জীবন ঝড়ের কোন নাম নেই ★ রেহেনা মাহমুদ 

“লা ইলাহা ইল্লা আনতা সুবহানাকা ইন্নি কুনতু মিনাজ জোয়ালিমিন….”

নানি উচ্চস্বরে সুর করে করে বিপদ-আপদের দোয়া “দোয়া ইউনুস” পড়ে যাচ্ছেন। আকাশে বিজলির উৎপাত। বজ্রপাতের শব্দে কানে তালা লাগার অবস্থা। আর নানির কণ্ঠ সেই বজ্রপাতের শব্দের সাথে উঠছে-নামছে। বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ বাড়ছে, কমছে। কারো কারো ঘরের চালাও উড়ে গেছে। প্রবল বাতাসের ঝাপটায় গাছপালা ডালপালাসহ একবার এদিকে, আরেকবার ওদিকের জমিনে নুয়ে পড়ছে।

ওই তো, মড়মড় করে বড় আমগাছটার মোটা একটা ডাল কররাত জোর শব্দে ভেঙে পড়ল যেন। গাছের সাথে একটু করে ঝুলে দুলছে ডালটা। দূর দিগন্তে মাথা উঁচু করে থাকা তালগাছটা বিদ্যুৎ চমকানোর সাথে সাথে ক্যামেরার ফ্ল্যাশলাইটের মতো দৃশ্যমান হচ্ছে, আবার অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছে। ভর বিকেলে মনে হচ্ছে রাত নেমে পড়েছে। চারদিক এমন ঘুটঘুটে অন্ধকার।

দোয়া ইউনূসের ফাঁকে ফাঁকে নানীর গলা শোনা যায়— “আল্লাহ, দয়াল আল্লাহ রহম করো,… বড় বউ,… হাঁসের বাচ্চাগুলারে খোপে নেও। এ শাহনাজ, ছাওয়ালগুলারে নিয়ে আমার ঘরে আয়….”

বিশাল বড় বাড়ি। একটা নানির ঘর, একটা বড় মামার, আরেকটা ছোট মামার। এছাড়া আছে কাচারি ঘর, যেটাকে বাহিরঘরও বলা যায়। অন্যটা পাকের ঘর বা রান্নাঘর। পুরুষ মানুষেরা বাহিরের কাচারিঘরে বসে। আত্মীয়-স্বজন এলে নারী আর বাচ্চাকাচ্চারা নানীর ঘরেই থাকে। নানীর ঘরে দুইটা খাট, একটা সিন্দুক আর মাচা। মাচায় গোলা ভর্তি ধান, হাঁড়ি ভর্তি মুড়ি, মোয়া, খই, চিড়া ইত্যাদি। সিন্দুকের উপরেও বিছানা পাতা। বিশাল সে সিন্দুকে থাকত নকশি করা কাঁথা, দস্তানা, কাসার বাসন-কোসন। মেহমান এলে এসব বের করা হতো। দলিল-দস্তাবেজ, গয়নাগাটিও রাখা হতো সেখানে। নানি খাটে শুত না। মাটিতে পাটি বিছিয়ে নাতি-নাতকুড় নিয়ে থাকতেন। সেখানেই বসতেন আর পানের বাটা থেকে পান নিয়ে চুন, জর্দা, সুপারি দিয়ে মুখে পুরতেন। অন্য ঘরগুলোয় খুব একটা যেতে দেখিনি তাকে। তার কাছেই সবাই আসত। তার ঘরটিই সারাদিন জমজমাট। নাতি-পুতি, ছেলে-মেয়ে দিয়ে ঘেরা থাকতেন। তিনি এ সংসারের সর্বেসর্বা। সেই ঘরের দাওয়ায় বসেই ঝড়ে ফসল ও অন্যান্য ক্ষতির আশঙ্কায় তিনি দোয়া-দরুদ পড়ে যাচ্ছেন। বোশেখ মাসের কালবৈশাখী বলে কথা! যেমন বাতাসের বেগ, তেমন বজ্রপাত, আর সাথে চামড়ায় সুঁই বিঁধে যাওয়ার মতো তীব্র বৃষ্টি। ধান কাটার সময়ে এমন ঝড় গ্রামের মানুষের জন্য বড় বিপদের।

আমরা চট্টগ্রাম থেকে ছুটিতে এসেছি। দুই মামার ছেলেমেয়ে মিলে আমরা দস্যিদের সংখ্যা নেহাত মন্দ না। সবাইকে ঝড়-বৃষ্টির দিনে আটকে রাখা তো যেমন-তেমন কম্ম না। এমন ঝড়বাদলের দিনে ঘরে বন্দী থাকা!—এ যে অসম্ভব। কার কার ভিটের কোন কোন গাছে কচি, আধাপাকা বা পাকা আম ঝুলে আছে, সবই তো আমাদের মুখস্থ। হালকা বাতাসে দু-একটা পাকা আম পড়লেই আমাদের সেটা পাবার জন্য যে হুড়োহুড়ি লেগে যায়! সেখানে এইরকম ঝড়ে আমাদের পায় কে!

