কলেজে পড়ার সময় বাংলা সাহিত্যের এক অসামান্য শিক্ষক হিসেবে পেয়েছিলাম অধ্যাপক মিয়া মুহাম্মদ আবদুল হামিদকে। দেশসেরা (নটর ডেম) কলেজ, কড়া শৃঙ্খলাপূর্ণ গুরুগম্ভীর পরিবেশ, ততোধিক গুরুগম্ভীর শিক্ষকমণ্ডলী, আর দেশের নানা প্রান্ত থেকে আসা মেধাবী তরুণদের সতর্ক পদচারণা- এর মধ্যে তাঁর ক্লাস ছিল আমাদের জন্য দারুণ আকর্ষণীয় এক অভিজ্ঞতা। তাঁকে নিয়ে গল্পের শেষ নেই। আজকে কেবল একটি বলি। কলেজ জীবনের একেবারে শুরুতেই তিনি পড়াতে শুরু করলেন জসীম উদ্দীনের বিখ্যাত কবিতা ‘নিমন্ত্রণ’ এবং মাত্র তিন-চারটি ক্লাসেই শেষ করে ফেললেন! প্রচলিত ব্যাখ্যাটিই দিলেন প্রথমে : গ্রাম থেকে আসা একটি ছেলে তার শহুরে বন্ধুকে বলছে- ‘তুমি যাবে ভাই – যাবে মোর সাথে, আমাদের ছোট গাঁয়’ … ইত্যাদি। তখনো স্যারের সঙ্গে আমাদের পরিচয় ওঠেনি বলে ভেবেছি, ওটাই তাঁর পড়ানোর ধরন। তো, শেষ করার পর তিনি বললেন- ‘এটা তো শেষ হলো, তোমরা সবাই বুঝেছ তো?’ হ্যাঁ, সবাই বুঝেছে! এ আর এমন কী, না বোঝার কী হলো? কঠিন কোনো কবিতা তো নয়! এরচেয়ে কত কঠিন কবিতা আমরা স্কুলের পাঠ্যবইতে পড়ে এসেছি! কিন্তু এরপরই তিনি বললেন- ‘তাহলে আগামী ক্লাস থেকে আমরা কবি জসীম উদ্দীনের নিমন্ত্রণ পড়তে শুরু করবো!’ নিশ্চয়ই স্যার ভুল বলছেন- আমরা ধরেই নিলাম! কিন্তু তিনি কথাটি দু-তিনবার উল্লেখ করলেন! সাহসী এক ছাত্র তাঁর ভুল ধরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করলে তিনি আবারও একই কথা বললেন! এবং পরের ক্লাস থেকে সত্যিই শুরু হলো তাঁর ‘নিমন্ত্রণ’ পড়ানো, চললো প্রায় চার-মাস ধরে! এবার প্রথম কয়েক পঙক্তি পড়েই তিনি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন- ‘কে কাকে বলছে কথাগুলো?’ আমরা সমস্বরে উত্তর দিলাম- ‘একজন গ্রামের ছেলে তার শহুরে বন্ধুকে…।’ তিনি স্নেহের হাসি হেসে বললেন- ‘সেটা তো আমরা আগেই শিখেছি। নতুন করে কিছু ভাবো।’ প্রিয় পাঠক, আপনাদের নিশ্চয়ই মনে আছে কবিতাটি, তবু প্রথম কয়েক পঙ্ক্তি তুলে দিচ্ছি–
‘তুমি যাবে ভাই – যাবে মোর সাথে, আমাদের ছোট গাঁয়,
গাছের ছায়ায় লতায় পাতায় উদাসী বনের বায়;
মায়া মমতায় জড়াজড়ি করি
মোর গেহখানি রহিয়াছে ভরি,
মায়ের বুকেতে, বোনের আদরে, ভাইয়ের স্নেহের ছায়,
তুমি যাবে ভাই – যাবে মোর সাথে, আমাদের ছোট গাঁয়’
আপনারাই বলুন, এই কয়েক পঙ্ক্তি পড়ে শুনিয়ে স্যার যে প্রশ্নটি করলেন আর আমরা যে উত্তরটি দিলাম তাতে ভুল কী হলো? তাছাড়া, তিনিই তো আগের সপ্তাহে এভাবে পড়িয়েছেন! তাহলে নতুন করে আর কী ভাববো? তো, আমরা ভেবেটেবে কূলকিনারা না পেয়ে স্যারকেই জিজ্ঞেস করলাম। তিনি মধুর হেসে বললেন- ‘ছেলেটি নিজেকেই বলছে কথাগুলো। এগুলো ডায়লগ নয়, মনোলগ। সংলাপ নয় আত্মকথন। নিজের সঙ্গে নিজের কথা বলা। ভেবে দ্যাখো তো, তোমরা অনেকেই তো গ্রাম থেকে এসেছ; তোমাদের কি মনে হয় না- এই শহরটা খুব নিষ্ঠুর, খুব হৃদয়হীন? তখন কি নিজেকেই নিজে বলো না- চলো ফিরে যাই সেই গ্রামে যেখানে হাজারটা স্মৃতি ফেলে এসেছি!’ ঢাকাকে নিয়ে আমার শহুরে বন্ধুদের কী অনুভূতি ছিল জানি না, কিন্তু আমার কাছে নিষ্ঠুর-নির্মমই মনে হতো। এমন নয় যে, এই শহরে সেটিই আমার প্রথম আসা, এর আগে বহুবার এসেছি। সত্যি বলতে কি, আমার ছোটবেলা কেটেছে ঢাকা আর মানিকগঞ্জের গ্রামে পেন্ডুলামের মতো যাতায়াত করে। তবু এই শহরকে আমার ভালো লাগতো না। ফলে, তিনি যখন কথাগুলো বলছিলেন, তখন আমার বুক কাঁপছিল। মনে হচ্ছিল, আমার মনের কথা তিনি জানলেন কী করে? তিনি বলছিলেন, আর আমার মনের ওপর থেকে একের-পর-এক পর্দা সরে যাচ্ছিল, জন্ম নিচ্ছিল অজস্র নতুন চোখ, নতুন করে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি। এরপর তিনি প্রতিটি পঙ্ক্তি ‘মনোলগ’ হিসেবে বুঝিয়ে দিতে লাগলেন। সেখানেই শেষ নয়। পড়াতে পড়াতে বললেন- ‘এর নাম রোমান্টিসিজম। একটা ছেলে আর একটা মেয়ের ভেতরে প্রেম-প্রণয়কেই কেবল রোমান্টিসিজম বলে ভাবলে চলবে না। রোমান্টিসিজম মানে নিজের সঙ্গে নিজের কথা বলা, নিজে ফেলে আসা দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করা, নিজের ভালোলাগা আর প্রিয় বিষয়গুলোর সঙ্গে বর্তমানের বা সদ্য পরিচিত কোনো কিছুকে মিলিয়ে দেখা…।’ আমার কাছে রোমান্টিসিজমের অর্থও পাল্টে গেল। শুধু কি রোমান্টিসিজমের ব্যাখ্যা? সাহিত্যে, বিশেষ করে কবিতায়, কীভাবে রোমান্টিসিজমের ব্যবহার হয়েছে তার অজস্র উদাহরণ; রোমান্টিসিজমের পর কীভাবে আধুনিকতা এলো কবিতায় এবং কথাসাহিত্যে, তার উদাহরণ; কীভাবে পরাবাস্তবতা, জাদুবাস্তবতার মতো তত্ত্বগুলো এলো, সেইসব গল্প- মানে, নিমন্ত্রণ পড়াতে গিয়ে তিনি সমগ্র বিশ্বই ঘুরে এলেন, ঘুরিয়ে আনলেন আমাদেরকেও। আমাদের সাহিত্যপাঠের ধরনও পাল্টে গেল!
