সময় ১৯৯৫ সাল, যেদিন জানলাম আমি ভর্তি পরীক্ষায় পাশ করেছি। আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে সবাইকে বলে বেড়াতে লাগলাম আমার তখনকার পদচারণা ইউএসটিসিতে, যেখানে গত আড়াই বছর আমি প্যাথলজি পড়াই। এদিকে অচেনা শহর ও প্রতিষ্ঠানের প্রতি শঙ্কাও ব্যক্ত করি বৈকি। সেখানে কমিউনিটি মেডিসিনের সহকারী অধ্যাপক শিশু বিশেষজ্ঞ স্বপন চৌধুরী খুব খুশি হয়ে বললেন, “ওহ্, প্যাথলজি? তাইলে আর চিন্তার কিছু নেই। ওখানে তো কামাল আছে। ওকে আমার কথা বলবে। জানো না, কামাল তো সিএমসিরই ছাত্র। আপনি পরিচয় দিলেই হবে।”
আমি তো বিশাল ভরসা নিয়ে রওনা দিলাম। জুলাই থেকে কোর্স শুরু। ভাবসাব বুঝার জন্য জুন মাসেরই ১৮ কী ১৯ তারিখে গিয়ে ডিপার্টমেন্টে হাজির হলাম। নেমপ্লেট দেখে দেখে খুঁজে পেলাম রুম। লেখা দেখে বুঝলাম সহযোগী অধ্যাপক, মানে অনেক বড় স্যার। ভাবলাম, তাতে কী? উনি তো আমাদের কলেজের বড় ভাই। হুট করে ঢুকে পড়লাম রুমে। যে শীতল দৃষ্টিতে স্যার আমাকে দেখলেন পুরু চশমার ফাঁক দিয়ে! বুকের রক্ত যেন তখনই জমাট বেঁধে যায়। কী চাই? কিংবা কে? এ জাতীয় কিছু একটা বললেন, আজ আর মনে পড়ছে না।
আমি হিম ঠাণ্ডা কণ্ঠে বিভ্রান্ত হয়ে পড়লাম। তারপরও ভাবলাম, হয়তো সিএমসির পরিচয় আর স্বপনদার কথা বললে স্যার এর মুড পাল্টে যাবে। মনে মনে দোয়া দরুদ পড়ে বলে ফেললাম, “স্যার আমি এবার ভর্তি হয়েছি। আমি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের ছাত্র। স্বপনদা আপনার সাথে দেখা করতে বলে দিয়েছেন।” এক নি:শ্বাসে হড়বড় করে বলে ফেললাম। গোঁফের আড়ালে তিনি কি মুচকি হাসলেন? বুঝিনি। খুব গাম্ভীর্যের সাথে বললেন, “ও, আপনি তাহলে চট্টগ্রাম থেকে এসেছেন। ভালো। ওখানে সবাই গ্রস দিচ্ছেন, কাজে লেগে যান এখন থেকেই।” এসেছিলাম ভাব বুঝতে। কিন্তু আনুষ্ঠানিক সূচনার দুসপ্তাহ আগেই শুরু করে দিলাম প্যাথলজি বিভাগে গ্রস দেওয়া। সাহস করে বলতে পারিনি, পকেটে টাকা নেই, বাড়ি যেতে হবে। কবিবন্ধু সোহেল ভাইয়ের বাসায় থেকে ক্লাস শুরু করে দিলাম। পরের শুক্রবার না আসা পর্যন্ত।
কিছুদিন পরে সবাই চলে এলো। চমৎকার সব সহপাঠী। আমার ২ বছর সিনিয়র আবেদ হোসেন পলাশ ভাইকে পেয়ে বিদেশ বিভুঁইয়ে যেন প্রাণ ফিরে পেলাম। পেলাম আগের ব্যাচে চমেক-র নজিব ভাইকে। শুরু হয়ে গেল টিউটোরিয়াল। কামাল স্যারের টিউটেরিয়াল সকাল ৮টায়। নাহিদা আরজুমান্দ বানু তিতাস এর বাচ্চার বয়স মাত্র ৬মাস, থাকে উত্তরা। টিউটোরিয়াল শুরু হয়ে গেল ঠিক ৮টায়। তিতাস পৌঁছালো ৮টা ৫ মিনিট এ।
