আমার প্রিয় শিক্ষক : ইউসুফ মুহম্মদ

শিক্ষা-জীবনের সকল স্তরে কিছু শিক্ষক থাকেন, যাঁরা দেবতুল্য। এই ধরনের শিক্ষক প্রসঙ্গে লেখার জন্য অনুরোধ করেছেন, খ্যাতিমান কবি রিমঝিম আহমেদ। তাঁর অনুরোধে লিখতে বসে দেখি বহু শিক্ষকই আমার প্রিয়। সবার কথা এই সংক্ষিপ্ত পরিসরে লেখা সম্ভব নয়। আমি শুধু আমার স্কুল শিক্ষকদের মধ্যে কয়েকজনকে সামনে আনবো। শিক্ষক প্রসঙ্গে বলতে গেলে সঙ্গত কারণেই শিক্ষা বিষয়টি সামনে চলে আসে। শিক্ষা ও শিক্ষক, একটি অন্যটির ‍পরিপুরক। শিক্ষা প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথের চিন্তা হচ্ছে, শিক্ষক শুধু তথ্য সরবরাহকারী নন, তিনি একজন পথপ্রদর্শক ও বন্ধু। তাঁর একটি কথা আছে এরকম, “একটি জ্বলন্ত প্রদীপই কেবল অন্য একটি প্রদীপকে জ্বালিয়ে দিতে পারে।” শিক্ষককে নিজেকেই একজন শিক্ষার্থী হতে হবে, নিরন্তর শিক্ষার্থী। রবীন্দ্রনাথ শুধু কথা বলে থেমে যাননি। তিনি শান্তিনিকেতন ও শ্রীনিকেতন প্রতিষ্ঠা করে শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটিয়েছেন। তবে বর্তমান যান্ত্রিক ও প্রতিযোগিতামূলক সময়ে মানবিক ও প্রকৃতিপ্রেমী দরদী মনের মানুষ তৈরির জন্য শিক্ষা নিয়ে নতুন করে ভাবনার অবকাশ রয়েছে। সে বিষয়ে আলোচনার ক্ষেত্র এখানে নয়। তাই আমি শুধু আমার প্রিয় শিক্ষক প্রসঙ্গেই কথা সীমাবদ্ধ রাখবো।

শিক্ষা জীবনের দীর্ঘ সময় যেসব শিক্ষকমণ্ডলীর সান্নিধ্য পেয়েছি তাঁদের কারো কারো কথা মনে হলে এখনো শ্রদ্ধায় হৃদয়-মন-মাথা ন্যুয়ে আসে। এ রকম শিক্ষকের কথা বলতে হলে প্রথমেই বলতে হয় জনাব তফজ্জল আহমদের কথা। তিনি আমার ক্ষুদ্র এ জীবন পথে আলোরদিশারী, সকল প্রেরণা ও উৎসাহের সারথী ছিলেন।

তাঁর সাথে প্রথম পরিচয় হয় আমি অষ্টম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হবার পরই। এর আগে স্যারকে আমি দেখেছি, কিন্তু তিনি অষ্টম থেকে দশম শ্রেণীর ক্লাস নিতেন বিধায় পরিচয়ের কোনো সুযোগ ছিলো না। স্যারের চলন বলন ছিল একেবারে সাধারণ। তাঁর মধ্যে জ্ঞানের আধার দেখেছি, কিন্তু আড়ম্বর কখনো দেখিনি। জ্ঞানগরিমায় ও মমতায় তিনি ছিলেন আমার কাছে এক বিস্ময়। তিনি আমাদের ইংরেজি ও অংকের ক্লাস নিতেন। অংক এবং ইংরেজি এ দুটো বিষয়ের প্রতি আমার অনীহা ও উদাসীনতার কথা স্যাররা সবাই জানতেন। তাই তিনি প্রায়ই আমাকে বাসায় ডেকে নিতেন এবং সহজভাবে সবকিছু বুঝিয়ে দিতেন। সে সময় আজকের দিনের মতো এতো কোচিং সেন্টার বা শিক্ষকের ঘরে ঘরে প্রাইভেট পড়ানোর রমরমা ব্যবসা ছিলো না। শিক্ষকরা যা করতেন মনের তাগিদে ছাত্রদের ভালোবেসে করতেন। সে সময় লেনদেনের কোনো বিষয় ছিলো না, ছিলো শুধু ছাত্রদের প্রতি স্নেহ ও প্রীতি। আমরাও স্যারদের শ্রদ্ধা ও বিনয়ের রসে ভিজিয়ে দিতাম। কিন্তু দিন পালটেছে, এখন আর ওই জাতীয় শিক্ষক বা ছাত্র নেই বললে অত্যুক্তি হবে না। তাছাড়া ক’দিন আগেই আমরা শিক্ষক হেনস্থার বিষয়টি প্রত্যক্ষ করেছি।

