১
জন্মেছিলাম গণ্ডগ্রামে। নদী-জলাভূমি পরিবেষ্টিত সেই জনপদটি খুবই দুর্গম ছিল সে সময়, শহরে যেতে-আসতে রেলগাড়ি বা অন্য গতিযান পেতে সাত-আট ক্রোশ হাঁটতে হত। বাঁধ-আলপথের মেঠো রাস্তা, মাঝে নদী। অবস্থাপন্ন বা বিপদে পড়া মানুষজনের ছিল পালকি, কিন্তু তার হ্যাপা কম ছিল না। চার জন সমর্থ বেয়ারা জোগাড় আর তাদের বায়নাক্কা সামলাতেই দিন কাবার। রাত-বিরেত, বর্ষা-শীত সব কিছু উপেক্ষা করে বাবা-কাকারা এই হাঁটাপথের ক্লান্তি, বিরক্তি ও বিপদ উপেক্ষা করে মাসে অন্তত একবার করে গ্রামে আসতেন আমাদের একান্নবর্তী পরিবারের ছত্রছায়ার নিশ্চিন্ত অমোঘ আকর্ষণে।
তারপর একদিন সময়ের তাগিদে, ছয়-সাত বছর বয়সে দাদু-ঠাকুমার আদরের কোল শূন্য করে, বাবার হাত ধরে আমি আর মা গ্রাম থেকে শহরে চলে এলাম। রুজি-রোজগারের ধান্দায় বাবা ও মেজকাকা আগেই শহরে চলে এসেছিলেন। তারা তখন বাসাবাড়িতে থাকতেন, আর ক্রমে বুঝতে পারছিলেন, শহরে বা তার আশেপাশে একটা দীর্ঘস্থায়ী আচ্ছাদনের খুব প্রয়োজন। দাদুর সম্মতিতে গ্রামের বেশ কিছু দোফলা জমি বিক্রি করে, মা-কাকিমার সোনাদানা আর কিছু সঞ্চয়ের বিনিময়ে কলকাতা শহরের অদূরে, নদীর অপরপ্রান্তে তিন কাঠার জমির ওপর তৈরি হল ইঁট-চূণ-সুরকির নতুন ইমারত—আমাদের শহুরে-আস্তানা। মাথা গোঁজার এই কংক্রিটের ছাতাটির ব্যাপকতা বুঝতে আমার অনেকটা সময় লেগেছিল। বুঝেছিলাম অনেক পরে, যখন আমাদের যৌথ পরিবার ভেঙে তিন টুকরো হয়ে গেল। তখন বাবা নিজের স্ত্রী-সন্তানসন্ততি নিয়ে অল্প আয়ে বেসামাল, আমি সবে স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে সবেমাত্র কলেজে।
তবে রোদজল থেকে মাথা ঢাকবার যে ছাতা-বস্তুটিকে আমি শিশুবয়স থেকে চিনেছিলাম, তা বরাবরই আমার কাছে ছিল একটা বোঝার মতো। সেও কোনোদিন আমাকে ভরসা করতে পারে নি। জীবনের পদে পদে তার সঙ্গে আমার সহজাত বিচ্ছেদ। সে আমাকে যতবার ছেড়ে চলে গেছে, আমিও তাকে ভুলে গেছি ততবার। তবে এর জন্যে আমাকে কম ঝক্কি পোয়াতে হয় নি। ইস্কুলে ছুটির পর বাড়ি ফিরলে মা যখন দেখত ব্যাগে ছাতা নেই আমার ওপর খুব রেগে বলত, -আবার হারালি? আমি জানতাম, মায়ের এ-রাগ আসলে তাঁর উৎকণ্ঠা—আমার সেদিনের ভবিতব্যের। বাবার অফিস থেকে ফেরার পরে আমার সান্ধ্যকালীন বিনোদন।
২
