আমার স্মৃতিসংবহনতন্ত্রে কজন স্যার : আনিফ রুবেদ

শিশুকালে ঘটে যাওয়া ঘটনা যখন এখন ভাবনার ভেতর আসে তখন সেগুলো একটা ভিন্নমাত্রার অর্থ নির্মাণ করে মনের ভেতর। মানুষের মগজ আজব এক রান্নাঘর। একই ঘটনাকে একেকসময় একেক রকমভাবে রান্না করে পরিবেশন করে যার মগজ তাকেই। ঘটনার ভেতর কখনো মশলা চড়িয়ে দেয়, কখনো লবণ কমিয়ে বা জ্বালের কমবেশ করে রান্নার রঙবাহার, গন্ধবাহার, স্বাদবাহার পাল্টে দেয়।

এই যে, এখন আমার স্মৃতিসংবহনযন্ত্রটা স্মৃতিখনি খুঁড়ে স্মৃতি তুলে আনছে আর স্মৃতিসংবহনতন্ত্রের পথে চালিয়ে দিচ্ছে অজ¯্র স্মৃতি। এসব স্মৃতির থেকে দুএকটি আমি বেছে নেব আর সেগুলো মগজকে রান্না করতে দেব আবার।


মনে পড়ছে, স্কুলের ছোটো ওয়ানের কথা। একটা কাঠের স্লেট বগলে চেপে ধরে পথের ধুলো ওড়াতে ওড়াতে যাচ্ছি স্কুলের দিকে। টিনশেডের তিনটে ঘর নিয়ে স্কুল। সব ক্লাসের বসার জায়গা হয় না। ছোটো ওয়ানে যারা পড়ে তারাকে নিয়ে বিনয় স্যার বসেন আমগাছের নিচে। স্যার বসেন একটা কাঠের নড়বড়ে চেয়ারে আর আমরা চন্দ্রাকারে মাটিতে বসে পড়া পড়ি, লেখা লিখি। বেশ ব্যাপার। এখন তো এ পরিবেশকে আমার মগজ বলছে, প্রাকৃতিক পরিবেশে পাঠদান, পাঠগ্রহণ।
ছোটো ওয়ানের জন্য কোনো বই ছিল না। বাজারে বিদ্যাসাগরীয় স্বরবর্ণের, ব্যাঞ্জনবর্ণের বই পাওয়া যেত চারপাঁচ টাকায়; সেটাই নিয়ে যেতাম। স্যার বলতেন, ‘পড় রে তোরা, পড়, নইলে মেরতে মেরতে মেরেই ফেলব।’ স্যারের এই ‘মেরতে মেরতে’ শব্দযুগলের কথা এখন মনে পড়লে হাসি লাগে কিন্তু তখন বেশ ভয় পেতাম। তার ‘পড় রে তোরা’ বলার পরপরই চিৎকার করে পড়তে শুরু করতাম ‘ক খ গ ঘ ঙ’। স্যার কোনোদিন কাউকে মারেননি।
স্যার মাত্র কিছুদিন আগে মারা গেলেন। এখনো মনে পড়ে, তার খদ্দেরের পায়জামা পাঞ্জাবী; রেগে যাওয়া, হাসি। আমার মগজ আমার স্মৃতিসংবহনতন্ত্রে যে ছবি ছড়িয়ে দেয়, তাতে প্রশ্ন জাগে, স্যার, আমাদের মারতেন না কেন? অন্য স্যারেরা তো মারতেন। এসব প্রশ্নের উত্তর মগজ রান্না করে দেয় আমাকে; আমি ভালো করে, পরিস্কার করে এর মানে বুঝতে পারি না। আমার মনে পড়ছে, আমাদের বিদ্যালয়ে একমাত্র হিন্দু শিক্ষক ছিলেন তিনি।


