ঝড় বৃষ্টি নিয়েই তো আমাদের জীবন। কখনো ঝড়ের সাথে লড়াই করে টিকা থাকা। আবার কখনো ঝড়ের বিরুদ্ধে গিয়ে নিত্যদিনের রুটি-রুজির যোগান দেওয়া। এই বড় বেলায় এসে আমার বারবার মনে হয় আহারে ছোট বেলা, ছোট বেলায় বুঝিনি কখনো ছোট বেলাটাই জীবনের আনন্দ আয়োজনের সেরা সময় ছিল। বরাবরই দায়িত্ব এড়ানো মানুষ আমি। অথচ দায়িত্বই এখন আমাকে দখল করে রাখে সারাক্ষণ। কোনো না কোনো অজুহাতে দায়িত্ব যখন কাঁধের উপর নিঃশব্দে নিঃশ্বাস ফেলে তখন আমার চিৎকার করে ফিরিয়ে দাও অরণ্যের মতো বলতে ইচ্ছে করে ফিরিয়ে দাও শৈশব।
শহরে বসবাস করার কারণে ঝড় বাদলের প্রলয়ঙ্কারী রূপ সেভাবে দেখা হয়নি কখনো যেভাবে দেখেছে উপকূলবর্তী মানুষেরা।
বড় হওয়া বয়সে দেখি ঝড়েরও নাম আছে। নামগুলো আবার ঝড়ের মতোই দাগ কেটে আছে মনে। সিডর, আইলা, মহাসেন, বুলবুল, আম্পান, রোয়ানু, সিত্রাং, রেমালু….
১৯৯১ সালে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে প্রলয়ঙ্কারী ঘূর্ণিঝড়ের সময় আমি ক্লাস ফাইভে পড়ি। এত বড় একটা ঘূর্ণিঝড় বয়ে গেলো দেশের উপর, প্রায় ১ লাখ ৩৮ হাজার মানুষ মারা গিয়েছে, গরু,ছাগল, হাঁস, মুরগী সহ গৃহপালিত পশু পাখির তো হিসেব নেই। ঘূর্ণিঝড়ের পরদিন সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠে দেখি আমাদের বিল্ডিংয়ের আশেপাশের সব লণ্ডভণ্ড হয়ে আছে। আমরা যে বাসায় থাকতাম সেই বাড়িওয়ালার খোলা উঠানের মতো ছোট একটা জায়গা ছিল। সেখানে আমগাছ, নারকেল গাছ, সুপারি গাছ ছিল। সকাল বেলা দেখি নারকেল গাছের ডাল,আম গাছের ডাল পড়ে আছে। এদিকে সেদিকে ডাব, নারকেল ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। এক পলক তাকিয়ে বোঝা যাচ্ছে এখানে প্রলয়ঙ্কারী কিছু ঘটে গেছে। তারপর তো সবার মুখে মুখে কেবল ঘূর্ণিঝড়ের অস্বাভাবিক তান্ডবের কথা। দু’একদিন পর থেকে আবার পত্রিকা আসা শুরু হলো। পত্রিকায় বড় বড় করে উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের মৃত্যুর খবর, হাহাকারের খবর, কান্নার খবর ছাপা হয়। লাখের উপর মানুষ মারা যায়, নিখোঁজ হয়, মরে যায়, ভেসে যায় অগুনিত গৃহপালিত পশুপাখি। ধ্বংস হয় ফসলের মাঠ, পুকুরের মাছসহ পুরো উপকূলীয় বিশাল জনপদ। টেলিভিশন বন্ধ। চট্টগ্রামে বেতবুনিয়া ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্র লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় ঘূর্ণিঝড়ের প্রকোপে। বয়স কম ছিল বলে আবেগ অনুভূতিও হয়তো কম ছিল। এত এত মানুষের মৃত্যু, এত ধ্বংসের খবরে সাময়িক মন খারাপ হলেও কিছুক্ষণ পরেই আমরা আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছিলাম। ঘূর্ণিঝড়ের