ঝড়ের ধারে কাটা ছিন্নভিন্ন জীবনগুলো ★ হাফিজ রশিদ খান

আমি যেন এক ঝড়ের দেশের উপদ্রুত সন্তান।

বঙ্গোপসাগরের সন্নিকটবর্তী বিস্তীর্ণ ধানীজমি-পরিবেষ্টিত খোলা আকাশ, খোলা হাওয়া আর অষ্টপহর গম্ভীর সামুদ্রিক স্বননের ভেতর এক প্রশস্ত জনপদে আমার পিতৃপুরুষের মৌজা। তারই মাঝখানে প্রধানত কৃষি ও মৎস্যজীবীদের তামাটে, পেশিবহুল শরীর আর তাদের সুখী-সচ্ছল জীবনযাপন দেখতে-দেখতে এবং সেই মানুষগুলোর মায়ায় আমার কিশোরকালের একাংশ আর যৌবনের ছাড়া-ছাড়া কিছু পর্ব কেটেছে।

আমার জন্ম যদিও চট্টগ্রাম নগরে আমাদের আরেক বাড়িতে, বেড়ে ওঠা ও পড়াশোনাও- তারপরও একান্নবর্তী পরিবারের ভূমিকেন্দ্রিক আয়ের একটা হিস্যা ওই গ্রাম-জনপদ থেকে আসতো বলে বাবা নুরুল আনোয়ার খানের কড়া সাহচর্যে ও তার সরকারি চাকরির ব্যস্ততাজনিত সময়গুলোতে আমাকে ও আমার অন্য ভাইদের চাকতাই ও অভয় মিত্র ঘাট হয়ে বাঁশখালী উপজেলার ৩ নাম্বার খানখানাবাদ ইউনিয়নের গ্রামটিতে প্রায়শই যেতে হতো সেকালের দাঁড়টানা সাম্পান বা আলকাতরার গন্ধভরা লঞ্চযোগে জমিবর্গার (লাগিয়তি) টাকা ও কখনো-সখনো ধানের বখরা বুঝে নেবার জন্যে। দিনকয়েক পুরোনো মাটির ঘরের মেঝেয় পাটিতে বা খাটে শুয়ে, কেরোসিন কুপি বা হারিকেনের কনক আলোয় ‘চাষাভুষো’দের সঙ্গে নির্দোষ আড্ডা-হল্লা করে কাটাতে হতো।

সেই সময়টায় কখনো-কখনো রাতের ঝকঝকে আকাশে দূরের গোল-গোল তারকাদের ঝিকিমিকি রহস্যের ভেতরে আমার অনেক ভাবুকতাময় নিশিরাত কেটেছে একলা, কোনো এক ‘তুমি’কে খুঁজতে-খুঁজতে। আর পরদিন কোন্ চাষাকাকুর ঘরে গিয়ে লাগিয়তির টাকা চাইবো বা বখরার ধান বুঝে নিয়ে তা একত্র করে লোকমারফত সাম্পানে উঠিয়ে পাঠাবো বাকলিয়ার সাবানঘাটায়। অতঃপর ফিরবো সেই আরেক ঘরে, দক্ষিণ শুলকবহরের পাকা একতলায়- বাইরের দেয়ালের নিচটায় যার শেওলামাখা, সেঁতসেঁতে মাটির ওপর ইটবিছানো আর তার চারপাশে লিকলিকে মাথা তোলা দূর্বাঘাসে ছাওয়া উঠোনের একান্নবর্তী এলেবেলে বাড়িটায়।

 

দুই

ওই জনপদের কৃষিজীবী মানুষগুলোর মুখে-মুখে শুনেছি তাদের ভেতরে নিত্য গুঞ্জরিত তথা প্রচলিত গল্প ও লোকগাথা কত যে! হাস্যরঙ্গের ধাতে এগোতে-এগোতে একসময় ওদের জবানে এসে পড়তো বুকে চেপে রাখা রোদন ও বিষাদের নোনা কাহনগুলো। সাইক্লোন টর্নেডো গোর্কি ও বন্যার। তাদের বুকের অশ্রুত কান্নায় আমার হৃদয়ের চোখগুলো ভিজে যেতো আড়ালে, খুব আড়ালেই। তারপরও ওরা তেল চিকচিকে মুখে মলিন হেসে অবলীলায় হুঁকোর টিকায় বামহাতের বুড়ো আঙুলের চাপে আগুন উসকে তুলতো গড়গড় শব্দে, বড় শ্বাস-প্রশ্বাসের তালে-তালে। পাশে রাখা মাটির পাত্র থেকে হাতে বানানো মিঠেকড়া তামাকের গন্ধে ভরে ওঠা সেই সন্ধ্যারাতের বাইরের আঁধারে আমি যেন শুনতে পেতাম বুক চাপড়ানো কোনো অশরীরী মা ও বাবার পায়ের শব্দ- ধানখেতের সবুজ চাদরের ওপর দিয়ে যা হাওয়ায়-হাওয়ায় ভেসে বেড়াচ্ছে হু-হু করে।