স্যার ভুরু কুঁচকে বললেন,”৮টার ১০ মিনিট আগে আসবেন, ৫ মিনিট পরে নয়”। তিতাস বললো, “স্যার আমার বাসা উত্তরা। বাস পেতে একটু…”
স্যার কথা লুফে নিয়ে বললেন,”বাসা উত্তরা হলে সে হিসেবে বের হবেন যাতে সময়ের আগে পৌঁছে যান।”
সেই দিন থেকে পরের ২ বছর ৪ মাস, তিতাস কেন আমাদের কারুরই সময়ের পরে পৌঁছাতে হয়নি।
এই প্রচণ্ড কড়া প্রিন্সিপল এর লোকটিকে দেখলেই কেঁপে উঠতো পা। কিন্তু আজ ২০ বছর পর বুঝি, যে কারণে স্যারের সামনে পা কাঁপতো, ঠিক সে কারণেই পেশাজীবন পা স্থির রেখেই চালিয়ে যাচ্ছি।
স্যারের ঘাড়ের উপর দিয়ে মাইক্রোস্কোপ দেখে হাতে-কলমে যে শিক্ষা পেয়েছি তা তো আমার আজীবন পাথেয়।
ভর্তি হওয়ার সাথে সাথে যখন জানা গেল, আমার বাড়ি চট্টগ্রাম, সাথে সাথে মালিহা আপা বললেন, এই তো আরেকজন বিষ্যুদবারের পার্টি। পরে জানলাম নজিব ভাইও বিষ্যুদবার একটু আগে আগে বেরিয়ে পড়েন। আমাকে তাই বিষ্যুদবার সকল রুটিন থেকে ফ্রি রাখা হতো। এই প্রসঙ্গে মনে পড়ছে, একদিন কী প্রসঙ্গে যেন কামাল স্যারকে বললাম, “নজিব ভাই….”। সাথে সাথে কড়া প্রত্যুত্তর – “কে আপনার ভাই, কে মামা, সেসব ঘরে বলবেন। আপনার পারিবারিক সম্পর্ক আমাদের জানার দরকার নেই। বলুন, ডা. নজিব”। মাথা নেড়ে জ্বী স্যার বলে মানে মানে কেটে পড়লাম।
বৃহস্পতিবার বাড়ি গেলে সবসময় তো আর শনিবার সকাল ৮টায় হাজির হতে পারতাম না। অথচ স্লাইড সেমিনারটি ছিলো শনিবার সকাল ৮টায়। একদিন মিনমিন করে উচ্চারণ করতে চাইলাম – দিনটা বদলানো যায় কিনা। শ্যামলী আপা বললেন, ও কাজটিও করবেন না। বললেই আপনি বিপদে পড়ে যাবেন। কতো ইচ্ছে করতো আর একটা রাত মা-বাবার সাথে কাটাই – এই এক কামাল স্যারের ভয়েই শুক্রবার রাতে হানিফের রেগুলার কাস্টমার, তবু রাস্তার জ্যামে মাঝে মাঝে দেরী হয়ে যেতো। পরে বুদ্ধি করে, ডায়াগনসিস আবেদ ভাইয়ের কাছে জমা দিয়ে যেতাম। যাতে দেরীতে পৌঁছালেও বকার মাত্রাটা সীমার ভেতর থাকে।
এবার আসি থিসিস প্রটোকল বিষয়ে। প্রথমে জমা দিলাম ব্রন্কিয়াল ব্রাশিং নিয়ে। আমি তো ইতিহাস জানি না। আমার মতো জমা দিলাম। কামাল স্যারের সে রুদ্র মূর্তি এখনো আমার পিলে চমকে দেয়। পরে জানলাম কিছুটা ফাঁকিবাজ হিসেবে পরিচিত খালেদ ভাই একই রকম প্রটোকল দিয়েছিলেন এবং স্যার তা বাদ করে দিয়েছিলেন। আমি যে নিজে সব করেছি। তা আজও জানাতে পারিনি। স্যার ভেবেছিলেন আমি সেই একই লেখা মেরে টুকে দিয়েছি। যাই হোক, তার পর তো আমি প্রটোকল বিশেষজ্ঞ। প্রতি সপ্তাহে একটা লিখি, আর পরদিনই রিজেক্টেড। পরে কামাল স্যার দয়া করে বললেন লাঙ্গ এফএনএসি সহ করলে তিনি মেনে নেবেন। তিন মাস বক্ষব্যাধি আর ক্যান্সার হাসপাতাল ঘুরে যা স্যাম্পল