ছোটবেলার কথা খুব মনে পড়ে, উপশহরের যে অঞ্চলে বেড়ে উঠছিলাম সেখানে দিগন্তপ্রসারী শষ্যক্ষেত ছিল না, তবে চারপাশ ছিল লাবণ্যময় সবুজে ভরপুর। কাছেদূরে ছোটবড় অগুন্তি নারকোল গাছ। ইতস্তত ফলের গাছ—আশপাশের পুরনো ভিটেয় আম-জাম-কাঁঠাল আর নতুন বসতির উঠোনে সদ্য-বসানো পেয়ারা, জামরুল, সুপারি। আমাদের বাড়িতে ছিল একটা কাঁঠাল গাছ জমির সঙ্গে বাড়তি পাওনা। বাড়ির আশপাশেই ছিল তিনটি পুকুর, আর একটা বড় জলাশয়। একটু দূরে বিশাল ছাতার মতো কয়েকটি গাছের নিচে–পাঁচিলে ঘেরা একটি গোরস্থান, বিকেলে দিদির সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে চলে যেতাম। দেখতাম তার এদিকওদিক চারপাশে কংক্রিট মাথা তুলছে। উপশহরও বেড়ে উঠছে আস্তে আস্তে আমার সঙ্গে তাল মিলিয়ে।
তখন বয়স নয় কি দশ। নিদারুণ নিদাঘ-দিনের জ্বালায় একটা কালবৈশাখীর জন্যে হা-পিত্যেশ করে বসে থাকতাম। বাড়ির উত্তরদিকে রাস্তা, তারপরেই একচিলতে মাঠ, আমাদের শ্বাস নেওয়ার একটু খোলা আকাশ। মাঠের পশ্চিমে লাগোয়া পুকুর, সীমানার পশ্চিমপাড় ইঁট চুণ-সুড়কিতে বাঁধানো। ইস্কুল থেকে ফেরা বেলা শেষ দুপুরে, তারপর এই দহনদিনে আমি বারবার জানলা খুলে আকাশ আর আর ওই একটুকরো জমিটার আগুনে জ্বলে ওঠা দেখতে দেখতে ক্ষেপে উঠতাম। তারপর একেকদিন ঝড়ে দিগন্ত কাঁপিয়ে কালো মেঘে আকাশ ঘনিয়ে বৃষ্টি আসত। আমরা দু-হাত মেলে আকাশের দিকে চোখ চেয়ে, চোখ বুজে ছুটতাম, গোল হয়ে ঘুরতাম, কাঁধ নাচিয়ে গান গেয়ে—পাখির মতো উড়তে চাইতাম, মাটিতে শুয়ে সারা গায়ে কাদা মাখতাম। এখন ছোটবেলার বৃষ্টিদিনের কথা মনে পড়লেই, Singin’ in the Rain-এ অবিশ্রান্ত বর্ষণধারাস্নাত সন্ধ্যায় ডন লকউড চরিত্রে জিন কেলি’র অসামান্য অভিনয়ের দৃশ্যটি ভেসে ওঠে। স্বতঃস্ফূর্ত হর্ষযাপনের এই উল্লসিত উচ্ছ্বাসের অংশটি বিষণ্ণদিনে এখনও মাঝেমধ্যে ইউটিউব খুলে মুগ্ধ হয়ে দেখি। উদ্দীপনা-উত্তেজনার তেজ জিন কেলি’র ডনের চেয়ে কোন অংশে আমার কম ছিল বলে এখনও মনে হয় না। তবে একটা বিরাট পার্থক্য ছিল অন্য জায়গায়। এই পরিবেশ-পারিপার্শ্বিকতায় আশ্চর্য প্রতীকি হয়ে উঠছিল ডনের হাতের ছাতাটি, তার স্পন্দিত গতিময়তার নির্ভরের মতো—কখনো প্রেমিকা, কখনও মাথায় ফুটবল-নাচানো মধ্যমাঠের আগুয়ান সেন্টার-ফরওয়ার্ড। যেন তিনি এক অর্কেস্ট্রেশনের কনডাক্টর, ছাতাটিকে ব্যাটন করে বারিধারার মহড়া নিচ্ছেন। প্রাণবন্ত অভিনয়ের সঙ্গে জিন কেলি ছাতাটিকেও যে কীভাবে আমাদের মর্মে গেঁথে দিয়ে গেছেন !
