লোনা জলের স্মৃতি, একানব্বইয়ের সেই প্রলয়ংকরী রাত ★ রোকসানা বন্যা

স্মৃতির আলমারিটা খুললে আজও নোনা বাতাসের গন্ধ নাকে লাগে। আমরা চট্টগ্রামের মানুষ, সাগরের গর্জন আমাদের লোমকূপে মিশে থাকে। ঝড়-তুফান আমাদের কাছে ডাল-ভাতের মতো ছিল, কিন্তু ১৯৯১ সালের ২৯শে এপ্রিলের সেই রাতটি ছিল প্রকৃতির এক রুদ্রমূর্তির বীভৎস প্রকাশ, যা আমাদের জীবনের মানচিত্রটাকে এক রাতেই দুমড়ে-মুচড়ে দিয়েছিল।

​সেদিন সকালটা ছিল সাধারণের মতোন, কিন্তু থমথমে। সংসারের কাজের ব্যস্ততায় কখন যে বিপদ দোরগোড়ায় এসে দাঁড়িয়েছে, বুঝতে পারিনি। মা বারবার তাগাদা দিচ্ছিলেন, সিগন্যাল বাড়ছে, পানি ধরে রাখ। আমি তখন ভাবছিলাম, এত কিসের ভয়, আমরা তো পাহাড়-সমুদ্রের সন্তান। সিগনালের ভয় করিনা আমি। কিন্তু সন্ধ্যার আকাশটা যখন ধীরে ধীরে লাল রঙ ধারণ করে উঠল, আর বাতাসটা এক অদ্ভুত গুমুট গরমে ভারী হয়ে এল, তখন বুকের ভেতরটা প্রথম শিরশির করে উঠেছিল।এমন রঙ আকাশের আগে দেখিনি। তবুও কেন জানি অতোটা ভয় কাজ করেনি।

​সেই রাতে বিনোদনের জন্য ভিসিআর-এ ক্যাসেট ঢোকানো হয়েছিল। কিন্তু সিনেমার রোমাঞ্চকে ছাপিয়ে প্রকৃতির তাণ্ডব শুরু হলো। হঠাৎ করেই আকাশ চিরে বাতাসের এক পৈশাচিক চিৎকার। বিদ্যুৎ চলে গেল নিমিষেই। বাইরের সেই নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে কেবল শোনা যাচ্ছিল টিনের চালের আর্তনাদ, গাছপালা ভেঙে পড়ার শব্দ আর চারদিক থেকে শো শো বাতাসের তীব্র ধাক্কা, ভেসে আসছে আজানের ধ্বনি। মানুষ যখন নিরুপায় হয়ে পড়ে, তখন স্রষ্টাকে ডাকা ছাড়া আর কোনো গতি থাকে না।

বাতাসের বেগ কিছুটা কমে আসার পর ​দরজা খুলে যা দেখলাম, তা কোনো দুঃস্বপ্নের চেয়ে কম ছিল না। চারদিকে পানি। আমাদের বাড়ির কাছে চাক্তাই খাল। সমুদ্রের পানির উচ্চতা আমাদের আশপাশের এলাকাগুলোও ছড়িয়েছে চোখের নিমিষেই । নিচতলার মানুষের কান্নায় আকাশ বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। আশ্রয়ের খোঁজে পাড়ার মানুষজনেরা উপর তলার প্রতিবেশীদের, আমাদের ঘরে ভিড় করেছে। আমার মনটা পড়ে ছিল একটু দূরেই বাবার বাড়িতে। বারান্দায় দাঁড়িয়ে চিৎকার করে ডেকেছি, কিন্তু বাতাসের গর্জনে নিজের কণ্ঠস্বর নিজের কানেই পৌঁছাচ্ছিল না। পানির উচ্চতা জানালা ছুঁয়ে গেছে। আমার টেনশন কি করছে বাড়ির লোকজন! তাঁরা ঠিক আছে তো! তখন মোবাইলও আসেনি। সবার ঘরে ল্যান্ড ফোনও ছিলো না। আমার অস্হিরতা দেখে বাদল চেষ্টা করেছিল যাওয়ার, কিন্তু গেটের ওপর বড় গাছ উপড়ে পড়ে সব পথ বন্ধ। বুক সমান পানি। টিনের চালগুলো তখন কাগজের মতো আকাশে উড়ছে, আর আকাশ থেকে বৃষ্টির বদলে ঝরছে আগুনের ফুলকা। সে এক বীভৎস রূপ।