স্যারের কথা শুনতে শুনতে অনেক প্রশ্ন ভিড় করতো মাথায়। যেমন, প্রেম-প্রণয়কে রোমান্টিসিজম বলা হয় কেন- এই প্রশ্নটি নিয়ে অনেক ভাবলাম, কিন্তু তাঁকে জিজ্ঞেস করার সাহস পেলাম না। তবে, উত্তর পেলাম অনেক পরে, বড়ো হয়ে, নিজের সঙ্গে কথা বলতে বলতে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মনে হতে লাগলো- মানুষ যখন কারো প্রেমে পড়ে বলে ভাবে, তখন সে আসলে নিজের প্রেমেই পড়ে। আর এই উপলব্ধিগুলোকে লিখে রাখলাম তাঁর ওই কথাগুলোর প্রায় কুড়ি বছর পর আমার ’অন্ধ জাদুকর’ উপন্যাসে, এভাবে-
‘কাদের সঙ্গে প্রেম হয় অথবা বন্ধুত্ব? একজন মানুষ আরো হাজার মানুষ থাকতে কেন একজন নির্দিষ্ট মানুষের সঙ্গেই
এরকম সম্পর্ক গড়ে তোলে? আমার মনে হয়, মানুষ আসলে তার প্রেমেই পড়ে যার মধ্যে সে নিজেকে প্রকাশিত হতে
দেখে। কিংবা বলা যায় এভাবেও- অন্যের প্রেমে পড়ার নামে মানুষ আসলে নিজের প্রেমেই পড়ে।… মাঝে-মাঝে
আমার এ-ও মনে হয়- সারা জীবন ধরে মানুষ অন্যের চোখে নিজেকে দেখে নিতে চায়। তার সমস্ত আয়োজন সম্পন্ন
হয় এই একটি উদ্দেশ্যকে কেন্দ্র করেই। একটা সুন্দর পোশাক আমি পরি কেন? পরি, আমাকে সুন্দর লাগবে বলে।
কিন্তু সুন্দর না লাগলে অসুবিধা কোথায়? লাগলেই বা সুবিধাটি কী? কী যায়-আসে এই সুন্দর লাগা- না-লাগায়? যায় আসে।
আমি চাই, অন্যের চোখ থেকে আমার প্রশংসা ঝরে পড়ুক। আমি যে সুন্দর সেটি যদি জানাও থাকে আমার, তা যেন যথেষ্ট
নয়, অন্যের চোখেও নিজেকে দেখে নিতে চাই। অন্যের চোখ থেকে প্রশংসা ঝরে না পড়লে আমার সমস্ত সৌন্দর্যই ম্লান
ও ব্যর্থ হয়ে যায়। একটি চায়ের কাপ কেনার সময় কেন সবচেয়ে সুন্দরটিই কিনতে চাই আমি? কারণ যে অতিথিকে আমি
সেই কাপে চা দেবো, তার কাছ থেকে যেন আমার রুচির প্রশংসা শোনা যায়। মানুষ এমনই- নিজের অজান্তেই সে নিজেকে
কেন্দ্র করে ঘোরে।… প্রেমও তাই। আমি তাকেই চাই, তারই প্রেমে পড়ি যার মধ্যে আমার পছন্দের বিষয়গুলো আছে,
যার চোখে তাকালে আমি নিজেকে দেখতে পাই।’
এক প্রসঙ্গ থেকে অন্য প্রসঙ্গে চলে গিয়েছি। ক্ষমা করবেন, পাঠক। আবার স্যারের কথায় ফিরি। মনে পড়ে, এমন এক জ্ঞান আর প্রজ্ঞার দ্যুতি ছিল তাঁর মধ্যে, আর কথা বলতেন এমন এক ভরাট-সম্মোহনী কণ্ঠে, বোঝাতেন এমন এক প্রাঞ্জল ভঙ্গিতে, ঠোঁটে লেগে থাকতো এমন এক স্নেহমাখা হাসি যে আমরা চোখ বা মন কোনোটাই ফেরাতে পারতাম না। তাঁর ক্লাসগুলোতে পিনপতন নীরবতা বিরাজ করতো, ছেলেরা স্তব্ধ হয়ে তাঁর কথা শুনতো, প্রায় চোখের পলকে কেটে যেত তাঁর জন্য নির্ধারিত একটি ঘণ্টা। মনে হতো, কেন যে কেবল এই একটি ক্লাসই সারাদিন ভরে হয় না! মনে পড়ে, একটু একটু করে দীর্ঘসময় নিয়ে, কবিতার প্রতিটি পঙ্ক্তি প্রতিটি শব্দ ধরে ধরে তিনি যেদিন শেষ পঙ্ক্তিগুলো পড়ছিলেন, আমার চোখ ভিজে উঠেছিল!
গাছের ছায়ায় বনের লতায়
মোর শিশুকাল লুকায়েছে হায়!
আজিকে সে-সব সরায়ে সরায়ে খুঁজিয়া লইব তায়,
যাবি তুই ভাই, যাবি মোর সাথে আমাদের ছোট গাঁয়।
তোরে নিয়ে যাব আমাদের গাঁয়ে ঘন-পল্লব তলে
লুকায়ে থাকিস, খুঁজে যেন কেহ পায় না কোনোই বলে।
মেঠো কোনো ফুল কুড়াইতে যেয়ে,
হারাইয়া যাস্ পথ নাহি পেয়ে;
অলস দেহটি মাটিতে বিছায়ে ঘুমাস সন্ধ্যা হলে,
সারা গাঁও আমি খুজিয়া ফিরিব তোরি নাম বলে বলে।
আমারও যে শিশুকাল ওভাবেই লুকিয়েছে, আমারও যে ইচ্ছে করে সেসব আবার নতুন করে খুঁজে নিতে, ইচ্ছে করে- পথ হারিয়ে অলস দেহটি ‘মাটিতে বিছায়ে’ ঘুমিয়ে পড়তে!
