স্মৃতির আবেগগুলি নড়েচড়ে ★ রাণা রায়চৌধুরী

ছাতা

আমি সাইকেলে। সামনের রাস্তা দেখা যাচ্ছে না। কারণ সামনে এক বিরাট খোলা ছাতা, কালো রঙের দেওয়াল। ছাতাকে পাস কাটিয়ে গেলে উল্টো দিক থেকে আসা সাইকেল বা মানুষের সঙ্গে আমার ধাক্কা লাগবে।

ফলে সামনের ছাতার ওপর আমার ভীষণ রাগ হচ্ছিল। আমাকে ছাতা এগোতে দিচ্ছে না। সামনের ছাতাটি পুরুষ না নারী? নারী নয়, এক বাচ্চা মেয়ে। ফলত আমার রাগের সঙ্গে মায়া ও স্নেহ মিশল মনে। আমি ধীরে সাইকেল চালাই। এখনো চালাচ্ছি

২।

আরেকটি ছাতার কথা মনে আছে, আমার কিশোরবেলার সেই ছাতা। একটি নয়, দুটি। প্রথমটি নরেন ঘোষের ছাতা। পোস্টাপিসের পিয়ন। প্রবল গরমে সে প্রতি মাসের প্রথমে আমার মায়ের স্কুলের মাইনে দিতে আসত পায়ে হেঁটে। মা নরেনদা ডাকত, আমিও নরেনদা ডাকতাম। নরেনদার কালো ছাতা রোদে পুড়ে পুড়ে ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। ছাতাটির কাপড় দেখলে বোঝা যায় যে, সে বহু যুদ্ধের যোদ্ধা। সে অনেক পথের পথিক।

নরেনদা রোদে ও বর্ষায় আমাদের গ্রাম ছাড়া আরও কতগুলো গ্রামে চিঠি ও টাকাপয়সা বিলি করত তা আমি জানতাম না। আমাদের গ্রামে কোনো ব্যাঙ্ক ছিল না। ফলে পোস্ট অফিস-ই গ্রামের মানুষের টাকা পাঠানোর এবং টাকা বা বেতন পাওয়ার আশ্রয়।

আমার এখন অনেক বছর বাদে মাঝে মাঝে মায়ের মুখের সঙ্গে, নরেনদার ক্লান্ত ফর্সা মুখের কথা মনে পড়ে। সঙ্গে মনে পড়ে তার বিবর্ণ মলিন ছাতাটির কথা। এতদিনে নরেনদা নেই, নেই তার ছাতাটিও। পৃথিবীতে ব্যবহৃত ব্যবহৃত হতে হতে বিবর্ণ ছাতার দল কোথায় শেষ পর্যন্ত পৌঁছয়? মহাকাল তাদের কোথায় নিয়ে যায় শেষ অবধি?

৩।

পোস্ট অফিসের পিয়ন নরেনদার ছাতা ছিল সেকেলে। সে ছাতার মধ্যে আধুনিকতার কোনো ছাপ নেই।  শুধু রোদের তাপ ও বর্ষার জল থেকে মাথা ও শরীরকে বাঁচানো। ছাতার কাপড় কালো এবং লাঠির  মতো লম্বা। ছাতা কোনো কোনো সময়ে লাঠিরও কাজ করত গ্রামের মানুষের কাছে।

নরেনদার ছাতা তার কাছে ছিল ফ্যামিলি মেম্বারের মতো। নরেনদার সেই ফাকাসে কালো ছাতাটি ছিল তার সন্তান অথবা পাহারাদার – কত প্রবল বর্ষা, কত ভীষণ দাবদাহ থেকে এই ছাতা যে তাকে বাঁচিয়েছে!

কিন্তু আমাদের রুবি মাসির ছাতা ছিল প্রবল আধুনিক। আর ডি বর্মণের গানের মতো সুরেলা সেই ছাতা। রুবি মাসির ছাতা নরেনদার ছাতার মতো সোজা-সাপ্টা নয়, সে আধুনিক এবং প্যাঁচালো। সে টু ফোল্ডের ছাতা। সে দুটো ভাঁজে নিজেকে ছোট করে নিতে পারে, আবার রোদে বা জলে, সে নিজেকে  ফুলের মতো মেলে ধরতেও জানে।

রুবি মাসির কালারফুল ছাতা দেখে গ্রামের সাধরণ মানুষ যেমন অবাক হত, তেমন অবাক হত রোদও। ফলে গ্রীষ্মের প্রবল রোদও রুবি মাসির রঙিন খোলা ছাতার অপর কেমন যেন মেঘলা হয় ঝরত।

রুবি মাসি, আমার মায়ের স্কুলের কলিগ, রিক্সায় আসত স্টেশনের ধারের গ্রাম থেকে, এসে থামত আমাদের বাড়ির সামনে, তারপর আমার মায়ের সঙ্গে একসঙ্গে স্কুলে যেত। তখন খুলত তরুণী রুবি মাসির ছাতা। সে এক অবাক করা ম্যাজিক। শাড়ির সঙ্গে প্রতিদিন ম্যাচ করা ছাতার রং ও নকশা। আমি কিশোর বয়সে ভাবতাম, তাহলে রুবি মাসির কতগুলো ছাতা? বিস্ময় লাগত। বিস্ময় নানান ভাবে লাগতে পারে। এখন ভাবলে অবাক লাগে, যে আমি ছাতা বিষয়েও কত বিস্মিত হয়েছিলাম একদা!