​সকালে যখন ঝড় থামল, পৃথিবীটা আর আগের মতো ছিল না। প্রকৃতি যেন এক রাতেই আমাদের সব অহংকার ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে। ধ্বংসস্তূপের মাঝখান দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে মনে হচ্ছিল, এ এক মৃত নগরী। বড় বড় গাছ, টিনের চালা আর ভাঙা আসবাবপত্রে রাস্তাঘাট বন্ধ। সবচেয়ে বড় আঘাত এল যখন শুনলাম মানুষের মৃত্যুর খবর। সেই বিষাদ কোনো ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।

​অর্থনৈতিকভাবে চাটগাঁর কোমর ভেঙে গিয়েছিল সেই এক রাতে। খাতুনগঞ্জ, চাক্তাই, আছদগঞ্জের মতো বাণিজ্যিক এলাকার গুদামগুলোতে লোনা পানি ঢুকে কয়েক বছরের সঞ্চয় সব নর্দমায় মিশে গেল। চাল, ডাল, তেল সব পচা দুর্গন্ধে একাকার। আমাদের নিজের দোকানের সব মালামাল লোনা পানিতে ভিজে নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। মধ্যবিত্ত মানুষের দীর্ঘদিনের শখের খাটের তোষক, সোফা, আলমারির কাপড়, সবই তখন আবর্জনার স্তূপ।

​পুরো এক মাস বিদ্যুৎ ছিল না। হারিকেন আর মোমবাতির আলোয় রাতের অন্ধকার আরও ভয়াবহ মনে হতো। এর দু’দিন পরেই ভূমিকম্পের মাইকিং শুনে ভয়ে সকলেই উপর তলা থেকে নেমে আসে। কেউ কেউ খোলা মাঠেও চলে যায়। ভয় এতোটাই ভিতরে কষ্ট দিচ্ছিল যে, ভূমিকম্পের আগাম বার্তা নেই এই বোধটুকুও সেদিন চট্টগ্রামের মানুষ হারিয়েছে।

খাবার পানির হাহাকার, চারদিকে পচা গন্ধ আর স্বজন হারানো মানুষের দীর্ঘশ্বাসে এক মাস আমরা যেন জীবন্ত লাশের মতো দিন কাটিয়েছি। ৯১-এর সেই তুফান আমাদের শিখিয়ে গিয়েছিল, প্রকৃতির সামনে মানুষ কতটা অসহায়। আজও যখন বৃষ্টি পড়ে বা বাতাসের বেগ বাড়ে, চট্টগ্রামের সেই লোনা জলের স্মৃতি আর আগুনের ফুলকার কথা মনে পড়লে শিরদাঁড়া দিয়ে এক শীতল স্রোত বয়ে যায়। স্মৃতিগদ্যের পাতায় সেই দিনগুলো কেবল একটি তারিখ নয়, বরং আমাদের বুকের ভেতরের এক গভীর ক্ষতচিহ্ন।

৯১-এর সেই স্মৃতির ক্ষত এতটাই গভীর যে, একবার নাড়া দিলে রক্তক্ষরণ থামতে চায় না। সেই প্রলয়ংকরী রাতের পর আমরা তো শুধু শহরের মাঝখানে বিদ্যুতহীন অন্ধকারের কষ্টটুকু দেখেছি, কিন্তু সমুদ্র উপকূলের সেই মানুষগুলোর ওপর দিয়ে যে সাক্ষাৎ আজরাইল বয়ে গিয়েছিল, তা ভাবলে আজও গলার কাছে কান্না দলা পাকিয়ে আসে।

