ঘাস বিচালি ৩

ছুঁড়ে দেওয়া তির আর বলে ফেলা কথা কোনওভাবেই ফিরিয়ে নেওয়া যায় না। প্রবচন এরকমই। সময়ও তো অমনই। যে মুহূর্ত যায়, সে কি আর ফেরে! তবু মানুষের স্বভাবই এমন যে, সে যেমন তার সামনের দিনগুলো নিয়ে মনে মনে আঁক কাটে, তেমনই থেকে থেকে হারিয়ে যাওয়া দিনের, না-দেখা না-চেনা দিনের বাতাস মুঠোয় ভ’রে, তার ঘ্রাণও নিতে চায়। পিতামহীর মুখে বাঘ-সিংহ-শেয়াল-কুমীরের মজাদার গল্প শুনে মনে মনে বানিয়ে নেয় কবেকার এক জলজঙ্গলে ছাওয়া ঘরকরনার ছবি। মাতামহীর গাওয়া গানের সুরের ভিতর দিয়ে ভেসে যেতে চায় কোন্ মন-কেমন-করা নদীর কূলে। সামান্য জীবাশ্ম থেকে মানুষ তাই এঁকে ফেলে একটা গোটা প্রাণীর চেহারা। মাটির নিচে পাওয়া কয়েকটা ভাঙা মূর্তি, চৌচির পাত্র, ছেঁড়া গয়না, ঘষা-খাওয়া মুদ্রার নমুনা দেখে টের পেতে চায় একটা সভ্যতার আদল। গল্প বানাতে গল্প শুনতে আর গল্প বিশ্বাস করতে পারে বলেই নাকি যূথবদ্ধতা থেকে ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছে মানুষের গোষ্ঠী কৌম সমাজ। গল্প ভালোলাগা থেকেই একদিন সে বানিয়ে ফেলেছে তার লোককথা পুরাণ ইতিকথা।
ইতিকথার কথা উঠলে আমরা একটা বিরাট পরিসরে জমে-ওঠা স্মৃতির কথাই ভাবি। একদল মানুষের বা একটা জনগোষ্ঠীর ধূসর অতীতের কথা। কিন্তু একলা একটা মানুষেরও তো কিছু ইতিকথা থাকতে পারে। থাকতে পারে হারিয়ে-যাওয়া পূর্ববৃত্তান্ত। একজন একজন মানুষের এইসব ছিন্নছেঁড়া কথা নিয়েই আবার গেঁথে তোলা যায় একটা গোষ্ঠীর একটা কৌমের একটা জাতির ইতিবৃত্ত। সেসব অনেক বিদ্বানদের কাজ। কিন্তু একশ বছর আগের কয়েকটি চিঠিপত্র আমার সামনে হঠাৎ ক’রে বেশ কিছু অজানা কথা মেলে ধরল। প্রাথমিকভবে যা নিতান্ত পারবারিক। কিন্তু সেইসূত্রে তা সমসাময়িক বাংলাদেশের খানিক বৃত্তান্তও।
গতবারে আমি তিনটি চিঠির বয়ান দিয়েছিলাম। কিন্তু কোনও পাদটীকা না-জোড়ায় পাঠিকা-পাঠকদের সেগুলি খানিক বিস্বাদ লাগা স্বাভাবিক। চিঠিগুলি লেখা হয়েছিল ১৯২০-২১ সালে। সব কটিরই লেখক প্রাণচাঁদ চৌধুরী। আর প্রাপক তাঁর ছেলে, প্রমথনাথ চৌধুরী। তিনটি চিঠিই গেছে অবিভক্ত নদিয়া জেলার ধোড়াদহ গ্রাম থেকে অবিভক্ত পাবনা জেলার সিরাজগঞ্জ শহরে। কিছুদিন আগে (১৯১৮) শেষ হয়ছে ১ম বিশ্বযুদ্ধ। যুদ্ধ শেষ হয়েছে, কিন্তু পিছু পিছু নিয়ে এসেছে ঘাতক মন্দা আর মারণ ফ্লু। গতবারেই উল্লেখ করেছিলাম, ১৯২০ সালে বাংলাদেশ জুড়ে ওই ইনফ্লুয়েঞ্জায় মৃত্যুর সংখ্যা ১১ লক্ষ ৪৪ হাজার ছাপিয়ে গিয়েছিল। প্রাণচাঁদ চৌধুরীর প্রথম চিঠিতেই দেখছি লেখা হয়েছে – ‘বাটীস্থ বালক বালিকারা সকলেরই জ্বর হওয়ায় অর্থাভাবে চিকিৎসার ব্যবস্থা করিতে না পারায় অদ্য ৫ দিন হইল সকলকেই যমশেরপুর১ পাঠান হইয়াছে’ (২০. ১১. ১৯২০)। একটি মাত্র বাক্যে দারিদ্র্য আর রোগবালাই, দুয়েরই নিষ্করুণ বিবরণ। হয়তো কোনও সম্পন্ন নিকট আত্মীয়ের (মাতুলালয়?) বাড়িই পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল বালক-বালিকাগুলিকে!