অলখের অপার শক্তিতে গভীরভাবে বিশ্বাসী ওরা একসময় দাঁড়িয়ে ঢিলে হয়ে যাওয়া লুঙ্গির গিঁট শক্ত করে বাঁধতে-বাঁধতে সঙ্গে রাখা রঙদার জলগামছায় পিঠের দুদিকে আলতো বাড়ি দিতে-দিতে নিকষ অন্ধকার, কখনোবা ‘অফ হোয়াইট’ চাঁদের আলোয় গেঁয়ো পথ বেয়ে ঘরে ফিরে যেতো সহাস্যে ‘অ আক্কু, বিয়ানে দেহা অইবু’ বলে।

গত শতকের ষাটের দশকের মাঝপর্বে যখন আমার সাত-আট বছর বয়স, সেই ঝড় বা তুফানের (একই সঙ্গে যা জলোচ্ছ্বাসেরও নামান্তর) বহু মর্মন্তুদ কাহিনি শুনে-শুনে বুকের খুব গহনে ভারী ব্যথা হয়ে সেসব গেঁথে গেছে কঠিন, চুঁইয়ে-চুঁইয়ে রক্তঝরানো ঝকঝকে গজালের মতো। বাবা-মা-বড়ভাইরা আর গ্রাম থেকে কোর্ট-কাচারি বা অন্য কোনো কাজে শহরে এসে আমাদের বাড়িতে ঠাঁই নেয়া স্বজন ও পড়শিদের কথকী বৈঠকের এককোণে চুপটি করে বসে শোনা সেসব গল্প তো কেবলি স্বজনহারানোর বিয়োগান্তক, কেবলি ধনপ্রাণ হারানো অস্ফুট বিলাপ ছাড়া আর কিছু ছিল না।

ওই মাইজপাড়া গ্রামে জোতদার লাতু খানের বিশাল বসতভূমি। তার প্রতুল ধানীজমি ও সাগরঘেঁষা দ্রোণ-দ্রোণ মৎস্যঘোনায় কাজ করে শতাধিক মনিষ্যি। তারা অবাধে খেতো, পরতো আর শুতো ওই বাড়িরই চারদিক থেকে বাতাস বওয়া, বড়সড় দহলিজে। তার দুই স্ত্রীর তিন পুত্রসন্তান- সুলতান খান, আশরাফ উল্লাহ খান ও নুরুল আনোয়ার খান। তাদের সন্তান-সন্ততির বাড়বাড়ন্ত ঝাঁক বাড়িটা ঘিরে নিত্য কোলাহলরত। লাতু খানের একমাত্র সোমত্ত কন্যা আমিনা খাতুনও অদূরে,পাশের গ্রামের সম্পন্ন ঘরের বউ- তারও দুই ছেলে, এক মেয়ে।