৩
ছাতা-হারানোর অঘটন আমার জীবনে বারবার ঘটেছে, আমার পরিণত বয়সেও, সময়-বিশেষে কখনও কখনও যৌবনে, দাম্পত্যে, পৌঢ়ত্বে ও বার্ধক্যে। বা স্থান-বিশেষে কোথাও কোথাও—যেমন কলেজে, মাঠ-ময়দানে, সিনেমা-হলে, কর্মক্ষেত্রে, রেস্তোরাঁ-কফিখানা বা বাসেট্রামে। সব ক্ষেত্রেই একাধিকবার আমি আমার বিস্মরণ-চিহ্ন দাগিয়ে আসতে পেরেছি। আর প্রতি ক্ষেত্রেই ছাতা-হারানোর বিয়োগব্যথা অনুভূত হয়েছে ঘরে ফেরার শেষ পর্বে, যখন বাস থেকে নেমে বাড়ির পথে হাঁটছি। যতদিন মায়ের তত্ত্বাবধানে ছিলাম ততদিন এসব হেলায় উড়িয়ে দিতাম। কিন্তু আমার পরিচর্চার একমাত্র অধিকর্ত্রী আমার সহধর্মিনী। একটা অনুশোচনায় ঠিক এই সময়টায় বড় বিব্রত বোধ করতাম। বাড়ি ফিরে আত্মরক্ষার যুক্তি কী হবে, এই নিয়ে একটা লড়াই নিজের মধ্যে চলতে থাকত। ছাতা হারানোর সদর্থক দিকগুলি কী কী হতে পারে, বা এ হেন সময়ে আমার তিনি বাড়িতে থাকতে পারেন কিনা। বা আমার তল্পিতল্পার দিকে লক্ষ্য করার মতো সময় বা খেয়াল তাঁর থাকবে কিনা। অপরাধীর ভাঙা মন নিয়ে এসব ভাবতে ভাবতে বাড়ির চৌকাঠে পৌঁছোতাম। আর কোনো কোনো দিন, হা=অদৃষ্ট, তখনই ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামত।
ছাতা বিয়োগের অঘটন কখন কীভাবে ঘটে তার একটা বিশ্লেষণ করে দেখেছি, যে বৃষ্টি হলে তবেই একমাত্র ছাতা হারানোর সম্ভাবনা থাকে। বাকি সময় তো ব্যাগের ছাতা ব্যাগেই থাকে এবং বাড়ি ফিরে আসে। মানে, বৃষ্টি হলে আমি ব্যাগ, থলি বা ব্রিফকেশ থেকে ছাতা বের করি, তারপর ছাতার দু’পা গজায়, নাচতে নাচতে আমাকে ফেলে পালায়।
অনেকদিন আগে, এক বৃষ্টির দিনে কফি-হাউসে এক বন্ধুর কাছে তার পারিবারিক একটা গল্প শুনেছিলাম। অবস্থাপন্ন বনেদী, একান্নবর্তী পরিবার। বাড়িতে দোল-দুর্গোৎসব হয়। সে-সময়ে তার দাদু ছিলেন বাড়ির সর্বময় কর্তা। তীক্ষ্ণ চোখে পরিবারের সব খুটিনাটির দিকে নজর রাখতেন। বাড়ির সবকটা ঘরে লাইট-পাখা ঠিকঠাক থাকা, দেওয়ালে আদ্দিকালের বাঁধানো ছবিগুলোয় কতটা ধুলোর পরত বা চার-চারটে দেওয়াল-ঘড়ি সবকটি কাঁটায় কাঁটায় মিলে সমান তালে চলছে কিনা, এরকম আরো অনেক ছোট-বড়-মাঝারি সবদিকে তাঁর সদা-সজাগ দৃষ্টি। বন্ধুরা তার প্রজন্মের খুড়তুতো-জাঠতুতো