কারণে আমরা বিল্ডিংয়ের বাচ্চারা প্রথম ধাক্কা খেয়েছিলাম বুধবারে। কারণ বুধবারে টিভিতে ইংরেজী সিরিয়াল “ম্যাকগাইভার”দেখানো হতো। ম্যাকগাইভার তখন আমাদের জান-প্রাণ, বাঁচা-মরা সব কিছু। “ম্যাকগাইভার” দেখতে না পারার শোক আমরা পাথর হয়ে থাকতাম বুধবার রাতে। এরমধ্যে সপ্তাহ খানেক পরেই জানা গেল এখন থেকে আর মাছ খাওয়া যাবে না কারণ নদী, সমুদ্রে ঝড়ের তোড়ে ভেসে যাওয়া মৃত মানুষদের শরীর নাকি মাছেদের খাবার হয়ে গেছে। বিল্ডিংয়ের প্রতিবেশীদের পারস্পরিক দৈনন্দিন আলাপচারিতার একটা বড় অংশই ছিল কখন থেকে মাছ খাওয়া যাবে, এই বিষয়ে। তারপর ঠিক কখন থেকে মানুষ স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে শুরু করেছে কিংবা ধ্বংসস্তুপ থেকে ফিনিক্সের মতো জেগে উঠেছে প্রকৃতির নিয়ম অনুসারে। মানুষ লড়াকু জাতি। লড়াইয়ের ধরণ ভিন্ন। কিন্তু লড়াই চলমান। আর সেই চলমান লড়াইকে পুঁজি করে তারা আবার একটু একটু ঘরে তোলে তাসের ঘর।
সেগুলো আর আমার স্মৃতিতে একদমই ডানা ঝাপটায় না। বাসায় নিয়মিত পত্রিকা নেওয়ার সুবাধে অবশ্য ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের জীবনের টুকরো টুকরো খবর পেতাম যেগুলো বিশাল সমুদ্রের ক্ষুদ্র বালুকণার মতো। এরপর বছর পেরোতেই দেখি ২৯ এপ্রিল এক কালো রাত্রি হিসেবে আমাদের স্মৃতিতে এবং ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছে। অনেক বছর পর জানতে পেরেছি ১৯৯১ এর সেই প্রলয়ঙ্কারী ঘূর্ণিঝড়ের নাম ছিল “ম্যারি অ্যান”।
১৯৯১ সালের পরও আরও অনেক ঘূর্ণিঝড় হয়েছে। কিন্তু ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ের ভয়াবহতাকে মানুষ ভুলতে পারেনি আজও। আর যারা সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত আমৃত্যু এই ট্রমা নিয়েই বাঁচবেন তারা। কিছু বিষয় আছে যেগুলো চাইলেও ভোলা যায় না। ৯১ এর প্রলয়ঙ্কারী ঘূর্ণিঝড় তেমনই এক ট্রমা।
আমার অবশ্য ২০০৭ সালে “সিডর” ঘূর্ণিঝড়ের কথাও মনে আছে। সুন্দরবনের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া আরেক ভয়ংকর ঘূর্ণিঝড়। যেদিন সিডর বয়ে যাবে বাংলাদেশের উপর দিয়ে তার দু’দিন আগে আমার নানা মারা গিয়েছিলেন। নানার জানাযা শেষেই আব্বাকে জরুরি প্রয়োজনে ফিরে আসতে হচ্ছিল চট্টগ্রামে। আমার খুব খারাপ লাগছিল আব্বার জন্য। মরার চাকরি মরা বাড়ির শোকও পালন করতে দেয় না কখনো কখনো। যেদিন আমরা লক্ষীপুর থেকে ফিরে আসছিলাম তখনই খবর পাচ্ছিলাম আজ রাতেই সিডর আক্রমণ করবে। বিপদ সংকেত চলছিল। ভ্রমণ ক্লান্তির জন্য কি না জানি না রাতে বিছানায় গা এলাতেই কোথ থেকে যে মরন ঘুম এলো, এরই মাঝে নাকি দেশ কাঁপিয়ে সিডর বয়ে গেছে।