সে যা হোক, স্যারের একটি বিষয় খুব ভালো লাগতো, তিনি বিধিবদ্ধ পড়ার বাইরেও সাহিত্য ও নানা প্রসঙ্গ নিয়ে কথা বলতেন। সেই থেকে আমার ভেতর সাহিত্য ও সংস্কৃতির অঙ্কুরোদগম হয়। তবে সাহিত্যের প্রতি এ বীজাঙ্কুরের কাজটি শুরু হয় তারও আগে ষষ্ট শ্রেণীতে থাকা কালে। সে সময় আমাদের ব্যাকরণ পড়াতেন প্রমোদ রঞ্জন ভট্টাচার্য। তিনি ব্যাকরণের পাঠদান করার পর্যায়ে বিভিন্ন কবিতা আওড়াতেন এবং সেসব প্রাঞ্জল ভাষায় আমাদের সামনে ব্যাখ্যা করতেন। আমরা তাঁকে পণ্ডিত স্যার বলে জানতাম। পণ্ডিত স্যার একদিন ক্লাসে জানালেন বিদ্যালয় থেকে একটি স্মরণিকা প্রকাশ করা হবে। আমরা যেনো ছড়া, কবিতা, গল্প যে যা পারি এরজন্য লিখি। সে সময় আমাদের বিদ্যালয়ে দেয়াল পত্রিকা প্রকাশেরও রেওয়াজ ছিল। এর সম্পাদনা করতেন পণ্ডিত স্যার। সেটাতে ছড়া দিয়েই লেখা শুরু করেছিলাম। লেখার আগ্রহ আরো তীব্র হয় এই ম্যাগাজিনের জন্য লেখার নির্দেশ পেয়ে।

এই দুজন স্যারের যে দিকটি সবচেয়ে বেশি আকর্ষণীয় ছিলো, হা হলো তাদের পাঠদানের কৌশল। তাঁরা শুধু সীমিত পাঠদানেই সীমাবদ্ধ থাকতেন না। তাঁদের জ্ঞান বিতরণের স্পৃহা ছিল সীমাহীন। পাঠ্য বইয়ের বাইরের সাহিত্যের বহু বিষয় তাঁরা শ্রেণীকক্ষে আলোচনা করতেন। এতে ছাত্রদের জানার পরিধি বাড়তো এবং এরা জ্ঞানের আলোয় উদ্ভাসিত হতো। স্যারদের আলোচনা শুনতে শুনতে সাহিত্যের প্রতি আমার তীব্র আগ্রহ তৈরি হয়, শুরু করি বিভিন্ন ধরনের বই পড়া। একজন শিক্ষক চাইলে ছাত্রের চিন্তাধারায় ও চেতনায় বিশাল পরিবর্তন সাধন করতে পারেন। লোভ-লালসার ঊর্ধ্বে ওঠে শিক্ষকরা যদি ছাত্র-ছাত্রীদের স্নেহের চাদরে আচ্ছাদিত করে রাখতে পারেন তবে ছাত্ররাও তাঁদের নিরাশ করার কথা নয় । ছাত্র ও শিক্ষকদের মধ্যে সৌহার্দ্য বজায় থাকলে ছাত্ররা শিক্ষকদের কাছ থেকে অনেক কিছু শিখতে, জানতে ও আদায় করতে পারে।

শুরু করেছিলাম তফজ্জল আহমেদ চৌধুরী স্যারের কথা দিয়ে। আমি প্রায়ই স্যারের বাসায় যেতাম। তিনি বিদ্যালয়ে খুব ব্যক্তিত্ব নিয়ে চলা ফেরা করলেও বাসায় একেবারে অন্য মানুষ। তাঁর মধ্যে ছিলো কঠোর শাসন ও মমতার বিস্তার। ফলে বাসায় যেতে যেতে তাঁর সান্নিধ্যে থেকে জীবনের বহু বিষয় আমার আয়ত্তে আসে। তাঁর সাথে ক্রমে ঘনিষ্ঠ এক সম্পর্ক তৈরি হয়। তিনি মাঝে মাঝে আমাকে নানা বিষয়ে গল্প শুনাতেন এবং সাহিত্য চর্চায় বেশ উৎসাহ যোগাতেন। আমি অংকে ফেল করি। তবে সে সময় চালু থাকা গ্রেস-সিস্টেমের আওতায় এস এস সি পাশ করার পর জীবন-জীবীকার তাড়নায় অকস্মাৎ পড়া-লেখা থেকে ছিটকে পড়ি। যথাসময়ে কলেজে ভর্তি হওয়া সম্ভব হয়নি। তফজ্জল স্যার আমাকে একদিন ডেকে বললেন, “চিন্তা করো না, তুমিও হয়তো একদিন কলেজে পড়বে, তুমি পারবে, শুধু ধৈর্য ধরো আর মনে সাহস ও নিজের ওপর আস্থা বজায় রাখো”।

আমাদের শিক্ষক সমাজে এমন কিছু শিক্ষক থাকেন, যাঁদের কাছে শুধু পেশাগত দায়িত্ব পালনই শেষ কথা নয়। তাঁরা চাইলে একজন ছাত্রের জীবন পথের ব্যবস্থাপত্র দিতে পারেন। ছাত্রদের সৎ ও ন্যায়পরায়ন হওয়ার পথে চালিত করতে পারেন।

আমি শিক্ষা জীবন থেকে বেশ ক’বছর বাইরে থেকেছি। পড়া-লেখার বাইরে থাকলেও স্যারের সাথে আমার যোগাযোগ কখনো ছিন্ন হয়নি। সেই ‍দুঃসময়ে পথ চলার শক্তি-সাহস যুগিয়েছিলেন আমাদের এই শিক্ষক। তিনি নির্দিধায় আমাকে পরামর্শ দিতেন, সেই পরামর্শের কারণে তৈরি হয়েছি আজকের এই আমি। এখন বুঝতে পারি একজন ছাত্রের জীবনে ভালো শিক্ষকের ভূমিকা কতটা গুরুত্ববহ ।

মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না। আবশ্যক ঘরগুলো * দিয়ে চিহ্নিত করা হয়েছে