প্রায় চার-মাস ধরে ‘নিমন্ত্রণ’ পড়িয়ে শেষ দিন তিনি বললেন, ‘বাবারা, এতদিন ধরে তোমাদের যা-যা বললাম, তা কিন্তু বোর্ড-পরীক্ষার খাতায় লিখো না, মার্কস পাবে না। শূন্যও পেতে পারো। প্রথম তিন-চারটা ক্লাসে যা বলেছিলাম, ওইটা লিখো, ফুল মার্কস পাবে।’
আমরাও তা-ই করেছি। এটুকু বোঝার ক্ষমতা আমাদের হয়েছিল যে, ‘নিমন্ত্রণ’কে ডায়লোগ হিসেবে না দেখে মনোলোগ হিসেবে দেখার মতো শিক্ষক দেশে খুব বেশি নেই। ওসব লিখে শূন্য পাওয়ার সম্ভাবনা তাই থেকেই যায়। স্যারের এই শেষ কথাটির মধ্যেও দেশের শিক্ষাব্যবস্থা ও শিক্ষকদের প্রতি তাঁর হতাশার ইঙ্গিত ছিল, আমরা বুঝে নিয়েছিলাম।
২
আগেই বলেছি, আমার ছোটবেলা কেটেছে শহর আর গ্রাম মিলিয়ে। বাবা অবসর জীবনে শহরে বেশিদিন থাকতে চাইতেন না, গ্রামে চলে যেতেন, সঙ্গে মা-ও যেতেন, আর সবার ছোট বলে তাঁদের সঙ্গে আমিও। ওদিকে ভাইবোনরা সব ঢাকায়, তাদেরকে ছেড়ে গ্রামেও বেশিদিন থাকতে পারতেন না তাঁরা। ফলে আমার কিছুদিন কাটতো এখানে, কিছুদিন ওখানে। স্কুল জীবনের শেষ তিন বছর অবশ্য গ্রামেই কাটলো। মানিকগঞ্জ শহর থেকে প্রায় বিশ কিলোমিটার ভেতরে পদ্মা তীরবর্তী হরিরামপুর উপজেলার শতবর্ষী পাটগ্রাম অনাথবন্ধু সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ক্লাস এইট-এ গিয়ে স্কুলে ভর্তি হলাম মূলত বাবার ইচ্ছেতেই। বাবা চেয়েছিলেন যেন আমি আমার ‘শেকড়’টাকে ভালোভাবে চিনে নিই। তো, ওই স্কুলেই দেখা পেয়েছিলাম কয়েকজন অসামান্য শিক্ষকের, যাঁরা সারা জীবনের জন্য আমার পথ তৈরি করে দিয়েছিলেন। এঁদের একজন গণিতের শিক্ষক শামসুল হক স্যার, অন্যজন ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষক বাবু হরিপদ সূত্রধর। শামসু স্যার প্রায় হাতে ধরে শেখালেন- অংকের আসল মজাটা কোথায়! একটা-দুটো প্যাঁচ খুলতে পারলেই অংক যে অতি সহজ বিদ্যা হয়ে যায় সেটি তাঁরই কাছ থেকে শিখলাম! শুধু তাই নয়, সঙ্গে চললো ক্রমাগত যুগপৎভাবে বকাবাজি এবং প্রশংসা। বকাবাজির কারণ আমার কথিত দুষ্টুমি; আর প্রশংসা- ‘তোর মাথা খুব ভালো। তোকে নিয়ে আমার অনেক আশা। জীবনে তুই অনেকদূর যাবি। এ আমার বিশ্বাস। তুই আমার আশা এবং বিশ্বাস নষ্ট করিস না।’ একজন শিক্ষক যখন কোনো ছাত্রকে এই ভাষায় সাহস ও প্রেরণা জোগান তখন সেই কিশোরের মনের খুব গভীরে কোথাও আলো জ্বলে ওঠে। আমারও তাই উঠেছিল। প্রকৃতপক্ষে এর নামই মোটিভেশন। প্রায় দু’বছর আমার পেছনে ছায়ার মতো লেগে ছিলেন তিনি। ফলাফল- এসএসসিতে সাধারণ গণিত, উচ্চতর গণিত, বাণিজ্যিক গণিত, এবং সাধারণ বিজ্ঞানে লেটার মার্কস। একজন মাত্র শিক্ষকের চেষ্টা কত সুদূরপ্রসারি হতে পারে- এটি তার এক চমৎকার উদাহরণ। শুধু এসএসসিতেই নয়, স্যারের ওই শিক্ষা আমার সারা জীবনের পাথেয় হয়ে আছে। পরবর্তীকালে আমি বিজ্ঞান নিয়েই পড়াশোনা করেছি, এবং কোনোদিনই লেটার মার্কসের কম নম্বর পাইনি! খুব অল্প বয়সেই তিনি আমাদের ছেড়ে পরলোকে চলে গেছেন। কিন্তু তাঁর দেয়া অমলিন শিক্ষা বহন করছে তাঁর অগুনতি ছাত্র-ছাত্রীরা।
একজন মানুষ কেমন ‘মানুষ’ হিসেবে গড়ে উঠবে, সেটা অনেকখানিই নির্ধারিত হয়ে যায় তার স্কুল জীবন থেকেই। স্কুল-শিক্ষাই জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। মানুষের ভিত্তিভূমি হিসেবে কাজ করে এই শিক্ষা। সেজন্যই স্কুল-শিক্ষকদের দায়িত্বও অনেক। একজন শিক্ষকের একটি কথাতেই একজন কিশোরের জীবনের গতিমুখ নির্ধারিত হয়ে যেতে পারে, তার হৃদয়ে জ্বলে উঠতে পারে হীরন্ময় প্রদীপ। এই লেখাটি আমার সেইসব শিক্ষক নিয়েই। কিন্তু স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত এত অসাধারণ সব শিক্ষকের দেখা পেয়েছি যে এক লেখায় সবার কথা বলে শেষ করা যাবে না। আজকে কেবল ওই স্কুলেরই আরো দুজন শিক্ষকের কথা বলি।
আমাদের শিক্ষকরা ছিলেন স্বভাবতই স্নেহপ্রবণ, তবে স্নেহপ্রকাশে কুণ্ঠা ছিল তাঁদের। কাউকে-কাউকে তো আমি কখনো বুঝতেই পারিনি। যেমন আবুল হোসেন স্যার। নিঃসঙ্গ ধরনের মানুষ ছিলেন তিনি, কারো সঙ্গে মিশতেন না, এমনকি তাঁর সহকর্মীদের সঙ্গেও নয়, কথাও বলতেন খুব কম। সামাজিক সম্পর্ক বলতে কিছু ছিল না তাঁর, কারো সঙ্গেই। এরকম ইউরোপীয় ধাঁচের চারিত্রিক-বৈশিষ্ট্য ওরকম গণ্ডগ্রামে অকল্পনীয় ছিল, আর তিনি সেটি সযত্নে লালন করে চলতেন। গভীর কোনো এক বিষণ্নতা ছিল তাঁর, ছিল অদ্ভুত একাকীত্ব। কিন্তু এর কারণ জানা হয়নি কোনোদিন।