সিডর এর এই আক্রমণের সময় জন্ম নেয় এক নবজাতক। নাম রাখা হয় তার “সিডর”।
২০১৩ সালে “মহাসেন” দর্শন দিতে আসেন আমাদের। মহাসেন এর কথা আমার বিশেষ ভাবে মনে আছে। মহাসেন নামটা শুনেই আশেপাশের সবাই মজা করছিল তানসেন এর ভাই মহাসেন আসছে। মহাসেন হালকা চালেই দোলা দিয়েছিল হয়তো দেশের মানুষের মনে। তবে আমার মনে বেজায় শঙ্কা ছিল মহাসেনকে নিয়ে। সতর্কবার্তায় বারবার বলা হচ্ছিল, মহাসেন বয়ে যেতে পারে দুপুরের দিকে। আগের রাত থেকেই তুমুল ঝড়বৃষ্টি। কন্যা তখন পেটের মধ্যে ছয় মাস বয়স শেষ করার লক্ষ্যে হাত-পা ছুঁড়ে ফুটবল খেলতে থাকে। সকাল বেলা ঝড়ের প্রকোপ দেখে বসের কাছে ফোন করে ছুটি চাইতেই আমার উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া একদফা মহাসেন এর গল্পটা আর জানা হয় না কারো। মুখ আমশির মতো করে ছয়মাসের পেট ভাসিয়ে যখন বৃষ্টির মধ্যে ছাতা মাথায় করে সিএনজির জন্য অপেক্ষা করছিলাম রাস্তায়, তখন রাস্তার এতিম কুকুরগুলোর পাশাপাশি দু’চারজন ভাগ্যহত মানুষ যারা বিভিন্ন কাজের প্রয়োজনে রাস্তায় কিংবা দোকানপাটে দাঁড়িয়ে ছিলেন তাদের চোখে মুখে সে কী বিস্ময়। পাগল না হলে এই ঝড়ের মধ্যে এই শরীরে কেউ ঘর থেকে বের হয়!
২০২০ সালে এলো আম্পান কিংবা আম্ফান ঝড়। তখন করোনা মহামারির যাঁতাকলে পৃষ্ঠ হয়ে ঘরবন্দী সবাই। পুরো পৃথিবী টালমাটাল অবস্থায়। প্রতিদিন মৃত্যু সংবাদ। প্রতিদিন করোনায় আক্রান্ত মানুষের খবর, তাদের পরিজনদের কান্নার খবর। সারা পৃথিবী জুড়ে আতঙ্ক। মানুষের প্রতি মানুষের অবিশ্বাস। চিকৎসা সরঞ্জামের অভাব। সব মিলিয়ে নাজুক অস্থির একটা সময়। আম্ফানের আক্রমনের সময় দেশে চলছিল রোজার মাস। আমার তখন অঢেল সময়। চিকিৎসার ভুলে কোলের শিশু পুত্র প্রিয় তখন আমার কাছ থেকে অনেক দূরে। সদ্য পুত্র হারানোর কঠিন সময় পারি দিতে গিয়ে দিবা-রাত্রির হিসাব ভুল হয়ে যাওয়া, স্বাভাবিক জীবন থমকে যাওয়া অবস্থায় আম্ফান ঝড় বয়ে গেল উপকূলীয় মানুষের দুঃখ, বেদনাকে দীর্ঘস্থায়ী করে।
ঝড় মানেই আতঙ্ক। ঝড় মানেই ক্ষতি আর ক্ষত চিহ্ন। প্রকৃতির ঝড়ের ক্ষতচিহ্ন তবু মানুষ মনে রাখে কিংবা তাকে স্মরনীয় রাখার একটা প্রচেষ্টা থাকে সমাজের। কিন্তু মানুষের মনের ভেতর বয়ে যাওয়া ঝড়ের ক্ষতচিহ্ন কেবল তার নিজেকেই বয়ে বেড়াতে হয়। নিত্য যাপনের ব্যস্ততায় ক্ষতস্থানে হালকা প্রলেপ পড়ে গেলেও খুব একান্তে, নিজের সঙ্গে নিজের বোঝাপড়ায় দগদ্গে ক্ষতচিহ্নগুলো কেমন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মনুষ্য জীবনের ট্র্যাজেডি হলো কোনো মনুষ্য জীবনই ঝড়মুক্ত নয়।