বলা যায়, দারিদ্র্যের কথাই চিঠিগুলির মুখ্য অনুষঙ্গ। আগের চিঠিটিতেই দেখা যাচ্ছে, প্রাণচাঁদের চোখের সমস্যা এতটাই তীব্র যে লেখাপড়া প্রায় অসাধ্য হয়ে উঠেছে। ফলে স্কুলের কাজ বন্ধ। অথচ চোখের চিকিৎসা বা নতুন চশমা বানানোর সঙ্গতিটুকু পর্যন্ত নেই। খুবই করুণভাবে তিনি লিখছেন – ‘পূজার পর হইতে স্কুল খুলিয়া ৪। ৫ দিবস কার্য্য করিয়াছিলাম। দিন দিন চোখের অবস্থা যেরূপ হইতেছে লেখাপড়ার কার্য্য আর করিতে পারিব না। বর্ত্তমান চশমা অপেক্ষা powerful চশমা হইলে কিরূপ দৃষ্টি হইতে পারে তাহা বলিতে পারিনা। … আমি অত্যন্ত বিপন্ন হইয়াছি। এরপরে আমার অদৃষ্টে যে কি আছে বলিতে পারিনা। শেষ কালে আমি যে খুব কষ্ট পাইব তাহা বেশ বোঝা যাইতেছে। ইহা অনুতাপ করিয়া আর কি করিব! সত্বর কিছু খরচ পত্র না পাঠাইলে আমার আর উপায় নাই।’
সারা বাংলাদেশ জুড়ে তখন জমি-জরিপের বিশাল কর্মযজ্ঞ চলছিল। তারও ভালোমন্দ কিছু প্রভাব এসে পড়েছে প্রাণচাঁদের জীবনে। কিছু জমি প্রাপ্য হয়েছে বটে, কিন্তু তার আনুষঙ্গিক খরচ জোগাতে গিয়ে চোখের চিকিৎসা বাতিল করতে হচ্ছে। সে-প্রসঙ্গে ছেলেকে জানাচ্ছেন – ‘সাহেব পাড়ার যে জমি আছে তাহা সেটেলমেন্টের জরিপে আমার নাম উঠিয়াছে। ঐ জমি জমায় নাম খারিজা দাখিল২ হয় নাই। তাহার কোন নিদর্শন আমার নিকট নাই। জমিদারের সেরেস্তায় আমার নাম খারিজা করিয়া দাখিল করিতে হইবে। শ্রীযুক্ত কান[নু]নগো বাবুকে সাক্ষী দেখাইতে না পারিলে দখল পাইব না। নাম খারিজায় উপস্থিত ১০৲ টাকার দরকার। অবশ্যই টাকা বাটী পাঠাইবা। আমার চক্ষু অপেক্ষা ঐ জমি রাখা নিতান্ত প্রয়োজন। এই বিবেচনা করেও চক্ষু সম্বন্ধে যাহা ব্যয় হইবে আপাততঃ সেই টাকাটা এই স্বার্থে অবিলম্বে [?] ব্যয় কর’ (১০. ০১. ১৯২১)।
প্রমথনাথ বাবাকে প্রতিমাসে পাঁচ টাকা ক’রে পাঠান। এছাড়াও পূজা-পার্বণ বা অন্যান্য উপলক্ষে বাড়তি টাকারও সংস্থান করেন। কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় সেই অর্থে সব সময়ই অকুলান হয়। প্রাণচাঁদের কলমে সেই ঘাটতি পূরণের কাকুতিট এইরকম – ‘তোমার ২১ ফাল্গুনের প্রেরিত ১৫৲ টাকা অদ্য প্রাতে পাইলাম। গত ৫৲ পাঁচ টাকা পাইয়াছি। গত ২৩ শিবরাত্রি হইয়াছে। তোমার পত্র না পাইয়া পূজার যোগাড় করিতে পারি নাই। আগামী চৈত্র সংক্রান্তি ভিন্ন পূজা হইবে না। [পূজা বাবদ] দশ টাকা রাখিলাম। কিন্তু পনর টাকা খরচ হইবে। তুমি সংসার খরচের বাবদ পাঁচ টাকা দিয়াছ। প্রতি মাসে পাঁচ দিতেছ। ইহাতে কি হয়? মাসিক পনর টাকা খরচ। নিতান্ত পক্ষে দশ টাকার কম হইতে পারেনা। তুমি মাসিক দশ টাকা না দিলে চলিতে পারেনা। আর পাঁচটাকা কোনপ্রকারে জুটিতে পারে, যাহা তোমার বিবেচনা হয় করিবা’ (১১. ০৩. ১৯২১)।
২.