আমার জীবনে সবচেয়ে গভীর প্রভাব রেখেছেন যে শিক্ষক, তাঁর নাম বাবু হরিপদ সূত্রধর। তাঁর কাছে আমি শিখেছি ভাষার মূলসূত্রগুলো। বাংলা ব্যাকরণ ও ইংরেজি গ্রামার দুটোই পড়াতেন তিনি। এবং আমি একথা নির্দ্বিধায় বলতে পারি- এত ভালো শিক্ষক বাংলাদেশে খুব কমই আছেন। যুগে যুগে এমন শিক্ষক দু-একজনই জন্মান। শুধু যে ক্লাসের পড়াশোনাতেই তাঁর শিক্ষাদান সীমাবদ্ধ থাকতো তা নয়, বরং একজন প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠার জন্য যা-যা প্রয়োজন সবই শেখাতেন তিনি। ভাষার মূলসূত্রগুলো (শব্দের ব্যবহার, বাক্য গঠন, শুদ্ধ উচ্চারণ ইত্যাদি) তিনি এমনভাবে শেখাতেন যে, যেসব ছাত্র এগুলো গ্রহণ করতে পেরেছে জীবনে তাদের ভাষা-বিষয়ক সমস্যায় পড়তে হয়নি কখনো।
হরিপদ স্যারের ঘনিষ্ঠ সন্নিধ্য পাওয়ার সুযোগ কীভাবে হয়েছিল, সেই গল্পটি একটু বলি। তখন ঘোর বর্ষাকাল, আর হরিরামপুরের পদ্মা-তীরবর্তী গ্রামগুলোতে বর্ষা মানেই মাঠঘাট ডুবে যাওয়া। বাড়ি থেকে স্কুলে আসা-যাওয়া ভারি মুশকিল। যে সময়ের কথা বলছি, তখন পাকা রাস্তা তো ছিলই না, কাঁচা সড়কের অবস্থাও ছিল নাজুক- তুমুল বর্ষায় কাদা থিকথিকে হয়ে থাকতো। বাড়ি থেকে সেই সড়কে উঠতে হলে মাঠের পানি ভেঙে আসতে হতো! তো, এইরকম একটা সময়ে ক্লাসরুম থেকে আমাকে ডেকে নিয়ে গেলেন স্কুলের দপ্তরি নুরু ভাই, হরিপদ স্যারের কাছে। কেন? দুরুদুরু বুকে ভাবতে ভাবতে যাচ্ছি- কী এমন অপরাধ করলাম যে, স্যার একেবারে ডেকে নিয়ে যাচ্ছেন? তখন স্কুলের পুকুর-পাড়ে বোর্ডিং-ঘর ছিল, দরজায় দাঁড়াতেই হরিপদ স্যারের গুরুগম্ভীর কণ্ঠ- ‘ভেতরে আয়।’ আমার ততক্ষণে গলা শুকিয়ে গেছে, মনে হচ্ছে এক্ষুণি পানি খেতে না পারলে মরেই যাবো। এত ভয় পেয়েছিলাম কেন, বলতে পারবো না। হরিপদ স্যার রাগী মানুষ ছিলেন না, জীবনে একটা বকাও শুনিনি তাঁর কাছ থেকে। অথচ তাঁকে ভয় পেতাম, ভীষণ সেই ভয়। রাশভারি ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ ছিলেন তিনি, অন্তত শিক্ষক হিসেবে তো বটেই। ব্যক্তিগতভাবে মেশার সুযোগ কখনো হতো না বলে তাঁর অপূর্ব সজ্জন রূপটি আমাদের কাছে অচেনাই ছিল। যাহোক, ভয় পেয়েছিলাম বটে, কিন্তু কেটে গেল মুহূর্তেই। দেখলাম- স্যার একটা আর্ট পেপার বিছিয়ে সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। আমাকে বললেন- ‘তোর হাতের লেখা তো সুন্দর, দেয়াল পত্রিকা লিখতে পারবি না?’ আমার হাতের লেখা যে সুন্দর সে প্রশংসা আমি আগেও অনেকের কাছে শুনেছি, কিন্তু স্যারের মুখে শুনে যেন মন ভরে গেল। কিন্তু দেয়াল পত্রিকা লেখা? ওরকম কোনো কাজ করা তো দূরের কথা, ভেবেও দেখিনি কোনোদিন। খাতায় লেখা আর আর্ট পেপারে লেখা তো এক ব্যাপার নয়। তা-ও দেয়াল পত্রিকা তৈরি করার মতো অজানা কাজ! স্যারের প্রশ্ন শুনে চুপ করে রইলাম। কিন্তু উত্তর না নিয়ে তো আর ছাড়বেন না তিনি। বলা ভালো, কাজটা না করিয়ে ছাড়ার মানুষ নন হরিপদ স্যার। তিনি যে এত এত ছাত্র-ছাত্রীর ভেতর থেকে আমাকেই বেছে নিয়েছেন লেখার জন্য, তা যে অকারণ নয়, অনেক ভেবেচিন্তেই নিয়েছেন, সেটি তখন বুঝিনি, বুঝেছি অনেক পরে। আমাকে চুপ করে থাকতে দেখে তিনি এবার বললেন- ‘নে শুরু কর, দেখি।’ আমি কাঁপা হাতে কলম নিয়ে লিখতে শুরু করলাম। কিছুক্ষণ দেখেই তিনি বললেন- ‘এই তো হবে। এটার মধ্যে একটু প্র্যাকটিস কর দু-একদিন, ঠিক হয়ে যাবে।’ তারপর নিজ হাতে লিখে দেখিয়ে দিলেন- কীভাবে লাইন সোজা রাখতে হয়, কিভাবে অ্যালাইনমেন্ট ঠিক রাখতে হয় ইত্যাদি। দু-তিন দিন প্র্যাকটিসের পর এবার আসল পত্রিকা লেখার কাজ। তিনি তাঁর পরিকল্পনার কথা জানালেন। বাংলাদেশ শিশু একাডেমি আয়োজিত জাতীয় শিশু-কিশোর প্রতিযোগিতায় এই পত্রিকা পাঠাতে চান তিনি। অতএব ছাত্র-ছাত্রীদের কাছ থেকে লেখা সংগ্রহ করা দরকার। সেই অনুযায়ী ঘোষণা হলো বটে, কিন্তু প্রত্যাশিত সংখ্যায় লেখা জমা পড়লো না। হয়তো সংখ্যাল্পতার জন্যই তিনি বললেন- ‘তুই লেখা দিচ্ছিস না কেন?’
