তোমায় করিগো নমস্কার : লুসিফার লায়লা

আমার হাতেখড়ি হয়েছিল এক অদ্ভুত মাস্টারমশাইয়ের হাতে, তার চেয়েও অদ্ভুত বিস্ময়কর ছিল তাঁর পাঠশালা। নির্ধারিত সময় নেই, শ্রেণিকক্ষ নেই, খাতা-বইপত্র কিচ্ছু নেই, বেত নেই, নেই কোনো রক্তচক্ষু! তার চাইতেও অদ্ভুত তাঁর নিজের বোধ—‘বিশ্বজোড়া পাঠশালা মোর, সবার আমি ছাত্র’। এহেন মাস্টারমশাই আদতে কি কিছু শেখাতে পারেন? না শিক্ষক হিসেবে তাঁকে কেউ মান্যি দেয়? এরকম অজস্র খুঁত নিয়েও তিনি আমাদের চিরকালের মাস্টারমশাই হয়েই রইলেন!
এই লেখাটা আমি লিখতেই পারতাম আমার একাডেমির প্রিয় শিক্ষকদের মুখ সামনে নিয়ে। সেটাই হয়তো জানতে বা পড়তে চাইবে সবাই। কিন্তু লিখতে বসে মনে হলো—উদ্দেশ্যপ্রণোদিত শিক্ষাদানে অনাগ্রহী আমার, আমাদের প্রথম মাস্টারমশাইকে আমি ভীষণ ভালোবাসি। আজ সেই মাস্টারমশাইয়ের কথা হোক, তাঁরই গুণগান, যা তিনি কোনোদিন শুনতে চাননি, সেইসব চলতে থাকুক সারাদিন ধরে।
আমাদের মাস্টারমশাই জীবিকা নির্বাহ করবার জন্য যে-পেশা বেছে নিয়েছিলেন সেটি তাঁর অল্প বয়সে অত্যন্ত প্রিয় ছিল। বয়স বাড়ার সাথে সাথে তিনি বুঝেছিলেন ওঁর ভেতর প্রবল এক লেখকসত্তা সুপ্ত হয়ে আছে। যখন বুঝলেন ততদিনে তাঁর সংসারের শেকড় অনেক গভীরে প্রোথিত হয়েছে, বড় সন্তানের দায়িত্ব এড়ানো অসম্ভব সে-কথাও মেনে নিয়েছেন চুপচাপ, আর তাঁর প্রিয় পেশাটি লেখকসত্তার জন্য অনুপযোগী এটাও বুঝেছিলেন নানা মূল্য দিয়ে। তাই গতস্য শোচনাই তাঁর শাস্তি, নিজের ইচ্ছের বিরুদ্ধে জীবন বেছে নেয়ার মাশুল।  যাই হোক তিনি তাঁর না-হয়ে ওঠার ভার বয়ে বেড়ানো মানুষ ছিলেন না বলে শিশুর মতোই খেলা ভেঙে নতুন খেলায় মেতে উঠতে পারতেন। তাঁর নানাবিধ শ্রেণিকক্ষের ভেতর একটার গল্প দিয়ে শুরু করি।
মাস্টারমশাইয়ের প্রিয় শ্রেণিকক্ষের একটি, বাসার রান্নাঘরের সামনের খোলা জায়গা। বাজারফেরত মাস্টারমশাই সমস্ত সদাই থালায় উপুড় করে দিয়ে আমাদের সাথে নিয়ে বসতেন। বাজার-সদাইয়ের নামধাম, রং-রূপ, বৈশিষ্ট্য নিয়ে কথা বলতেন আর আমরা চিনতাম কাতল মাছ আর রুই মাছের ভেদ চিনতে হয় মাথা দেখে। পাকা পুঁইবীজ থেকে ভারি সুন্দর বেগুনি রং হয় কিংবা শিউলি ফুলের বোঁটার রং কমলা আর সেটা দিয়ে খাবারের রং থেকে শুরু করে ছবি আঁকা সমস্তই চলতে পারে।
অ-আ-ক-খ শেখার বদলে আমরা শিখতে শুরু করলাম পরিবেশবিদ্যা, প্রাতর্ভ্রমণে নিয়ে গিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বলতেন বৃষ্টির জল উইপিং দেবদারুর শরীর চুঁইয়ে নামে বলেই ওর নামের শুরুতে ‘উইপিং’ আছে। বটল ব্রাশের ফুল বোতল ধোয়ার ব্রাশের মতো বলেই ওর অমন নাম অথবা আমাদের অঞ্চলে যাকে সক্কলে শিশুগাছ বলে ডাকে রবীন্দ্রনাথের গানে সে-ই শিরীষ নামে উজ্জ্বল। গাছেদের সাথে মানুষের জীবন জড়িয়ে আছে, বৃক্ষ তার বেঁচে থাকার প্রধানতম উপাদান অক্সিজেনের প্রস্তুতকারক।
এমন সব অবাক-করা পাঠদানের এক সকালে তাঁর সবচেয়ে বড় শিক্ষার্থীটির হাত থেকে শিলনোড়া পড়ে একটা গিনিপিগ মারা গেছে।  সমস্ত কাজ ছেড়ে মৃত গিনিপিগ হাতে তিনি ভীষণ ব্যথিত হয়ে বললেন, ওকে তুমি মেরে ফেললে! সেদিনের সেই ব্যথিত মুখের মাস্টারমশাই কিছুই শেখাতে চাননি, বড় হবার পথে হাঁটতে হাঁটতে বুঝেছি বহুদিন আগে দেখা মাস্টারমশাইয়ের অবাক করা ব্যথার মানে, বুঝেছি কেবল মানুষের একার প্রাণটাই গুরুত্বপূর্ণ নয়।
