আমার শিক্ষকরা ক্লাসরুমের বাইরের শিক্ষক। যেমন ব্রহ্মপুত্র নদ। এই নদ থেকে আমি গতি, চলমানতা ও ক্ষমার শিক্ষা পেয়েছি। আমার শিক্ষক নীলাচল পাহাড়। এই পাহাড় আমাকে শিখিয়েছে ধৈর্য, মন্থরতা ও সংকল্পের পাঠ। আমি বিজ্ঞান নিয়ে পড়েছি কিন্তু আমার প্রকৃত শিক্ষক গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলার প্রফেসর বীরেন্দ্রনাথ রক্ষিত। স্যার আমার প্রথম জানালা। সেই জানালা দিয়ে আমি সাহিত্যের জগতকে তিলতিল করে বুঝতে শিখেছি। স্যারের কতগুলো শিক্ষা আমার কাছে বেদবাক্য। যেমন দুটি শব্দ বা দুটি পংক্তির অন্তর্বর্তী শূন্যতাকে কীভাবে অনুভব করতে হয়, শব্দের মোটিফ ধরে এগোতে পারলে লিখনের কাছে পৌঁছানো যায়, লেখককে বাইরের জীবনের ঘটনাক্রম নয় বরং লেখার ভেতরের ধুকপুকানি থেকে লেখক সত্তাকে উন্মোচন করা যায়। তবে আমি আজ এই শিক্ষকদের কথা বলছি না। বলছি এমন এক শিক্ষকের কথা যিনি আমরা জীবনকে জীবনানন্দীয় করে তুলেছেন।
নবারুণ ভট্টাচার্যর মৃত্যুর পর বিশেষ সংখ্যার জন্য
‘এইসময়’ পত্রিকায় লেখা জমা দিয়েছি, বিভাগীয় সম্পাদক ফোন করে জানতে চাইলেন, আমার সঙ্গে নবারুণদার কোনও ছবি আছে কি না। আমি থতমত খেয়ে বললাম, না তাে। অথচ নবারুণদা প্রায়শই আমার বাড়ি এসেছেন, আমি নবারুণদার বাড়ি গেছি, নিয়মিত আড্ডা তাে বহাল ছিলই, কখনও ছবি তােলার কথা ঘুণাক্ষরেও আমার মনে হয়নি। হ্যাঁ ভূমেন্দ্র গুহর সঙ্গেও আমার কোনও ছবি নেই। অথচ এই লেখাটার সঙ্গে তেমন একটা জুতসই ছবি থাকলে মন্দ হত না। ঘুরে ঘুরে সাক্ষাৎকার নেওয়ার সময় তাে ক্যামেরা ও টেপ-রেকর্ডার নিয়েই ঘুরতাম ! আসলে কেউ কি গাছের সঙ্গে, সূর্যের সঙ্গে, বাতাসের সঙ্গে ছবি তুলে রাখে নাকি ? আমিও জাস্ট তুলিনি। তা ছাড়া এমন কোনও ভাবনার অবকাশও হয়নি। ভূমেন্দ্র গুহ তাে ভূমেন্দ্র গুহই। এত বাহুল্য কেন ? আয়ােজন কেন ? কেন এত কলরব ?
কবে থেকে পরিচয় ? একটা শুরু তাে থাকে। জন্মের। মৃত্যুর। অথবা থাকে না। তখন সবে ‘বিভাব’ পত্রিকার জীবনানন্দ সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছে। অক্টোবর মাস। সংখ্যাটা হাতে পেয়ে একটা ঘাের-লাগা ভাব।পাগল-খ্যাপা অবস্থা। সেটা ১৯৯৮। দিনরাত ‘বিভাব’-এর সংখ্যাটা নিয়ে যাকে বলে ডুবজলে যেটুকু প্রশ্বাস ! এমন একটা সময় একদিন সন্ধ্যাবেলা অনির্বাণ (ধরিত্রীপুত্র) দার ফোন। ভূমেন্দ্র গুহ জীবনানন্দর ডায়েরি উদ্ধারের কাজে সাহায্য করতে পারে এমন কাউকে খুঁজছেন, যদি আমি দেখা করি। আসলে অনির্বাণদা আমার জীবনানন্দ ও কমলকুমারের প্রতি ভালোবাসার কথাটা কিছুটা হলেও জানতেন। অনির্বাণদার জীবনদীপ বিল্ডিং-এর অফিসে আমাদের মধ্যে জীবনানন্দ নিয়ে দীর্ঘ আলােচনা হয়েছে। তা ছাড়া আমাদের মাঝখানে কমন একজন প্রিয় মানুষ ছিলেন, আমার আরেকজন শিক্ষক বীরেন্দ্রনাথ রক্ষিত, যাঁর কমলকুমার ও জীবনানন্দ নিয়ে কাজ প্রায় প্রবাদপ্রতিম। এবং আজকে আমার যতটুকু যা সামান্য লেখালেখি, তার নেপথ্যে রক্ষিত স্যারের ভূমিকা সবচাইতে বেশি।
