্ভব হতো না ক্লাশছুট হওয়া। একদিন বিকেল চারটের সময় একান্তে শম্পা মোবাইলে কথা বলছে আর কাঁদছে। দুচোখে দরদর করে জল গড়াচ্ছে।
—কি হলো, শম্পা?
জবাব না দিয়ে শম্পা ফোনটা আমার হাতে ধরিয়ে দিলো। ফোনে একটি কচি বাচ্চার ক্রমাগত মা মা বলে কান্নার স্বর।
বললাম, চলে যা। কিন্তু পার্সেন্টেজ না পেলে তো পরীক্ষায় বসতে পাবি না।
বড়ো অসহায় চোখে তাকালো।
—তাহলে স্যার কাল থেকে আর ইউনিভার্সিটি আসবোনা। পড়াশোনা ছেড়ে দিচ্ছি।
এক মুহূর্ত থমকে গিয়ে বললাম, ভালো রেজাল্ট করে দেখাতে পারবি তো? যাতে পরীক্ষায় বসতে পারিস, পার্সেন্টেজ যাতে বাধা না হয়ে ওঠে, তার ব্যবস্থা করছি।
শম্পা সেবছর প্রথম শ্রেণীতে তৃতীয় হয়েছিল। ছাত্রছাত্রীদের পুত্র কন্যা জ্ঞানে দেখতে হয়,
শিখেছিলাম আমার অধ্যাপক সুমিতা চক্রবর্তীর কাছে। তিনি বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন বলে কলকাতা থেকে আসা অধ্যাপকদের মতো অহেতুক গাম্ভীর্য ও দূরত্ব বজায় রাখতেন না। ছাত্রদের সঙ্গে বন্ধুর মতো মিশে যেতেন। কত সমস্যা তাঁর হস্তক্ষেপে সমাধা হয়েছে। আমি তো বটেই, কত ছাত্র তাঁর আর্থিক সহায়তায় পড়াশোনাটা চালিয়ে যেতে পেরেছি। সুমিতাদির আদর্শে আমিও আমার সাধ্যমতো আর্থিক কারণে পড়া-আটকে-যাবে ছাত্রদের পাশে দাঁড়িয়েছি।
তাহলে তো আমার সকল ছাত্রের শ্রদ্ধা পাওয়ারই কথা। না পেতে পারি না। এই যুগে ক্ষমতার কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়া, উচ্চাকাঙ্ক্ষীরা, একমাত্র ক্ষমতাবানকেই যথাবিহিত সম্মান শ্রদ্ধা ইত্যাদি ইত্যাদি প্রদশর্ন করে থাকে, যতদিন না তার উদ্দেশ্য চরিতার্থ হচ্ছে। আমরা একটা নির্ভেজাল আদর্শহীনতার আদর্শ প্রতিষ্ঠা করে চলেছি প্রতিনিয়ত—আদর্শ আর মূল্যবোধের কতটুকু মূল্য থাকে সামনে বিকট চেহারায় অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ দাঁড়িয়ে থাকলে? কি যাতনা বেকারত্বের বিষে, ভুক্তভোগী ছাড়া কে বুঝবে? অধ্যাপনা সম্ভবত সবচেয়ে অভিশপ্ত জীবিকা, যার উৎপাদন কেবল উচ্চশিক্ষিত বেকার তৈরি করা।
কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ শুরু হয়েছিল বড়ো দারিদ্র্যে, কিন্তু বড়ো প্রেম ছিল। উপযুক্ত ক্লাশরুম ছিল না, শিক্ষকদের বসার ঘর ছিল না, স্পেশাল পেপার পড়ানোর আলাদা রুম ছিল না। স্কলার ও শিক্ষকরা যে ঘরে বসে পড়াশোনা করতেন সেই ঘরেই করতে হতো স্পেশাল পেপারের ক্লাশ। স্কলার শিক্ষকরা হয় সরে যেতেন, না হয় তাঁরাও ছাত্র হয়ে লেকচার শুনতেন। কিন্তু বাংলা বিভাগ তলে-তলে তার শেকড়, প্রকাশ্যে তার ডালপালা বিস্তার করছিল। প্রভাব বাড়ছিল। উপাচার্য অফিস থেকে রেজিস্ট্রার অফিস থেকে, লাইব্রেরি থেকে, সারা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বাংলা বিভাগ হয়ে উঠেছিল সমস্ত বিভাগের চেয়ে প্রভাবশালী। ছাত্র শিক্ষক গবেষক সকলেই সেই প্রভাবটাকে চাক্ষুষ করতে পারছিলাম। অনুভব করতে পারছিলাম, এই প্রভাব বাংলা বিভাগের নিজস্ব গুণে নয়, একান্ত এক ব্যক্তির ব্যক্তিগত ক্ষমতার বলে বলীয়ান হয়ে উঠছে; এর প্রভাব পড়তে শুরু করলো ছাত্রদের মধ্যেও।