রাস্তায় হাঁটতে গিয়ে জ্বলন্ত সিগারেটের বাট, ভাঙা কাচের টুকরো, জংধরা পেরেক কুড়িয়ে নিয়ে নিরাপদ দূরত্বে ফেলে দিতেন। রাস্তার ময়লা হাত দিয়ে ধরতেন বলে আমাদের কিঞ্চিৎ রাগ হতো। উনি হেসে বলতেন, সবার পায়ে তো জুতো থাকে না। খালিপায়ে চলা মানুষগুলোর কথাও ভাবতে হবে। এমন দায় চাপিয়ে দেননি অথচ সেদিনের পরে রাস্তা থেকে সেসব সরিয়ে নেয়ার দায়িত্ব আপনা থেকেই নিয়েছি আমরা। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন জামাকাপড় সমেত নালায় নেমে বেড়ালছানা উদ্ধার করে মায়ের বুকে ফিরিয়ে দিয়ে তিনি স্বস্তির নিশ্বাস ফেলতেন।
জোর করে শেখাবেন না এমন পণ করা মাস্টারমশাই তাঁর  ছুটির দিনে হয়ে উঠতেন আমাদের একান্ত গল্পবুড়ো। পৃথিবীর নানা প্রান্তের উপকথা, রূপকথার ঝাঁপি খুলতে খুলতে তাঁর  দ্যুতিময় চোখ, মুখের ভঙ্গি, হাত-পা নাড়ানো সব একটা  বিস্ময়কর জগতের দিকে আমাদের টেনে নিয়ে যেত। তিনি যেন হ্যামেলিনের সেই বাঁশিওয়ালা যাঁর পিছু ছুটতে ছুটতে আমরা চিনেছি রবীন্দ্রনাথ থেকে সুকুমার রায়, ঠাকুমার ঝুলি থেকে হান্স ক্রিশ্চিয়ান অ্যান্ডারসন কিংবা ইশপ। ইশপের গল্পের শেষে নীতিবাক্য কখনো বলতে শুনিনি ওঁকে। মনে হয় ভাবতেন সেইসব নীতিকথা চাপিয়ে দেয়ার চাইতে নিজে বুঝতে শেখাটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
দারুণ ভ্রমণপিপাসু ছিলেন তিনি অথচ পাশের দেশের কলকাতার বাইরে আর কোথাও যাননি কখনো! তাহলে এই যে এতসব ভ্রমণের গল্প তিনি কী করে করতেন? উত্তরে বলেছিলেন, ভ্রমণ কেবল সশরীরে হতে হবে এমন কোনো দিব্যি কেউ দেয়নি। রাতদিন মাথা গুঁজে এত এত সব বইপত্রের ভেতর তিনি হিমালয়ের চূড়ায় চড়লেন, ব্যাবিলনের শূন্য-উদ্যান হয়ে চলে গেলেন আমাজনের গভীর জঙ্গলে, ফিরে এসেই হয়তো ছুটলেন ইলোরা, অজন্তায়। পৃথিবীর দীর্ঘতম রেলপথের গল্পে আমাদের সবার চোখ চকচক আর মন আইঢাই করত। বহুকাল পরে আমাদেরই একজন রাশিয়া থেকে চীন পর্যন্ত দীর্ঘতম সেই রেলপথে ঘুরতে ঘুরতে তাঁকে ফোনে জানিয়েছিল ভ্রমণের অভিজ্ঞতা। একবার ওঁর সেই মানসভ্রমণের সঙ্গী হয়ে আমি লু্‌ভ্‌র্‌ মিউজিয়াম দেখতে গিয়েছি, সিঁড়ি ভেঙে আইফেল টাওয়ারের মাথায় উঠে কফি খেয়েছি। আশ্চর্য সেই ভ্রমণ শেষ হলে আমার ঘুমকাতর মাথাটা কাঁধে নিয়ে তিনি হয়তো অন্য কোনো পথে বেরিয়ে পড়েছেন পৃথিবীর পথে। পৃথিবী নামের এই নীলাভ সবুজ গ্রহটাই যে হয়ে উঠতে পারে আমাদের শিক্ষার আকরগ্রন্থ উনি না থাকলে হয়তো জানাই হতো না।

অ-তে আম, A for apple শেখা হলো না বলে অন্য অনেকের ভুরু কুঁচকে তাকানো দেখে মনে হতো এই একপাল উচ্ছন্নে যাওয়া শিশুর কিচ্ছু হবার নেই এই জীবনে। আশ্চর্যের বিষয় কিছু যে হতেই হবে এই বাস্তবতাকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে আমাদের মাস্টারমশাই হয়ে উঠলেন পৃথিবীর পাঠশালার কাণ্ডারী। তাঁর জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি আমাদের আরাধ্য হয়েই ছিলেন সে কারণে।
কিছু একটা হয়ে ওঠার ইঁদুর-দৌড় থেকে আমাদের উনি রক্ষা করতে চেয়েছেন প্রাণপণে। তাই আমরা ‘আহা কী আনন্দ আকাশে বাতাসে’ গাইতে গাইতে জীবনের পথে ধীর গতিতে…

মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না। আবশ্যক ঘরগুলো * দিয়ে চিহ্নিত করা হয়েছে