‘আমার দুঃখের দিন তথাগত আমার সুখের দিন ভাসমান! এমন বৃষ্টির দিন পথে-পথে আমার মৃত্যুর দিন মনে পড়ে।’ স্বপ্নবিজড়িত কোন পূরবীর সুর নিয়ে চিন্তা করতে গেলে আমার প্রথমেই মনে পড়ে শৈশবে স্কুল পালিয়ে বৃষ্টি দেখতে যাওয়ার স্মৃতি কিংবা আরও সহজভাবে বলতে গেলে বলা যায়, চলমান জলের কাছে দাঁড়িয়ে শোনা বৃষ্টির গান। সে’ই কবেকার কথা, বাবার বদলির চাকরি, তখন আমরা থাকি দ্বীপ জেলা ভোলায়। স্কুলজীবন কেটেছে ঐ মফস্বলেই। ভৌগোলিক কারণেই হয়তো অন্য সব শহরের তুলনায় এইখানে বৃষ্টি হতো বেশি। বৃষ্টি মানেই ছিল স্কুলে না যাওয়ার বাহানা, বৃষ্টি মানেই ছিল ফুটবল নিয়ে মাঠে ছুটে যাওয়া, বৃষ্টি মানেই ছিল এক অফুরন্ত ছুটির দিন। রবীন্দ্রনাথের গানের সাথে পরিচয় হয়েছিল শৈশবেই, আম্মার ইচ্ছাতেই হারমোনিয়াম নিয়ে বসতে হতো বিকালে। গানের দিদি আসতো, কোন এক বর্ষাহত দিনে দিদি একটি গানের সুর তুলে দিলো গলায়, ‘আজি ঝরো ঝরো মুখর বাদরদিনে, জানি নে, জানি নে কিছুতে কেন যে মন লাগে না ॥’ মন কেমন কেন করতো জানতাম না তখনও, এখনও কী জানি। সে’ই সুর আমাকে ছেড়ে গেছে কবে কিন্তু এখনও এই পড়ন্ত বেলায়, মধ্যবয়সে দাঁড়িয়ে যখনই বিকেলবেলার আকাশ কালো হয়ে আসে, যখনই পাখিদের মধ্যে দেখা যায় অপূর্ব চঞ্চলতা — এই বর্ষাহত মন তখনও কেমন করে, কিছুতেই এখনও যে কেন মন লাগে না! জানি না।
মেঘেদের আন্দোলনে সাড়া দিয়ে জীবনে প্রথমবার স্কুল পালিয়েছিলাম মনে পড়ে, ফিরে যাওয়া যাক সে’ই অপার্থিব দিনে। আমাদের স্কুল থেকে সামান্য দূরেই ছিল শহরের সবচেয়ে উঁচু স্থান, হ্যালিপ্যাড। বিশিষ্ট লোকজন এখানে এলে এই জায়গাটা খুবই সুন্দর করে সাজানো হতো। চারপাশে পুকুরকাটা মাঝে কপ্টার নামানোর জন্য তৈরি করা হয়েছিল বিশাল একটি বৃত্তাকার স্থান। হেলিপ্যাডের উল্টোদিকে দিগন্তবিস্তৃত ধানক্ষেত। বর্ষায় সেখানে সমস্ত লজ্জা ভেঙে জল ছলছল করতো। আমাদের পরিচিত ধানক্ষেত ক্রমেই হয়ে উঠতো মেঘনার দুধভাই। এখানে জোয়ার আছে, আছে ভাটা — ঢেউ ওকে সমুদ্রের মতো — এই কথা বলে আমারই এক বখাটে বন্ধু প্রলোভন দেখিয়েছিল হয়তো স্কুল পালানো শুরুও হলো সেইদিন। তখন সেভেন অথবা এইটে পড়ি হয়তো, ভালো মনে নেই তবে মনে আছে আমাদের ঐ নদী তার সমস্ত রূপ নিয়ে সেদিন দাঁড়িয়েছিল এক দেবীর মতো। আজানুকেশ ভিজিয়ে নেয়া আকাশছেঁচা জলে ভিজে যখন বাড়িতে এলাম তখন তুলকালাম কান্ড ঘটে গেছে.. আমি হারিয়ে ফেলেছি