মিলে অনেকগুলি ভাই-বোন, কেউ পাঠপর্ব শেষ করে চাকরি বা পেশায়, আবার কেউ কলেজে বা উচ্চতর পড়াশোনায় ব্যস্ত। তাদের বন্ধুবান্ধব-সহপাঠী-সহকর্মীদের আসা যাওয়া লেগেই থাকত। বৃষ্টি-বাদলার দিনে বাড়ি ফেরার সময় কারোর কারোর দরকার হয়ে পড়ত ছাতার। অতিথি-অভ্যাগতরা বাড়ি এলে হঠাৎ-বর্ষায় ফেরার সময় যাতে বিপদে না পড়েন সে জন্যে কুলুঙ্গির পাশে দালানের দেওয়ালের হুকে চারপাঁচটি ছাতা ঝুলত। এ ব্যবস্থা বহু পুরনো, প্রায় তিন-পুরুষের। বছর আট-দশ আগে পুরনো ছাতা বাতিল করে গোটা পাঁচেক ফোল্ডিং ছাতা কেনা হয়েছিল। সেই সঙ্গে দাদু একটি নতুন নিয়ম করেছিলেন। কুলুঙ্গিতে রাখা খাতায় যিনি ছাতা নিচ্ছেন তাঁর নাম আর পাশে ব্রাকেটে যার সৌজন্যে তিনি অতিথি হয়েছেন তাকে তাঁর নাম খাতায় লিখে রাখতে হবে। দাদু ফাইফরমাশ খাটার বরিষ্ঠজন রামুকে এই বিষয়টি লক্ষ্য রাখার দায়িত্ব দিলেন। যিনি ছাতা ফেরৎ দিয়ে যাবেন, তাঁর নামটি খাতা থেকে কেটে দেওয়ার কাজ তার। বেশ কয়েক বছর ব্যবস্থাটি ঠিকঠাকই চলছিল, ছাতা সংখ্যায় কখনও চার, কখনও তিন, আবার কখনও দুই—বর্ষার শেষে আবার পাঁচ। একটা সুস্থিতি আসায় ব্যাপারটায় আর তাই কারও নজরে ছিল না। চৈত্রশেষের হঠাৎ এক কালবৈশাখীর সন্ধ্যায় ছাতা-ঝোলানোর দেওয়ালে দুখানা ছাতা দেখেই দাদু তড়াক করে লাফিয়ে উঠলেন। শেষ বৃষ্টি হয়েছে আশ্বিনে, এই ছমাসে তো কারোর ছাতা ব্যবহারের কথা নয়, তাহলে তিনটি ছাতা গেল কোথায়? সঙ্গে সঙ্গে রামুকে তলব। রামু তড়িঘড়ি খাতা খুলে বসল, খাতায় না-কাটা নাম একটি মাত্র, মানে একটি মাত্র ছাতা বাইরে। দুটো ছাতার কোনো হিসেব মিলল না। ছাতা নির্গমন নথি করার দায় শেষ প্রজন্মের আদরের নাতি-নাতনিদের। তাদের সঙ্গে দাদু পেরে উঠতেন না, তারা এসব অভিযোগ হেলায় উড়িয়ে, দাদুর টাকে হাত বুলিয়ে চলে যেত। দাদু সেদিন আর কাউকে কিছু না বলে দেওয়ালের হুক থেকে দুটো ছাতা আর কুলুঙ্গিতে রাখা খাতাটা সরিয়ে রাখলেন। পরদিন সকালে দামুকে নিয়ে বাজারে গিয়ে বেতের অর্ধচন্দ্রাকৃতি বাঁটের মোটা কালো কাপড়ের তিনটি পেল্লাই ছাতা কিনে হুকে ঝুলিয়ে দিলেন। ছাতা থাকুক, খাতা আর রইল না। তারপর থেকে দেওয়ালে ছাতার গতর আর গোমড়া-মুখের দিকে তাকিয়ে নব্য প্রজন্মের যুবকযুবতীরা কালেভদ্রে ছাতায় হাত দিতেন, বেশির ভাগ সময়েই অন্য দিকে চেয়ে বৃষ্টি মাথায় করেই বেরিয়ে যেতেন।