ক্ষমতার সঙ্গে সঙ্গে হাত ধরাধরি করে হাঁটে ডোমিনেট-প্রবণতা। ডোমিনেট এমন একটি তামসিক গুণ, যেটা শেষ পর্যন্ত ডোমিনেটকারীর স্বাভাবিক গুণগুলিকেও ডোমিনেট করে। বাংলা বিভাগের ভাগ্যে তাই ঘটলো। ছাত্রদের মধ্যে সেটা দগদগে ঘা হয়ে উঠলো অচিরে। ছাত্ররা তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে গেল। ১. ক্ষমতার কাছাকাছি, ২. ক্ষমতার কাছাকাছি যাবার যাবতীয় প্রয়াস ব্যর্থ হলে নিরপেক্ষ সে-দল কোনো হালতে নিছকই আনন্দে কাটিয়ে দেওয়া, যেন এমএ পড়তে পারার এইযে দুর্লভ সুযোগ, তাকে উপভোগ করা এবং যথাসময়ে মেধার প্রকাশ ঘটানোর প্রতিজ্ঞায় দৃপ্ত, ৩. উচ্চাশাহীন, আকাঙ্ক্ষাহীন একদল ছাত্র, ঘরের সামনে বিশ্ববিদ্যালয়, তাই পড়তে এসেছে, আসানসোলে বিশ্ববিদ্যালয়ে না স্থাপিত হলে এরা এ-জীবনে হয়তো এমএ-ও পড়তো না।
আর একটি দল ছিল, খুব ছোট্ট সে দলটি ছিল হতাশের। সে দলটি এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার জন্য অনুশোচনায় দগ্ধ হতো। তারা তুলনায় বেশি মেধাবী, অথচ নিজের আত্মমর্যাদাবোধ থাকায় ক্ষমতার কাছাকাছি গিয়ে মাথা নোয়াতে চাইতো না।
আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে তৃতীয় থাকের ছাত্র-সংখ্যাই বেশি। তাদের মধ্যে অবাধ্যতা বেশি, তাদের মধ্যে অবজ্ঞা বেশি, ফলে তারাই সবচেয়ে ডোমিনেট। তারা ছিল এক্সপ্লয়েটেড। বাংলা বিভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ের কোয়ালিটি হারিয়ে হয়ে উঠলো একটি বিশুদ্ধ বিদ্যালয়। হেড মাস্টারের রক্তচক্ষুর তলায় তারা বাধ্য ছিল শেষ পিরিয়ড পর্যন্ত ক্লাশে বসে থাকতে। নীরব, শান্তশিষ্ট, একদল ছাত্র সমস্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও বই নিয়ে বসে আছে লাইব্রেরিতে—এই দৃশ্য এখনো চোখে ভাসে। তাদের সাদা শঙ্খের মতো করুণ মুখ এখনো চোখের সামনে ফুটে ওঠে। বাংলা বিভাগের হত্তাকত্তাবিধাতা সারা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন প্রকল্পে ভিসি অফিসে হয়তো ব্যস্ত, পাঁচটা বেজে গেছে, কিন্তু যতক্ষণ না ভিসি অফিস থেকে তাঁর অনুমতি আসে, বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত অধ্যাপক তাদের ক্লাশরুমে বসিয়ে রেখেছেন। বাধ্যত একদল ছাত্র অবাধ্য হয়ে উঠেছিল, তারা অনুমতির তোয়াক্কা না করে মর্জিমতো চলে যেতো। কঠোর শৃঙ্খলা বিশৃঙ্খলারই জন্ম দেয়। অবাধ্য করে। ক্ষমতা এটা অনেক সময় বুঝেও বুঝতে চায় না!
এই বিশৃঙ্খলার সমস্ত রোগলক্ষণ দেখা দিল স্কলার ছাত্রদের মধ্যে। তাদের দোষ দেব না, তাদের সামনে রুক্ষ দুর্মর রাক্ষসের মতো অপেক্ষায় আছে বেকারত্ব, স্বপ্নভঙ্গ; তার হাত থেকে নিস্তার পেতে তারা আদর্শ মূল্যবোধ সবকিছুকে বিসর্জন দিয়ে ক্ষমতার কাছাকাছি যেতে চেষ্টা করলো।
গবেষক ছাত্ররা ক্ষমতার কাছাকাছি যেতে বাধ্য ছিল, গবেষণার শেষে তাদের একটি চাকরি চাই, সে চাকরিটি করে দিতে পারে যোগ্যতা নয়, একমাত্র ক্ষমতা। আমার সে ক্ষমতা নেই, থাকলেও অনৈতিকতাকে কোনোদিন প্রশ্রয় দিই নি। নীতি আদর্শ এযুগে কে মানে?
একজন স্কলার ছাত্রকে বললাম, আসানসোলে থাকিস, আসানসোল নিয়েই গবেষণা কর।
—সেটা কি জিনিষ স্যার?
—আসানসোল কয়লাখনি আর শিল্পের শহর। কয়লাখনির সাহিত্য নিয়ে কাজ কর।
—পারবো স্যার?