ছাতা আর স্কুল পালানোর খবরও পৌঁছে গেছে আম্মার কাছে। বাকি ঘটনা কী ঘটেছিল সচেতন পাঠক মাত্রই জানে, আমাদের শৈশব কেটেছে একইভাবে। ‘আব্বা বলেন, পড় রে সোনা / আম্মা বলেন মন দে’ আমাদের স্কুলজীবনে বৃষ্টি হওয়া মানেই ছিল লোডশেডিং। ঐ মফস্বলে বিদ্যুৎ চলে গেলে কখন আসবে কেউ জানতো না। আমরা হারিকেনের আলোয় তবু বই খুলে বলতাম। পাশের বাসার আন্টির সাথে গল্প করতে করতে আম্মা প্রায়ই মেঘের ভাষাতেই হুংকার দিতো, আমি শব্দ করে করে পড়তাম। কী পড়তাম সেটা বলি, আমি একটা রচনাই বারবার পড়তাম। রচনাটির নাম, ‘একটি বর্ষণমুখর সন্ধ্যা’। জানালার পাশে বসে শুনতে পেতাম বৃষ্টিপাতের শব্দ। কোন কোন পাখি এসে বসতো বারান্দায়। রাস্তাঘাট জনশূন্য। জোনাকির মিটিমিটি আলো দেখে মনে হতো, এই রচনায় বর্ণিত সকল কথাই আমার নিজের.. আমি যেন ঐ রচনারই একটি চরিত্র।
বর্ষা নিয়ে আরও পিপাসাকাতর হয়ে গেলাম হুমায়ূন আহমেদ হাতে আসার পর, বাংলা সাহিত্যে এই ভদ্রলোক এবং রবীন্দ্রনাথ যেভাবে মাতামাতি করেছেন তা অকল্পনীয়! আগে বৃষ্টি দেখতাম, বৃষ্টিতে ভিজতাম — আবেগ ঘন হয়ে আসার পর থেকে বৃষ্টিবিলাস করতে শুরু করলাম। বৃষ্টি হবে এবং হুডখুলে রিক্সায় ভিজবো না, এমন ঘটনা জীবনে খুব বেশি ঘটেনি! জীবনের দগ্ধ পান্ডুলিপি খুলে বসলে নিশাজাগরূক যে অধ্যায়ে পৌঁছুলে চোখের পাতা ঝাপসা হয়ে আসে, ঠিক এ কারণেই সেখানেও আছে বৃষ্টির সচেতন উপস্থিতি। পার্কের বেঞ্চে বসে, পাশে ছাতা ফেলে রেখে বৃষ্টিতে ভেজার যে সুখ, তা কী অন্য কোথাও আছে? ‘আবার সুখের মাঠ জলভরা আবার দুঃখের ধান ভরে যায়! এমন বৃষ্টির দিন মনে পড়ে আমার জন্মের কোনো শেষ নেই।’ অবলম্বনহীন মানুষের সবচেয়ে বড় সম্বল সম্ভবত স্মৃতি। স্মৃতিতেও আবার অনেক সেন্সরের ছাপ আছে ফলে সময়ের সাথে সাথে স্মৃতি কখন বিস্মৃতিতে পরিণত হয় ঠিক বোঝা যায় না। বৃষ্টি হলে এখন আমি অনেককিছু ভাবতে চেষ্টা করি, ভাবনাগুলো ক্রমশ অগোছালো মনে হয়, মনে হয় এইসব যা কিছু আমি চিন্তা করছি তা হয়তো অন্য কোন জীবন কিংবা গতজন্মের কথা — নিজের কাছেই কখনও কখনও নিজেকে অচেনাই লাগে। আমার কলেজ জীবন কেটেছে ঢাকায়, খুবই বিরক্তিকর ছিল ঐসব দিন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবন অবশ্য ছিল বৃষ্টিমুখর তবে অনুভূতি তখন পোক্ত হতে চলেছে।