১৯৬০ সালে এই উপকূলীয় এলাকায় পরপর দুটি ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে। ৯ ও ১০ অকটোবর এবং ৩১ অকটোবর। পরেরটি ছিল সবচেয়ে প্রলয়ঙ্করী। ১৫০ কিমি বেগের ওই ঘূর্ণিঝড়ের বৈনাশিক ছোবলে ৫ লক্ষাধিক মানুষ প্রাণ হারায় চট্টগ্রামসহ পুরো উপকূলীয় পূর্ববাংলায়। ১৫-২০ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসের সৃষ্টি হয়। সেই ঝড় ও জলের কালোপাহাড়ি তাণ্ডবে লাতু খানের রাজসিক হালচাষাবাদের কিংবদন্তি, মৎস্যঘোনা ও বিশাল চৌচালা বাড়ি বিলীন হয়ে যায় বঙ্গোপসাগরগর্ভে নিমিষেই। ভেসে যায় তার মেজোপুত্র সেকালের আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চতর ধর্মীয় শিক্ষা সমাপনকারী মাওলানা আশরাফ উল্লাহ খানের পরমাসুন্দী কন্যা রিজিয়া বেগম ও তার ফুটফুটে ছেলেমেয়েরা। লাতু খান তখন বেঁচে নেই। তার ছেলেদের তত্ত্বাবধানে কাজ করা সেই বাড়িতে কাজ করে খাওয়া আরও জনাবিশেক মানুষও নিরুদ্দিষ্ট হয়ে যায় অজানায়। মাওলানা আশরাফ উল্লাহ খান ও তার জামাতা ইনসাফ মিয়া (রিজিয়া বেগমের স্বামী) ঝড়ো জলোচ্ছ্বাসের ধাক্কায় ভেসে যেতে-যেতে কোনো এক ভাসন্ত বড় বৃক্ষের প্রতাপী ডালে আটকে থেকে বেঁচে গেলেন। এই আশরাফ খান ছিলেন সেকালের কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক নুরুল আনোয়ার খানের সহোদর মেজোভাই। খানখানাবাদ মৌজাসহ পুরো বাঁশখালীজুড়ে আধ্যাত্মিক তরিকার সাধকপুরুষরূপে মাওলানা আশরাফের খ্যাতি এখনো সশ্রদ্ধ গুঞ্জরণ তোলে সংগুপ্ত জনমনে। পরে তিনি সেই ইনসাফ মিয়ার সঙ্গেই তার ছোটোকন্যা মনতুলাকে- যে-মেয়েটিও কোনো দৈব আনুকূল্যে বেঁচে গিয়েছিল ভেসে যেতে-যেতে কারো বড়ঘরের চালায় আটকে গিয়ে- বিয়ে দিয়েছিলেন পারিবারিক সম্পর্কের সুতোটি ধরে রাখার লোকায়ত অঙ্গীকারে।

ষাটের সেই ঝড়ের কৃষ্ণকালে নুরুল আনোয়ার খানের পরিবার চট্টগ্রাম শহরে তারই আরেক নিবাসে অবস্থান করার কারণে তার সন্তানেরা- এই অধমসহ- রক্ষা পায় বটে, কিন্তু সেই দুর্ধর্ষ, রোমশ ঘটনা তাকে ও তার পরিবার-সদস্যদের মানসিকভাবে যেন বিচ্ছিন্ন করে ফেলে বিশদ বিষাদে গ্রামযাপনের সেই মধুর সংলগ্নতা থেকে। পরবর্তীকালে আনোয়ার খান সেই শেকড়ের সঙ্গে সম্পর্কটা সুগভীর কোনো ব্যক্তিগত দায়ে কোনো রকমে ধরে রাখলেও সেখানে নবতর বসতিনির্মাণ ও জমি-জিরাতের প্রতি আকর্ষণে কেমন জানি আলগা-আলগা বা উদাসীন রয়ে গেলেন বহুদিন। এ নিশ্চয়ই প্রিয় স্বজন-পরিজন হারানোর দুঃসহ স্মৃতিরই এক গভীর সংক্রাম! দিন যত গেল ব্যাখ্যাতীত সেই এক অদ্ভুত নাড়ির টান তাকে যেন গোপনে-গোপনে ঠিকই কুরে-কুরে খেতে থাকে। উত্তরাধিকারের বিভাজিত পৈতৃক ভিটায় তিনি আবারও চারচালা বেড়া ও ঝকঝকে টিনের ঘর গড়ে তুললেন ছেলেমেয়েদের অনুক্ত অনীহাকে উপেক্ষা করে গ্রামীণ হিতাকাঙ্ক্ষীদের নিয়ে– সে কোন্ তাড়ায় কে জানে! তার ‘ট্রমা’গ্রস্ত ছেলেমেয়েরা পিতার নিপাট ব্যক্তিত্বের মোহে আপাত হাস্যমুখে সেখানে মাঝে-মধ্যে যাওয়া-আসাপর্ব চালিয়ে গেলেও কী এক অজানা ভীতিতে শুধু শীত মরশুম বা ‘সুদিনে’ কোনো রকমে ওখানে দু-একদিন কাটাতো কেবল। আর জুতসই কোনো মওকা পেলে তল্পিতল্পাসহ তড়িঘড়ি করে শহর-বাড়িতে চলে আসতে চাইতো খাঁচা খোলা পাওয়া পাখিয়াল-পাখিয়ালির উড়ালের মতো। এই মনোজাগতিক পলায়নপরতা আর শেকড়প্রীতির প্রতি দোলাচলতার ভেতরে ক্রমে তার ছয় ছেলেমেয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার্জনের আবহে একদিন ‘তাবাল’ হয়ে গেল বিশ্বভুবনে। আর জ্যেষ্ঠ সন্তানেরা চট্টগ্রাম শহরের বুকে জড়িয়ে পড়লো ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরিবাকরি আর সামাজিক-সাংস্কৃতিক কর্মের বিভিন্ন প্রাণনায়।