প্রাণচাঁদ চৌধুরীর চিঠিতে যে জ্বরের কথা শুনছি, তার কথা তো আমরা আগেই জেনেছিলাম, মুর্শিদাবাদের খাগড়া থেকে লেখা সরযূ দেবীর চিঠিতে৩। সিরাজগঞ্জে কর্মরত স্বামী প্রমথনাথকে সে-চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন – ‘বড় দিদি খুব জ্বর অমনে দুই দিন হইল পথ্য করিয়াছেন। দাদার শনিবার দিন হইতে খুব জ্বর হইয়াছে। জ্বর ছাড়েনি। আমার আবার রবিবার দিন হইতে হুহু জ্বর হইতেছে। একদিন ছোট এক দিন বেশি জ্বর হইতেছে। বেশি লিখিতে পারিতেছি না’ (২৪. ০২. ১৯২০)। কিন্তু সেই জ্বরই যে এই স্প্যানিশ ফ্লু, সেটা তখন ঠাহর করি নি। ভেবেছিলাম, বুঝি ম্যালেরিয়া। প্রাণচাঁদের চিঠিগুলি আবিষ্কার করার পর সেই সময়কার তথ্য ঘাঁটতে ঘাঁটতে জানতে পারলাম বিশ্বযুদ্ধের পরিখা থেকে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়া এই স্প্যানিশ ফ্লুয়ের কথা। বুঝলাম, ওই ফ্লুয়েই সরযূ দেবীর মৃত্যু! হয়তো ২৪ ফেব্রুয়ারির চিঠিটি লেখার কয়েকদিনের মধ্যেই।
হায় রে মানবচরিত্র! সরযূর মৃত্যুর পর বছরও ঘুরল না। প্রাণচাঁদ তাঁর সদ্য বিপত্নীক পুত্র প্রমথনাথেকে আবার বিয়ের পিঁড়িতে বসানোর জন্য ব্যাকুল। ওই বছরের ২০ নভেম্বরের চিঠিতেই তিনি লিখছেন – ‘নতিয়াডাঙ্গা নিবাসী গণপতি সান্যাল মহাশয় আপুনার কন্যার বিবাহের জন্য বিশেষ অনুরোধ করিয়া বলিয়াছে মেয়েটী সুন্দরী। ১২। ১৩ বৎসর বয়স। নগদ ও গহনাদি ছয় সাত শত টাকা দিবে। যদি তোমার মত কর সত্বর আমাকে লিখিবা।’ বিবাহপ্রস্তাবের পিছনে অর্থনৈতিক কারণটি চোখ এড়ায় না। সংসারে নিত্যসঙ্গী দারিদ্র্য। সেখানে ছেলের বিয়ে দেওয়া কিছুটা অর্থাগমের উপায়। তবে ছেলে থাকে টাউনে। সিরাজগঞ্জ তখন মহকুমা শহর। পাটের ব্যবসাকেন্দ্র, নদীবন্দর, রেল ইস্টিশন, পুরসভা, আদালত, জেলখানা – কী নেই সেখানে। এমন এক জমজমাট শহরে বাস করা ছেলের ব্যাপারে চাপা একটা ভয়ও আছে বাবার। পাছে কোনও শহরের মেয়েকে বিয়ে করা মনস্থ করে বসে সে। আবার রোজগেরে ছেলের প্রতি সমীহও আছে কিছুটা। তাই ভাববাচ্যে জানান – ‘যদি বিবাহ করা মত হয় তবে townএ না করিয়া এ দেশে করায় ভাল।’
বাবার চিঠিতে অবশ্য প্রমথনাথের মন গলে নি। কারণ মাস চারেক পরের আরেক চিঠিতেও তাঁর কাছে যাচ্ছে নতুন একটি বিবাহপ্রস্তাব। প্রাণচাঁদ লিখছেন – ‘এখানে রাখাল মৈত্রের শালির সঙ্গে তোমার বিবাহ কথা বলে। মেয়েটী মন্দ নহে বয়স্থা। তোমার [মত] হ’লে স্থির করা হইবে’ (১১. ০৩. ১৯২১)। মত প্রমথনাথের সে-যাত্রাও হয় নি। সরযূর মৃত্যুর পর তিনি আর দ্বিতীয়বার বিয়েই করলেন না।
