জীবন মাস্টার : মাহমুদ আলম সৈকত

এমন একটা সময়ে লিখতে বসেছি, যখন, মনে হচ্ছে মাথার ভেতরে নরম মগজের বদলে কেউ শক্ত একটা ইট বসিয়ে রেখেছে। ইটভাটার তিন নম্বর কাঁচা ইট নয়, পোড়া, শক্ত ইট। ছুঁড়লে যার শরীর থেকে আওয়াজ বেরোয়—টং! এই টং-টং শব্দের ভেতরেই খুঁজতে বসেছি ‘প্রিয় শিক্ষক’-এর মুখ। বিষয় হিসাবে প্রিয় শিক্ষক বা একজন অনুকরণীয় ব্যক্তির উল্লেখ শুনতে যতটা আবেগময় লাগে, আমার জন্য ঠিক ততটাই তা অস্বস্তিকর। কারণ এই টপিক আসলে তাদের জন্য, যারা ভাবুক মানুষ, যাদের সুন্দর সুন্দর স্মৃতি জমা আছে, যারা সেইসব স্মৃতি রোমন্থন করতে, সেসব মাঝেমধ্যে ডুবে থাকতে ভালোবাসেন, কিংবা যারা গল্পকার, সুন্দর বলতে পারেন। যারা ন্যারেটিভ গড়ে তুলতে পারেন। আমি এসবের কোনোটাই নই। এ-বিষয়ে লিখতেই হবে, এমন কোনও বাধ্যবাধকতাও বোধ করিনা। তদুপরি মৌলিক গদ্য লেখার ধাতও আমার নাই।

তারপরও, যেহেতু কিঞ্চিৎ ভাবতে হলো, তখন, বিষয়টি নিজেই আমাকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিতে শুরু করলো। আমার জীবনে কি আদৌ কোনো প্রিয় শিক্ষক ছিলেন? কিংবা আরও স্পষ্ট করে বললে, এমন কেউ কি ছিলেন যিনি আমার জীবন বদলে দিয়েছেন, বর্তমান ‘আমি’-কে গড়ে তুলেছেন?

চলচ্চিত্র কিংবা জৈবিক জীবনে, ফ্ল্যাশব্যাক একটি কার্যকরী ট্রিকস। হলেও, এটি বিশেষ ক্ষেত্রের বাইরে হরেদরে ক্লিশে, আমার কাছে। ফলে পিছন ফিরে তাকানোর চেষ্টা করি। শৈশবে, নুরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জসিম স্যার। শাসন ছিল, নিয়ম ছিল, ভয়ও ছিল। কিন্ডারগার্টেনের রাজ্জাক স্যার, লাইন ধরে দাঁড় করানো, হাতের লেখা ঠিক করানো, খেলাধুলায় নামানো। এরপর হাইস্কুল, ইবনে তাইমিয়ার ইংরেজি শিক্ষক আজিজ স্যার। এই পর্যন্তই স্মৃতির আলো পৌঁছায়। তা-ও ভাসাভাসা, যেন ঝুলে থাকা ভারি কুয়াশার ভেতরে দেখা কয়েকটা ছায়ামাত্র। কলেজ আর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা যেন স্মৃতি থেকে উবেই গেছে। মাস্টার্সের ফলাফল ‘তৃতীয় শ্রেণী’ তো আর এমনি এমনি আসে না—এটুকু তথ্যই হয়তো সবচেয়ে দৃঢ়ভাবে টিকে আছে।

আমি ব্যক্তিগতভাবে কখনোই মনে করতে পারি না যে কোনও একজন শিক্ষক আমার জীবন নাটকীয়ভাবে পাল্টে দিয়েছেন। বিষয়টা নিশ্চতভাবেই একপাক্ষিক নয়। আমিও কখনো আদর্শ ছাত্র ছিলাম না। ছাত্র-শিক্ষকের চিরন্তন সম্পর্ক, যেখানে শ্রদ্ধা আছে, অনুসরণ আছে, আদর্শ মানার চেষ্টা আছে, সেরকম সম্পর্কে আমি প্রবেশই করতে পারিনি। শিক্ষকদের সঙ্গে আমার সম্পর্ক ছিল একেবারেই প্রাথমিক স্তরের। প্রাইভেটে-কোচিংয়ে যতটুকু পড়তে গেছি, কিংবা কদাচিৎ ক্লাসে বসে লেকচার শুনেছি – এটুকুই। কোনো প্রশ্ন, কোনো তর্ক, কোনো অন্তরঙ্গ বৌদ্ধিক বিনিময়, কিছুই নয়। এরকম পরিস্থিতিতে তাহলে নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করতে হয়—আমার জীবনে কি শিক্ষকের কোনো প্রভাবই নেই? নিশ্চয়ই আছে। তাহলে সেই শিক্ষক কে বা কারা? কোথায় তার বা তাদের গুরুকুল?