এভাবে এলো ১৯৭০ সাল।  এই সেই ‘কহর’-এর ১২ নভেম্বর। এইদিন উপকূলজুড়ে আঘাত হানলো পুরাণিক ধ্বংসের দেবতার বেতাল, ক্রুদ্ধ আচরণের মতো সেই অলক্ষুণে ‘ঘুন্নিঝড়’। তার উৎপাটী ঝড়ো হাওয়া আর প্রমত্ত জলোচ্ছ্বাসে সেবারও চট্টগ্রামের দক্ষিণাঞ্চলে প্রাণ হারালো পঞ্চাশ হাজারের মতো আদমসন্তান। গবাদি পশু, মাঠভর্তি পাকা শস্য, সুবিন্যস্ত ধানচালের গোলা, বৃক্ষ-লতাপাতা, ভূত্বক ও বৃক্ষকোটরের প্রাণবৈচিত্র্যসমূহের ক্ষয়ক্ষতির হিশেব-নিকেশ কে আর রাখে অত!

 

তিন

২৯ এপ্রিল ১৯৯১ সাল। ১০ নাম্বার মহাবিপদ সংকেতে ভরা উৎকণ্ঠা নিয়ে বিকেলের দিকে রাস্তার ধারের একটি চা-দোকানে বসে আছি। সঙ্গে বম আদিবাসী জাতির বর্ষীয়ান সন্তান, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মি. লালনাগ বম। বান্দরবান জেলার রুমা উপজেলায় বাড়ি। আমিও ডনবসকো মিশনারি হাই ইশকুলের তরুণতর শিক্ষক তখন। প্রায়শই বিকেল বা সন্ধ্যার দিকে ওই ছোট্ট চা-দোকানে তিনিসহ আরও জনাকয়েক আদিবাসী মারমা ও বাঙালি শিক্ষক আড্ডা জুড়তেন। জ্ঞানের জ্যোতি, বয়সের সম্ভ্রম, শিক্ষাব্রতে তাদের দীর্ঘদিনের অর্জন- কোনোটাতেই আমি তাদের সমকক্ষ নই। শুধু কবিতা লিখি- এই সুকোমলবৃত্তির বিবেচনায় আমার কিছুটা ঠাঁই হতো তাদের ওই নির্মল-নির্দোষ আড্ডায়। হ্যাঁ, আমারও একটি বিতর্কিত সম্পদ ছিল বইকি- প্রগল্ভতা! যা মূলত নিজের বক্র অভিমত প্রকাশের একধরনের একরোখামি। সেসবের মধ্যে থাকতো আদিবাসী মানুষের প্রতি সরকারি অবহেলার প্রতিবাদ ও সমালোচনা, তাদের ঐতিহ্যবাহী লোকায়ত সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক অধিকারের প্রতি পক্ষপাত। এই বয়স্ক মানুষেরা তা হা-করে শুনতেন আর ফাঁকে-ফাঁকে আদিবাসীদের জীবনধারার তখন নপর্যন্ত অনুল্লিখিত, অজানা সব তথ্যে আমার ভাষ্যকে আরও সমৃদ্ধ ও শাণিত করার পথ উন্মুক্ত করে দিতেন যেন। তবে কিছুটা সাবধানে, অনেকটা নিচু গলায়- যেহেতু বান্দরবান পার্বত্য জেলা তখনও সরকারি ভাষায় ‘ইনসারজেনসি’র আওতায়!

ওইদিন (২৯ এপ্রিল) আকাশ ও জমিনের চারধারে কেমন যেন ব্যাপক অদৃষ্টপুর্ব গুমোটভাবের ছায়াখসা অস্বস্তি আমার ভেতরেও জ্বলছিল ‘ঘুিস ঘুসি’। লালনাগ বম মহোদয় আকাশের দিকে তার কুতকুতে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বললেন : কবি, বাতাসের চাপা-চাপা গর্জন ভেসে আসছে পাহাড়ের ওপার থেকে, শুনছ? পরিস্থিতি তো মোটেও ভালো মনে হচ্ছে না। আজ আড্ডারুদের তেমন কেউ এলেন না। শুধু লিকলিকে গড়নের অঙ্কের স্যার জগদীশ চক্রবর্তী প্রায় দৌড়ের ওপর এসে চা খেলেন ফুড়ুৎ-ফুড়ুৎ শব্দ তুলে। তারপর বললেন, বাড়ি যাচ্ছি। তার বাড়ি কাছেই- কেরানিহাটের দিকে।

কেন?

