বৃত্তে ঘেরা পরিধি ★ অনুভব আহমেদ

জীবনের অদ্ভুত এক নিয়ম হচ্ছে জীবন প্রতিনিয়ত পাল্টায়। শৈশব পাল্টে কৈশোর হয়, কৈশোর পাল্টে যৌবন, যৌবন পাল্টে মধ্যবয়স,মধ্যবয়স পাল্টে বার্ধক্য। প্রত্যেকটা যেনো একেকটা অধ্যায়। এক অধ্যায়ের সাথে অন্য অধ্যায়ের কোনোও মিল নেই।

জীবনের এক অধ্যায়ের সঙ্গে আরেক অধ্যায়ের এই অমিল কখনও কখনও দূর থেকে তাকালে রূপকথার গল্পের মতো লাগে। ফেলে আসা জীবনকেও তখন মনে হয় অন্য কারও জীবন। যেন সেই জীবন কোনওদিন আমার ছিল না। যেনো সেই জীবন বহু আগে পড়া কোনও গল্পের বিস্মৃত খণ্ডের মতো ফিরে ফিরে আসে স্মৃতির ভেতর।

ছোটবেলায় জ্বর আসতো গ্রীষ্মকালে। আম,কাঁঠাল ভর্তি বাড়িটায় ম ম দুপুরে জ্বর চড়ে গেলে মাথায় পানি ঢালতো কেউ না কেউ।দুধ জাল দিয়ে উপরে জমা সরের মত জ্বর ভেসে থাকতো আমার ওপরে, আমি তলিয়ে যেতাম।

চকলেট, জুস, চিপস -এমন নিরীহ খাবারগুলো আম্মা কর্তৃক নিষিদ্ধ ছিলো। শুধু জ্বর এলে সেই নিষেধাজ্ঞা তুলে দিয়ে আম্মাই সাধতো, খাবে? খাবে?

জ্বরের বিস্বাদ জীভ জড়িয়ে গেলেও মনের লোভেই খেতে চাইতাম। মাথার কাছের টেবিলটাতে ভিড় হতো দোকানের সেইসব মনোহরা খাবারের। খেতে পারতাম না কিছু। শুধু কষ্ট হতো, জানতাম জ্বর ভালো হলে আমার নিষ্ঠুর মা সব অন্য কাউকে দিয়ে দেবে। আমাকে ঘরের খাবারটাই খেতে হবে।

 এই জীবনে মানুষ যদি কোথাও ফিরতে চায়, তবে সে হয়তো তার শৈশবেই ফিরতে চায়। এই পাল্টে যাওয়া জীবনের ভিড়েও মানুষের মন বারবার ফিরে যেতে চায় সেই উৎসমূলে। বড় হওয়া মানে তো আসলে এক দীর্ঘ নির্বাসন। সেই নির্বাসন থেকে মুক্তির একমাত্র উপায় হলো স্মৃতির নৌকায় চড়ে শৈশবের ঘাটে নোঙর ফেলা।

মানুষ তার সারা জীবনের সব প্রাপ্তি আর অপ্রাপ্তির হিসাব চুকিয়ে দিনশেষে হয়তো সেই অতি চেনা উঠোনটাকেই খুঁজে ফেরে। যেখানে নিয়ম ছিল না, ছিল না কোনো কৃত্রিমতার আবরণ। আমাদের প্রত্যেকের ভেতরেই একজন অবাধ্য শিশু ঘুমিয়ে থাকে, যে সুযোগ পেলেই সভ্যতার সব মুখোশ ছিঁড়ে ফেলে দৌড়ে যেতে চায় সেই শৈশবে।

সারাজীবন ধরে মানুষ আসলে সেখানেই ফিরে যায় বারবার, নিঃশব্দে।

বারবার আমিও তাই ফিরে যাই। দেখি, সাদা চিকন পাড়ের শাড়ি জড়িয়ে আমাদের বাড়ির বারান্দায় বসে আছেন দাদি। দুপুর গড়িয়ে নামছে চারপাশে ঢুলুঢুলু হয়ে। বাগানের ঝরে পড়া শুকনো পাতা শুস্ক হাওয়ায় খসখস শব্দ তুলে উড়ে অছড়ে পড়ছে ফের। বাঁশবাগান থেকে কোনো পাখির অহেতুক চিৎকার ভেসে ভেসে ছড়িয়ে যাচ্ছে বাড়িময়। দাদি পান চিবুতে চিবুতে  ভাবছেন, এই বুঝি তার দুষ্টু নাতনি বিছানা ছেড়ে দৌড়ে বেরিয়ে পড়বে—গাছে গাছে চড়বে, পানিতে নেমে হাবুডুবু খাবে, ধুলো মেখে ধুলোর প্রতিমা হয়ে মায়ের হাতে বেদম মার খাবে। আর সারাদুপুর তিনি তার পিছু পিছু ছুটবেন, যাতে কোনও অঘটন না ঘটে।