আমি একটু অবাক হয়ে বললাম- ‘আমিও লিখতে পারবো স্যার?’
‘হ্যাঁ, পারবি না কেন?’
‘কী লিখবো স্যার?’
‘তোর যা ইচ্ছে সেটাই লিখে আনিস।’
আমি দুদিনের মধ্যে গল্প-কবিতা-প্রবন্ধ সবই লিখে নিয়ে গেলাম। দেয়াল পত্রিকার বিষয় ছিল বর্ষা, লেখাগুলোও ছিল বর্ষাকেন্দ্রিক। আমার গল্পটার নাম ছিল (সম্ভবত) ‘বরষায় ফিরে আসা।’ সেটিই ছিল আমার প্রথম গল্প লেখার চেষ্টা। প্রবন্ধে কী লিখেছিলাম মনে নেই। স্যার তিনটে লেখাই পড়লেন, কবিতাটা আলগোছে সরিয়ে রাখলেন পাশে, প্রবন্ধটা আবার পড়ে বললেন- ‘চলবে!’ তারপর গল্পটা দ্বিতীয়বার পড়ে বললেন- ‘তুই যদি গল্প লিখিস, মানে গল্প নিয়ে লেগে থাকিস তাহলে তোর হবে!’ তারপর গলায় একটু আমোদ ঢেলে বললেন- ‘লেগে থাকিস, বুঝলি! লেগে থাকিস। লেগে থাকলে তোর হবে রে, তোর হবে!’ সেটি ছিল আমার লেখা প্রথম গল্প। গল্প ‘হবে’ আর প্রবন্ধ ‘চলবে’ এই ছিল আমার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়া মন্তব্য। সেই থেকে আজ পর্যন্ত লেগে আছি আমি।
স্যারের ওই কথাগুলোর মধ্যে জাদু ছিল, ছিল আমার ভবিষ্যতের পথ পাড়ি দেয়ার এক অমোঘ দর্শন। তাঁর ওই ‘হবে’ শব্দটিই আমার ভেতরে এমন এক প্রেরণা সৃষ্টি করলো যে, আমি খাতার-পর-খাতা ভরিয়ে ফেলতে লাগলাম গল্প লিখে লিখে; পরিণত বয়সে লেখালেখিটাকেই বেছে নিলাম জীবনের প্রধান কাজ হিসেবে। আর ওই ‘লেগে থাকিস’ শব্দ দুটোকে নিলাম জীবনের মন্ত্র হিসেবে। শুধু লেখালেখির ক্ষেত্রেই নয়, যে-কোনো কাজেই যদি লেগে থাকা যায়, তাহলে একসময় সাফল্য এসে ধরা দেয়ই- এমনকি সাফল্য না চাইলেও। জীবনে ফল লাভের আশায় কোনো কাজ করিনি আমি, করেছি কাজ করার আনন্দে, লেগে থেকেছি আপোসহীন মানুষের মতো এবং দেখেছি- কাজটা হয়ে গেছে। অনেক বাধা-বিপত্তি-দুর্যোগ-দুর্বিপাক এসেও কাজটিকে থামিয়ে দিতে পারেনি। একজন কিশোরের মনে মাত্র একটি বাক্য প্রোথিত করে দিয়েছিলেন তিনি- সাধারণ কোনো বাক্য নয়, জীবনাভিজ্ঞতায় উজ্জ্বল একজন মানুষের মৌল দর্শনবাহী বাক্য ছিল ওটা।
এখনো সেই দিনটি স্পষ্ট চোখে ভাসে। একজন কিশোর দাঁড়িয়ে আছে তার প্রথম লেখা নিয়ে এমন একজন শিক্ষকের সামনে যাঁর জানাশোনার কোনো শেষ নেই। ভীরু-শঙ্কিত সেই কিশোরটির উৎকণ্ঠিত অপেক্ষার অবসান ঘটালেন সেই শিক্ষক ভীষণ প্রেরণাদায়ী এক মন্তব্য করে। আমার এই অভিজ্ঞতার কথা আমি বহুবার বহু জায়গায় বলেছি।
আমার প্রবন্ধগ্রন্থ ‘সংশয়ীদের ঈশ্বর’-এর ভূমিকায়ও স্যারকে নিয়ে লিখেছি- ‘আমার সারাটি জীবন কেটেছে বহু মানুষের স্নেহ পেয়ে। তাঁদেরই একজন আমার স্কুলের শিক্ষক বাবু হরিপদ সূত্রধর। হরিপদ স্যার কোনো সাধারণ শিক্ষক ছিলেন না, প্রাচীনকালের যেসব আদর্শ শিক্ষকের গল্প মানুষের মুখে মুখে ফিরতো, তিনি ছিলেন সেইরকম। যেটুকু শেখাতেন তিনি, পরিপূর্ণভাবেই শেখাতেন। আমি নিজে বিজ্ঞানের ছাত্র, একাডেমিক প্রয়োজনে বাংলা ভাষা বা সাহিত্য শেখা হয়নি। স্বীকার করতে দ্বিধা নেই- যতটুক শুদ্ধভাবে বাংলা (এবং ইংরেজি) বলতে, পড়তে বা লিখতে পারি, সেটুকু স্যারের শেখানো। ভুল যেগুলো হয় তা নিজের দোষে। স্যার ভাষা-শিক্ষার মূলসূত্রসুলো শিখিয়ে দিয়েছিলেন, সেগুলোর চর্চার দায়িত্ব ছিল তাঁর ছাত্রদেরই। তারা সেটি না করলে তিনি কী করতে পারেন! কিন্তু স্যারের কাছে আমি ঋণী হয়ে আছি অন্য কারণে। তিনি ছিলেন উদার মানবতায় বিশ্বাসী একজন উঁচুমাপের মানুষ। ক্লাসে আমার মতো অপগ- অমনোযোগী ছাত্রদের সামনে বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর মন্তব্যগুলো মণিমুক্তার মতো ঝরে পড়তো, আমরা যার সামান্যই কুড়াতে পেরেছি। যেটুকু পেরেছি সেগুলোই হীরন্ময় প্রদীপ হয়ে জ্বলছে বুকের মধ্যে। আমার লেখালেখির প্রথম উৎসাহদাতাও তিনিই। বলেছিলেন- ‘লেগে থাকিস, লেগে থাকলে তোর হবে।’ আমি, হয়তো স্যারের কথা রাখার জন্যই, লেগে আছি- অবশ্য আদৌ কিছু হচ্ছে কি না সেটি এখনো বুঝে উঠতে পারিনি।’
আর আমার ‘শিল্পের শক্তি, শিল্পীর দায়’ গ্রন্থের উৎসর্গপত্রে লিখেছি-
আমার শিক্ষক
বাবু হরিপদ সূত্রধর শ্রদ্ধাস্পদেষু,
বহুকাল আগে আপনার এক কিশোর ছাত্রের লেখা পড়ে আপনি বলেছিলেন-
‘লেগে থাকিস, লেগে থাকলে তোর হবে।’
আমি এখনো লেগে আছি, কিন্তু কিছু হচ্ছে কি না, বুঝতে পারছি না!
