এ ফাদার ইন চট্টগ্রাম কলেজ : ওমর কায়সার

গ্যালারি। রেড বিল্ডিং। ক্যান্টিন। মিলনায়তন। ভূগোল ভবনের করিডোর। মূল ভবন থেকে পূর্ব গেটে যাওয়ার সিঁড়ি। এরকম নানা স্থির চিত্র মগজে ঝুলে আছে। কিন্তু কোনো পূর্ণাঙ্গ চলচ্চিত্র নেই। কোনো ঘটনার কথা মনে পড়ে তো, তার চরিত্রগুলো ঝাপসা। কিছু কিছু মুখ মাঝে মাঝে বড় স্পষ্ট হয়ে ওঠে, কিন্তু নাম খুঁজে পাওয়া যায় না। চট্টগ্রাম কলেজ নিয়ে প্রতারক স্মৃতি এক অদ্ভুত লুকোচুরি খেলে আমার সঙ্গে।

সত্তুর দশকের শেষে আমাদের যৌবনের উত্থান পর্বটি নিশ্চয় জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়। সেটি এখন কেমন রহস্যে ভরা।  কোনো প্রাচীন চিত্রকলার মতো আমার হৃদয়ে। কিন্তু আশ্চর্য এক ব্যাপার। এমন কুয়াশার মধ্যেও একজন মানুষ আমার কাছে বড় স্পষ্ট হয়ে আছে। না কোন স্থির অচঞ্চল চিত্র নয়, একেবারে চলচ্চিত্রের মতো কিছু দৃশ্য আমি এখনো ধারণ করে আছি। যেন একটি আধুনিক আর্কাইভে সুরক্ষিত আছে সেই গল্প।  যারা আমার মতো চট্টগ্রাম কলেজের শিক্ষার্থী তারা এই ঘটনা স্মরণ করে সেদিনের মতো  আর্দ্র হয়ে উঠেব তাদের হৃদয়।

এই ঘটনার নায়ক আমাদের রণজিৎ স্যার। সত্যিকারের নায়ক। তিনি ছিলেন আমার স্বপ্নের মানুষ। তাঁর দীর্ঘ দেহ, কেতাদুরস্ত জামা কাপড়, উল্টো দিকে ঘোরানো চুলে মাঝ বরাবর সিঁথি, সামান্য বাতাসে অথবা ব্যস্ত হয়ে হাঁটার সময় ফুরফুর করে উড়ত।  তার কবিতা বলার আবেগ, বক্তৃতা দেওয়ার নাটকীয়তায়, ক্লাস নেওয়ার সময় পাঠ বুঝিয়ে দেওয়ার সক্ষমতা এবং কথা বলার আন্তরিকতায় আমি মোহাচ্ছন্ন ছিলাম। মনে হতো মর্ত্যের মানুষ নন তিনি। আকাশ থেকে আসা কোনো দেবদূত। আমি এতটাই মুগ্ধ ছিলাম স্যারের প্রতি কোনো কাজ ছাড়াই ছল ধরে তাঁর কাছে যেতাম। স্যার হাতওয়ালা চেয়ার থেকে তাঁর বাম হাত দিয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরে  জিজ্ঞাসার উত্তর দিতেন। আমার যত অপ্রয়োজনের জিজ্ঞাসা আগ্রহ নিয়ে শুনতেন। আর সেসবের জবাব দিতেন ঝটফট। স্যারকে তখন আমার মনে হতো একটা সজীব অভিধানের মতো।

আমরা ক্লাসে কত দুষ্টুমি করেছি। গ্যালারিতে ওপর থেকে মার্বেল ছুড়েছি। বৃষ্টির দিনে ক্লাসের ভেতর ছাতা ধরেছি। কৌটার ভেতর ব্যাং নিয়ে গেছি। কিন্তু রণজিৎ চক্রবর্তীর ক্লাস ছিল সুনসান। অস্থির ছেলেগুলোকে দেখতাম স্যারের কথা শুনবার জন্য উদগ্রীব হয়ে কান পেতে আছে।