এদিকে সরযূ আর প্রমথনাথের ছেলে (মা-কে হারানোর সময়ে, বয়স আড়াই বছর) গোপালকে দেখাশোনা করবে কে! মাতৃহারা শিশুটিকে তখনকার মতো রেখে দেওয়া হল তার মাতুলালয়ে। প্রমথনাথ হয়তো লোকজন মারফত খবরাখবর করেন। সে-খবর আবার জনান প্রাণচাঁদকে। প্রাণচাঁদ তাঁর অপর চিঠিতে লিখছেন – ‘তোমার ও শ্রীমান গোপাল ভায়ার শারীরিক কুশল সংবাদে নিশ্চিন্ত করিবা’ (২০. ১১. ১৯২০)। অন্য এক চিঠি থেকে বোঝা যায়, প্রমথনাথের কাছ থেকে তিনি জেনেছেন, ইতিমধ্যে গোপালের আমাশয় হয়েছিল। তাই তিনি লিখছেন – ‘শ্রীমান গোপাল ভায়ার আমাশয় হইয়াছে সংবাদে বড়ই চিন্তিতাছি। আরোগ্য সংবাদে নিশ্চিন্ত করিবা’ (১০. ০১. ১৯২১)। প্রমথনাথের শারীরিক অবস্থা নিয়েও উদ্বেগ আছে সেখানে – ‘তোমার শারি[রী]রিক অসুস্থ সংবাদে চিন্তিতাছি। শরীর সম্বন্ধে বিশেষ রূপে যত্ন করিবা – এবং ঔষধাদি ব্যবহার করিবা – শরীর সম্বন্ধে কোনরকম অবহেলা করিও না।’ এই চিঠি থেকেই গোপালকে নিয়ে আর এক তথ্য পাওয়া যায়। তথ্যটি গোপালের নাম নিয়ে। প্রাণচাঁদের মন্তব্য এই যে, গোপালের এই নামকরণ যুক্তিযুক্ত হয় নি। কারণ, সেটি প্রাণচাঁদের পিতামহেরও নাম – ‘শ্রীমান ভায়ার গোপাল নাম রাখা হইয়াছে, ঐ নাম রাখা ঠিক হয় নাই। কারণ [উহা] আমার ঠাকুরবাবার নাম’।
গোপালের প্রসঙ্গ এসেছে প্রাণচাঁদের শেষ চিঠিতেও। বহরমপুর হল মুর্শিদাবাদের জেলা সদর। সেখানে পরিচিত কেউ কেউ পরীক্ষা দেবার জন্য গিয়েছিলেন। সেই সূত্রে লাগোয়া শহর খাগড়ায় গিয়ে তাঁরা গোপালকে দেখে এসেছেন। সে ভালো আছে। এই খবর জানিয়ে প্রাণচাঁদ ছেলেকে লিখছেন – ‘শ্রীমান হারাণরা বহরমপুর পরীক্ষা দিতে গিয়াছিল। গোপাল ভায়াকে দেখিয়া আসিয়াছে। ভাল আছে’ (১১. ০৩. ১৯২১)। ওই চিঠি থেকেই জানা যাচ্ছে, আসন্ন দোলের সময় প্রমথনাথের খাগড়ায় ছেলেকে দেখতে যাওয়ার কথা আছে। ছেলেকে দেখে তিনি যেন একবার ধোড়াদহের বাড়িও ঘুরে যান, এমনই অনুরোধ প্রাণচাঁদের – ‘তুমি দোলের সময় খাগড়া যাইবে। যদি পার বাটী আসিবা’। সেবছর দোল পূর্ণিমার তারিখ ছিল ২৩ মার্চ, বাংলার ৯ চৈত্র ১৩২৭। ছেলের সাথে বাবার সেদিন আদৌ দেখা হয়েছিল কি না, সেসব কোনও তথ্য আর আমাদের হাতে নেই।