ভূদেব স্যার আমার বাবার বন্ধু ছিলেন। তিনি প্রায়ই আসতেন আমাদের বাড়িতে। আমাদের আঙিনার পেয়ারাগাছের নিচে কাঠের হলুদ চেয়ারে বসে চা খেতেন; বাবার সাথে গল্প করতেন। খুব হাসাহাসি করতেন তারা। অনেকদিন পর্যন্ত আমি তাকে ‘ভুদেব স্যার’ না বলে ‘ভূদেম স্যার’ বলতাম। এখন অনেকদিন পর আমার শিশুমীর কথা মনে করে আমারই হাসি পায়।
বিনয় স্যার বদলি হয়ে চলে যাবার পর তিনি এসেছিলেন আমাদের স্কুলে। বিনয় স্যার ছিলেন, ফর্সা, লম্বা পাতলা। ভূদেব স্যার ছিলেন কালো, লম্বা পাতলা। বিনয় স্যারকে সাদা চক বলতাম আমরা। আমাদের সাথে পড়ত কাজল রেখা। ভূদেব স্যার যখন নতুন এলেন আমাদের স্কুলে তখন কাজলরেখা স্যারকে দেখে বলেছিল, ‘সাদা চক চলে গেলেন, এলেন কালো চক; এখন আমাদের লেখার বোর্ডগুলোকে সাদা করতে হবে।’ আমরা খুব হেসেছিলাম।
একদিন আমাদের বাড়ির পাশে মঞ্চ তৈরি হলো। স্কুলের পড়া আগেই বানিয়ে নিয়ে মঞ্চের কাছে চলে গেলাম সন্ধ্যা হতেই। গম্ভীরা হবে। শুরু হতে দেরি হচ্ছে। যতক্ষণ দেরি হচ্ছে, ততক্ষণ গান গাইছেন স্বরলিপি শিল্পী গোষ্ঠীর শিল্পীরা। একসময় গম্ভীরা শুরু হলো। চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিখ্যাত লোকনাটক। গম্ভীরাতে চরিত্র থাকে দুজন। নানা আর নাতি। তাদের কা-কারখানা দেখে মানুষ হাসতে হাসতে লুটিয়ে পড়ে। এই গম্ভীরা দেখতে দেখতেও আমরা হাসছি; লুটিয়ে পড়ছি একেঅপরের গায়ে, পায়ে, পিঠে। আমার মামা বললেন, ‘এই গম্ভীরার নানাকে চিনতে পারছিস?’ মামা যখন প্রশ্ন করলেন তখন ভেবে নিলাম, নিশ্চয়ই আমার চেনা উচিত বলেই মামা প্রশ্ন করলেন। কিন্তু অনেকক্ষণ খেয়াল করেও বুঝতে পারলাম না। বড়ো বড়ো দাড়িগোঁফ, মাথায় মাথাল, হাতে গরু তাড়নার পাচন; একজন বয়স্ক কৃষক। মামা বললেন, ‘তোদের ভূদেব স্যার’। আমি অবাক হলাম; অবাক হয়ে স্যারের অভিনয় দেখলাম, নাচ দেখলাম, গান শুনলাম; গম্ভীরাতে এই তিনটিই থাকে। সেইদিন থেকে স্যারকে আমার ভালো লাগতো আরো বেশি।
আরও মনে পড়ে, স্যারের বাড়ির ওখানে গণেশ জননী মন্দিরে গণেশ পূজা হতো অগ্রহায়ণ মাসে। এখনও হয় কিন্তু যাওয়া হয় না। পূজার সময় মেলা বসত। জিলাপি, বাতাসা, সন্দেশ, পাঁপড়, গজা, তিলুয়া, মতিচুর, রসগোল্লাসহ নানারকম খাবার বিক্রি হতো। আমরা গেলে স্যার আমাদের নানাকিছু খাওয়াতেন।
তখনই জানতাম, ভারতের পশ্চিমবঙ্গে এ পূজা ব্যাপকভাবে হলেও, বাংলাদেশে হয় শুধুমাত্র চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার লাহারপুর গ্রামের তাঁতিপাড়ায়। তথ্যটাকে যাচাই করার জন্য এ লেখা লেখার সময় সার্চ দিলাম গুগলে; এআই যা জানাল তা ভুল কি ঠিক বুঝতে পারছি না। দুবার সার্চ দেওয়াতে দুরকম তথ্য দিলেন তারা। একবার বললেন, সুনামগঞ্জের লাহারপুরে এ পূজা হয়; দ্বিতীয়বার বললেন, নারায়গঞ্জের লাহারপুরে। এ অবস্থা দেখে আবারও সার্চ দিলে বললেন, চট্রগ্রামের লাহারপুরে। আর সার্চ দেব না।
ভূদেব স্যারও মারা গেছেন কিছুদিন আগে।


এবার সেমাজুল স্যারের সাথে যে স্মৃতিটা আছে তা বলে নেওয়া যায়। তখন কেবল সিক্সে উঠেছি। পরে ধীরে ধীরে খারাপ ছাত্র হয়ে উঠেছিলাম আমি কিন্তু ঐসময় ভালো ছাত্রই ছিলাম। সিক্সে কয়েকটা ক্লাসের পরেই স্যারের নজরে পড়ি আমি; খুব ভালো করে পড়া বানিয়ে নিয়ে যাই; স্যার আমাকে পড়া ধরে আরাম পান।
সেমাজুল স্যার ছিলেন খুব রাগী। পড়া না পারলে খুব মারতেন। সকলেই ভয় পেত। আমিও। একদিন তিনি পড়া ধরছিলেন এবং যারা পারছিল না তারাকে দাঁড় করিয়ে রাখছিলেন। সেদিন আমিও ছিলাম পড়া না পারাদের দলে।
স্যার সবাইকে মারবেন কিন্তু স্যারের কাছে লাঠি ছিল না। আমি খুব ভয় পাচ্ছিলাম। কোনোদিন পড়া পারিনি এমন হয়নি, আজকে পারিনি, আজকে তো মার খেতে হবে। আমার কাঁপুনি ধরে গেছিল। স্যার, আমাকেই বললেন, ‘লাঠি নিয়ে এসো।’ আমি অফিসে লাঠি আনতে চলে গেলাম। লাঠি এনে স্যারের হাতে দিয়ে নিজের জায়গায় গিয়ে পড়া পারা ছেলেদের মতোই বসে গেলাম। আমি মারের হাত থেকে বেঁচে গেলাম।
এখন যখন ওকথা আমার মনে পড়ে তখন বুঝতে পারি, স্যার আসলে সেদিন আমাকে মারতে চাননি; তিনি আমার কাঁপুনি টের পেয়েছিলেন। আমি বসে গেলাম আর তিনি ব্যাপারটা খেয়াল করলেন না, এমনটা হতেই পারে না।
আরও অনেক ঘটনা জমা হয়ে আছে আমার স্মৃতিসংবহনতন্ত্রে। সেসব পরে কোনোদিন রোমন্থন হবে হয়তো। সকল স্যার ভালো থাকুন।

মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না। আবশ্যক ঘরগুলো * দিয়ে চিহ্নিত করা হয়েছে