একদিন আমি স্যারের কাছে গেলাম অকারণে। দ্বিতীয় তলার ইংরেজি বিভাগের কক্ষে স্যার অন্যদের সঙ্গে আলাপে ব্যস্ত ছিলেন। আমাকে খেয়াল করেন নি। আমি দরজার কাছে পর্দা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে রইলাম। স্যারকে নমস্কার কিংবা কোনো সম্বোধন করে দৃষ্টি আকর্ষণ করব সেই সাহস হচ্ছে না। কিন্তু ঢুকে গিয়ে বের হতেও পারছি না। কিছুক্ষণ পর স্যার আমার উপস্থিতি টের পেয়ে দ্রুত কাছে এলেন। আমার মাথায় হাত দিয়ে বললেন, কিছু বলবে?

আমি নিজের প্রত্যুৎপন্নমতিত্তে নিজেই অবাক হয়ে বললাম — স্যার আমার ইংরেজি খুব দুর্বল। বাবা বলেছে আপনার কাছে প্রাইভেট পড়তে।

মৃদু হেসে স্যার বললেন, আমার ক্লাস যদি তুমি মনযোগ দিয়ে শোন তবে আর প্রাইভেট পড়তে হবে না।

আমি বললাম — স্যার তারপরও অনেক কিছু বোঝার থাকে।

স্যার বললেন, ক্লাসে যদি তোমার কোনো কিছু বুঝতে অসুবিধা হয়, আমি তোমাকে ক্লাসের পরে কিছু সময় দেব।

কিন্তু আমি নাছোরবান্দ। বাবা আমাকে প্রাইভেট পড়তে বলেনি। কেউ আমাকে পরামর্শ দেয়নি। তবু আমি জোর করতে লাগলাম স্যারকে — স্যার আমি আপনার কাছে পড়বই।

অগত্যা স্যার রাজী হলেন। কলেজে যে স্যারকে দেখেছি, এখানে তার  উল্টো। ঘরোয়া আলাপী মানুষ। স্যার আমার সঙ্গে এমন আচরণ করলেন যেন আমি তার ঘরের একজন সদস্য। তার হেমসেন লেনের বাসায় প্রথম যেদিন গিয়েছি সেদিন তিনি আমাকে একটি ফুলস্কেপ সাদা কাগজ দিয়ে বললেন, চেয়ার নিয়ে একটি রচনা লেখ, ইংরেজিতে।

চেয়ার নিয়ে ইংরেজিতে কোনো রচনা এর আগে কোনোদিন পড়িনি। লিখব কীভাবে।

স্যার বললেন, পড়নি, কিন্তু জন্মের পর থেকেই তো চেয়ার দেখছ। চেয়ার ছাড়া তো এই আধুনিক জীবনটাই অচল। পড়া মুখস্ত করে জ্ঞানার্জন হয় না, দেখাটাই আসল, দেখে অনুধাবন করাটাই জ্ঞান।

স্যার আমাকে সাহস দিয়ে বললেন, দেখ, এটা পরীক্ষা নয়। এখানে পাশ ফেল নেই। নম্বর বেশি কম পাওয়ার বিষয় নেই। তুমি যা দেখেছ, বুঝেছ সেইটা তোমার জানা শব্দগুলো দিয়ে লেখ।

আমি চেয়ার নিয়ে লেখা শেষ করলাম ভয়ে ভয়ে। স্যার সেই লেখা দেখলেন। সেটার ভুল ভ্রান্তি বিশ্লেষণ করলেন। কিছু শব্দের বিকল্প শব্দ শেখালেন। একটা রচনা নিয়ে স্যার আমার সঙ্গে প্রায় এক ঘণ্টা কাটালেন। তারপর বললেন আজ ছুটি। আর বললেন, আমার এখানে পড়তে আসবে না, আসবে লিখতে। প্রতিদিন আমি তোমাকে একটা কাগজ দেব, আর তুমি নতুন নতুন বিষয়ে লিখবে।