মনে হচ্ছে বড় ঝড় হবে। আমার ঘরটা বহুদিনের পুরোনো। ঘরে এখন বউ ছাড়া কেউ নেই। তারপর একশলা ‘হিলম্যান’ সিগারেট ধরিয়ে ধোঁয়া ওড়াতে-ওড়াতে, লম্বা-লম্বা পা ফেলে জগদীশ বাবু চলে গেলেন বাস স্ট্যান্ডের দিকে। লালনাগ বাবুও ওঠে দাঁড়ালেন। আমার দিকে চেয়ে বললেন, আজ আসি। বেঁটেখাটো, গোলগাল সদাশিব আচরণের মানুষটাও পিঠ দেখিয়ে হেলেদুলে চোখের আড়াল হয়ে গেলেন। আমিও মারমা বাজারের রাস্তার ধারের ডেরায় ফিরে এলাম অগত্যা।

 

চার

সন্ধ্যার পর হঠাৎই বাতাসের বেগ বেড়ে গেল। থেমে-থেমে এই বেগ এসে বেড়ার অবস্থানের ওপর বারবার ঘা হেনে যাচ্ছে প্রাগৈতিহাসিক অন্ধজন্তুর ধরনে শোঁ শোঁ শব্দে। টিনের ছাউনির ক্ষণে-ক্ষণে ওলটপালট হবার দশাটা বেশ বোঝা যাচ্ছে। এভাবে রাত বাড়ে। আর সেই সঙ্গে থেমে-থেমে ঝড়ের আক্রোশটাও বাড়ে কমজোরি বেড়ার ঘরটার ওপর। এমন অবস্থায় মনে এলো রাত আরও বাড়লে ভাতঘর খোলা পাবো তো! তাই দুটো খাবো বলে বেরোই। রাস্তায় স্বল্পসংখ্যক মানুষের থমথমে চলাফেরা। তাদের চুল আর লুঙ্গিতে বাতাসের চোরাগোপ্তা হামলা চলছে বেশ এলোমেলো ভঙ্গিতে। শব্দ তুলে দোকানপাটগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। পরিচিত হোটেলওলা দেখেই দ্রুত ভাতের প্লেট সামনে রেখে বললেন, ‘অ স্যার, খাইয়েরে ঘরৎ যনগুই তাড়াতাড়ি! আঁরাও দোআন বাঁধি দিউম!’

রাতের দিকে পরিস্থিতি ভয়ংকর আকার ধারণ করলো। যেন একপাল দুর্ধর্ষ ঝড়ো-হার্মাদ আমার থাকার ঘরটাকেই শুধু লক্ষ করে সজোর ধাক্কা দিয়ে প্রচণ্ড গোঁ-গোঁ শব্দ তুলে কিছুক্ষণের জন্যে অন্যদিকে চলে যাচ্ছে উদ্যত তরবারি ঘোরাতে-ঘোরাতে। আবার ফিরে আসছে একই ভঙ্গিতে। সঙ্গে দাপুটে বড় সাইজের জলকণা টিনের চালে আছড়ে পড়ছে ক্ষিপ্রগতিতে। আমি স্বল্প আলোর ঘরটার বিছানায় (একটি কাঠের নড়বড়ে টেবিল আর চেয়ারও আছে বটে) জড়োসড়ো হয়ে গ্রামের বাড়িটার কথা ভেবে চলেছি। সাগরপারের সেই মাইজপাড়া গ্রামের আমাদের সদ্য তোলা চারচালা বাড়িটা। বাবার নিভৃত পরিচর্যায় মাথা তুলে দাঁড়ায় আর বারবার ভেসে যায় যে-বাড়ি। বাবা সর্বশেষ এটার নির্মাণকাজ শেষ করেছেন একেবারে অশক্ত শরীর নিয়ে। সারাদিন কাজের লোকেদের সঙ্গে লেগে থেকে বহু ব্যয়ে ও শ্রমে বাড়িটার কাজ শেষ করলেন ১৯৮৭ সালের দিকে। তারপর একটু বেশি মাত্রায় অসুস্থ হয়ে পড়লে শহর-বাড়িতে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন ডাক্তারের পরামর্শে। তবে হায়, ওই বাড়িতে তিনি আর যাবার ফুরসত পাননি। ১৯৮৯ সালের ১ ফেব্রুয়ারি চলে গেলেন আমাদের ছেড়ে। আমি এসব ভাবছি।