৪
আর কে ফিল্মসের শ্রী৪২০ ছবিতে বৃষ্টির বাহানায় রাজ কাপুর-নার্গিসের সলাজ ঘনিষ্ঠ হওয়ার দৃশ্যটি ভারতীয় সিনেমার সর্বশ্রেষ্ঠ রোম্যান্টিক মুহূর্ত হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে একটি ছাতাকে অবলম্ব ক’রে। মুষল বাদলধারা, ছাতার নিচে যুগলের আবেগঘন সান্নিধ্যে আরও কাছে আসা, ক্রমে প্রেমের প্রস্তাবনা, প্রতিশ্রুতি সেই সঙ্গে ভবিষ্যৎ-শঙ্কায় ব্যাকুল আর্তির প্রকাশ গানে গানে বিমূর্ত। এই আবেগমুহূর্তের ভরকেন্দ্রে মূর্ত হয়ে থাকে অনর্গল বৃষ্টি-ভেজা ছাতাটি, যার নিচে বিভোর প্রেমিক-যুগল। নার্গিসের চুল থেকে পড়া বৃষ্টিবিন্দু, কপালে টিপের পাশ দিয়ে দীঘল চোখের আকুলতা ছুঁয়ে টিকালো নাকে আর কপোল বেয়ে ঝরে পড়ে। এই দৃশ্য যখনই মনে পড়ে, এক আশ্চর্য আকর্ষণে আমি তখন শত-যোজন দূরে কৈশোরের নিজস্ব স্মৃতির গহনে—স্বপ্নে আবিষ্ট হই। আঁধার ঘন মেঘে এক ধানের ক্ষেতে আলপথে-পথে আমি যেন একা-একা হাঁটছি কোনো এক আনমনা কৃষ্ণকলির খোঁজে…
এখন মনকে সান্ত্বনা দিই, আমার হাতে তো ছাতা ছিল না, তাই দেখা হয় নি। হয়তো বা, সে কিশোরীর ছিল না আমাকে দেখার আকুলতা।
৫
চার্লি চ্যাপলিনের বিশ্ববন্দিত ছন্নছাড়া চরিত্রের ব্যবহার্যের উপকরণগুলির অন্যতম তাঁর বেতের লাঠিটি, যেটি প্রথম তাঁর হাতে ছাতা হয়ে আবির্ভূত হয়েছিল। জীবনের দ্বিতীয় ছায়াচিত্র, নির্বাক স্বল্পদৈর্ঘ্যের ছবি, হেনরি লেহরম্যান নির্দেশিত Between Showers। বৃষ্টি-ধরার মাঝে রাজপথের কাদাজলে বিব্রত এক নারী, আর সাহায্যের ছলে তার সান্নিধ্যের বাসনায় একটি অপহৃত ছাতা নিয়ে দুই পুরুষের উদগ্র শৌর্যের উৎযোগ। তার মধ্যে অবশ্যই উৎকৃষ্টজন চার্লি চ্যাপলিন। এই ছবিতেই তাঁর ভবঘুরে জীবনধারার শুরু, তারপর ইতিহাস।
চার্লি চ্যাপলিন। পৃথিবীর সমস্ত নিঃস্ব, নিষ্পেষিত মানুষের দুঃখকষ্ট, যন্ত্রণা-বেদনাগুলো যাকে বিচলিত ও বেপরোয়া করে তুলেছে বারবার। ব্যঙ্গাত্মক, উপহসিত, তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিটিকে ছাতার মতো ঢাল করে বারবার রুখে দাঁড়িয়েছেন তিনি–আস্ফালন ও আগ্রাসনের বিরুদ্ধে। কখনও মুক, কখনও বাঙ্ময় ছিল তাঁর অভিব্যক্তির অভিঘাতগুলি, কিন্তু প্রত্যয়ে অটল।