আমাদের তখন একমাত্র দুশ্চিন্তা, সর্বাগ্রে সব আম কুড়িয়ে পাড়ার অন্য বাচ্চাদের কী করে টেক্কা দেব। এটা যে কত সিরিয়াস একটা ব্যাপার, তা কী ওই বড়রা বুঝবে! তারাতো ভেবেই পায় না, বাড়ির ভিটেয় এত এত আম-জাম-ফল-ফলাদির গাছ থাকতে অন্যের ভিটে থেকে এত যুদ্ধ করে কুড়িয়ে এনে কেন খেতে হবে আমাদের!

দেরি হলে আমাদের ভাগ্যে ছাই জুটবে, এই না ভেবে আমরা বাচ্চাকাচ্চার দল এক দৌড়। আমাদের আটকায় কার সাধ্য! কিন্তু এ কী! এই ঠাডা-পড়া ঝড়ের দিনে, যেখানে ভেবেছি আমাদের মতো দুঃসাহসী এ গাঁয়ে আর কেউ নেই, সেখানে একদঙ্গল ছেলেমেয়ে, কেউ লুঙ্গি গুটিয়ে, কেউ ফ্রকের কোঁচড়ে, আবার কেউ কেউ বাঁশের খাঁচি (বাঁশ দিয়ে বানানো ঝুড়ি বিশেষ) নিয়ে আম কুড়ানো শুরু করে দিয়েছে। সেখানে শেষ করে কেউ কেউ আবার আরেক বাড়ির দিকে দৌড় দিয়েছে। কে বলবে দুনিয়া ভেঙে ঝড়-বৃষ্টি নেমেছে এ তল্লাটে!

ছোটবেলার ঝড় মানেই তো এমন, আম কুড়ানো, ঝড়ের সাথে পাল্লা দিয়ে নিজেকে জয়ী করার তাড়না। কী ক্ষতি হচ্ছে না হচ্ছে, সেসব বোঝার বয়স নয় তখন। কুড়ানো আম ঝিনুকের খোলে ছুলে, বড় মামির বানানো সর্ষের ঝাঁঝালো কাসুন্দি মাখিয়ে খেয়ে দাঁত টক করে ফেলার আনন্দ তখন অপার্থিব।

এখন ঝড় এলে শৈশবের মতো দৌড়াদৌড়ি নেই, নেই আম কুড়ানোর আকুলতা। এখন ঝড় এলে দরজা-জানালা বন্ধ করে নিরাপদে বসে থাকা আর আবহাওয়ার সংবাদ জানা কেবল। কয় নম্বর বিপদসংকেত চলছে, তা জেনে বুঝে নিই বিপদের আলামত। তবে প্রকৃতির এই রুদ্র রূপের সাথে বড় হতে হতে পরিচয় ঘটে অন্যরকম এক ঝড়ের সাথে, যার সাথে আমাদের লড়াই অনিবার্য। অথচ এ ঝড়ের কোনো নাম নেই; না সে কালবৈশাখী, না সাইক্লোন, না টর্নেডো। এর আগমনেরও নেই কোনো ঋতু। গ্রীষ্ম, বর্ষা, শীত, বসন্ত—যে কোনো সময় এ আঘাত হানতে পারে। নিঃশেষ করে দিতে পারে বাঁচার সঞ্জীবনী। এমন শত শত ঝড়ের মুখোমুখি হয়ে বাঁচতে-বাঁচতে, মরতে-মরতে, যুঝতে-যুঝতে পৌঁছেছি এ বেলায়।

স্মৃতির ভারে ক্লান্ত মগজে নেই তেমন কোনো সুখস্মৃতি, যার সুধা পিয়ে কাটানো যায় অলস বেলা। বোশেখের আচম্বিত ঝোড়ো হাওয়া-বৃষ্টিতে এখনও শৈশবের সেই আমকুড়োনোর চর্বিতচর্বণ। তবু কোনো এক টালমাটাল সময়ের তলদেশ থেকে উঁকি দিতে চায় কোনো এক উথাল-পাথাল ঝড়বেলা। সে এক অদ্ভুত ঝড়। বড্ড এলোমেলো করে দেয়। তখন রবি ঠাকুরের কাছে পাওয়া যায় এর টোটকা। পাওয়া যায় আশ্রয়। তার গানই তখন হয়ে ওঠে একমাত্র অবলম্বন। সে ঝড় জীবন-মরণের সীমানা ছাড়ায়ে যায় আর অদ্ভুত উন্মাদনায় আগ্রাসী হয়ে ওঠে। এ ঝড় বিস্ময়কর, রোমান্সকর। শ্রাবণের ঘনঘোর বিকেলে, যখন সন্ধ্যা নামি নামি, ঝড় আসি আসি করছে, যখন ভেতর ঝড় বাহির ঝড়ের সাথে একাকার হতে চাইছে, মনে পড়ে তিনি শিলাইদহে বসে কোনো এক শ্রাবণেই লিখেছেন আমার জন্য মল্লার রাগে শ্রাবণের গান—

“আজি ঝড়ের রাতে তোমার অভিসার
পরানসখা বন্ধু হে আমার॥
আকাশ কাঁদে হতাশ-সম,
নাই যে ঘুম নয়নে মম
দুয়ার খুলে হে প্রিয়তম, চাই যে বারে বার॥…”

ইউটিউব ছেড়ে আমি ডুব দেই তাতে। একবার… দু’বার… বারবার।

মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না। আবশ্যক ঘরগুলো * দিয়ে চিহ্নিত করা হয়েছে