আম্মার তৈরী দুপুরে ভাতঘুমের কঠিন রীতি ভেঙে নিভু নিভু পায়ে আমি এগোচ্ছি সেই দুর্দমনীয় মাঠের দিকে। আম্মার মারের ভয় ভুলে ধুলো মেখে, গাছে চড়ে, সন্ধ্যা নামার ঠিক আগে ফিরে এসে তার হাতেই মার খাব বলে। আর সেই মার থেকে আমাকে বাঁচাবেন টানা বারান্দায় বসে থাকা সাদা শাড়ির সেই বৃদ্ধা।

সময়ের কী নিষ্ঠুর চাল। সেই বৃদ্ধা কিংবা মেরে ভর্তা বানিয়ে দেয়া সেই মা দুজনের কেউ আর নেই আমার দুপুরগুলোকে নজরদারি করবার জন্য। একজন যিনি সমস্ত শাসন দিয়ে পৃথিবীর রুঢ়তা থেকে দূরে রাখতে চেয়েছেন, আরেকজন যিনি প্রশয় দিয়ে জয় করতে শিখিয়েছেন-তারা দুজনেই নেই।

কেবল আমি আছি। আজ যখন জীবনের কোনো রুক্ষ মরুভূমিতে দাঁড়িয়ে হাহাকার করি, তখন মনে হয়—পৃথিবীর সমস্ত ঝড় থেকে বাঁচানোর জন্য আম্মার  সেই মার কিংবা দাদির সাদা আঁচলটাই কি যথেষ্ট ছিল না?

ঝড়ের সাথে জীবনের বড় যোগাযোগ। কোন ঝড় যে কখন এসে গাছের মত কোন জীবনকে নুঁইয়ে দিয়ে যায় কে জানে! ঝড় শব্দটা লিখতে গিয়ে মনে হলো বড় হতে হতে ঝড় শব্দটা কেমন ভীতিকর চেহারা হয়ে উঠেছে। অথচ শৈশবে ঝড়ের এমন অর্থ আমি জানতাম না। বৈশাখের শুরু মানেই আমরা জেনে যেতাম হঠাৎ এক খর রোদের দুপুরে ঈষাণ কোণ কালো মেঘে ছেয়ে যাবে।

 আকাশটা যখন ধীরে ধীরে ভারী হয়ে আসত, তখন প্রকৃতির ভেতর এক অদ্ভুত রূপান্তর ঘটত। মনে হতো, কেউ যেন দিগন্তের ওপারে এক বিশাল কালো মখমলের চাদর বিছিয়ে দিচ্ছে। তপ্ত দুপুরের গুমোট ভাব কাটিয়ে হঠাৎ বাতাসের শিরশিরানি বলে দিত, আসছে। কালবৈশাখী আসছে।

বাঁশবাগানের মাথাগুলো যখন ডাইনে-বাঁয়ে দুলতে শুরু করত, আর আমগাছের পাতাগুলো উল্টো পিঠ দেখিয়ে আতঙ্কে কাঁপত, তখনই শুরু হতো আসল নাটক। বড়দের হাকডাক, গরুগুলোকে গোয়ালে তোলার ব্যস্ততা, উঠোন থেকে কাপড় সরাবার হুড়োহুড়ি—সব মিলিয়ে এক মহাযজ্ঞ। আমি তখন মুগ্ধ হয়ে আড়ালে দেখতাম প্রকৃতির সেই সংহারী রূপ। বিদ্যুতের চিকচিক আলো যখন চারপাশকে এক মুহূর্তের জন্য সাদা করে দিত, তখন মনে হতো মহাকালের কোনো অতিকায় ড্রাগন মেঘের আড়ালে গর্জন করছে।

সেই ঝড়ের ভেতর একটা বুনো স্বাধীনতা ছিল যেনো। মনে হতো, মানুষ কত ক্ষুদ্র! প্রকৃতির এক ঝাপটা বাতাসেই আমাদের সভ্যতার অহংকার তাসের ঘরের মতো কাঁপতে শুরু করে। টিনের চালে বৃষ্টির সেই রণবাদ্য আর জানালার পাল্লার ঠকঠক শব্দ আজও কানে বাজে। সেই শব্দের ভেতর আমি এক আদিম সুর খুঁজে পেতাম, যা আমাকে ঘরবন্দি থেকেও অরণ্যের ডাক দিত।