সারা দেশ তখন অসহযোগ আর খিলাফত আন্দোলনে উত্তাল। দোলের অনেক আগেই (৯ মার্চ ১৯২১) গ্রাম-মফসসল জুড়ে যেন হয়ে গেছে চাঁচর বা নেড়াপোড়া উৎসবের মহড়া। বিলেতি কাপড় জড়ো ক’রে সেদিন আগুন ধরানো হয়েছে বাংলার যত হাটে-বাজারে। ওদিকে কলকাতার ছাত্রসমাজ ক্লাস বয়কট ক’রে রাজপথে পিকেটিং করছেন। ব্রিটিশ চটকলের ক্ষতি করার জন্য পাটের বদলে ধান আর তুলোচাষ করতে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছিল চাষিদের। পাটচাষ লাভজনক বলে সে-ডাকে তেমন সাড়া না-পাওয়া গেলেও, রাজশাহি-নদিয়া-পাবনা-মুর্শিদাবাদ সীমান্তে সাহেবদের জমিদারি কোম্পানির বিরুদ্ধে প্রচারে ভালো সাড়া পাওয়া গিয়েছিল। কংগ্রেসের দাফতরিক নীতি না হলেও কোথাও কোথাও খাজনা বন্ধও প্রজা আন্দোলনের কর্মসূচিতে ঢুকে পড়ছিল। ওই একই সময় অসহযোগ আন্দোলনের সূত্রে তখনকার যুক্তপ্রদেশে (বর্তমান উত্তর প্রদেশ ও উত্তরাখণ্ড) অনেক বড় আকারে কৃষক বিক্ষোভ ঘনিয়ে উঠেছিল। চাষিরা অত্যাচারী ভূস্বামীদের বিরুদ্ধে খেপে উঠে, খামার আক্রমণ খাজনা বন্ধ ইত্যাদি শুরু করেছিলেন। তাতে রাশ টানার জন্য গান্ধী তাঁর ইয়ং ইন্ডিয়া পত্রিকায় কলম ধরলেন (৯ মার্চ ১৯২১)। ভারতের চাষিদের দেশি জমিদারদে র সাথে সংঘাতে জড়াতে বারণ করলেন তিনি। বললেন, সব লড়াই দেশের সবচেয়ে বড় জমিদার বিদেশি ইংরেজ শাসকের বিরুদ্ধে। তাঁর স্পষ্ট বার্তা ছিল খাজনা বন্ধের বিরুদ্ধে আর দেশি জমিদারদের সঙ্গে সমঝোতার পক্ষে। কোনও সন্দেহ নেই, সেদিনের এই নির্দেশনা বাংলার প্রজা আন্দোলনে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলেছিল।
দেশের পরিস্থিতি এহেন যত উঁচু তারেই বাঁধা হোক না কেন, তার কোনও ঢেউ যে ধোড়াদহ গ্রামের নুন-আনতে-পান্তা-ফুরানো মানুষটির জীবনে এসে পড়েছিল, এমন কোনও নজির নেই। পরিবার প্রতিপালনে দারিদ্র্য আর রোগবালাইয়ের মোকাবিলা করতে করতেই তাঁর দিন কেটে যায়। পেশায় শিক্ষক। দৃষ্টিক্ষীণতার জন্য সে-কাজও বন্ধ। ১ম বিশ্বযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে গ্রামীণ মধ্যস্বত্ত্বভোগী বাঙালি বর্ণহিন্দুর গড় জীবন কি এরকমই ভারাক্রান্ত ছিল? প্রাণচাঁদ চৌধুরী। জমিদারিহীন এক প্রজা চৌধুরী। আমার প্রপিতামহ। তাঁর বিষয়ে আর একটি অতিরিক্ত কথাও আমার জানা নেই। এই চিঠি তিনটি৪ আবিষ্কারের আগে এটুকুও জানতাম না। তবে প্রমথনাথের একটি অগোছালো হিসাবের খাতা থেকে দেখা যাচ্ছে, প্রাণচাঁদকে পাঠানো মাসকাবারি টাকার অংক কিছুদিনের মধ্যেই পাঁচ টাকা থেকে বেড়ে দশ টাকা হয়েছে। তাঁর হিসাব লেখার ধরনটি খামখেয়ালি। বং শ্রাবণ ১৩২৮-এর পর আবার ইং জানুয়ারি ১৯২২-এর উপাত্ত। ২ শ্রাবণ ১৩২৮ আর ১৪ জানুয়ারি ১৯২২ (১ মাঘ ১৩২৮), এই দুই তারিখেই বাবাকে দশ টাকা ক’রে পাঠিয়েছেন তিনি।