পেলাম – দেখি স্পুটাম মেলে তো এফএনএসি নেই, এফএনএসি পেলাম তো ব্রাশিং নেই, ব্রাশিং পাই তো বায়পসি নেই। তখন আজিম স্যারের শরণাপন্ন হয়ে ইঁদুরের অণ্ডকোষে এসপিরিনের প্রভাব দেখার থিসিস শুরু করি। তার পর থেকে পাশ করা পর্যন্ত কামাল স্যারের সামনে দাঁড়ানোর সাহস হয়নি। একদিন হঠাৎ স্লাইড সেশন শেষে জানতে চাইলেন থিসিস বিষয়ে। আর মন্তব্য করলেন “এটা তো ফার্মাকোলজির থিসিস”। আমি মাথা নিচু করে বেরিয়ে এলাম।
স্যার কোনোদিন আমার ইঁদুর বা থিসিসে আগ্রহ দেখাননি। সারাক্ষণ মনটা খারাপ থাকতো। যদি শেষে স্যার সব বাতিল করে দেন? তাই, যখন ইঁদুর সেক্রিফাইস করার দিন এলো সেদিন ভয়ে ভয়ে স্যারকে জানালাম। কিন্তু স্যার নিস্পৃহ। পরে আমার বন্ধু নিউরোসার্জারীর ছাত্র ধীমানকে ডেকে আনলাম। তার ভাল ক্যামেরা আছে। তাকে বললাম ৫৪টি ইঁদুর সবগুলোর ছবি একসাথে তুলতে হবে। সে বারবার বললো, আরে একটা ইঁদুরের ছবি তুললেই তো হয়। আমি বললাম, তুই বুঝবি না। সমস্ত নমুনা এতো মেথডিক্যালি পুঙ্খানুপুঙ্খ সংরক্ষণ করেছিলাম – সবই এই এক ভয় থেকেই। পরে যেদিন ফাইনাল পরীক্ষা দিলাম, পরীক্ষা শেষে এক্সটারনাল আব্দুল মান্নান শিকদার স্যার বললেন “তাড়াতাড়ি চলে এসো”, তখন বুঝলাম পাশ করে গেলাম। আনন্দের এই মুহূর্তে ইচ্ছে হলো কামাল স্যারের সাথে একটু দেখা করি। সালাম করি। মনে হলো, এই যে পিজি ছেড়ে চলে যাবো, আর তো এভাবে কেউ শেখাবেন না, বকবেন না। সালাম করার পর কামাল স্যার বসতে বললেন।
টিউটোরিয়াল দেওয়ার সময় ছাড়া আর কোনো সময় স্যারের সামনে বসিনি। সাহসও হয়নি। মনে হলো এক বিশাল সম্মান পেলাম। পরীক্ষা তো পাশ করবো, এটা মোটামুটি বুঝতে পারছিলাম। কিন্তু কামাল স্যারের কাছ থেকে এমন আন্তরিক স্বর শুনবো, এ যেন পরম পাওয়া। তারপর যে অভাবনীয় কথা স্যার বললেন তা শুনে আমি পুরো থ বনে গেলাম- “আপনার থিসিসটাও ভালো থিসিস। ওটার আগের কাজটি যে জার্নালে পেয়েছেন, সেখানে পেপার পাঠিয়ে দিন”। এ কী শুনলাম! স্যার যে আমার কাজ যথার্থ পর্যবেক্ষণ করেছেন পরোক্ষে, তা বুঝলাম।
এমন একটা ডিপার্টমেন্টে পড়লাম, যার বিভাগীয় প্রধান আজিম স্যার স্নেহ দিয়ে আগলে রাখেন, আর সহযোগী অধ্যাপক রাখেন কড়া শাসনে। পড়া লেখা তো আছেই, এটিকেট শিক্ষাও সমান তালে চলে। ভয় আর ভরসা দুটো যেন এক মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ। সবচেয়ে মজার সময় কাটতো দুপুরের পরে স্লাইড দেখা। মাঝে মধ্যে রাত ১০টাও পার হয়ে যেতো। কখনো একারম্যান এর বইতে মাথা রেখে সামান্য নিদ্রাও। অকস্মাৎ রাত ৯টায় ২/১ বার ঘুরে গেলেন কামাল স্যার। সে কী মারাত্মক সময়!