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে শিখেছি, মানে, এমন না যে ‘অতঃপর আমি বুঝিতে পারিয়াছি’, বুঝতে বুঝতে গেছি, যে, কেবল রক্ত মাংসের মানুষই ‘শিক্ষক’ হন না। অনেক সময় পরিস্থিতিও শিক্ষক হয়ে ওঠেন। সময় নিজেই জরুরি বিষয়ে পাঠদান করে। দারিদ্র্য শেখায় কীভাবে হিসেব করে বাঁচতে হয়। রাজনৈতিক উত্তাল সময় শেখায় কীভাবে নীরব থাকতে হয়, আবার কখন কথা বলতে হয়। সামাজিক অবস্থান শেখায় সীমারেখা, কে কোথায় দাঁড়িয়ে কথা বলতে পারে, কে পারে না। সংসর্গ মানুষ চিনতে শেখায়। সংগঠন চেষ্টা করে শৃঙ্খলা শেখাতে, দায়িত্ব আর ক্ষমতার ভাষা বুঝতে। এই সবকিছু মিলেই একেকজন শিক্ষক। এই অর্থে, ব্যক্তি মানুষের চেয়ে সময়ই আমাকে বেশি শিখিয়েছে। সুন্দর করে, সুষমামন্ডিত অবয়ব নিয়ে নয়, বেশির ভাগ সময়ই রুঢ়ভাবে। কোনো প্রশংসা ছাড়াই, কোনো সার্টিফিকেট ছাড়াই।

আমার প্রিয় শিক্ষক তাই কোনো নির্দিষ্ট মুখ নয়। তিনি কোনো ক্লাসরুমে দাঁড়িয়ে চক দিয়ে বোর্ডে কিছু লেখেননি। তিনি পরীক্ষার খাতায় ভালো নম্বর দেননি। তিনি হয়তো আমাকে কখনো বলেনওনি, “তুমি পারবে।” বরং বারবার বুঝিয়ে দিয়েছেন, পারতে চাইলে নিজের পথ নিজেকেই বানাতে হবে।

বছর দশেক আগেও মনে হতো, জীবনে শারীরিক অস্তিত্বঅলা একজন শিক্ষক বা এমতন মানদণ্ডের ইউটোপিয়ান কেউ একজন থাকলে, সেই একজন হাত ধরে পথ দেখাবেন বা দেখাতেন। বয়স দশ বছর বাড়ার পর এখন আমি জানি, হাত ধরার লোক না থাকাটাও একধরনের শিক্ষা। এতে হাঁটাচলা খানিকটা কঠিন হয় বটে, সময়ে সময়ে হোঁচট খেয়ে পড়ে যেতে হয়, উঠে দাঁড়াতেও সময় লাগে। কিন্তু এই শেখাটা জীবনবোধের গভীরে বসে যায়। কৈশোরে নব্বইয়ের রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে বড় হওয়া আমাকে শিখিয়েছে, সব কথা ঠাস্ করে বলে ফেলা যায় না, কিন্তু সব কথা, প্রতিটি শব্দ-বাক্য শুনে রাখতে হয়, বাতিল মালপত্র ডাই করে রাখা চিলেকোঠায় ফেলে রাখতে হয়,  প্রয়োজনে ধুলো ঝেড়ে সেসব মনে করতে হয়। গোটা কৈশোর এবং অনতি তারুণ্য পর্যন্ত সময়টাতে দারিদ্র্যের মুখোমুখি হওয়া আমাকে শিখিয়েছে, স্বপ্ন (যদি দেখে থাকি সেসময়) বিলাসিতা নয়, দায়িত্ব। সমাজ আমাকে শিখিয়েছে, ন্যায় আর সুবিধা সব সময় একই ভরবিন্দুতে অবস্থান করে না। হাতেগোনা ক’বছর সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থেকে শিখেছি (বা সাংগঠনিক মানুষদের সাহচর্যে থেকেও), নেতৃত্ব মানে সামনে থাকা নয়, কোনওভাবে পরিচালনা করে যাওয়া নয় বরং সম্ভাব্য সকল ক্ষেত্রে দায় নেওয়া, এবং তা বহন করা।

এখন, এই সব শিক্ষকদের নাম তো কোনো রেজিস্টারে লেখা নাই! তাঁরা ক্লাসরুমে ক্লাস নেন না, তাদের পাঠ্যসূচি নাই, তাদের এলেমদারি নাই, পরীক্ষার প্রশ্নপত্র নাই, প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার ফ্যাকরা নাই। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে তাঁদের পাঠ এড়িয়ে যাওয়ার কোনও উপায় কিংবা সুযোগও নেই।

তবু, লিখতে লিখতেই ভাবনা উঁকি দিচ্ছিলো, হয়তো আমারও কোনো একজন শিক্ষক ছিলেন, যিনি হয়তো নীরবেই কিছু রেখে গেছেন। হতেই পারে, আমার ঘোলা দৃষ্টিতে তিনি ধরা পড়েননি, আমি তখন কিছু শিখতে চাইনি। এটা তো ঠিক যে, অনেক সময় শিক্ষকের চেয়ে ছাত্রের অযোগ্যতাই বড় হয়ে ওঠে। হলেও, আমার প্রিয় শিক্ষক আসলে সেই সময়-ই, যে আমাকে একবিন্দু ছাড় দেয়নি। যে আমাকে ভুল করতে দিয়েছে, আবার তার খেসারতও আদায় করেছে কড়ায়-গন্ডায়। সেই সময় আমাকে আদর্শ বানায়নি বটে, কিন্তু বাস্তববাদী করেছে। ফলে, এই লেখা কোনো কৃতজ্ঞতা প্রকাশের ফুলেল গদ্য নয়। বরং স্বীকারোক্তি। কেননা আমি কোনো একজন নির্দিষ্ট মানুষকে দেখিয়ে বলতে পারি না, যে, এই মানুষটি আমাকে গড়ে তুলেছেন। কিন্তু আমি নির্দ্বিধায় বলতে পারি, যে, জীবন আমাকে শিখিয়েছে। কঠিন হাতে, কখনো নির্মমভাবে, কিন্তু কার্যকরী।

সেই জীবনই আমার প্রিয় শিক্ষক। ‘জীবন’ নামের মহান শিক্ষক, আপনাকে বিপ্লবী অভিবাদন!

মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না। আবশ্যক ঘরগুলো * দিয়ে চিহ্নিত করা হয়েছে