—পারবি।
আমি বিষয় বলে দিলাম, পরিচ্ছেদ বিভাগ করে দিলাম, লেখকদের নাম বইয়ের নাম বলে দিলাম, জীবিত লেখকদের ঠিকানা বলে দিলাম। শেষে বললাম, আর একজন গুরুত্বপূর্ণ লেখকের নাম বলছি না, তাঁর সঙ্গে তোর নিত্য কথা হয়। বলে লাজুক হাসলাম।
সে লেখকের নাম জানিস?
ছাত্রটি অবাক হয়ে বললো, স্যার, আপনি!
কয়লাখনি নিয়ে কাজ করার ছাত্রটি অচিরেই বুদ্ধিমানের মতো ক্ষমতার দিকে ঢলে পড়লো, আমার সমস্ত সহায়তা নিয়ে তার গবেষণা থিসিসে আমার লেখার কথা দূরে থাক, আমার নাম পর্যন্ত উল্লিখিত হলো না। এরপর থেকে আমি গবেষক ছাত্রদের এড়িয়ে যেতাম। বিন্দুমাত্র আগ্রহ বোধ করিনি।
পৃথিবীতে আমিই প্রথম কমলকুমার মজুমদার বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক গবেষক। এক ছাত্র কমলকুমার মজুমদার বিষয়ে গবেষণায় আগ্রহ দেখিয়ে আমার কাছে এলো। আমি কোনো সাহায্য করতেই রাজি হলাম না। আর একজন অধ্যাপক তাকে গবেষক হিসেবে নিলেন। ছাত্রটি, অধ্যাপকের পরামর্শ মোতাবেক পুনরায় আমার কাছে এসে সাহায্য চাইল। বেশ কড়া করেই বললাম, আমার বই আছে, শোধগঙ্গায় আমার গবেষণা গ্রন্থটি পিডিএফ আকারে পাওয়া যায়। আমাকে বিরক্ত করো না।
সাহায্য মানে ত প্রায় থিসিসটি লিখে দেওয়া, তা করিনি বলে, আমার কমলকুমার সম্পর্কিত কোনো মূল্যায়ন তার গবেষণা থিসিসে উল্লিখিত হয়নি।
এরা দুজনেই সফল পিএইচডি।
গাইডের প্রভাব থাকলে সাদা থিসিসেও পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করা যায়। আর মহা মূর্খরাই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়।
তবুও ছাত্রদের ভালোবাসি, যে ছাত্র পরিশ্রমী, যে ছাত্র কৌতুহলী, যে ছাত্র পড়ুয়া।
এসব কথার শেষ নেই, থাক সেসব। দিবস থাকলে রাত্রিও থাকবে, আদর্শ থাকলে আদর্শহীনতাও থাকবে। নীচ বিষয় মনকে নীচ করে। তবে, জীবনের অভিজ্ঞতায় বুঝেছি, আদর্শহীন মানুষ কখনও শিরদাঁড়া সোজা রেখে চোখে চোখ রাখতে পারে না। আমার শিক্ষক জীবনে আদর্শবান ছাত্রও আছে, আদর্শহীন ছাত্রও কিন্তু আছে। তাদের ব্যবহার আমাকে ব্যথিত করেছে। কিছু কিছু ছাত্রদের মধ্যে দুর্বিনীত আচরণ কষ্ট দিয়েছে। ভুলে গেছি সেসব। শিশু তো শৈশবে গুরুজনকেও লাথ মারে! কিন্তু সচেতনে লাথি! সেসব কি ভোলা যায়?
ভুলতে চেষ্টা করেছি, পারিনি, অবচেতন মনের ভেতর রয়ে গেছে। জানি, তারা সিস্টেমের ক্রীড়নক মাত্র; তাদের বিন্দুমাত্র দোষ নেই।
প্রাণ থেকে উৎসারিত শ্রদ্ধা বিষয়টা বেশ কয়েক বছর আগে থেকেই হারিয়ে গেছে আমাদের সমাজ সংস্কৃতিতে। সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষকতা বৃত্তি এমন নীতিহীনতায় ভুগছে, শিক্ষকদের প্রকাশ্যে গালাগাল শুনতে হচ্ছে। অশিক্ষিত অনৈতিক শিক্ষকে ভরে গেছে শিক্ষাঙ্গন।
আমরা, শিক্ষকেরা অন্তত সকলে সব ছাত্রের প্রণাম পাবার যোগ্য নই, তাই। সব ছাত্রের সব শিক্ষককে প্রণাম করার অধিকারও বোধহয় নেই। ছাত্র শিক্ষকের এই বিভাজিত বাস্তবতার পেছনে রয়ে গেছে কত কিসিমের রসায়ন গণিত ইতিহাস ভূগোল বীজগণিত জ্যামিতি…। এর উপপাদ্য, এর প্রতিপাদ্য, বোধহয়, একটাই, আত্মস্বার্থ চরিতার্থতা। শিক্ষককে শেষপর্যন্ত নীতিনিষ্ঠ হতে হবেই।
অশ্রদ্ধা পেলে সে শিক্ষকের মৃত্যু ঘটে তৎক্ষণাৎ।