আমি তাে প্রস্তাবটি শুনে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলাম। ভূমেন্দ্র গুহ তখন প্রায় মিথ। ‘দরগা রােড’ কাগজ করেন, রাতভর আড্ডা বসে দরগা রােডের বাড়িতে। রথী-মহারথীরা সেই আড্ডা আলােকিত করেন । তা ছাড়া সদ্যপ্রকাশিত ‘বিভাব’তাে আমার হাতে । কাকে বলে সম্পাদনা , চোখে আঙুল দিয়ে যেন দেখিয়ে দিয়েছেন। তাে একদিন গুটিশুটি গিয়ে হাজির হলাম দরগা রােডের বাড়িতে। তখন প্রায় সন্ধ্যা ৭.৩০। জীবনে সেদিন অনেক কিছু প্রথম দেখলাম। পাজামা-ফতুয়া পরা ডাক্তার, বাংলাতে প্রেসক্রিপশন-লেখা ডাক্তার, রােগীর সঙ্গে খেজুরে গল্প জুড়ে দেওয়া ডাক্তার। তাে বসেই আছি, সমস্ত রােগী চলে যাওয়ার পর আমার ডাক এল। দুরুদুরু বক্ষে গিয়ে বসলাম সামনের চেয়ারে। আমাকে যেন প্রায় দেখলেনই না, বা দেখেও পােকামাকড় জ্ঞান করলেন। ঠিক বাঁ হাতে কিছু নামের লিস্টের একটা কাগজ ধরিয়ে দিয়ে তাচ্ছিল্যভরে বললেন, দেখুন উদ্ধার করতে পারেন কিনা।
বাড়ি ফিরে এসে কেমন একটা রােখ চেপে গেল, (পরে শুনেছি এই লিস্টটা অনেক হাতফেরতা হয়ে আমার কাছে এসেছিল ) লাইব্রেরিপ্রীতিটা আমার আগে থেকেই ছিল। বইপত্রও ছিল সামান্য। তাে এক সপ্তাহ আদা-জল খেয়ে লেগে পড়লাম। এবং ২ / ৩ টি ছাড়া প্রায় সবকটি উদ্ধারও করেও ফেললাম। সেই শুরু। আর কোনও চৌকাঠ পেরােনাে নয়, একেবারে সটান মানুষটার হৃদয়ে প্রবেশ করলাম। অতঃপর পরবর্তী ১০ টা বছর এমন কোনও দিন মনে পড়ে না , আমাদের দেখা হয়নি বা ফোনে কথা হয়নি। শুধু আমি নয়, আমার পরিবার ও ভূমেন্দ্র গুহর পরিবারও কাছাকাছি হলাম। সে এক সুদীর্ঘ ইতিহাস। অন্য প্রসঙ্গ।
শেষ ক-বছর যে জীবনানন্দকে দেখেছেন, সেই দেখার আলাে আমি ভূমেন্দ্র গুহর চোখে-মুখে ফুটে উঠতে দেখতাম। জীবনানন্দর প্রসঙ্গ উঠলে, বিশেষত দিদির প্রসঙ্গ ( জীবনানন্দর বােন সুচরিতা দাশ ) উঠলে শিশুর মতো হয়ে উঠতেন। কত গল্প। কত ঘটনার কথা যে বলতেন। আবার কাজের ক্ষেত্রে কঠোর শিক্ষক। কত যে বকুনি খেয়েছি। শিখেছি যে কত কিছু। কীভাবে পাণ্ডুলিপি উদ্ধার করব, হাতে ধরে শিখিয়েছেন। শিখিয়েছেন জীবনানন্দর হস্তলিপি উদ্ধারের প্রক্রিয়াও।
একটা ঘটনার কথা মনে পড়ে। আমার বাড়ি। সন্ধ্যা হয় হয়। কথা উঠেছে জীবনানন্দর নারীবিদ্বেষ নিয়ে। তুমুল তর্ক। কথার মাঝখানে দেখি, শাশ্বতীকে বললেন, কাব্যসমগ্রটা নিয়ে আসতে। তারপর সেই সন্ধ্যায়, না থেমে একের পর এক জীবনানন্দর প্রেমের কবিতাগুলাে পড়ে যেতে লাগলেন। সুচেতনা , শঙ্খমালা , শ্যামলী , বনলতা , ..। থামলেন যখন চোখভরা জল । জল আমদের চোখেও। আর-একদিন। সেটাও আমাদের বাড়ি। সন্ধ্যা। জানালার সামনে দাঁড়িয়ে খুব বিষন্ন কণ্ঠে যেন স্বগােতক্তি করছিলেন। সারাজীবন অপারেশন করে কটা লোক আর বাঁচিয়েছি, বড়ােজোর ১০০। একটা বােমা পড়লে ১০০ লােক মারা যায়। অথচ জীবনানন্দ মানুষটা বড্ড অভাগা, দেখার কেউ নেই লােকটার, আমি যদি শুধু এই কাজটাই করতাম।