এভাবে সপ্তাহে তিনদিন স্যারের কাছে যেতাম। একটা করে রচনা লিখতাম।  তিন মাস অতিক্রান্ত। স্যার আমাকে একদিন বললেন, আজ তুমি চেয়ার নিয়ে একটা রচনা লেখ।

আমার মনে পড়ে গেল প্রথম দিন আমাকে এই বিষয়ে লিখতে বলেছিলেন। প্রতিদিন নানা বিষয় বলতে বলতে স্যার আর বিষয় খুঁজে পাচ্ছেন না। তাই আবার পুরোনো বিষয়ের কথা বললেন। আমি মৃদু আপত্তি তুললাম।

স্যার বললেন, আমি জানি, প্রথম দিন তুমি এ বিষয়ে লিখেছ। আজও লেখ।

আমি লিখলাম। লেখা শেষে তিনি একটা আলমারী খুললেন। দেখি আমার লেখা সব রচনা স্যার একটা ফাইলের মধ্যে রেখে দিয়েছেন। বললেন, প্রথম দিন তুমি যে রচনা লিখেছ, তিনমাস প্র্যাকটিসের পর তুমি নিজেই দেখ কতুটুক উন্নতি হয়েছে তোমার। আমি প্রথম দিনের লেখার সঙ্গে আমি মিলিয়ে সত্যি অনেক প্রার্থক্য খুঁজে পেলাম। তবে সেদিনের স্যারের অনেক কথা আমার জীবনের সম্পদ হয়ে থাকবে। স্যার বললেন, শব্দকে যে যত বেশি মাত্রায় ব্যবহার করতে পারবে সে তত বড় পণ্ডিত। তুমি শুধু চেয়ার মানে একটা আসবাব বোঝাতে চেয়েছে। কিন্তু চেয়ার তো ক্ষমতার প্রতীক। সে সম্পর্কে কিছু লেখনি। শব্দের স্বাভাবিক অর্থকে ছাড়িয়ে নতুন অর্থ দিতে পারলে তোমার রচনাটি হতো অনেক মূল্যবান। স্যার বললেন, দেশের চেয়ারে বসে আছে এখন ভুল মানুষ। এই চেয়ার তার নয়, সে অনধিকার চর্চা করে চেয়ারটি দখল করেছে। আমার যেন একটা নতুন দিগন্ত খুলে গেল স্যারের কথায়।