যেমনটি লিখেছি আমার আরেক প্রবন্ধগ্রন্থ ‘বাংলা গল্পের উত্তরাধিকার’-এর উৎসর্গপত্রে, মিয়া মুহাম্মদ আবদুল হামিদকে নিয়ে-
অধ্যাপক মিয়া মুহাম্মদ আবদুল হামিদ শ্রদ্ধাস্পদেষু,
কলেজে পড়ার সময় এই মহান শিক্ষকের কাছেই আমি শিখেছিলাম
কীভাবে সাহিত্য পাঠ ও ব্যাখ্যা করতে হয়!
আমার সৌভাগ্য, হরিপদ স্যারের হাতে বইটি তুলে দেয়ার সুযোগ পেয়েছি আমি; আর দুর্ভাগ্য, মিয়া মুহাম্মদ আবদুল হামিদ স্যার কোনোদিনই জানতে পারবেন না- কী এক মোহনীয় প্রদীপ জ্বালিয়ে দিয়েছিলেন একজন তরুণের বুকে। জানাবার আগেই অনন্তলোকে পাড়ি জমিয়েছেন তিনি।
শুধু লেখাতেই নয়, জীবনের নানা পর্যায়ে সুযোগ পেলেই আমি আমার শিক্ষকদের কথা বলেছি। তাঁরা সেসব শুনতে পাননি, জানতেও পারেননি, কিন্তু তাঁদের কথা বলে আমি আমার নিজের ঋণের বোঝা হালকা করার চেষ্টা করেছি। কিন্তু একটা কথা বুঝে গেছি- এই ঋণ কোনোদিন শোধ হওয়ার নয়।
যাহোক, দেয়াল পত্রিকার প্রসঙ্গে ফিরে আসি। পরপর কয়েকদিন কাজ করার পর দেয়াল পত্রিকাটি পূর্ণাঙ্গ রূপ পেলো। এবার সেটিকে নিয়ে শহরে যাওয়ার পালা। তখন হরিরামপুর থেকে কোনো বাস সার্ভিস ছিল না, মানিকগঞ্জ পর্যন্ত যেতে হতো নৌকায় চড়ে! মানে, সারাদিনের ব্যাপার। একদিন, ভোরবেলা রওনা হলাম, মানিকগঞ্জ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে সব উপজেলার স্কুলগুলো থেকে আসা দেয়াল পত্রিকার প্রদর্শনী চললো। অবশ্য প্রথম পুরস্কার আমাদের ভাগ্যে জুটলো না, ওটা পেলো ঘিওর অথবা দৌলতপুর থেকে আসা কোনো একটি স্কুলের দেয়াল পত্রিকা। ঘোষণা করার সময় বিচারকদের পক্ষ থেকে আমাদের পত্রিকাটির মানের প্রশংসা করা হলো বিশেষভাবে, কিন্তু তবু যে সেটিকে পুরস্কৃত করা গেল না, তার কারণ হিসেবে বলা হলো- পুরস্কৃত পত্রিকাটি অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে বর্ষার একটা ছবিও যুক্ত করেছে, যা আমরা করিনি! হ্যাঁ, বিষয়-বৈচিত্রের দিক থেকে ওটা এগিয়ে গেল বটে, যদিও লেখার মান, ডিজাইন, হাতে আঁকা ছবি সব দিক থেকেই আমরা এগিয়ে! কিন্তু কী আর করা! আমাদের কারো কাছেই একটা ক্যামেরা ছিল না যে, ছবি তুলে সেটি পত্রিকায় জুড়ে দিতে পারবো! সম্ভবত তখনো কোনো স্টুডিও হয়নি হরিরামপুরে, বিকল্প কিছু করা সম্ভবও ছিল না আমাদের পক্ষে। যাহোক, পুরস্কার না পেলেও নতুন একটি বিষয়ের সঙ্গে পরিচিত হলাম। বড়ো কোনো পরিসরে প্রতিযোগিতা করা, অনেক অচেনা মানুষের সঙ্গে কথা বলা, কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলে তার উত্তর দেয়া ইত্যাদি। অর্থাৎ ছোট একটা গণ্ডি থেকে বেরিয়ে বড়ো কোনো প্রান্তরে বেড়ানোর যে আনন্দ, ব্যাপারটা সেরকমই। হরিপদ স্যার সম্পূর্ণ স্ব-উদ্যোগে এই ধরনের কাজে আমাদের যুক্ত করতেন, বড়ো কিছু ভাবতে শেখাতেন, বড়ো কিছু করার স্বপ্ন দেখাতেন।
স্কুল ছেড়ে আসার পর তেমন করে আর ফেরা হয়নি হরিরামপুরে। ওই অঞ্চলটি পদ্মার ভাঙন কবলিত। যে নদীর স্নেহ-মমতার ছায়ায় বেড়ে উঠেছি, সেই নদীই তার সর্বগ্রাসী রূপ নিয়ে দেখা দিয়েছে আমার জীবনে। ভেঙে নিয়ে গেছে আমার পূর্বপুরুষের ভিটে, দাদা ও দাদির কবর, বাবা ও বাবার দাদার কবর, মায়ের সংসার, আমার শৈশব-কৈশোরের স্মৃতিমাখা চিহ্নসমূহ। না, শেকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার কোনো দুরভিসন্ধি আমার ছিল না, কিন্তু পূর্বপুরুষের ভিটেবাড়ি-জমিজমা যখন গ্রাস করে নিলো প্রমত্ত পদ্মা, তখন এক গভীর অভিমান এসে বাসা বাঁধলো মনের ভেতরে। মনে হলো, আমি তো ছাড়তে চাইনি, প্রকৃতি আমাকে বাধ্য করেছে শেকড়চ্যুত হতে! অবুঝ এই অভিমান, জানি। প্রকৃতি তার আপন নিয়মে চলে, কারো মান-অভিমান, দুঃখ-কষ্ট, আনন্দ-বেদনার ধার ধারে না। তবু, অভিমান তো অভিমানই। কিন্তু অভিমান করে বসে থাকার সুযোগ দিলো না আমার অনুজপ্রতিম ভাইয়েরা। আমাকে খুঁজে বের করলো ওই স্কুলেরই ছাত্ররা, যারা আমাকে কখনো চোখেই দেখেনি, ফিরিয়ে নিয়ে গেল স্মৃতিজড়ানো স্কুলে। আর বহুদিন পর ফিরে নানারকম পরিবর্তন দেখে বিস্ময় জাগলো। আমি রেখে এসেছিলাম একটা অন্ধকার অঞ্চল- সব অর্থেই। পদ্মার ভাঙনে বিপর্যস্ত মানুষ আর তাদের ক্ষুধা-দারিদ্র-সর্বস্ব হারানোর হাহাকার, প্রকৃতির খামখেয়ালিপনার