আমরা প্রত্যেকে কোনো না কোনো ভাবে বেঁচে থাকি আমাদের স্মৃতিতে। জীবনের সবচেয়ে কষ্টের মুহূর্তটিও এক সময় আমাদের কাঙ্ক্ষিত স্মৃতি হয়ে ওঠে। প্রতিটা মুহূর্ত আমরা বেঁচে থাকি স্মৃতি তৈরি করার জন্য। আজ যে সময়, একদিন পরেই সেটা ম্মৃতি। স্মৃতিতে যত পাক ধরে, তত যেন বেঁচে থাকা অর্থপূর্ণ মনে হয়। লিখতে বসেছি শালিকা উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় নিয়ে। মাত্র দুটি বছর, ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণিতে পড়েছি এই স্কুলে। অষ্টম শ্রেণিতে উঠে মেহেরপুর সরকারি বালক বিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম। সময়ের বিচারে অন্যদের তুলনায় আমার স্মৃতির ভাণ্ডার কম হওয়ার কথা। কিন্তু কম হলেও নিজেকে দরিদ্র মানতে চাই না। দু বছরের সমৃদ্ধ একটা স্মৃতিভাণ্ডার আমার আছে। তাছাড়া এই গ্রামের ছেলে আমি, বেড়ে ওঠা এখানকারই আলো-বাতাসে। এই বিদ্যালয়ের মাঠে খেলেছি এই সেদিনও। ক্রিকেট-ফুটবলে আমার যত সুখস্মৃতি, জয়-জরাজয়ের স্কোরবোর্ড, সবই মিশে আছে এই মাঠের সবুজ, কখনো কখনো হলুদ হয়ে ওঠা ঘাসে। একদিন হয়ত থাকবো পৃথিবীর কোথাও। মানুষ যখন চলে যায়, তখন সে অন্যের স্মৃতির মধ্যে বেঁচে থাকে। জড় কিংবা নিশ্চল জীবেরও স্মৃতি থাকতে পারে, যেমন গাছের স্মৃতিতে আমি বেঁচে থাকতে পারি, স্কুলের লোনাধরা দেয়ালে যে আমি টপকে ছিলাম এক ক্লান্ত দুপুরে, সেই দেয়ালের স্মৃতিতেও আমি বেঁচে থাকি, এভাবে আমার বেঁচে থাকার কতগুলো সম্ভাব্য চিত্রনাট্য আমি এখানে রেখে গেছি।
আমি যখন ভর্তি হই, সময়টা ছিল বিদ্যালয়ের সুখ ও সমৃদ্ধির। শিক্ষক হিসেবে আমরা পেয়েছি জেলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিক্ষকদের। আওয়াল স্যার, আজ যিনি প্রতিষ্ঠানের যোগ্য প্রধান শিক্ষক, তিনি তখন আমাদের ইংরেজির ক্লাস নিতেন। আমার প্রতি তাঁর পক্ষপাত ছিল বলে মনে হতো, পরে দেখি, পক্ষপাতের চেয়ে শ্লাঘার বিষয় হলো, তিনি আমাকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন। অত্যন্ত আনন্দের বিষয় ছিল যে, সে সময় স্কুলের ‘বাঘ’ পরিচয়ে খ্যাত খোরশেদ স্যারের ক্লাস আমরা ষষ্ঠ শ্রেণিতে পাইনি। স্যারের কড়া মেজাজের আঁচ অবশ্য পাশের রুম থেকে যা পেতাম, তাতেই আতঙ্কে থাকতে হত। কিন্তু সেভেনে উঠে স্যারের কিছু ক্লাস আমরা পাই। মজার ব্যাপার প্রত্যক্ষভাবে পেয়ে ভয়টা বাড়ার চেয়ে কিছুটা কমে। কিছুটা বলছি কারণ, স্যারকে শুধু তখন না, এখনো এক ধরনের ভয় পাই। কেন পাই সেটির কারণ হয়ত তার নামের সঙ্গে