এমনি বহু কথা, বহু স্মৃতি জীবনের বহু বাঁক পেরিয়েও আমি ভুলতে পারিনি। সেইসব কথা উচ্চারণের ক্ষেত্র এটি নয়। এই লেখা শুধু চট্টগ্রাম কলেজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নানা স্মৃতির প্রকোষ্ট উম্মোচনের জন্য। তাই আবার চট্টগ্রাম কলেজে ফিরে আসছি। তাও আবার স্যারের ক্লাসে। ঘণ্টা পড়ার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে স্যার ক্লাসে আসতেন। ক্লাসে ঢুকেই প্রথমে হাতের ঘড়িটা খুলে টেবিলে রাখতেন। তারপর ব্ল্যাকবোর্ডে লিখতে পড়ার বিষয়টা। একদিন স্যার এসে ব্ল্যাক বোর্ডে লিখলেন — এ মাদার ইন ম্যানভিল। এটি একটি গল্পের নাম। লেখক মারজোরি কিনান রওলিংস। অনেক কষ্টে এই নারী লেখকের নাম আমি মুখস্ত করেছি। কারণ স্যারের উপস্থাপনার কারণে এই গল্পটিকে এত ভালোবেসে ফেলেছি যে এর লেখকের নাম মনে না রাখার কোনো উপায় ছিল না। স্যার অত্যন্ত নাটকীয়তায়, সহজ ইংরেজিতে, অভিনয় করে সাসপেন্স রেখে একজন পারফরমারের মতো্ নিপুণ বাচন ভঙ্গিতে গল্পটি আমাদের বলতে লাগলেন। আমরা তন্ময় হয়ে শুনতে থাকলাম। জেরি নামে একটা দশ বছরের বালক। এতিমখানায় থাকে। এতিমখানার পাশে একটি কক্ষ ভাড়া নিয়ে কিছুদিনের জন্য একটা লেখা শেষ করতে এলেন লেখক সেখানে। তীব্র তুষারপাতের শীতল দিনগুলোতে উত্তাপের জন্য ঘরে ফায়ার প্লেসে আগুন জ্বালিয়ে রাখতে হয়।  জেরি লেখককে কাঠ কেটে দিত সামান্য পারিশ্রমিকের বিনিময়ে। জেরি খুব পরিশ্রমি, সৎ এবং মায়াবী। প্রতিদিন কাঠ কাটতে এসে জেরি লেখিকার পাশে এসে বসত। নানা গল্প করত। জেরি লেখিকাকে বলত, আপনি যখন আগুনের কাছাকাছি বসেন, তখন আপনাকে আমার মায়ের মতো লাগে। আপনার চেহারা  কিছুটা আমার মায়ের মতো।

প্রতিদিন জেরি তার মায়ের গল্প বলত জেরিকে। মা তাকে কী কী উপহার দিয়েছে, কখন দেখতে আসে। এইসব গল্প শুনে শুনে লেখিকা আক্ষেপ করতেন — আহারে এতটুকুন ছেলেকে তার মা কেন এতিমখানায় দিল।

 গল্পের শেষ দিকে এসে দেখা যায় লেখিকা সে্ই এতিম খানা ছেড়ে চলে যাবেন। যাওয়ার আগে তিনি জেরির সঙ্গে দেখা করেত যান। কিন্তু পান নি। সেখানে জেরির জন্য কিছু টাকা রেখে যান এতিমখানার কর্মকর্তার কাছে। তখনই লেখিকা জানলেন, জেরির আসলে মা নেই, মায়ের গল্পগুলো সে যা বলেছে তা সবই কাল্পনিক। মাকে পাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা থেকে এবং লেখিকার কাছ থেকে মাতৃস্নেহ পাওয়ার ব্যাকুল বাসনা থেকে মাতৃহীন জেরি লেখিকাকে মায়ের গল্প বলত। ক্লাসে পিনপতন নিস্তব্ধতা। ওই মাতৃহীন শিশুর জন্য আমাদের ভেতরে এমন এক মায়া জাগিয়ে দিল স্যার। আমরা বাকরুদ্ধ হয়ে গেলাম। এমন সময় মেয়েদের সারি থেকে হঠাৎ কান্না ভেসে এলো। একেবারে সামনের সারিতে বসেছিল মেয়েটি। তার কান্না শুনে স্যার কথা বলা বন্ধ করলেন। প্ল্যাটফর্ম থেকে নেমে মেয়েটির কাছে গেলেন। সস্নেহে তাকে জিজ্ঞেস করলেন, কি হয়েছে? কোনো অসুখ। মেয়েটি মুখ নিচু করে কেঁদে কেঁদে বলল, স্যার আমারও মা নেই। স্যার কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর চশমা নামিয়ে রুমালে চোখ মুছলেন। মেয়েটিকে মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, আমরা আছি তো। এ মাদার এন ম্যানভিল পড়তে পড়তে আমরা সবাই যেন এ ফাদার ইন চট্টগ্রাম কলেজ দেখলাম।

মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না। আবশ্যক ঘরগুলো * দিয়ে চিহ্নিত করা হয়েছে