টিউটোরিয়াল এর কথা না বললে তো চলে না। এমন কাণ্ড জীবনে দেখিওনি, শুনিওনি। টানা ২০/৩০ পৃষ্ঠা পড়া দিয়ে দিলো। ঠাটা মুখস্ত করো। স্যার বই খুলে রাখেন, আর আমরা মুখস্ত বলে যাই। প্রথম দিন বদরুল স্যারের খপ্পরে। প্যারাকেরাটোসিস, পোরোকেরাটোসিস, স্পনজিওসিস- কী সব খটর মটর শব্দ! বাপের জন্মেও শুনিনি। আর যেই দাঁড়ি কমা সেমিকোলনে ভুল হলো – “এভাবে হবে না। জানেন, কতো এম ফিল এই ৬ তলার জানালা দিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছি”। মোটামুটি সব স্যারই রবিন্স মুখস্ত চান। কামাল স্যার তবু কিছুটা রিল্যাক্সড ছিলেন। একটু এদিক ওদিক হলে তেমন খেপতেন না। তবে মজার ব্যাপার হলো কামাল স্যারের টিউটোরিয়ালের দিন প্রস্তুতি এমন থাকতো যে খুব একটা ভুল হতো না। আমি আবার জীবনে মুখস্ত না করা লোক। কী ফ্যাসাদে পড়লাম। তিতাস আর মিমি সব গড়গড় করে বলে যায়, আমার সব তাতেই আমতা আমতা। বিকাল থেকে রাত ১০টা মুখস্ত করে রাতের খাবার খেতাম, তারপর রিকশায় বাবলার সাথে মগবাজারের ভাড়া বাসায় যাবার পথে পুরো পড়া মুখস্ত বলতাম। বাবলার বিহ্বল বিস্ময় বুঝতাম। তবে, সে ছিল খুব ভাল শ্রোতা। রাতে ঘুমিয়ে ভোর ৫টায় উঠে আবার মুখস্ত করা। ৭টায় বের হয়ে ডিপার্টমেন্টে হাজিরা।
কিন্তু টিউটোরিয়াল দেবার আগে দেখতাম সব ভুলে বসে আছি। সহপাঠী কবির ভাই আমাকে খুব ঈর্ষা করতেন – আমার ভাগ্যকে। স্যারের রুমে ঢুকার আগে, যে অংশটা পড়তাম, স্যাররা প্রায় সেটাই আমাকে ধরতেন। আমি কোনো রকমে পড়াটা বমি করে, সব কিছু ভুলে যেতাম। আর যে অংশে দুর্বল, কবির ভাইকে সেটাই ধরা হতো।
এই যে বাইরে কঠিন ভেতরে কোমল কামাল স্যার যে আমাকে খুব পছন্দ করেন, ভালোবাসেন, তা বুঝতে পারি অনেক পরে। ২০০৯এ পিএইচডি শেষ করলাম। ২০১১ তে হঠাৎ ডেকে পাঠালেন। সরাসরি বিএসএমএমইউতে যোগদানের প্রস্তাব। আমি অশ্রুসিক্ত হলাম, আপ্লুত হলাম। প্রস্তুতিও নিয়েছিলাম। তখন অবশ্য আর তা হয়ে ওঠে নি অন্য কারণে। ২০১২-২০১৮, আমার সব রকম কনফারেন্স বা সিএমইতে স্যার সবসময় আমাকে উৎসাহ দিতেন। তখন না হলেও ২০২০-এ কামাল স্যার এবং কামরুল স্যার মিলে আমাকে ঠিকই নিয়ে এলেন বিএসএমএমইউর প্যাথলজি বিভাগে। কামাল স্যারের সেই বিখ্যাত রুমটিতে আমি কাজ শুরু করি। আজ আমি শুধু এটুকুই বুঝি, যা জেনেছি বা জানার আগ্রহ সবই এই মহান শিক্ষকের জন্য – আমার মেন্টর, মনোলোকের শিক্ষক।