টু ফোল্ড ছাতা। শৌখিন। এবং পলকা। প্রবল বৃষ্টিতে বা একটু বেশি হাওয়ায় সে ছাতা হাত থেকে ছিটকে গেলে সে ঘুড়ির মতো উড়তে উড়তে অনেক দূরে পড়ার সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু তা অবশ্য কোনোদিন হয়নি। জীবনে সুখী রুবি মাসির – ছাতাও সুখী ও নরম ছিল চিরকাল। তার সঙ্গে ছিল সেইসব রঙিন ছাতার দল, যারা তার সঙ্গে সঙ্গত করে গেছে বসন্তে গ্রীষ্মে হেমন্তে ও বর্ষায়।

ঝড় অথবা কালবৈশাখী

এখন তো আধা শহরে থাকি, ফলে ঝড় বা কালবৈশাখীর শুরুটা বা তৈরি হয়ে ওঠাটা বুঝতে পারি না। যেন হঠাৎ করে শুরু হল কালবৈশাখী। কিন্তু কালবৈশাখী শুরুরও একটা শুরু থাকে। কবিতা লেখার প্রস্তুতির মতো সে প্রস্তুতি – সেই প্রস্তুতির শব্দ আমি ছোটবেলায় গ্রামে থাকতে বুঝতে পারতাম- টের পেতাম। তখন ছোট ছিলাম, তবু বুঝতাম এক আনন্দময় বিপর্যয় আসছে। দিগন্তে ঘন কালো মেঘ। যেন কোনো শিল্পী তার ক্রোধ আঁকছে, এঁকেই যাচ্ছে, দিগন্তে। যেখানে আকাশ উপুড় হয়ে প্রায় শেষ হয়ে আসছে, সেখানে গর্জন করছে, ঝড়ের প্রস্তুতি। শহরে এই প্রস্তুতি বোঝা যায় না, বা দেখা যায় না।

কালবৈশাখী শুরু হল গানের মতো। ধানবোনা খেত দিয়ে যাচ্ছিল এক নিরীহ গোখরো সাপ, তাকে ঝড় যেন হাতে করে তুলে নিল আকাশ পর্যন্ত। কালবৈশাখীর বিষধর সাপ যেন এক শিশুর খেলনার মতো দুলছে।

কালবৈশাখীর ঝড় এলেই আমরা ছোটরা আমবাগানে ছুটতাম আম কুড়োতে। সে ছিল ফজলি আমের বিরাট বাগান। বড় বড় ফজলি আম – কখনো ল্যাংড়া বা কাঁচা মিঠে আম বাগানময় গাছ থেকে ঝড়ের আঘাতে ঝরে পড়ছে। আমরা আম কুড়োচ্ছি। সে এক অদ্ভুত নাচের দৃশ্য! ঝড়ও নাচছে রবীন্দ্রনাথের শ্যামা গীতিনাট্যের মতোন, আমরা ছোটরাও কালবৈশাখীর ঝড়কে সাথ দিচ্ছি, আমাদের বালক মনের ঝড়কে দিয়ে!

আমরা ছোটরা মানে আমি রাজু নিনি প্রদীপ বাদল সমর – আমাদের মধ্যে একজনই বালিকা – সে মিলি, আমাদের বাড়িওয়ালার মেয়ে – সে ফ্রক পরে আম কুড়োচ্ছে আর তার বড় ফ্রক থলের মতো করে, তার মধ্যে রাখছে।

একই ঝরে পড়া আমে হয়তো আমি আর মিলি দুজনেই হাত দিয়েছি নেব বলে, মিলির বালিকা আঙুলে আমার বালক আঙুল লেগে গেলে ঝড় যেন হঠাৎ থমকে থেকে আবার তার তীব্রতা শুরু হয়। ধুলোয় চোখ চিকচিক করছে। এবার বৃষ্টি শুরু হল, বিদ্যুৎ চমকাতে শুরু করল। এক বীভৎস ভয়ের পরিবেশ, সন্ধে নামল। আমরা তখন ঝড়ের মধ্যে আম-বাগানে, বিষাক্ত সাপ আমাদের পায়ের পাশ দিয়ে চলে যায় – ঝড়ে আম কুড়ানো তার সন্তানের সন্ধানে। বাচ্চা সাপ আম খায়? হ্যাঁ খায় তো!

ঝড় চল যাওয়ার পর এক শীতল স্থিতি। যেন – শোক বয়ে গেল। নয় তো – আনন্দ বয়ে গেল আমাদের জীবনের ওপর দিয়ে। সব বাতি নিভিয়ে দিয়ে গেল। চোখের জল মুছে, বাড়ির মেয়েরা আবার বাতি জ্বালে, আলো ফিরে আসে আমাদের জীবনে একটু একটু করে। আর ঝড়ে কুড়ানো আমগুলো কেমন যেন নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ে থাকে মেঝের এক কোণে! ঝড় পরবর্তী গান, কেউ যেন গেয়ে ওঠে দূরে অথবা কাছে কোথাও।

মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না। আবশ্যক ঘরগুলো * দিয়ে চিহ্নিত করা হয়েছে