ঝড়ের বিকেলে অংকের মাস্টার আসতেন না, সন্ধ্যায় পড়তে বসা ছিলো না। দমকা বাতাসে ভেঙে পড়া গাছটা, গরুর ঘরের উড়ে যাওয়া টিনটা কিংবা গ্রামের কারো কাচা ঘর ধ্বসে যাওয়ার ঘটনায় সে সন্ধ্যাটা বড়দের পড়তে বসার তাড়াহীন সন্ধ্যা। বিদ্যুৎহীন সেই সন্ধ্যায় আমাদের একমাত্র সঙ্গী ছিল কেরোসিন বাতির ম্লান হলুদ আলো। দেয়ালের গায়ে আমাদের ছায়াগুলো যখন দীর্ঘ হতো, তখন চারপাশটা যেন এক রূপকথার রাজ্য হয়ে উঠত। মনে হতো আরব্য রজনীর শেহেরজাদ খুলে বসেছে তার গল্পের বাক্সো। বাতাসের ঝাপ্টায় জানলার ফাঁক দিয়ে দেখা যেত নারকেল গাছগুলো যেন আকাশের সাথে কোনো এক প্রাচীন মল্লযুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে।

তারপর একসময় ঝড় থামত। এই থামাটা ছিল এক অপার্থিব শান্তির প্রতীক। বৃষ্টির পর ভিজে মাটির যে ঘ্রাণ—পৃথিবীর কোনো দামি সুগন্ধি কি তার সমতুল্য হতে পারে? ঝড় শেষে চারপাশটা যখন নতুন করে ধুয়ে-মুছে সাফ হয়ে যেত, তখন মনে হতো পৃথিবীটা যেন সদ্যজাত কোনো শিশু। উঠোনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কাঁচা আম, ভেঙে পড়া ডালপালা—এসবই ছিল আমাদের ঝড়ের পরের সম্পদ। সেই আম কুড়োনোর আনন্দ ছিল কোনো রাজকোষ জয়ের চেয়েও বেশি।

আমাদের স্টিলের বালতি ভরে উঠতো কুড়ানো আমে। আহা দিন!

আকাশে তখন হয়তো একটু মেঘের আভা বাকি থাকত, কিন্তু বাতাসে থাকত এক অদ্ভুত স্নিগ্ধতা। মনে হতো, প্রকৃতি তার সব ক্ষোভ উগরে দিয়ে এখন নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে।

নিজের ভেতর এক অবিনশ্বর শিশু নিয়ে আমরা কেবল বড় হয়ে যাই,বেড়ে উঠি।

আসলে মানুষ কখনও পুরোপুরি বড় হয় না। মানুষ তার ভেতরে এক টুকরো শৈশবকে সারা জীবন বয়ে বেড়ায়। যখন জীবনের বড় বড় ঝড়ে আমরা বিধ্বস্ত হই, যখন চারপাশটা কুয়াশাচ্ছন্ন লাগে, তখন আমরা অবচেতনভাবেই ফিরে যেতে চাই সেই টানা বারান্দায়। আমরা খুঁজি সেই সাদা শাড়ির আশ্রয়, সেই কেরোসিন বাতির মৃদু আলো আর সেই নির্ভয় বিকেল।

আজ যা সত্য, কাল তা স্মৃতি। কিন্তু স্মৃতির এই আনাচ-কানাচেই লুকিয়ে থাকে মানুষের  প্রকৃত অস্তিত্ব।

এখন শহরের কংক্রিটের ভেতর থেকেও যখন হঠাৎ কালবৈশাখীর মেঘ দেখি, তখন সেই পুরোনো দিনগুলোর কথা মনে পড়ে। মনে পড়ে টিনের চালে বৃষ্টির রণবাদ্য, মায়ের ডাক, কেরোসিন বাতির হলুদ আলো, আর ঝড় শেষে ভেজা মাটির গন্ধ। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ অনেক কিছু ভুলে যায়, কিন্তু কিছু ঝড় কখনও ভোলা যায় না। তারা আমাদের ভেতরেই থেকে যায়—এক টুকরো শৈশব হয়ে, এক টুকরো অস্থির আকাশ হয়ে।

জীবন মানুষকে কত দূরে নিয়ে যায়। তবু কোনও কোনও রাতে হঠাৎ মেঘ ডাকলে এখনও মনে হয়—এই বুঝি দৌড়ে বেরিয়ে যাব, কাদামাখা উঠোনে পড়ে থাকা কাঁচা আম কুড়াব, আর টানা বারান্দায় বসে থাকা সাদা শাড়ির সেই বৃদ্ধা দূর থেকে আমাকে ডাকবেন।

আসলে, মানুষ তার সারাজীবনের দীর্ঘ পথচলায় নিজের ভেতরে এক চিরকালীন কালবৈশাখীর বিকেল লালন করে বেঁচে থাকে। সেই বিকেলেই আমাদের মুক্তি, সেখানেই আমাদের ঘর।

মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না। আবশ্যক ঘরগুলো * দিয়ে চিহ্নিত করা হয়েছে