যুক্ত হওয়া কিছু মিথ। স্যারকে কেমন ভয় পেতাম তার একটা উদাহরণ আজ দিতে পারি। অবশ্য স্যার এই লেখাটা পড়তে পারেন ভেবে ভয়ে ভয়ে বলছি! স্যার আমাদের আত্মীয় হন। এমনিতেই গ্রামের শিক্ষকেরা সকলে কোনো না কোনো ভাবে আত্মীয়র মতোই ছিলেন। কিন্তু স্যার আত্মীয় মতো না, আত্মীয়ই বটে। আমার এক ভগ্নপতির বড়োভাই। এক ঈদে স্যারের বাসায় গেছি, আমার বোন খেতে দিলেন। খাচ্ছি রুটি৷ ভাবি ভাত আনলেন। ক্ষুধা নেই, বললাম খাবো না। স্যার পাশের ঘর থেকে বললেন, ‘এই খাবিনি মানে, খা!’ আমি ভয়ে ভয়ে নিলাম দু চামচ। একটু পর স্যার বাইরে এসে বললেন, ‘এই বেশি করে নে!’ আমি আবার নিলাম। এবার উনি যতক্ষণ পাশে দাঁড়িয়ে থাকলেন ততক্ষণ খাওয়া আর বন্ধ করতে পারি না। মনে হচ্ছিলো আজ খেতে খেতেই মরে যাবো! এরপর স্যারের উপস্থিতিতে ও বাড়িতে আর খেতে বসিনি। এখনো সেই সাহস হবে কিনা জানি না। স্কুলে আরো একজন আত্মীয় আমার ছিলেন। তিনি আর আমার দুলাভাইয়ের ভাই না, সাক্ষাৎ দুলাভাই। আমার মেজো দুলাভাই তিকার মাস্টার। স্কুলের বাইরে ডাক্তার। তাঁকে ততটা ভয় পেতাম না। আমি অল্প কিছু ক্লাস পেয়েছি। মজার ব্যাপার হলো, দুলাভাইকে স্কুলে আমি খুব সহজভাবে নিয়েছিলাম। সেটার ফল অবশ্য ভালো হয়নি। প্রথম ক্লাসেই একটা অংকে সামান্য ভুল হওয়ায় আমাকে বললেন, হাত পাততে। উনার হাতে বেত। আমি ভাবলাম মস্করা করছেন। শ্যালকের সঙ্গে তেমনই সম্পর্ক হয় ভগ্নিপতিদের, তাই বলে রীতিমতো ক্লাসের মধ্যে ঠাট্টা করা! আমি দ্বিধান্বিত থেকে হাত তুলছিলাম না দেখে, তিনি আমার বাঁ পাজরে সপাং সপাং করে বসিয়ে দিলেন। এবার আর মস্কারা না, বিষয়টি আমার কাছে বাড়াবাড়ি বলে মনে হলো। তার চেয়ে অপমানের বিষয় হলো, স্কুলে তাকে স্যার বলতে হবে। স্কুলের বাইরে ভাই। আমার সহপাঠী ছিল সেই দুলাভাইয়েরই এক কন্যা। অর্থাৎ আমরা মামা ভাগ্নি ক্লাসমেট ছিলাম। নূরুন্নাহার শ্রেণিকক্ষে আব্বা না স্যার ডাকত আজ আর মনে করতে পারছি না। যাই হোক, সেদির মার খেয়ে বাড়ি ফিরে মায়ের কাছে গিয়ে বললাম, মা তোমার ভালো জামাই মোটেও ভালো না। মারে। মা তো আমার কথা শুনে চড়াগলায় বললেন, ‘কি তিকার রুলিকে (আমার মেজোবোনের নাম) মারে? হতেই পারে না?’ আমি তখন তাড়াতাড়ি থামিয়ে দিয়ে বলি, ‘তোমার মেয়েকে না, আমাকে মেরেছে, আজ ক্লাসে।’ আমার কথা শুনে মা গলা নামিয়ে এমন করে বললেন, ‘ও, তাই বল!’ যেন এটা কোনো ঘটনাই না। মেয়েকে মারা যাবে না কিন্তু ছেলেকে মারা যাবে। মায়ের এ কেমন বিচার! আমার রাগ আরো বেড়ে গেল। বাবাকে বলতে পারতাম কিন্তু তাতে অংক পারিনি শুনে উল্টো আবার মার খাওয়ার সম্ভাবনা ছিল। সাইকেলটা নিয়ে ছুটে গেলাম বোনের কাছে। টাইট দেয়ার ক্ষমতা তখন একমাত্র তার হাতে। আজই এর একটা বিহিত না করলে ফের মার খেতে হতে পারে। বোনকে গিয়ে কিছু বলার আগেই বললেন, ‘তোর ভাই বলেছে। এজন্য ওর মনটা খারাপ।’ আমিই আবার তখন দুলাভাইকে সান্তনা দিয়ে আসি, ‘একটু মেরেছেন তো কি হয়েছে। ব্যাপার না!’ বলে চলে আসি। এরপরও দুয়েকদিন তিনি বেত ব্যবহার করেছেন। তখন স্কুলে স্যার বলতাম বলে মার খেতে সমস্যা হয়নি।
দু’বছরে শিক্ষকের হাতে মার খাওয়ার ইতিহাস বেশ লম্বাই হবে। পানি পথের যুদ্ধের মতো। সে সময় বাবা মা স্কুলে দিয়ে শিক্ষকদের বলতেন, ‘থুয়ে গেলাম। দেখেশুনে রাখবেন। প্রয়োজনে বাড়িতে হাড়গুলো পৌঁছে দিয়েন।’ কিন্তু এখন উল্টো স্কুল-কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠানোর সময় বাবা মা ছেলের পিঠে হাত বোলাতে বোলাতে বলেন, ‘ভালো বাবা আমার—স্যারকে মারে না!’ আর শিক্ষককে বলেন, ‘ছেলেকে রেখে গেলাম, সাবধানে থাকবেন!’ কিন্তু আমাদের সময় শিক্ষকের মার খেয়ে স্কুল ছেড়ে দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে। শ্রেণিকক্ষে সব সময় প্রথম হওয়ার কারণে কিছু কিছু সময় দুষ্টুমি করেও পার পেয়ে গেছি। তবে দুয়েকবার যা ধরা খেয়েছি, তা ভোলার মতো না। একদিনের কথা স্মরণ করছি। স্কুলের সবচেয়ে নরম মনের শিক্ষক ছিলেন আকবর চাচা না ধর্মশিক্ষার মৌলানা স্যার এ নিয়ে রীতিমতো তর্ক হতে পারে। কিন্তু কথায় আছে, নিরাগীর রাগ বেশি! একবার আমি ধর্মপরীক্ষার খাতায় সব লেখার পর জায়গা বেঁচে যাওয়ায় সেখানে আমার একটি প্রিয় গানের কয়েক লাইন লিখে দিয়েছিলাম। স্যারকে নিয়ে একটা মিথের প্রচলন ছিল যে, তিনি হারিকেনের তেল বাঁচানোর জন্য চাঁদের আলোয় খাতা দেখেন। ফলে পৃষ্ঠা ভরাট দেখে মার্ক দিয়ে দেন। অর্থাৎ কিছু একটা কষ্ট করে লিখলেই মার্কস! প্রচলিত এই কথায় বিশ্বাস রেখে খেলাম ধরা। খাতা দেয়ার দিন আমাকে দাঁড় করালেন। যেখানে পাবো আশির উপরে সেখানে দিয়েছেন কোনোমতে ৩৩। স্যার জীবনে সম্ভবত এত কম কাউকে দেননি। সেখানেই শেষ না। তিনি আমাকে বেত দিয়ে মারলেন! আমি খু্ব কষ্ট পেলাম! স্যার সেটা টের পেয়ে কদিন পর আমাকে কাছে টেনে বললেন, ‘সবাই যা করে ক্লাসের ফার্স্টবয়কে সেটা করতে হয় না। আমি তোমার খাতা পড়তে পছন্দ করি।’ স্যারের এই কথা শোনার পর মনখারাপের বিষণ্ণ প্রজাপতি রঙ মেখে পাখায় উড়ে গেছে আনন্দভূবনে। আকবর স্যারের ঘটনাতে আমার দোষটা আরেকটু বেশিই ছিল। স্যারের বাসায় পড়তে যেতাম। মাস শেষে মা আমার হাত দিয়ে হাদিয়া পাঠাতেন। কিন্তু আকবর স্যারকে, ডাকতাম আকবত চাচা বলে, কখনোই দেরি হলে চাইতে দেখিনি। যেমন রাফিউল স্যার স্মরণ করিয়ে দিতেন। একবার এই কারণে মার সঙ্গে টাকা নিয়ে আকবর স্যারকে না দিয়ে বল কিনে ফেললাম। কিন্তু আল্লাহর কি বিচার, সে মাসেই চিকিৎসার জন্য টাকার প্রয়োজন পড়ায় স্যার সরাসরি মাকে গিয়ে বলেন। মা তো শুনে বাড়িতে আমার খাওয়া বন্ধ করে দিলেন। তাতে সমস্যা না, পাশের বাড়িতে চাচির কাছে মেহমানের মতো খেয়ে আসতাস। ভালো কিছু রান্না হলে আবার মা চাচির হাতে দিয়ে গোপনে আসতেন। মায়ের হাতের রান্নার স্বাদ জেলখানাতে বসেও টের পাওয়ার কথা! যাই হোক, এই ঘটনার পর দেখি, আকবর স্যার কথা বলা কমিয়ে দিয়েছেন। এর চেয়ে বেতের বাড়ি অনেক ভালো ছিল। কিছুদিন পর অবশ্য তিনি সব ভুলে যান।
শিক্ষকদের পাশাপাশি বন্ধুদের কথাও স্মরণ করতে হয়। বন্ধুপাগল মানুষ আমি। মাহফুজ, আকবর, রবিউল, রনি, মহাব্বত, সুজন, আনিস, হাসিনুল, লালমিয়া, মোকলেসুর, বিটু, রুহুল, মিলন, ঝন্টু, সাইদুল, সাইফুল, বাদশা—এত বছর পর সবার নাম মনে করা মুশকিল। এর মধ্যে অধিকাংশের বাড়ি শালিকা, কারো কারো বুড়িপোতা ও বাড়িবাকা। লাল মিয়া, মকলেস ছিল গুচ্ছগ্রামের। মকলেস এখন স্কুলেই চারকি করে। ক্লাসে এমন দুয়েকজনও ছিল যাদের সঙ্গে একবারও কথা হয়নি। যেমন মেয়েদের মধ্যে রুনার (বুড়িপোতার) কথা মনে করতে পারি। ওর সঙ্গে এই কথা না-হওয়ার বিষয়টি নিয়ে পরে একটি ছোটগল্পও লিখেছি। অর্থাৎ আমার লেখালেখিতেও সেই দিনগুলোর বড় রকমের ভূমিকা আছে।
দুটি বছরে কি শিখেছি সেই হিসাব করতে যাওয়া অর্থহীন। জীবনের সব হিসাব গণিতের পাল্লায় মাপা যায় না। আজ এতবছর এটুকু বুঝি, জীবনে কয়েকজন শ্রেষ্ঠ শিক্ষকের কথা মনে করতে গেলে শালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষকের কথা মনে পড়ে। যদি শ্রেষ্ঠ সময়ের কথা বলি, তাও সেই সময়টাকে কোনোভাবেই বাদ দিতে পারি না। শিক্ষকদের অনেকে আজ স্মৃতি হয়েছেন, কেউ কেউ চলে গেছেন পরপারে, তাঁদের আত্মার শান্তি কামনা করি। অনেকে বেঁচে আছেন, কিন্তু আমার সঙ্গে আর কোনো যোগাযোগ নেই। আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি তাঁরা ভালো আছেন। ভালো আছে আমার কাছে-দূরের বন্ধুরা।
‘ভালো থেকো ফুল, মিষ্টি বকুল, ভালো থেকো।
ভালো থেকো ধান, ভাটিয়ালি গান, ভালো থেকো।
ভালো থেকো মেঘ, মিটিমিটি তারা।
ভালো থেকো পাখি, সবুজ পাতারা।
ভালো থেকো।’ [ভালো থেকো- হুমায়ুন আজাদ]