ওখানে তখন ছিল আমার বোবা ও বধির মেজোভাই, তার স্ত্রী ও তাদের একমাত্র শিশুসন্তান- মহীন। এ বাড়িতে তারা গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি পালনের একটা ছোটোখাটো খামার গড়ে তুলোছল। ছুটিছাঁটায় ঘরের অন্যেরা ওদের সঙ্গ দিতে যায়। এই তো আমিও  সেদিন গিয়ে দুইদিন, দুরাত ছিলাম। এসব ভাবতে-ভাবতে হয়তো নিদ্রামতো এসেছিল চোখে। বিদ্যুৎবিহীন ওই প্রায় নিয়ানডারথাল যুগের অন্ধকারের ভেতর ঘুম ভাঙে ঝড়ের অকল্পনীয়, ভীতিকর গর্জনে। গোটা ঘর কেঁপে-কেঁপে, দুলে উঠছে তৃণের মতো। আমার পাশের জুমিয়া মারমাদের বেড়ানির্মিত ঘরগুলো থেকে নরনারীর ভয়মিশ্রিত, উদ্বেগভরা চাপা-চাপা গলার স্বর ভেসে আসছে। আমি বিছানাটায় ক্রমাগত কুঁকড়ে যাচ্ছি এই ভয়ানক ভাবনার গহ্বরে যে, এই পার্বত্য শহরটাতে ঝড়ের ছোবল বিশাল-বিশাল পাহাড়ের প্রবল প্রতিপক্ষের বাধা পাওয়া সত্ত্বেও যে-মাত্রায় ভয়াল শঙ্কা জাগাচ্ছে, না-জানি, উপকূলের লোকবসতিতে ঠিক এখন, এই সময়টাতে কী ঘটছে, কী ঘটে চলেছে!

তখনও মোবাইলফোনসেট বা নেটের যুগ শুরু হয়নি। সাধারণ টিএন্ডটি ফোনও ধারেকাছে নেই। একমাত্র ইশকুল ও খ্রিস্টীয় মিশনের ফাদার-এর দপ্তরে বা গির্জায় আছে। তাও এই ঝড়ের রাতের ধারালো থাবার চক্রব্যূহ ভেদ করে কীভাবে অন্তত শহর-বাড়ির খবরটা নিই! সেই সময়ে আমাদের শহর-বাড়িতে টেএন্ডটির সংযোগ ছিল। না, কোনো পথ বা উপায় নেই কোথাও। ঝড়ের দাবড়ানি আর প্রমত্ত গর্জনের ভেতরে বিস্ফারিত চোখে স্থবির হয়ে বসে থাকা ছাড়া।

মনে পড়ে, এ ঝড়ের একটা নাম ছিল- ‘ম্যারি এন’। ২৫০ কিমি বেগে ‘ম্যারি’ চলেছিল। ‘ম্যারি এন’ ৬ মিটার (২০ ফুট) উচ্চতার জলোচ্ছ্বাস এনেছিল। এক লাখ আটত্রিশ হাজার মানবসন্তান সেই জলরাক্ষসের উদরে হারিয়ে গেল। দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় এলাকাজুড়ে অর্থাৎ পুরো উপকূলীয় বেষ্টনীতে এই ‘সুনামি’ প্রতিম কেয়ামত বয়ে গেছে। আনোয়ারা বাঁশখালী সন্দ্বীপ কুতুবদিয়া মহেশখালী এবং নোয়াখালী জেলার চরাঞ্চলের এক কোটি মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়ে নিঃস্ব হলো। গেরস্তের পরানের ধন বিশ লাখ গবাদি পশুসহ সহায়-সম্পদ বিলীন হয়ে গেছে কোন্ অজানায়! এসব তথ্য জানছি পরদিন, পরদিন আরও পরদিন নানা সূত্রে- সংবাদপত্রে বেতারে টিভিতে আর শোকতপ্ত মানুষের মুখ থেকে কাঁপা-কাঁপা কণ্ঠে। অর্ধস্ফুট রোদনের কইছালিতে।