প্রমথনাথ যে নিজে খুব কাপ্তেনি ক’রে চলতেন, তা নয়। চলবেনই বা কী ক’রে! মহকুমা আদালতের এক আইনজীবীর সেরেস্তায় কাজ। অর্থাৎ যাকে বলে মুহুরিগিরি। রোজগার আর তেমন কী! জানুয়ারি ১৯২২ সালে বাবাকে পাঠানো টাকা সমেত সাকুল্যে তিনি খরচ করেছেন ৩২টাকা ৮আনা ৩পয়সা। হিসাবের খাতার সাক্ষ্য অনুযায়ী ছেলেকেও তখন নিজের কাছে নিয়ে এসেছেন। কাজেই সেই শিশুটির (বয়স প্রায় ৪ বছর) বাবদেও কিছু খরচ রয়েছে। নিকট আত্মীয়ের যৌথ পরিবারের সদস্য বলে, মনে হয় দৈনন্দিন খাইখরচটুকু লাগত না। ছেলের জন্য আলাদা একটু চাল আর দুধ মাছ মুড়ি মুড়কি বিস্কুট তালমিছরি সাগু কখনও কমলা – এইসবই তাঁর মুখ্য খরচ। ৮ জানুয়ারি অবশ্য নিজের জন্য এক জোড়া কাপড় কিনেছিলেন ৫টাকা ৬আনা দিয়ে। কাপড় জোড়া যে মিহিসুতার, তা দাম দেখে বোঝা যায়। কারণ ওই সময় এক জোড়া খদ্দরের ধুতির দাম ছিল ২টাকা ৪আনা। এই তথ্যটি পাচ্ছি অবিভক্ত বাংলার (এবং পরবর্তীকালের পূর্ব পাকিস্তান এবং বাংলাদেশের) স্বনামধন্য রাজনীতিবিদ সাংবাদিক এবং সাহিত্যিক আবুল মনসুর আহমদ-এর স্মৃতিচারণায়৫।
কৌতূহলবশত মনসুর আহমদের বইয়ের পাতায় খানিক উঁকি মারা যায়। রাজনৈতিক বৃত্তান্ত নয়, নিছক সমকালীন অর্থনীতির কিছু আন্দাজ পাওয়ার জন্য। দেখছি, তখন এক পয়সায় এক কাপ চা, চার পয়সায় পঁচিশটি মুখপোড়া বিড়ি আর পয়সায় দু’টি দিয়াশলাইয়ের বাক্স পাওয়া যেত। তিনি লিখছেন, ‘তাতে সারাদিনে চার আনার বেশি খরচ করিতে পারিতাম না’। তিনি আরও লিখেছেন, ‘এক নম্বর ঢাকাই বাংলা সাবান ছিল পাঁচ আনা সের। দশ পয়সায় আধা সেরের একটা দলা পাওয়া যাইত’। প্রমথনাথের খাতাতেও দেখছি ২৬ জানুয়ারি ১৯২২ তারিখে অন্যান্য খরচের সাথে উল্লেখ করা আছে সাবান বাবদ দশ পয়সা (দুই আনা দুই পয়সা) খরচের কথা। আন্দাজ করা যায় সেটিও ওই বাংলা সাবানেরই আধা সেরের একটি দলা ছিল।
প্রসঙ্গত, মনসুর আহমদ তখন অসহযোগ-খিলাফত আন্দোলনের উদ্দীপ্ত সৈনিক। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনের আদর্শে প্রাণিত। বাংলা জুড়ে তখন দেশবন্ধুর নেতৃত্বে সমস্ত সরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ইস্কুল-কলেজ বয়কটের ডাক। পাশাপাশি আবার শিক্ষায় একটা জাতীয় বিকল্প গড়ে তোলার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। সরকারি ব্যবস্থাপনার বাইরে দিকে দিকে গড়ে উঠছে জাতীয় বিদ্যালয়। তরুণদের প্রতি নেতাদের আহ্বান : ফিরে চল মাটির টানে। এহেন