বিরুদ্ধে বেঁচে থাকার অবিরাম যুদ্ধ আর অনিশ্চয়তা- এইসবকিছু মনে গেঁথে ছিল। এই জনপদ যে আবার কোনোদিন উঠে দাঁড়াবে, বিশ্বাসই হতো না। কিন্তু এসে দেখলাম, মাথা তুলে উঠে দাঁড়াচ্ছে এখানকার সংগ্রাম-মুখর মানুষ। আরেকটি পরিবর্তন খুবই স্পষ্টভাবে চোখে পড়লো। আমি যখন ছিলাম, তখন এ অঞ্চলে শিশু-কিশোর-তরুণদের সাংস্কৃতিক চর্চা প্রায় ছিলই না। এক হরিপদ স্যার তাঁর দু-তিনজন সহকর্মী নিয়ে বছরে একটা-দুটো অনুষ্ঠান করতে পারতেন। স্যারের উৎসাহের অভাব ছিল না, কিন্তু এগুলোতে অংশ নেয়ার মতো ছেলেমেয়েদের সংখ্যা ছিল নিতান্তই অল্প। এতদিন পর ফিরে দেখলাম, সেই সংখ্যা যেমন বেড়েছে তেমনি বেড়েছে গুণগত মানও। আর এই সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডগুলো আবর্তিত হয়েছে যথারীতি হরিপদ স্যারকে কেন্দ্র করে। ওই একই ব্যাপার- লেগে থাকা। শত দুর্যোগেও স্যার হাল ছাড়েননি, লেগে থেকেছেন, আর এখন দেখতে পাচ্ছেন- বিফলে যায়নি এই লেগে থাকা।
তাঁর ছাত্র-ছাত্রীরা সবসময়ই চেষ্টা করেছে তাঁকে প্রাপ্য সম্মানটুকু বুঝিয়ে দিতে। তিনি বোধ-হয় সেই বিরল শিক্ষকদের একজন যাঁকে নিয়ে তাঁর ছাত্ররা স্মারকগ্রন্থ প্রকাশ করেছে, তাঁর নাট্যচর্চার পঞ্চাশ বছর পূর্তি উপলক্ষে বর্ণাঢ্য এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে এবং আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর হাতে গ্রন্থটি তুলে দিয়েছে। এসবই তাঁর প্রাপ্য ছিল। ছাত্রদের জন্য তিনি জীবন ব্যয় করে দিয়েছেন, ছাত্ররাও তাঁকে জানাতে দ্বিধা করেনি- তিনি না থাকলে আমরা যে তিমিরে ছিলাম সেই তিমিরেই রয়ে যেতাম।
৩
নদী-ভাঙন কবলিত এলাকা বলে পাটগ্রাম স্কুল বারবার ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে, স্থাপনাগুলো চলে গেছে নদীগর্ভে, স্থান পরিবর্তন করে নতুনভাবে আবার সব গড়ে তুলতে হয়েছে। এত বিপর্যয় পেরিয়েও স্কুলটি যে একটা আদর্শ বিদ্যাপীঠ হিসেবে নিজের নামটিকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরতে পেরেছিল, তার কারণ- স্কুলটিতে বরাবরই ছিলেন একদল নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক। আমাদের সময়ে এক আলোকস্তম্ভের মতো প্রধান শিক্ষক ছিলেন- শামসুদ্দীন আহমদ। স্যার ছিলেন দারুণ রাশভারি একজন মানুষ- স্বল্পভাষী, প্রজ্ঞাবান, নির্লোভ, সৎ একজন মানুষ। কেবল স্কুলের চৌহদ্দিতেই নয়, তাঁর ব্যক্তিত্বের সৌরভ ছড়িয়ে পড়েছিল সমস্ত অঞ্চল জুড়ে, এবং সর্বস্তরের মানুষ তাঁকে শ্রদ্ধাও করতো খুব। হরিরামপুরে বোধহয় এমন কোনো মানুষ ছিলেন না যিনি স্যারকে চিনতেন না। যারা কখনো স্কুলের ধারেপাশেও আসতেন না, সেইসব নিরক্ষর মানুষদের কাছেও তিনি ছিলেন জ্ঞান আর প্রজ্ঞার প্রতীক। ধীরপায়ে হেঁটে যেতেন তিনি আর তাঁকে দেখে রাস্তা ছেড়ে সরে দাঁড়ানোই ছিল গণমানুষের শ্রদ্ধা জানানোর রীতি। পরিণত বয়সে আমি অনেক ভেবেছি- কী করে সর্বস্তরের মানুষের এই শ্রদ্ধা অর্জন করেছিলেন তিনি? এর উত্তর দেয়া কঠিন। ওই প্রত্যন্ত অঞ্চলে সারাজীবন ধরে জ্ঞানের আলো বিলানোর দায়িত্বটি নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করার মতো মানুষ খুব বেশি তো ছিলেন না, যেমনটি তিনি ছিলেন। এবং দায়িত্বটি তিনি নিজে থেকেই কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন, কেউ তাঁকে জোর করে চাপিয়ে দেয়নি। তিনি ছিলেন সেই দুর্লভ মানুষদের একজন যাঁরা জাতি-গঠনের কাজটিকে একটা ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন, এমনকি নিজের সুখ-সাচ্ছন্দ্য-সমৃদ্ধি বিসর্জন দিয়ে হলেও। তিনি যে সময়ের মানুষ এবং তাঁর যে শিক্ষা-জ্ঞান-প্রজ্ঞা, তাতে তিনি দেশের যে-কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেই যুক্ত হতে পারতেন, সমৃদ্ধি ও সচ্ছলতার পথে হাঁটতে পারতেন। তা না করে প্রত্যন্ত গ্রামের একটি স্কুলকে বেছে নিয়েছিলেন নিজের কাজের ক্ষেত্র হিসেবে, যদিও তিনি এ অঞ্চলের মানুষ ছিলেন না, তাঁর বাড়ি ছিল ফরিদপুর। এই যে নিজের বাড়িঘর ছেড়ে একটা স্কুল নিয়ে জীবন কাটিয়ে দেয়া, অতি আটপৌরে জীবনযাপনে নিজেকে অভ্যস্ত করা, নিরন্তর জ্ঞানের আলো বিলিয়ে চলা- এসবের পুরস্কার তিনি পেয়েছিলেন প্রাকৃতিকভাবেই, সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা অর্জনের মাধ্যমে। তাঁর নেতৃত্বেই পাটগ্রাম স্কুল হয়ে উঠেছিল শিক্ষা ও সংস্কৃতি চর্চার কেন্দ্র, মুক্তবুদ্ধি-প্রগতিশীলতা ও অসাম্প্রদায়িকতা চর্চার কেন্দ্র।