পয়লা মে’র ছুটির দিনে শহরে যাবো ভাবছি। কিন্তু বাজারে দোকানপাটে জড়ো হওয়া মানুষেরা বলাবলি করছে, বান্দরবান-কেরানিহাট সড়কে তখনও কোমরসমান থইথই জল। আর বড় বড় সব মুখ থুবড়ে পড়া বৃক্ষের সারিতে পুরো আরাকান সড়ক অবরুদ্ধ। পরিবহন ব্যবস্থাও স্থবির।

তবুও ও-পথ আমি হেঁটেই যাবো। কাঁধে পাহাড়িদের নিত্য ব্যবহার্য কাপড়ের ঝোলায় শার্ট-পেন্ট-গামছা-টুথব্রাশ আর পায়ে স্পঞ্জের চপ্পল ভরসা করে আগ্রহী আমার দুজন মারমা ছাত্রকে সঙ্গে নিয়ে জোর কদমে হাঁটতে থাকি। সত্যিই তো! পিচের সড়কের ওপর বেগবতী ঘোলা-ঘোলা ‘চারিদিকে বাঁকাজল করিছে খেলা …। সেই খলখলানো জলস্বর আর পথপাশের মহান বৃক্ষগণের শেকড় উপড়ানো বা আধাআধি ভেঙে পড়া বিভৎস, বিপর্যয়কর পতনের দৃশ্য আমাদের থমকে দাঁড়াতে বাধ্য করে। ভারি ভগ্ন মন আর ঘামভেজা শরীর নিয়ে ফিরে আসতে হলো মারমা বাজারের বকর মাস্টারের ঝড়ধ্বস্ত আমার সেই ভাড়াঘরটায়।

 

পাঁচ

এভাবে আরও দুদিন গেল। ইতোমধ্যে বাড়ি থেকে ইশকুলের টিএন্ডটি ফোনে ছোটোভাই শাহিন কল দিয়েছে। তারা ভালো আছে, তবে শহর-বাড়ির সামনের দিককার দেউড়িঘর- যেটিতে আমি থাকতাম কিছু বইপত্রসহ. ওটা এবং আমাদের সেমিপাকা ভাড়াঘরগুলো সম্পূর্ণ ভূমিসাৎ হয়ে গেছে। আর গ্রামের বাড়িতে আমাদের বোবা ও বধির ভাই ও তার বউটি ঐশ্বরিক কৃপায় শরীরের নানাস্থানে ঝড়ের আঘাতের দাগ নিয়ে কোনো রকমে বেঁচে গেলেও তাদের প্রাণের প্রথম সন্তানকে ধরে রাখতে পারেনি- ও ভেসে গেছে ওদেরই চোখের সামনে দিয়ে, হাত ফস্কে। আর বাবার শেষ বয়সে যত্নে গড়া সেই দৃষ্টিকাড়া, মজবুত বাড়িটা লোহা-লক্কড়ের শক্ত বাঁধুনি ও গাঁথুনিসহ উৎপাটিত হয়ে গেছে চলে গেছে ‘বেবাম সায়রে’র কোন্ অতলমহলে! ততদিনে পানি নেমেছে। ভিটিটা খাঁখাঁ করছে দরিয়ার সেই চিরাচরিত শান্ত, উদ্দাম হাওয়ায়। এসব তথ্য ইশকুলের বয়স্ক দপ্তরি ফণী দাশ এসে জানালো তার এলোমেলো ভাষ্যে। আর আমি বুঝে নিলাম, আমাদের আবারও সর্বনাশ ঘটে গেছে।

মে মাসের প্রথম সপ্তাহের মধ্যপর্বে কেরানিহাট হয়ে রাস্তার পানি সরেছে ভাঙচুরের নানা চিহ্ন রেখে চারপাশে। পতিত বৃক্ষগণের প্রকাণ্ড শরীর ও তাদের শাখা-প্রশাখাসমূহ কেটেছেঁটে রাস্তাও নাকি অনেকটা পরিষ্কার করেছে সদাশয় আমজনতা। এসব জেনেশুনে বহু কায়ক্লেশে, প্রান্তিক মনে অগণন যাতনার ভার নিয়ে শহর-বাড়ি এলাম পর্বে-পর্বে। বাড়ির উঠোনে পা ফেলার আগেই আমার অনেক স্বপ্নসাধ ও নিঃসঙ্গ যৌবনের দিনরজনির সাক্ষী দেউড়িঘরটি আর সমতালে সারবব্ধ আধপাকা ভাড়াঘরগুলো দেখি মুখ থুবড়ে পড়ে আছে থকথকে কাদাজলের শয্যায়।