৭/৮ বছরে আমাদের যৌথ সম্পাদনা ও আমার সম্পাদক সহায়কের ভূমিকা হিসেবে ১৫ টা বই প্রকাশিত হয়েছে। একটি বইয়ের ভূমিকায় আমার সম্পর্কে লিখেছিলেন, ‘গৌতম তাঁর স্বাভাবিক ভালোবাসার প্রবণতার বশে এখন আমার ক্রাচ হয়ে আছেন নিজেই।’ ঠিক আমার বাবার বয়সি ছিলেন মানুষটা। আর আমার মানুষটাকে ঠিক শিশুর মতােই মনে হত। অমন উচ্ছ্বাস, অভিমান ও রাগ।
কত স্মৃতি। কত সাক্ষাৎকার যে একসঙ্গে নিয়ে ফিরেছি।কত আড্ডা। কতশত বই জোগাড় করা। কত রােদ ঝড়-বৃষ্টি মাথায় করে ফেরা। ডায়েরির একেকটা এন্ট্রি উদ্ধারের পর সে কী উল্লাস। কত স্মৃতি। কত সাক্ষাৎকার যে একসঙ্গে নিয়ে ফিরেছি ।সব কথা লিখলে মহাভারত হয়ে যাবে। অমন নিষ্ঠাভরে কাজ করতে খুব কম মানুষকেই দেখেছি। কেন ভারতবর্ষের প্রথম ওপেন হার্ট সার্জারিটিতে উনি কেন যুক্ত ছিলেন টের পেতাম।
আমাকে একটি বই উৎসর্গ করেছিলেন। শাশ্বতীকে একটি। আমি কোনও বই তাঁর জীবিতকালে উৎসর্গ করতে পারিনি। মৃত্যুর পর করেছি। শ্মশানে গিয়েছিলাম। শ্রাদ্ধেও। থাকতে পারিনি বেশিক্ষণ। আসলে সহ্য করতে পারিনি। অতিজীবিত ছিলেন যে মানুষটি।
তখন ভূমেন্দ্র গুহর অনেক বন্ধু, অনেক শুভাকাঙ্ক্ষী, অনেক পরামর্শদাতা, অনেক জনপ্রিয়তা। তখন আমি রাজস্থানে। আমি বরাবরই ভিড়ের মধ্যে গুটিসুটি এক কোণে থাকা মানুষ। পার্টি করতে পারি না। নেশা করতে পারি না। মন জুগিয়ে কথা বলতে পারি না। নিজের কথা মুখ ফুটে বলতে পারি না। আমার ভূমেন্দ্র গুহ তাে দুপুরবেলা সল্ট লেকের বাড়িতে নিজের হাতে ভাত বেড়ে খাওয়াচ্ছেন, যাবতীয় ফিক্সড ডিপােজিট আলমারি থেকে বের করে হিসেব নিকেশের পরামর্শ চাইছেন, আমার ভূমেন্দ্র গুহ সল্ট লেকের রাস্তার অল্প আলােয় অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপির খবর শুনে আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছেন, এমন কোনওদিন মনে পড়েনা আমাকে করুণাময়ী মােড় অবধি এসে গাড়িতে না তুলে ফিরেছেন। তবে সামান্য হলেও আমার অহংকারও আছে কিছু। আসলে ভালােবাসা। আমিই একমাত্র ব্যক্তি, যে ভূমেন্দ্র গুহর সঙ্গে যুগ্মভাবে জীবনানন্দ দাশের গ্রন্থ সম্পাদনা করেছি।
কবি ছিলেন মানুষটা। আদ্যপান্ত একজন কবি। প্রজ্ঞায় বাঁচতেন মানুষটা। প্রজ্ঞা তাঁর মতে, ‘সীমাতিক্রান্ত জ্ঞানের বিশুদ্ধতা ‘। মহাচার্য দীপঙ্করের ‘বােধি-পথ-প্রদীপ’- এর এই সূত্রে তাঁর মতি ছিল,’প্রজ্ঞার সব ধর্মস্বভাবত আলম্বনহীন। তাই নৈরাত্ম-ভাবনাই প্রজ্ঞা-ভাবনা।’ এমন নির্মোহ, যুক্তিনিষ্ঠ ও দরদিমানুষ খুব কম দেখেছি। আমার কাছে জীবনানন্দ দাশের সমার্থক শব্দ ভূমেন্দ্র গুহ। আমার শিক্ষক সেই ভূমেন্দ্র গুহ যিনি কবিতায় লেখেন, ‘চোখে যে গড়াবে জল, সেরকম সাহসিক নই …’!