আমরা যখন ছাত্র, তখন তিনি আর ক্লাস নিতেন না। ফলে ক্লাসরুম শিক্ষক হিসেবে তাঁকে আমরা পাইনি। কিন্তু একদিনের কথা খুব মনে পড়ে। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় হঠাৎ একদিন একটা ক্লাসে এলেন তিনি। যেহেতু ক্লাসে আসেন না কখনো, সেদিন কেন এলেন আমরা বুঝতেই পারিনি। এসে প্রথমে একটু শাসন করলেন। এই ক্লাসের ছাত্ররা নাকি বেশ দুষ্টু হয়ে উঠেছে বলে তিনি শুনেছেন- ‘ফারদার যেন এরকম কোনো অভিযোগ আমার কানে না আসে!’ – শুধু এইটুকু বলেই ও প্রসঙ্গ শেষ করলেন। কোনো বকাঝকা নয়, কোনো হুমকি-ধামকি নয়, আবার তাঁর কানে ওরকম কিছু গেলে তিনি কী ধরনের শাস্তি দেবেন সে সম্পর্কেও কিছুই বললেন না তিনি। কেবল ওই একটি বাক্য। গুরুগম্ভীর স্বরে ওই সাবধানবাণীই হয়ে উঠলো আমাদের পথনির্দেশ! এরকম অভিভাবক থাকলে একটা স্কুলের আর কী লাগে? যাহোক, ওই কথাটুকু বলে তিনি চলে গেলেন ধর্মতত্ত্ব বিষয়ক আলোচনায়। সম্ভবত সেটি ধর্ম-পিরিয়ড ছিল বলেই তিনি ওই প্রসঙ্গ তুলেছিলেন। পাঠ্যবইয়ের ধারেকাছেও গেলেন না তিনি, কী কী বলেছিলেন সব মনে নেই, তবে একটা কথা খুব কানে বাজে এখনো। কথা বলতে বলতে তিনি একটা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছিলেন- ‘পবিত্র কোরআনে নামাজের কথা অনেকবার বলা হয়েছে, কিন্তু পাঁচ ওয়াক্তের কথা কোথাও বলা নেই। কেন নেই?’ বলাইবাহুল্য এ প্রশ্নের উত্তর কারোরই জানা ছিল না, তিনি হয়তো উত্তর আশাও করেননি, নিজেও উত্তর দিলেন না। অনেক পরে আমার এমনও মনে হয়েছে, প্রশ্নটি হয়তো আমাদের করেনওনি তিনি। এ ছিল তাঁর নিজের সঙ্গেই নিজের কথা বলা। স্বগতোক্তি। কারণ, উত্তরের জন্য ছাত্র-ছাত্রীদের দিকে তাকাননি তিনি, তাকিয়ে ছিলেন জানালা দিয়ে দূরে, বহুদূরে। হয়তো আকাশের দিকে। প্রশ্নটি রেখেই চলে গেলেন তিনি। বিষয়টি নিয়ে ভাবনায় পড়ে গেলাম। সত্যিই কি পাঁচ ওয়াক্তের কথা নেই? না থাকলে, কেন নেই? এরকম একটি জটিল প্রশ্ন তিনি ক্লাস এইটের বাচ্চাদের উদ্দেশ্যে ছুঁড়ে দিয়েছিলেন কেন? তার কারণ সম্ভবত এই যে, তিনি প্রশ্ন করে চিন্তা করতে শেখাতেন। হয়তো এটিই তাঁর শিক্ষাদানের কৌশল ছিল।
তাঁর সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক ছিল বহুদূরের। পারতপক্ষে তাঁর সামনে পড়তে চাইতো না শিক্ষার্থীরা। তিনিও কাউকে ডাকতেন না, খুব বেশি কথাও বলতেন না। ফলে স্কুলের শিক্ষার্থীরা তাঁর মনের কতটা জায়গা দখল করে আছে তা বোঝার উপায় ছিল না। শুধু একবার, এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর তাঁকে দেখেছিলাম অচেনা এক রূপে। ফল প্রকাশের দিন আমি ঢাকায় ছিলাম বলে স্কুলে যাওয়া হয়নি। কয়েকদিন পর বাড়িতে গিয়ে স্কুলে গেলাম স্যারদের সঙ্গে দেখা করার জন্য। সম্ভবত সেটি ছুটির দিন ছিল। স্কুল বন্ধ। চলে গেলাম স্কুলসংলগ্ন স্যারের বাসায়। দরজা খোলা। বিছানায় স্যার একা শুয়ে আছেন। আমি দরজায় দাঁড়িয়ে ভেতরে যাওয়ার অনুমতি চাইলে তিনি উঠে বসলেন- কে? আমি নিজের নাম বললাম। তিনি চশমা চোখে লাগিয়ে আমাকে দেখে দু-হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললেন- ‘এসো বাবা!’ আমি প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়লাম তাঁর বুকের ওপর। তিনি এমনভাবে আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন যেন আমি এক ছোট্ট শিশু, হারিয়ে গিয়েছিলাম, আর তিনি সেই পিতা যিনি খুঁজে খুঁজে হয়রান হয়েছেন এতদিন। কত ভালোবাসতেন তিনি, ছাত্রের ভালো ফলাফলে কী বাধভাঙা আনন্দ হতো তাঁর, সেদিন বুঝেছিলাম।
মাথায়-পিঠে ক্রমাগত হাত বুলিয়ে আদর করতে লাগলেন তিনি, কপালে চুমু খেলেন, দেখলাম তাঁর দুই চোখ ভরা জল। এই এতদিন পর লিখতে গিয়ে সেই দৃশ্যটির কথা ভেবে আমার চোখ ভিজে উঠলো আবার, মনে হলো- তাঁর পবিত্র অশ্রুতে ধুয়েমুছে গেছে আমার জীবনের সকল অকল্যাণ-অমঙ্গল, মঙ্গল-আলো জ্বালিয়ে দিয়েছেন তিনি আমার জীবনজুড়ে!