মা নুরনিসা বেগম বেগম আমাকে দেখতে পেয়ে ‘অ পুত’ বলে দৌড়ে এসে জাপটে ধরে হাউমাউ করে নীরবে কাঁদলেন অনেকক্ষণ। আমিও নিঃশব্দে তপ্ত আশ্রুবিন্দু ফেলি ছোটোখাটো গড়নের মায়ের শাদা চুলের সিঁথির ওপর। সেই তপ্ত জল মাকে বিচলিত করে। তাই দ্রুত তার কান্না সম্বরণ করে আমাকে ঘরে টেনে নিয়ে গেলেন আর বাকহারা হয়ে বসে রইলেন আমার কাছটি ঘেঁষে। ঘরের আর সবাই সজল চোখে আমার দিকে চেয়ে আছে। যেন তারা বলে চলেছে- এই কি জীবন? আশা নেই, ভাষা নেই। এই কি জীবন?

ঝড় নামক করাল দৈত্যের দুহাতে ধরা শাণিত কৃপাণের ধারে কাটা গুচ্ছগুচ্ছ, ছিন্নভিন্ন মানুষের সকরুণ মৃতদেহ তখনও জড়ো হয়ে আছে সারাদেশের উপকূলজুড়ে।

 

ছয়

তারপর বহুদিন গেল।

একদিন চারপাশে তার সংবেদনশীল দৃষ্টির নজর বুলোতে-বুলোতে আমার বাড়ি এলেন অসাধারণ এক সাধারণ মানুষÑ সৈয়দ মহিউদ্দিন। তাকে দেখতে পেয়ে আমার চোখে কি অশ্রুকণা জমেছিল কোনো? তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরে নিয়ে গেলেন পাড়ার দেহাতি এক চা’র দোকানের এককোণে। কারো ঘরে প্রবেশে এ লোকায়ত মুসাফিরের ওপর যেন কোনো দৈব নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। কখনোই ঘরে ঢোকানো গেল না তাকে। দৃষ্টির সীমানায় দাঁড়িয়ে দূর থেকে হাতছানিতে ডাকেন কেবল হাসিভরা মুখে। চট্টগ্রাম আঞ্চলিক ভাষায় সৈয়দ মহিউদ্দিনের অপূর্ব কথা-সুর আর অনন্য গায়কির খ্যাতি কে না জানে? সেই চা’র দোকানে ২৯ এপ্রিলের প্রাকৃতিক মারণযজ্ঞের ওপর সদ্য লেখা একটি গান শোনালেন তার সংযত, কিন্নর কণ্ঠে, ধীরে-ধীরে। সেই গানের কথা এমন সুবেদী ও মর্মভেদী, অতঃপর এমন অফুরান আশাজাগানিয়া হলো যে, শুনতে-শুনতে উদ্বেল হয়ে উঠেছিল আমার সংকুচিত চিত্ত। বাংলাদেশের উপকূলীয় মানুষগুলোর জীবনসংগ্রাম ও তাদের বেঁচে থাকার দুর্বার কাঙ্ক্ষার অক্ষয় সনদ হয়ে আছে এ গান। গানটি আমার ভেতরে সঞ্জীবনীশক্তি আনলো, ঠিক বিজলি চমকের কালে ফকফকা খোলা প্রান্তর দেখার মতো :

গর্কি তুয়ান, বন্যা খড়া মোহামারী ঘুন্নিঝড়
ভাসাই মারে ধ্বংস গড়ে মাইনচে-ত আর বঅই নরর \
হগ্গল কামর ধান্ধা চলের আবার নয়া সিষ্টি অর \

ভাংগা গাছত নয়া ঠেইল্ পাতা মেলি দেখার খেইল্
পংখি আবার উডের-ঘুরের চুপ্পে প্রেমর কথা কঅর \

দুনিয়া দুরগইত্যা বোঝা, বাচন কঠিন মরণ সোজা
পক্কীতির ইচ্ছার উদ্ধি গরার কিছু নাই

আশায় আনে মনর বল নইলে জীবন টলমল
আপদ-বলাই চাই নো আইয়ে গরীব মইধ্য তোয়াংগর \

মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না। আবশ্যক ঘরগুলো * দিয়ে চিহ্নিত করা হয়েছে