তখন বিরহের যোগাযোগ ছিল বৃষ্টির সাথে। আজ এই বড়বেলায় মনে হয়, বৃষ্টি শুধু একজন অচিন দীর্ঘশ্বাসই নয় বরং বৃষ্টির সাথে মিল আছে গোরখোদকের। সেটা কেমন একটু বলি, বৃষ্টি হলে মন খারাপ হয় এবং সুন্দর সমস্ত দিন যা পড়ে থাকে অতীতে তাও এসে করে যায় আহত। ভালো লাগে আবার লাগে না। তবে, অনুভব করি জীবন এমনই। এই কসমোপলিটন জীবনের দখল নিয়েছে যখন লাল নীল বাতি, যখন বাস্তবতার উঁচু পাঁচিলে দাঁড়িয়ে মনে হয় এই মন কনক্রিট দিয়ে গড়া, যখন বৃষ্টির দিনে অসহ্য লাগে নাগরিক জ্যাম, যখন শহরের শেষ কদম গাছটিও মরে গেছে অনাহারে তখনও মনে হয়, এই শহরেও আজও কেউ আমারই মতো করছে বৃষ্টিবিলাস। ঐ মানুষটিকে আমার হিংসে হয় খুব। যে কোন বৃষ্টির দিনে রেইনকোট পড়ে পথে নেমে আমি আজও সেই মানুষটিকেই খুঁজি, যে সচেতনভাবে বারবার হারিয়ে ফেলে ছাতা।
বাংলাদেশের অনেককিছুই আমার ভালো লাগে না। এই দেশের মানুষের জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা ভালো লাগে না। এই দেশের কালচারের নামে বদলে যাওয়া সময় ভালো লাগে না। এই দেশের মানুষের মধ্যে বেড়ে ওঠা নির্মমতা ভালো লাগে না। ভালো লাগে না আরও কত কী! তালিকা করলে নতুন কোন অধ্যায় লেখা যাবে হয়তো। সেসব থাক। মাঝেমাঝে ভাবি, দেশে ছেড়ে চলে যাবো। বাবা-মা ও সামান্য কিছু পিছুটান না থাকলে চলেও যেতাম কবেই.. ভবিষ্যতেও যাওয়ার প্রবল ইচ্ছে রাখি। যখন এইসব চিন্তা আমাকে তাড়া করে তখন ভাবি, দেশ ছেড়ে চলে গেলে ঠিক কী কী আমি আক্ষরিকঅর্থে মিস করবো? প্রথমেই মাথায় আসে বৃষ্টির কথা.. একটা কবিতাও লিখেছিলাম এই ভাবনা থেকে, ‘… বাতাসের সাথে মেঘেরা খেলছে অদূরে পড়ছে বাজ পাখি চলে গেছে আত্মগোপনে কে বাজায় পাখোয়াজ? শোনা যায় কতো নূপুরের ধ্বনি চারপাশে নেই কেউ মনে হয় রাগ মেঘমল্লার নদীতে তুলেছে ঢেউ কচুপাতা হাতে পথে নেমে আমি কুড়িয়ে পেয়েছি ফল দেখি কতো গাছ এসবের মাঝে তুলে নেয় স্নানজল! খালি পায়ে হাঁটি ঘাসেদের বুকে বুক ভরে নিই শ্বাস মাটি মাটি ঘ্রাণে মাতোয়ারা হলো ঘরছাড়া বুনোহাঁস যবনিকা নেই এই ভ্রমণের ক্রমে হই পরিণত ডুবসাঁতারের স্মৃতি সাথে হাঁটে ছায়াবন্ধুর মতো আর কিছু নয় এসব দৃশ্য তুলে নেব আমি সুরে যদি কোনদিন এই দেশ ছেড়ে যেতে হয় বহুদূরে’ আলোচনা শুরু করেছিলাম শঙ্খ ঘোষের কবিতা দিয়ে, শেষে এসে ঐ কবিতার শেষ দুটি লাইনই যেন জীবনের শাশ্বত সত্য মনে করে বারবার বলতে ইচ্ছে করে। বৃষ্টি হলেই আজও বারবার মনে হয়, এমন বৃষ্টির দিন মনে পড়ে, আমার জন্মের কোন শেষ নাই.. আমার জন্মের কোন শেষ নাই…