‘আমি বৃষ্টিতে ভিজতে ভালোবাসি। কারণ বৃষ্টিতে আমার কান্না কেউ বুঝতে পারে না।‘ চার্লি চ্যাপলিন কখন, কী প্রেক্ষিতে এই উক্তি করেছিলেন মনে পড়ছে না, তবে মর্মমূলে চিরনিষিক্ত হয়ে আছে।
বছর চার-পাঁচ আগের এক বৃষ্টি-বিঘ্নিত সকালের কথা মনে পড়ে গেল। অঝোর বৃষ্টির মধ্যে টোটোয় চেপে গ্রামের বাড়িতে ফিরছিলাম শহর থেকে। টোটোর মাথাটাই শুধু আচ্ছাদিত, দুপাশ দিয়ে ধেয়ে আসা জলের ঝাপটায় গোটা শরীর ভিজে একশা। পথে নদী পেরতে হয় কাঠের নড়বড়ে সাঁকোয়। সাঁকোর ঠিক আগে বাঁ-দিকে ঊঁচু নদীর চরে শ্মশান। সেখানে ইতস্তত মানুষের জটলা। শবযাত্রী—সংখ্যায় চোদ্দ-পনেরো, সবাই বৃষ্টি নিয়ে শশব্যস্ত। একটু দূরে রাস্তার পাশে বাঁশের মাচায় শায়িত শবদেহ, সাদা কাপড়ে ঢাকা। তার মাথার দিকে দাঁড়িয়ে এক দশ-এগারো বছরের কিশোর ছাতা দিয়ে ঝোড়ো-বাতাস ও বৃষ্টি থেকে শবদেহের মুখাবয়বটি ঢেকে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করছে। বড় বিষণ্ণ হয়ে উঠেছিলাম দৃশ্যটি দেখে। কার মুখ সে এত সযত্নে আগলে রেখেছে ! হয়তো কিছুক্ষণ পরে দাহমঞ্চে সেই মুখেই আগুন ছোঁয়াতে হবে তাকে। তখন তার চোখ কি চিকচিক করে উঠবে না, নাকি মুখ ফিরিয়ে নিস্পৃহায় আকাশের দিকে তাকিয়ে চেয়ে থাকবে সে ! কত অন্তস্থ অশ্রুজল তো অগোচরেই ঝরে যায়।
৬
এই বৃদ্ধ বয়সে চারপাশের পরিবেশ-মানুষজন বড় অস্পষ্ট, অসুস্থ, অচেনা হয়ে উঠছে। প্রতিনিয়ত হিংসা, অবিশ্বাস, স্বার্থের নির্লজ্জতা মরুবাতাসের তপ্ততীক্ষ্ণ বালুকণার মতো আমাকে দগ্ধ, ছিন্নবিচ্ছিন্ন করে। অবসাদে ক্লান্তি, বিপন্নতা আসে। তখন অসহায়ের মতো মেরি পপিন্সকে ডাকি। মেরি পপিন্স স্বপ্নে তার জাদু-ছাতা নিয়ে আমার কাছে আসে, হাত ধরে আমাকে উড়িয়ে নিয়ে যায় অসীম অনন্তের পানে। আমি কখন যে ঘুমিয়ে পড়ি। তারপর চোখ খুলে দেখি, রাত্রি গহন, প্রান্তরে খোলা আকাশের নীচে শুয়ে আছি। কালো আকাশটা ছাতার মতো, অদৃশ্য স্পাইক দিয়ে দিকচক্রবালের অন্ধকারে বাঁধা। তার অজস্র ফুটো দিয়ে নক্ষত্রকণার আলো বৃষ্টির মতো ঝরে পড়ছে। স্নিগ্ধ হাওয়া বইছে, আমি প্রাণভরে শ্বাস নিই।