​আমার সেই বিষাদমাখা গদ্যে এই অংশটুকু না জুড়ালে ইতিহাস অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।

​শহরের জীবনে আমাদের বড় কষ্ট ছিল এক মাস বিদ্যুৎ না থাকা আর জমানো আসবাবপত্রের বিনাশ। কিন্তু যখন একটু একটু করে বাইরের খবর আসতে শুরু করল, তখন বুঝতে পারলাম আমাদের এই ক্ষতি আসলে সমুদ্রের সেই জনপদগুলোর তুলনায় কিছুই নয়। আনোয়ারা, সন্দ্বীপ বা বাঁশখালী,পতেঙ্গার সেই মানুষগুলোর কাছে ওই রাতটি ছিল কেয়ামত।

​লবণাক্ত পানির সেই দানবীয় স্রোত যখন লোকালয়ে ঢুকে পড়েছিল, তখন মুহূর্তের মধ্যে জনপদগুলো লাশের মিছিলে পরিণত হয়। অনেকে বাঁচার তাগিদে বাড়ির কাছের গাছগুলোকে পরম মমতায় জড়িয়ে ধরেছিল। সারা রাত হাড়কাঁপানো বাতাস আর নোনা জলের ঝাপটায় সেই গাছ আঁকড়ে ধরে ঝুলে থাকা যে কতটা যন্ত্রণার, তা কল্পনা করলেও শরীর রি রি করে ওঠে। কত শিশু মায়ের কোল থেকে পিছলে গেছে, কত বৃদ্ধ হাত ফস্কে তলিয়ে গেছে সেই করাল স্রোতে, তার হিসাব কোনোদিন পাওয়া যায়নি। সকালে যখন জোয়ার নেমে গেল, দেখা গেল নোনা মাঠজুড়ে কেবল মানুষের নিথর দেহ আর মরা গবাদি পশু একাকার হয়ে পড়ে আছে।

​পানির স্রোত শুধু প্রাণ কাড়েনি, কেড়ে নিয়েছিল বেঁচে থাকার শেষ অবলম্বনটুকুও। টিউবওয়েলগুলো লোনা পানিতে ডুবে যাওয়ায় এক ফোঁটা পানযোগ্য জলের জন্য কী হাহাকার! এক গ্লাস মিষ্টি পানির জন্য তৃষ্ণার্ত মানুষের সেই আর্তনাদ আজও কানে বাজে। চারদিকে খাবারের জন্য হাহাকার, অথচ গুদামের সব চাল-ডাল তখন পচা কাদায় মিশে গেছে।

​উপকূলীয় এলাকার সেই মৃত্যু আর স্বজন হারানোর গল্পগুলো যখন একে একে কানে আসছিল, আমি নিজের ভেতরে চুরমার হয়ে ভেঙে পড়েছিলাম। নিজের ঘরের ভাঙা কাঁচ আর ভেজা সোফার শোক তখন তুচ্ছ মনে হতে লাগল। মনে হচ্ছিল, আমরা যারা বেঁচে আছি, তারা আসলে এক বিশাল দয়া নিয়ে বেঁচে আছি। সেই আমি কেবল আর্থিক সংকটে ভুগিনি, বরং এক গভীর মানসিক যন্ত্রণায় ডুবে ছিলাম। মানুষের এই অসহায়ত্ব, প্রকৃতির এই নিষ্ঠুরতা আর লাশের গন্ধে ভারী হয়ে আসে চট্টগ্রামের বাতাস। দিনশেষে আমরা সবাই বালির বাঁধের ওপর দাঁড়িয়ে আছি।

​একানব্বইয়ের সেই তুফান কেবল আমাদের ঘরবাড়ি ওলটপালট করেনি, আমাদের চেনা জগতটাকেও আজীবনের জন্য বিষাদমাখা করে দিয়ে গেছে। সেই স্মৃতি আজও যখন মনে পড়ে, বুকের ভেতরটা হু হু করে ওঠে, ঠিক সেই রাতের বাতাসের কান্নার মতো।

মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না। আবশ্যক ঘরগুলো * দিয়ে চিহ্নিত করা হয়েছে