পরিস্থিতিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের উজ্জ্বল ছাত্র মনসুর দায়সারাভাবে সাম্মানিক স্নাতক পর্যায়ের ফাইনাল পরীক্ষাটি দিয়ে সোজা চলে গেলেন ময়মনসিংহ জেলার বৈলর গ্রামে। সেখানে কিছুদিন বিনা বেতনে জাতীয় উচ্চ বিদ্যালয়ে সহকারী প্রধান শিক্ষকের পদে বহাল। পরে, ময়মনসিংহ শহরে জাতীয় বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা। তখন বেতন মাসে চল্লিশ টাকা। তিনি লিখেছেন, ‘এই টাকাতেই আমি খেলাফত নেতাদের মধ্যে রীতিমতো ধনী লোক হইয়া গেলাম।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাহেব শিক্ষকের প্রিয় ছাত্র আবুল মনসুর আহমদ তখন আন্দোলনে নিবেদিতপ্রাণ আদর্শবাদী তরুণ। মাসে চল্লিশটি টাকা তাঁর কাছে অনেক। অন্যদিকে, মফসসল আদালতের উকিলের মুহুরি ছাপোষা প্রমথনাথের বত্রিশ টাকা আট আনা তিন পয়সা ক্রয়ক্ষমতা নিয়ে কোনও আফসোস বা আত্মতৃপ্তি ছিল কি না, তা জানার কোনও উপায় নেই। অবশ্য জানুয়ারি ১৯২১-এই তিনি একদিন চার পয়সার আর একদিন দুই পয়সার কাঁচাগোল্লা খরিদ করেছেন।
এইসবই আমার পিতৃপুরুষের সামান্য গল্প। আমার বাবা তো সারা জীবন সিরাজগঞ্জ শহরের স্মৃতিই বহন করতেন। তাই হয়তো কোনও দিন না-দেখা সেই শহরটি আমার ভিতরেও কেন জানি না খানিকটা জড়িয়ে আছে। অথচ প্রপিতামহের ধোড়াদহ নয়। আমার পিতা বা পিতামহ কেউই সে-গ্রাম নিয়ে কোনও দিন কোনও রকম আগ্রহ দেখান নি। দেশভাগের পরেও না!
১ নদিয়া জেলারই একটি বর্ধিষ্ণু গ্রাম এই যমশেরপুর। ধোড়াদহ থেকে মাত্র ১১ কিমি দূর। এই গ্রামটি কবি যতীন্দ্রমোহন বাগচীর (১৮৭৮-১৯৪৮) জন্মস্থান। যাঁর কাজলাদিদি কবিতাটি হয়তো বাঙালির যৌথ অবচেতনে বহুদিন থেকে যাবে।
২ এক প্রজার নামে থাকা জমি অন্য প্রজা নিলে, জমিদার বা রাজস্ব বিভাগের খাতায় পুরনো নাম বাতিল (খারিজ) ক’রে নতুন নাম লিপিবদ্ধ করার প্রক্রিয়াকে বলে নাম খারিজা। খারিজা দাখিল না হওয়া পর্যন্ত আনুষঙ্গিক জমিতে নতুন প্রজার স্বত্ত্ব জন্মায় না।
৩https://gumaibil.com/%e0%a6%98%e0%a6%be%e0%a6%b8-%e0%a6%ac%e0%a6%bf%e0%a6%9a%e0%a6%be%e0%a6%b2%e0%a6%bf/
৪https://gumaibil.com/%e0%a6%98%e0%a6%be%e0%a6%b8-%e0%a6%ac%e0%a6%bf%e0%a6%9a%e0%a6%be%e0%a6%b2%e0%a6%bf-%e0%a7%a8-%e0%a6%97%e0%a7%8c%e0%a6%a4%e0%a6%ae-%e0%a6%9a%e0%a7%8c%e0%a6%a7%e0%a7%81%e0%a6%b0%e0%a7%80/
৫আহমদ, আবুল মনসুর, সেপটেম্বর ২০১৩, আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর, ঢাকা, খোশরোজ কিতাব মহল
